খুঁজুন
                               
, ,
           

দেশে চাহিদার চেয়ে বেশি সার মজুত আছে: কৃষিমন্ত্রী

ফরিদপুর প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬, ৯:১৭ অপরাহ্ণ
দেশে চাহিদার চেয়ে বেশি সার মজুত আছে: কৃষিমন্ত্রী

কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী জনাব মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেছেন, দেশে সারের কোনো সংকট নেই, আমরা চাহিদার তুলনায় আগামী চার মাসের জন্য প্রয়োজনীয় সার অতিরিক্ত মজুত রেখেছি। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও দুষ্কৃতিকারীরা মিলে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি চেষ্টা করছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে সরকার।

শনিবার (২৯ আগস্ট) দুপুরে ফরিদপুর সদর উপজেলা পরিষদ কনফারেন্স রুমে জেলা প্রশাসন ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের যৌথ উদ্যোগে স্থানীয় পেঁয়াজ ও পাট চাষীদের সাথে এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

কৃষিমন্ত্রী বলেন, ফরিদপুর পেঁয়াজ উৎপাদনে করে দেশীয় চাহিদার ২৫ শতাংশ পূরণ করে। আমরা পেঁয়াজ চাষীদের জন্য এয়ার ফ্লো মেশিন দিয়েছি, যা দিয়ে দীর্ঘদিন পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। এছাড়া আগামী মৌসুমের আগেই আরো অনেক চাষিদের এই এয়ার ফ্লো মেশিন দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, ফরিদপুর পাট উৎপাদনে বিখ্যাত, পাটের সঠিক মূল্য যেন চাষিরা পান, সে বিষয়ে কাজ করছে সরকার। এছাড়া বন্ধ হয়ে যাওয়া পাটকলগুলো চালুর জন্য সরকার উদ্যোগ নিয়েছে।

মতবিনিময় সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এমপি, ফরিদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য চৌধুরি নায়াব ইউসুফ, ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. শহিদুল ইসলাম বাবুল এবং ফরিদপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য প্রফেসর ড. মো. ইলিয়াস মোল্লা, কৃষিসম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফাতেমা ইসলাম, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোদারেস আলী ইছা, ফরিদপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. আফজাল হোসেন খান পলাশ।

ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক মাজহারুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সভায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সোহরাব হোসেন, সদর উপজেলার নির্বাহী অফিসার মেশকাতুল জান্নাত রাবেয়া, সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. শফিকুল ইসলাম, জেলা বিএনপির সদস্য সচিব একে কিবরিয়া স্বপন, জেলা বিএনপির আব কমিটির সদস্য ও মহানগর কৃষক দলের সভাপতি মামুন ও রশিদ মামুনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা ও প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং চাষিরা।

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ

জনগণকে সঙ্গে নিয়ে অপরাধ দমনের নির্দেশ আইজিপির

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬, ৯:০৪ অপরাহ্ণ
জনগণকে সঙ্গে নিয়ে অপরাধ দমনের নির্দেশ আইজিপির

জনগণকে সঙ্গে নিয়ে অপরাধ দমনে মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। একই সঙ্গে অপপ্রচার ও গুজবের বিষয়ে সতর্ক থাকার পাশাপাশি অপরাধ সংঘটনের আগেই গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

শনিবার (২৯ আগস্ট) রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের বাংলাদেশ পুলিশ অডিটরিয়ামে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের ত্রৈমাসিক সম্মেলনের শেষ অধিবেশনে সভাপতির বক্তব্যে আইজিপি এসব নির্দেশনা দেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সকালে প্রধান অতিথি হিসেবে দিনব্যাপী এ সম্মেলনের উদ্বোধন করেন। এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী। অতিরিক্ত আইজি, সব মহানগর পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলার পুলিশ সুপাররা সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।

আইজিপি বলেন, ‘সব ধরনের অপপ্রচার ও গুজব সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে।’ কোনো ঘটনা ঘটার আগেই সে বিষয়ে আগাম গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

মো. আলী হোসেন ফকির বলেন, পুলিশ দেশের জন্য ও জনগণের কল্যাণে কাজ করছে। তিনি পুলিশ সদস্যদের ঐক্যবদ্ধভাবে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান।

