আমন ধানে ছাতরা পোকার আক্রমণ, ফলন নিয়ে শঙ্কায় কৃষক
কুড়িগ্রামে আমন ধানের খেতে ছাতরা পোকার (মিলিবাগ) আক্রমণ দেখা দেওয়ায় ফলন নিয়ে উদ্বেগে পড়েছেন কৃষকেরা। এ পোকার আক্রমণে ধানগাছের পাতা হলদে হয়ে যাচ্ছে, ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক বৃদ্ধি। কোনো কোনো গাছ শুকিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের বালাইনাশক প্রয়োগ করেও প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ায় ক্ষতির আশঙ্কা করছেন চাষিরা।
কৃষকদের ভাষ্য, আগের বছরগুলোতে আমন ধানে এ পোকার উল্লেখযোগ্য আক্রমণ দেখা যায়নি। তবে চলতি মৌসুমে জেলার বিভিন্ন এলাকার ধানখেতে এর উপস্থিতি বেড়েছে। এতে ধানের উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সাদা আবরণে ঢেকে যাচ্ছে ধানগাছ
সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন এলাকার ধানখেত ঘুরে দেখা যায়, আক্রান্ত ধানগাছের কাণ্ড ও পাতার খোলে সাদা তুলা বা মোমের মতো আবরণ তৈরি হয়েছে। ওই আবরণের নিচে ছোট ছোট পোকা রয়েছে। আক্রান্ত গাছের পাতা হলদে হয়ে যাচ্ছে এবং স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। কোনো কোনো গাছ শুকিয়ে পুড়ে যাওয়ার মতো দেখাচ্ছে।
কৃষকেরা জানান, পোকা দমনে বিভিন্ন ধরনের বালাইনাশক ব্যবহার করেও প্রত্যাশিত সুফল পাচ্ছেন না তাঁরা। ফলে বাড়তি খরচের পাশাপাশি ফসলের ক্ষতি নিয়েও দুশ্চিন্তা বাড়ছে।
উলিপুর উপজেলার ধামশ্রেণি ইউনিয়নের খাওনারদরগা এলাকার কৃষক আকবর আলী বলেন, চলতি মৌসুমে তিনি এক একর ৭৫ শতাংশ জমিতে আমন ধান চাষ করেছেন। এর মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ জমির ধান ছাতরা পোকার আক্রমণে আক্রান্ত হয়েছে। এতে এবার বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে তাঁর।
রাজারহাটের কৃষক জগদীশ চন্দ্র সরকার জানান, তাঁর প্রায় ২৫ শতাংশ জমির ধান আক্রান্ত হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের ওষুধ প্রয়োগ করেও কোনো সুফল পাননি। পরে আক্রান্ত ধানগাছ কেটে গরুকে খাইয়েছেন তিনি।
আগে এমন আক্রমণ দেখেননি স্থানীয় ব্যবসায়ী
স্থানীয় কীটনাশক বিক্রেতা কাইয়ুম সরকার বলেন, প্রায় ২০ বছর ধরে তিনি কীটনাশকের ব্যবসা করছেন। কিন্তু আমন ধানের খেতে এ ধরনের পোকার আক্রমণ আগে দেখেননি। গত বছর দু-একটি গাছে পোকা দেখা গেলেও তেমন ক্ষতি হয়নি। তবে এবার বিভিন্ন জমিতে এ পোকার উপস্থিতি বেড়েছে।
কৃষকদের পাশাপাশি স্থানীয় কীটনাশক ব্যবসায়ীরাও পোকার এমন উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তবে আক্রান্ত জমির পরিমাণ ও সম্ভাব্য ফলনহানির সুনির্দিষ্ট তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
খরার কারণে আক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মাসুদ রানা বলেন, ছাতরা পোকা কোনো রোগ নয়; এটি গাছের রস শোষণকারী ক্ষতিকর পোকা। এর আক্রমণে ধানগাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং পাতা হলদে হয়ে যায়। আক্রমণ তীব্র হলে গাছ শুকিয়েও যেতে পারে। তাঁর ভাষ্য, আগের বছরগুলোতে কুড়িগ্রামের আমন ধানের খেতে এ পোকার উপস্থিতি দেখা যায়নি।
কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবু ফাত্তাহ্ মো. রওশন কবির বলেন, খরার কারণে ধানখেতে ছাতরা পোকার আক্রমণ বাড়তে পারে। এ পোকা দমনে মাঠপর্যায়ে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সচেতনতা বাড়াতে লিফলেট বিতরণসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চলছে।
তিনি জানান, কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী সঠিক সময়ে বালাইনাশক প্রয়োগ করলে এ পোকা দমন করা সম্ভব।
লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে আমন আবাদ
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর কুড়িগ্রামে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ২১ হাজার হেক্টর। এর বিপরীতে আবাদ হয়েছে ১ লাখ ২১ হাজার ৬৩০ হেক্টর জমিতে।
লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে আমন আবাদ হলেও ছাতরা পোকার আক্রমণ কৃষকদের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। আক্রান্ত জমিতে দ্রুত পোকার বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন চাষিরা।
এ পরিস্থিতিতে আক্রান্ত জমি শনাক্ত করা, পোকার বিস্তার পর্যবেক্ষণ এবং কৃষকদের সঠিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া জরুরি। নির্বিচারে বিভিন্ন বালাইনাশক ব্যবহার না করে কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিলে অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানোর পাশাপাশি ফসলের ক্ষতি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
Array