অপতথ্যের তাণ্ডব, সেনাবাহিনীর অটুট ঐক্য ও সেনাপ্রধানের ঐতিহাসিক নেতৃত্ব
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে ঘিরে কল্পকাহিনি ও গুজব ছড়ানোর প্রবণতা আবারও বেড়েছে। নানা অজুহাতে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালিয়ে সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ করার অপতৎপরতা বাড়বাড়ন্ত হয়ে উঠেছে। বাহিনীর সর্বোচ্চ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে কেউই এসব অপপ্রচারের লক্ষ্যবস্তু হওয়া থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইউটিউবে তথ্য-প্রমাণহীন মিথ্যাচার ও বিষোদ্গারের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানকে ঘিরেও অপপ্রচার চালানো হয়েছে। অসত্য, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট প্রতিবেদন ছড়িয়ে বিভ্রান্তির স্রোত তৈরির এই তৎপরতা যেন ভাড়াটে প্রোপাগান্ডা চক্রের ঘৃণ্য উল্লাস। কথিত নিরপেক্ষতার মুখোশে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য সামনে রেখে চটকদার শব্দচয়ন ও মনগড়া বয়ানের আড়ালে রচিত হচ্ছে ষড়যন্ত্রের নীলনকশা। সাজানো হচ্ছে মনগড়া কাহিনির মঞ্চ। যদিও এসব অপতৎপরতা দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী ও এর সর্বোচ্চ নেতৃত্বের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়। এসব মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর বয়ান সাধারণ মানুষের বিবেচনাবোধ এবং সেনাবাহিনীর প্রতি গভীর আস্থাকে কোনভাবেই টলিয়ে দিতে পারেনি।
বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীকে ঘিরে বিভ্রান্তি ছড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করা হচ্ছে। উদ্দেশ্যও স্পষ্ট—‘ঠাকুরমার ঝুলি’র মতো মনগড়া কাহিনি ফেঁদে দেশপ্রেমিক বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে অপপ্রচারের ডালপালা বিস্তার করা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বিনষ্টের লক্ষ্যে এমন অপতৎপরতা তীব্র হয়ে উঠেছিল। সশস্ত্র বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার সেই অপপ্রয়াস ব্যর্থ হলেও গুজব ও বিতর্কের জালে বাহিনীকে ঘায়েল করতে নতুন করে মরিয়া হয়ে উঠেছে কুচক্রী মহল।
সামরিক বাহিনীর সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা অব্যাহত রয়েছে। অথচ গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার এই বাস্তবতাই যেন গুজববাজদের কাছে অসহনীয়। তাই নতুন করে সাজানো হচ্ছে আজগুবি কাহিনি, ছড়ানো হচ্ছে ভিত্তিহীন অপতথ্যের ডালি। জাতির ঐক্য ও সংহতির প্রতীক সেনাবাহিনীকে ঘিরে এমন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা কেবল বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টাই নয়; বরং এর মধ্য দিয়ে উন্মোচিত হচ্ছে অপপ্রচারকারীদের বিকৃত রুচি, হীন অভিসন্ধি ও মনস্তাত্ত্বিক দীনতা।
দুনিয়াকে আলোড়িত করা চব্বিশের অবিস্মরণীয় গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তথা সশস্ত্র বাহিনীকে ঘিরে স্বরচিত মিথ্যাচার ও মনগড়া কাহিনি ছড়িয়ে আসছে দেশের বাইরে অবস্থানরত গুটিকয়েক সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্ট। সংঘবদ্ধ স্বার্থান্বেষী মহলের অসত্য বয়ানকে পুঁজি করে ক্রমেই বিস্তার ঘটেছে গুজবের মহামারির। আর এই অপতথ্যের সবচেয়ে বড় লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান।
৫ আগস্টের আগে তৎকালীন সরকারের সহিংস ভূমিকার প্রেক্ষাপটে যখন লাশ, বারুদের গন্ধ ও রক্তস্রোতে দেশ বিপর্যস্ত হওয়ার আশঙ্কা ঘনীভূত হচ্ছিল, তখন ছাত্র-জনতার গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রামের অন্তর্নিহিত আকাঙ্ক্ষাকে হৃদয়ঙ্গম করে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। তাঁর সময়োচিত সিদ্ধান্ত ও দূরদর্শী নেতৃত্ব দেশের ইতিহাসের এক কঠিনতম সন্ধিক্ষণে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। নানা উসকানি, ক্রমবর্ধমান গুজব ও শত প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি নিজ বাহিনীর মনোবল অটুট রাখেন। সংকটের প্রতিটি বাঁকে ধৈর্য, সংযম ও মানবিকতার পরিচয় দিয়ে দায়িত্বশীল নেতৃত্বের দৃঢ় স্বাক্ষর রাখেন। এমন নেতৃত্ব সত্যিই ইতিহাসে বিরল।
