এক ছাগল থেকে দুই খামার, ফরিদের সাফল্যের গল্প
ইউটিউবে ছাগল পালনের একটি ভিডিও দেখে আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। সেই আগ্রহ থেকেই প্রায় ছয় লাখ টাকা পুঁজি নিয়ে আফ্রিকান বোয়ার জাতের একটি ছাগল কিনেছিলেন শেখ ফরিদ। সাত বছরের ব্যবধানে সেই একটি ছাগল থেকেই শুরু হয়েছে তাঁর খামার গড়ার যাত্রা। এখন গাজীপুর ও সিলেটে তাঁর দুটি খামারে রয়েছে বিদেশি জাতের ১২৫টি ছাগল। এসব ছাগলের বর্তমান বাজারমূল্য ৫০ লাখ টাকার বেশি বলে জানিয়েছেন তিনি। ছাগল পালন থেকে বছরে তাঁর আয় প্রায় ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা।
গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার শ্রীপুর পূর্বপাড়া গ্রামে নিজের বাড়ির আঙিনায় ‘মা গট ফার্ম’ নামে একটি খামার গড়ে তুলেছেন ফরিদ। পাশাপাশি সিলেটেও রয়েছে তাঁর আরেকটি খামার। শখ থেকে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ এখন তাঁর আয়ের অন্যতম উৎস। নিয়মিত পরিচর্যা, ধৈর্য, অভিজ্ঞতা ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে গড়ে তোলা খামারটি স্থানীয়ভাবে সম্ভাবনাময় উদ্যোগের উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
ইউটিউবের ভিডিও থেকে খামার গড়ার স্বপ্ন
শেখ ফরিদ জানান, প্রায় সাত বছর আগে ইউটিউবে ছাগল পালনবিষয়ক একটি ভিডিও দেখে বিদেশি জাতের ছাগল পালনের প্রতি আগ্রহী হন তিনি। পরে প্রায় ছয় লাখ টাকা পুঁজি নিয়ে অনলাইনে অর্ডার করে আফ্রিকান বোয়ার জাতের একটি ছাগল কেনেন। সেই ছাগল দিয়েই শুরু হয় তাঁর খামার গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথচলা।
শুরুর দিকে খামারে ছাগলের সংখ্যা ছিল খুবই কম। তবে নিয়মিত পরিচর্যা, খাবারের ব্যবস্থা এবং খামার পরিচালনার অভিজ্ঞতা বাড়ানোর মাধ্যমে ধীরে ধীরে ছাগলের সংখ্যা বাড়াতে থাকেন তিনি।
প্রথম তিন বছরের মধ্যে তাঁর খামারে ছাগলের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৫০টিতে। এ সময় কিছু ছাগল বিক্রিও করেন। পাঁচ বছর পর খামারে ছাগলের সংখ্যা বেড়ে হয় প্রায় ৮০টি। পরে খামার সম্প্রসারণের মাধ্যমে গাজীপুরের পাশাপাশি সিলেটেও ছাগল পালন শুরু করেন।
বর্তমানে গাজীপুরের খামারে রয়েছে ৫০টি এবং সিলেটের খামারে ৭৫টি ছাগল। দুই খামার মিলিয়ে মোট ছাগলের সংখ্যা ১২৫টি।
বোয়ার, কালাহারি ও বারবারি জাতের ছাগল
ফরিদের খামারে আফ্রিকান বোয়ার, কালাহারি ও বারবারি জাতের ছাগল পালন করা হচ্ছে। জাত, বয়স ও শারীরিক গঠন অনুযায়ী এসব ছাগলের দাম ৩৫ হাজার টাকা থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত বলে জানান তিনি।
বিদেশি জাতের ছাগল পালনে খাবার, পরিচর্যা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার দিকে বিশেষ নজর দিতে হয়। ফরিদের খামারেও ছাগলের বয়স ও প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার সরবরাহ করা হয়। তাঁর মতে, পরিকল্পিতভাবে খামার পরিচালনা এবং নিয়মিত পরিচর্যা করতে পারলে বাংলাদেশেও এসব জাতের ছাগল পালন করে ভালো ফল পাওয়া সম্ভব।
খাবারে ঘাস, সাইলেজ ও দানাদার পুষ্টি
ছাগলের পুষ্টির চাহিদা পূরণে ফরিদের খামারে বিভিন্ন ধরনের খাবার ব্যবহার করা হয়। খাবারের তালিকায় রয়েছে নেপিয়ার ও জার্মান ঘাস, সাইলেজ, ভুট্টার সাইলেজ এবং বিভিন্ন ধরনের দানাদার খাবার।