সম্মেলনে এপ্রিল থেকে জুন—এই তিন মাসের দেশের সার্বিক অপরাধ পরিস্থিতি তুলে ধরেন অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম।

এ সময় ডাকাতি, দস্যুতা, হত্যা, ধর্ষণ, পুলিশ আক্রান্ত ও অপহরণের মামলা, মুলতবি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, তদন্ত ও বিচারের ফলাফল এবং সাজার হার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

সভায় ডাকাতি ও ধর্ষণ মামলার তদন্ত বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। পুলিশ আক্রান্তের মামলাগুলোতে তদারকি বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। মুলতবি মামলা কমানোর পাশাপাশি সাজার হার বাড়ানোর বিষয়ে জোর দেওয়া হয়।

এ ছাড়া নিখোঁজসংক্রান্ত সাধারণ ডায়েরি (জিডি) গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করার জন্য মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়।

ইউনিটগুলোর কার্যক্রম নিয়ে নির্দেশনা

সভায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) প্রধান অতিরিক্ত আইজি মো. মোস্তফা কামাল, অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) প্রধান অতিরিক্ত আইজি ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মোশাররফ হোছাইন, অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের (এটিইউ) প্রধান অতিরিক্ত আইজি মো. রেজাউল করিম, র‍্যাবের মহাপরিচালক অতিরিক্ত আইজি মো. আহসান হাবীব পলাশ এবং বিশেষ শাখার (এসবি) প্রধান অতিরিক্ত আইজি সরদার নুরুল আমিনসহ বিভিন্ন ইউনিটের প্রধানেরা তাদের নিজ নিজ ইউনিটের কার্যক্রম সম্পর্কে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন।

সম্মেলনে পুলিশ সপ্তাহ ২০২৬ পালনের সময় প্রশংসনীয় কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২৬ জন পুলিশ সদস্যকে আইজি ব্যাজ দেওয়া হয়। আইজিপি তাদের ব্যাজ পরিয়ে দেন।

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ

আগামী গ্রীষ্মে দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি অনেকটা কমবে: জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬, ৭:৫১ অপরাহ্ণ
আগামী গ্রীষ্মে দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি অনেকটা কমবে: জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে উদ্যোক্তাদের নানা সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে সরকার। ফলে আগামী গ্রীষ্মের আগেই ন্যূনতম তিন হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম হবে দেশ। আর এ কারণে আগামী গ্রীষ্মে দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি অনেকটা কমে যাবে।

শনিবার (২৯ আগস্ট) দুপুরে যশোর পিটিআই অডিটোরিয়ামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক, শিক্ষা কর্মকর্তা ও পরিচালনা পর্ষদের সভাপতিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে একথা বলেন

প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, প্রাথমিক পর্যায় থেকেই নৈতিক শিক্ষার ভিত গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতা ও মানসম্মত স্যানিটেশন নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাল্যবিবাহ রোধে অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময় করতে হবে। অর্থের অভাবে কোনো শিক্ষার্থীর পড়াশোনা বন্ধ হবে না। সরকারের পক্ষ থেকে তার দায়িত্ব নেয়া হবে বলেও জানান তিনি।

তিনি বলেন, দলের কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোনো প্রভাব বিস্তার কিংবা অরাজকতা সৃষ্টি করলে ছাড় দেওয়া হবে না। কেউ যদি করতে চায়, তার বিরুদ্ধে প্রথমে সাংগঠনিক ও পরে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, সৌদি আরব তো তেলের ওপর ভাসছে। সেখানে কেন তেলের দাম বাড়লো? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কেন তেল-গ্যাসের দাম বাড়লো? বিশ্ববাজারে দাম বাড়ছে। সেখানে আমাদের মতো একটা দেশে সরকার কতদিন সমন্বয় না করে থাকবে?’ তারপরও সরকার জনগণের কথা ভেবে সমন্বয় করছে। এজন্য নিজেদের মধ্যে পরিমিতিবোধ তৈরি করার পাশাপাশি শিশুদেরও পরিমিত ব্যবহার শেখাতে হবে।

যশোর জেলা প্রশাসনের আয়োজনে মানসম্মত ও নৈতিক শিক্ষার উন্নয়ন, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিতকরণে এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন জেলা পরিষদের প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন খোকন।

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ

গুমের অবসান ও ন্যায়বিচারের পথে নতুন বাংলাদেশ

আহসান হাবিব বরুন:
প্রকাশিত: শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬, ৭:৪৯ অপরাহ্ণ
গুমের অবসান ও ন্যায়বিচারের পথে নতুন বাংলাদেশ

রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা দেওয়া। কিন্তু রাষ্ট্র নিজেই যখন তার নাগরিককে দিনদুপুরে বা রাতের আঁধারে তুলে নিয়ে নিখোঁজ করে দেয়, তখন তা আর কোনো গণতান্ত্রিক সমাজ থাকে না—তা রূপান্তরিত হয় এক নারকীয় বন্দিশালায়। ৩০ আগস্ট ‘আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস’ বা বিশ্ব গুম দিবস। এই দিবসটি কেবল পঞ্জিকার পাতা উল্টানোর কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি গুম হওয়া হাজারও মানুষের কান্না, অন্ধকারের কুঠুরিতে বন্দী জীবনের নিঃশব্দ আর্তনাদ এবং বিচারহীনতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার দিন। গুম কেবল একটি নির্দিষ্ট মানুষকে হারিয়ে যাওয়া বোঝায় না, এটি একটি মানবতাবিরোধী অপরাধ, যা ভুক্তভোগী পরিবারসহ সমগ্র সমাজকে প্রতিনিয়ত তিলে তিলে ধ্বংস করে। গুম হওয়া প্রতিটি নাম, প্রতিটি মুখ আজ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বিবেকের কাছে এক একটি জ্বলন্ত প্রশ্ন।

কোনো শিশুর কাছে তার বাবা কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নন। তিনি সেই মানুষ, যিনি স্কুল থেকে ফেরার সময় হাত ধরে বাড়ি নিয়ে আসতেন। কোনো গৃহবধূর কাছে নিখোঁজ স্বামী কোনো পরিসংখ্যান নন; তিনি সংসারের নির্ভরতা, সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং জীবনের সঙ্গী। কোনো বৃদ্ধ মায়ের কাছে নিখোঁজ সন্তান আজও সেই ছোট্ট শিশুই—যে একদিন মায়ের আঁচল ধরে হাঁটতে শিখেছিল।

তাই একজন মানুষকে তুলে নিয়ে গিয়ে তার অবস্থান অস্বীকার করা মানে শুধু একজন নাগরিককে অদৃশ্য করে দেওয়া নয়; একটি পরিবারকে জীবন্ত অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেওয়া। মৃত্যুতে অন্তত একটি শেষ খবর থাকে, কবর থাকে, শোকের আনুষ্ঠানিকতা থাকে। গুমের সবচেয়ে নির্মমতা হলো—এখানে শোকেরও কোনো শেষ নেই।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিগত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে চলা শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যূত ও পলাতক স্বৈরাচারী শাসন আমলটি চিহ্নিত হয়ে থাকবে গুম, খুন ও চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে। শেখ হাসিনার শাসন আমলকে টিকিয়ে রাখার মূল হাতিয়ার ছিল রাষ্ট্রীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে ব্যবহার করে বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মী, ভিন্নমতালম্বী, মানবাধিকারকর্মী ও সাধারণ নাগরিকদের গুম করা। এই স্বৈরাচারী ব্যবস্থার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও নারকীয় রূপ ছিল ‘আয়নাঘর’।

বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা দ্বারা পরিচালিত এই গোপন বন্দিশালাগুলো ছিল আধুনিক যুগের টর্চার সেল। জানলাহীন, আলো-বাতাসহীন, অত্যন্ত ছোট ছোট স্যাঁতসেঁতে কুঠুরিতে বন্দীদের বছরের পর বছর আঁটকে রাখা হতো। দিনে-রাতে সবসময় প্রকাণ্ড ফ্যানের আওয়াজ চালিয়ে রাখা হতো, যাতে বাইরের কোনো শব্দ ভেতরে না আসে এবং ভেতরের আর্তনাদ বাইরে না পৌঁছায়।