দানাদার খাবারের মধ্যে রয়েছে ভাঙা ভুট্টা, সয়াবিন, অ্যাংকার, ছোলা, বুটের ভুসি ও মসুরের ভুসি। ছাগলের বয়স, শারীরিক গঠন ও পুষ্টির প্রয়োজন বিবেচনায় খাবারের মান ও পরিমাণের দিকে নজর দেওয়া হয়।
খামারে ছাগল সুস্থ রাখা এবং কাঙ্ক্ষিত বৃদ্ধি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সুষম খাবারের পাশাপাশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।
রোগ প্রতিরোধে নিয়মিত টিকা ও চিকিৎসা
ছাগলকে রোগবালাই থেকে সুরক্ষিত রাখতে খামারে নিয়মিত টিকা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। ফরিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ছাগলকে এফএমডি, গোট পক্স ও পিপিআর রোগের টিকা দেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী কৃমিনাশক, ভিটামিন, ক্যালসিয়াম ও মিনারেল সরবরাহ করা হয়।
খামারে রোগ ছড়িয়ে পড়লে একসঙ্গে অনেক ছাগল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এ কারণে নিয়মিত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনের সময় প্রাণিসম্পদ বিভাগের পরামর্শ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন ফরিদ।
বছরে আয় ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা
শেখ ফরিদ জানান, বর্তমানে তাঁর দুই খামারে থাকা ছাগলগুলোর বাজারমূল্য ৫০ লাখ টাকার বেশি। ছাগল বিক্রি ও খামারের অন্যান্য আয় মিলিয়ে বছরে প্রায় ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা আয় হচ্ছে তাঁর।
তবে এই আয়কে পুরোপুরি নিট মুনাফা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ছাগলের খাবার, চিকিৎসা, পরিচর্যা, শ্রমিক ও খামার ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় রয়েছে। এসব ব্যয় বাদ দিয়ে প্রকৃত লাভ নির্ধারিত হয়।
ফরিদের ভাষ্য, একটি ছাগল দিয়ে শুরু করা উদ্যোগ আজ তাঁর কাছে শুধু ব্যবসা নয়, স্বপ্ন ও ভালোবাসার জায়গা। শুরুতে অনেক কিছুই শিখতে হয়েছে। সময়ের সঙ্গে অভিজ্ঞতা অর্জন করে খামার বড় করেছেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘একটা ছাগল দিয়ে শুরু করেছিলাম। এখন গাজীপুর ও সিলেটে আমার দুটি খামারে ১২৫টি ছাগল রয়েছে। ছাগল পালনকে শুধু ব্যবসা হিসেবে দেখি না, এটি এখন আমার স্বপ্ন ও ভালোবাসার জায়গা। শুরুতে অনেক কিছু শিখতে হয়েছে। ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। সঠিক পরিচর্যা ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা করতে পারলে ছাগল পালন থেকে ভালো আয় করা সম্ভব।’
সফলতায় পাশে প্রাণিসম্পদ বিভাগ
শ্রীপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আব্দুল আলিম বলেন, শেখ ফরিদ আফ্রিকান বোয়ারসহ বিদেশি জাতের ছাগল পালনে সফলতা অর্জন করেছেন। প্রাণিসম্পদ বিভাগের পক্ষ থেকে তাঁর খামার নিয়মিত পরিদর্শন করা হয় এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, খামার সম্প্রসারণের প্রয়োজন হলে প্রাণিসম্পদ বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হবে।
একটি ছাগল দিয়ে শুরু হওয়া শেখ ফরিদের উদ্যোগ এখন দুটি খামারে ১২৫টি ছাগলে বিস্তৃত। তাঁর এই যাত্রা দেখাচ্ছে, আগ্রহের সঙ্গে অভিজ্ঞতা অর্জন, পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ও নিয়মিত পরিচর্যা যুক্ত হলে শখের উদ্যোগও আয়ের উৎস হয়ে উঠতে পারে।
কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
Array