সেখানে বন্দীদের ওপর চালানো হতো অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন—বৈদ্যুতিক শক, ওয়াটার বোর্ডিং, নখ উপড়ে ফেলা এবং হাত-পা বেঁধে ঝুলিয়ে পিটানো ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। সাবেক সেনাকর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (বহিষ্কৃত) আবদুল্লাহিল আমান আযমী কিংবা বারিস্টার আরমানদের মতো ভুক্তভোগীরা দীর্ঘ ৮-৯ বছর পর মুক্তি পেয়ে যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা কোনো সভ্য সমাজের গল্প নয়; তা যেন মধ্যযুগীয় কোনো হিংস্রতার নামান্তর।

গুমের সবচেয়ে করুণ দৃশ্য ফুটে ওঠে গুম হওয়া পরিবারগুলোর দৈনন্দিন জীবনে। একটি স্বাভাবিক মৃত্যু মানুষকে শোক সইবার শক্তি দেয়, কিন্তু গুম বা জোরপূর্বক নিখোঁজ হওয়া একটি পরিবারকে অনন্তকাল ধরে ঝুলন্ত যন্ত্রণার মধ্যে রাখে। মায়ের আর্তনাদের কোনো শেষ নেই। “আমার বাবা কি বেঁচে আছে, নাকি তাকে মেরে ফেলা হয়েছে?”—এই প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে কত শত মা চোখ বোজা পর্যন্ত দরজার দিকে তাকিয়ে থেকেছেন। অনেক মা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন সন্তানের মুখটি আর না দেখেই। ছোট্ট শিশুদের কান্না দেখলে পাষাণ হৃদয়ও কেঁপে ওঠে।

বহু শিশু রয়েছে, যারা যখন ছোট ছিল তখন তাদের বাবাকে তুলে নেওয়া হয়েছিল; আজ তারা বড় হয়েছে, কিন্তু বাবার ছায়া পায়নি।  ঈদের দিন বা জন্মদিনে অন্য শিশুরা যখন বাবার হাত ধরে ঘুরে বেড়ায়, তখন গুম হওয়া পরিবারের শিশুরা তাদের বাবার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে নীরবে অশ্রু বিসর্জন দেয়। গৃহবধূর অপেক্ষার প্রহর যেন শেষই হতে চায় না। স্বামী জীবিত না মৃত—এই নিশ্চিত তথ্য না থাকায় বহু নারী সামাজিকভাবে আইনি ও পারিবারিক চরম জটিলতায় পড়েছেন। তাদের এই দীর্ঘ নীরব কান্না রাষ্ট্রের প্রতিটি ইট-পাথরে আছড়ে পড়ে। ‘মায়ের ডাক’ নামক প্ল্যাটফর্মটি গত এক দশক ধরে এই কান্না ও দাবির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার তথ্যানুসারে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনামলে ৭০০ জনেরও বেশি মানুষকে জোরপূর্বক গুম করা হয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর তথ্যমতে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে অন্তত ৬০০ জনের বেশি গুমের শিকার হয়েছেন।

এদের মধ্যে পরবর্তীতে অনেকের লাশ নদী বা রাস্তার পাশে পাওয়া গেছে, কাউকে কাউকে কয়েক মাস বা বছর পর গ্রেফতার দেখানো হয়েছে, কিন্তু একটি বড় অংশের কোনো খোঁজ আজও মেলেনি। একই সাথে মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত অন্তত ৭০৮ জন ব্যক্তি গুমের শিকার হন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এর ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ২০২১ সালে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ “He Didn’t Even Cry: Enforced Disappearances in Bangladesh” শীর্ষক ৮২ পৃষ্ঠার একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে সংস্থাটি উল্লেখ করে, তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার বিরোধী দলের নেতাকর্মী ও সমালোচকদের নিশ্চিহ্ন করতে গুমকে একটি পরিকল্পিত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে এবং তারা ৮৬টি সুনির্দিষ্ট গুমের ঘটনার বিস্তারিত তালিকা জাতিসংঘে জমা দিয়েছিল, যার সদুত্তর শেখ হাসিনার সরকার কখনোই দিতে পারেনি।

পাশাপাশি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানায় যে র‍্যাব এবং গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) সরাসরি এই গুমের সাথে জড়িত। এসবের ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র র‍্যাব এবং এর শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল এই গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যা।

বাংলাদেশের ইতিহাসে কিছু গুমের ঘটনা বিশ্ব বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল। ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল বিএনপি-র শীর্ষস্থানীয় নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য এম ইলিয়াস আলী এবং তার গাড়িচালক আনসার আলীকে ঢাকার বনানী থেকে গুম করা হয়, যাদের আজ পর্যন্ত কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

২০১০ সালের ২৫ জুন ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা চৌধুরী আলমকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়ার পর তিনি চিরতরে নিখোঁজ হন।

২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর ঢাকার শাহীনবাগ এলাকা থেকে ৮ জন যুবকের সাথে সাজেদুল ইসলাম সুমনকে তুলে নিয়ে যায় র‍্যাব-১; পরবর্তীতে সুমনের বোন সানজিদা ইসলাম তুলি ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক হিসেবে গুমবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।

২০১৯ সালের ৯ এপ্রিল ইউপিডিএফ নেতা মাইকেল চাকমাকে ঢাকা থেকে গুম করা হয় এবং তিনি ৫ বছরেরও বেশি সময় আয়নাঘরে বন্দী থাকার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর মুক্ত হন।

একইভাবে ২০১৬ সালের আগস্টে নিজ নিজ বাসা থেকে তুলে নিয়ে ৮ বছর আয়নাঘরে বন্দী রাখার পর ২০২৪ সালের আগস্টে মুক্তি পান মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান ও আবদুল্লাহিল আমান আযমী।

আন্তর্জাতিক আইনে গুম একটি স্বতন্ত্র ও গুরুতর মানবতাবিরোধী অপরাধ। ২০০৬ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ‘International Convention for the Protection of All Persons from Enforced Disappearance’ বা ‘সব ব্যক্তির গুম হওয়া থেকে সুরক্ষার আন্তর্জাতিক সনদ’ গৃহীত হয়, যার মূল কথা হলো—কোনো অবস্থাতেই, যুদ্ধ বা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার বাহানাতেও কাউকে গুম করা যাবে না।

জাতিসংঘের ‘ওয়ার্কিং গ্রুপ অন এনফোর্সড অর ইনভলন্টারি ডিসঅ্যাপিয়ারেন্সেস’ দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের গুমের ঘটনাগুলো তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছিল। জাতিসংঘ বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ সরকারকে গুমের অভিযোগগুলো তদন্তের নিরপেক্ষ সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানালেও তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার তা ধারাবাহিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে এসেছিল।

বিশ্বের উন্নত দেশসমূহ ও বিভিন্ন অঞ্চলে গুম প্রতিরোধে কঠোর আইনি অবকাঠামো রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মানবাধিকার সনদ এবং ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতের (ECHR) অধীনে গুমকে চরম মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ফ্রান্সে গুমের অপরাধের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং মারাত্মক শারীরিক ক্ষতির ক্ষেত্রে অপরাধীদের অত্যন্ত কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘Global Magnitsky Human Rights Accountability Act’-এর অধীনে আন্তর্জাতিকভাবে গুম ও মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত যেকোনো দেশের কর্মকর্তাদের ওপর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত, ভিসা নিষেধাজ্ঞা এবং আর্থিক অবরোধ আরোপ করা হয়।

অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নেপাল ২০১৭ সালে তাদের নতুন ক্রিমিনাল কোডে গুমকে একটি সুনির্দিষ্ট অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে, যেখানে গুমের অপরাধে যুক্ত ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ ১৫ বছরের কারাদণ্ড এবং জরিমানার বিধান রয়েছে।

শ্রীলঙ্কা ২০১৮ সালে জাতিসংঘের গুমবিরোধী সনদে অনুস্বাক্ষর করে এবং গুম প্রতিরোধ আইন পাস করে, যেখানে গুমের অপরাধে ২০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের কঠোর বিধান রাখা হয়েছে। তবে পাকিস্তান ও ভারতে গুমের ঘটনা ঘটলেও সেখানে গুমবিরোধী আলাদা ও পূর্ণাঙ্গ আইনের মারাত্মক অভাব রয়েছে, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহল দীর্ঘদিন সোচ্চার।

২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে এবং গঠিত হয় নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ডক্টর ইউনুসের নেতৃত্বাধীন সরকার গুমের বিচার ও এটি প্রতিরোধে অভূতপূর্ব ও দৃঢ় অঙ্গিকার প্রদর্শন করেছে। দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট জাতিসংঘের গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদে অনুস্বাক্ষর করেছে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে গুম বন্ধের আইনি অঙ্গীকারে আবদ্ধ হলো।

বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারকে বাস্তব আইনে পরিণত করা। ২০২৫ সালে Enforced Disappearance Prevention and Redress Ordinance-এর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পরে ২০২৬ সালের ৩ আগস্ট বর্তমান সরকার Enforced Disappearance Prevention and Redress Act, 2026-এর খসড়ায় অনুমোদন দেয়। সাম্প্রতিক সরকারি তথ্য অনুযায়ী খসড়ায় enforced disappearance-কে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। তবে ভুক্তভোগীর মৃত্যু হলে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত যাওয়ার বিধান এবং সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা জরিমানার প্রস্তাব রয়েছে; তদন্ত ও বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য সর্বোচ্চ ১২০ দিনের সময়সীমার কথাও বলা হয়েছে।

আমি মনে করি,এখানে সরকারের সামনে দুটি বিষয় সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, আইনটি দ্রুত কার্যকর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আইনটি যেন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ কঠোর শাস্তি থাকাই যথেষ্ট নয়; স্বাধীন তদন্ত, ন্যায়সংগত বিচার, কমান্ড রেসপনসিবিলিটি, সাক্ষী সুরক্ষা, ভুক্তভোগীর অধিকার এবং কার্যকর প্রতিকার—সবকিছুর সমন্বয় একান্ত প্রয়োজন।

পরিশেষে বলতে চাই,একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে গুমের মতো বিভীষিকার আর কখনো যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে, তার জন্য কেবল কমিশন গঠন বা সনদে স্বাক্ষরই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। জাতিসংঘের সনদের আলোকে বাংলাদেশের দণ্ডবিধিতে গুমকে একটি পৃথক, জামিনঅযোগ্য ও গুরুতর অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যেখানে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান থাকবে। ডিজিএফআই, র‍্যাব ও ডিবি-র মতো সংস্থাগুলোকে রাজনীতিকরণের হাত থেকে মুক্ত করতে হবে এবং কোনো গোয়েন্দা সংস্থা যেন সাধারণ নাগরিক বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে গোপনে তুলে নিয়ে আটক রাখার এখতিয়ার না পায়, তার জন্য আইনি তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি গুমের শিকার ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে উপযুক্ত অর্থ ও সামাজিক ক্ষতিপূরণ প্রদানসহ গুম হওয়া ব্যক্তিদের রেখে যাওয়া সন্তানদের পড়াশোনা ও পরিবারের দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে গুমের হুকুমদাতা থেকে শুরু করে সরাসরি বাস্তবায়নকারী—তা সে যত বড় প্রভাবশালী বা শীর্ষ কর্মকর্তা হোক না কেন—প্রত্যেককে আইনের আওতায় এনে দৃশ্যমান শাস্তি দিতে হবে। বিশ্ব গুম দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—রাষ্ট্রের কোনো নাগরিক আর কখনোই রাতের আঁধারে গুম হবে না, কোনো মায়ের কোল আর খালি হবে না, আর কোনো শিশুকে বাবার ছবির দিকে তাকিয়ে কাঁদতে হবে না। রাষ্ট্রকে তার বিবেকের কাছে সৎ হতে হবে; হারিয়ে যাওয়া প্রতিটি নামের হিসাব দিতে হবে এবং সুবিচার সুনিশ্চিত করতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।