মনগড়া তথ্য জুড়ে দিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান কিংবা সরাসরি সেনাবাহিনীকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া বিভিন্ন কনটেন্ট ও পোস্টকে বিচ্ছিন্ন সাইবার অপরাধ হিসেবে দেখার অবকাশ নেই। বরং এসব অপতৎপরতার মাধ্যমে সেনাবাহিনীকে ক্ষতিগ্রস্ত করা কিংবা রাষ্ট্রকে দুর্বল করার সুসংগঠিত প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে মনে করছেন সামরিক বিশেষজ্ঞ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন কনটেন্ট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিভ্রান্তিকর ও ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে অপপ্রচারের প্রধান লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। একই ধারায় বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর শীর্ষপর্যায়ের কর্মকর্তাদেরও জড়ানো হচ্ছে নানা ভিত্তিহীন প্রচারণায়।
বিশেষ করে দিন কয়েক ধরে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, দেশে সামরিক শাসন আসছে—এমন নানা গুজব ছড়িয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টা চলছে। এসব ভিত্তিহীন প্রচারণার বিষয়ে সতর্ক করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও সেনাপ্রধানকে ঘিরে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিকর, অসত্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্যে প্রভাবিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)। গত শনিবার (১০ অক্টোবর) প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আইএসপিআর জানায়, এসব তথ্য প্রচারের মাধ্যমে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়। এ ধরনের বিভ্রান্তিকর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচারে প্রভাবিত না হওয়ার জন্য সবার প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে সংস্থাটি।
আইএসপিআরের বক্তব্যের মূল তাৎপর্য হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত কোনো দাবি বা গুজব যাচাই ছাড়াই সত্য বলে গ্রহণ করা উচিত নয়। সেনাবাহিনী ও সেনাপ্রধানকে ঘিরে কোনো তথ্য প্রচারিত হলে তার সত্যতা নিশ্চিত করতে হবে আনুষ্ঠানিক ও নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে। একই সঙ্গে বাহিনীর চেইন অব কমান্ড, পারস্পরিক আস্থা, ঐক্য, শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্ব অটুট থাকার বিষয়টি তুলে ধরে আইএসপিআর জানিয়েছে, দেশ ও জনগণের প্রতি অর্পিত দায়িত্ব পালনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। অর্থাৎ, গুজবের ভিত্তিতে বাহিনীর অবস্থান বা নেতৃত্ব সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পরিবর্তে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ওপর আস্থা রাখার আহ্বানই সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মূল বার্তা।
দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখার পাশাপাশি জননিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলা সুরক্ষা, অনাকাঙ্ক্ষিত নৈরাজ্য-সহিংসতা প্রতিরোধ এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের অশুভ তৎপরতা রুখে দিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বারবার সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের স্বাক্ষর রেখেছে। চব্বিশের দুনিয়া কাঁপানো গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার পাশে দাঁড়িয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের ঐতিহাসিক ও সাহসী ভূমিকা মেনে নিতে পারেনি গুজবনির্ভর প্রচারণায় লিপ্ত ফেসবুক ও ইউটিউবকেন্দ্রিক একটি মহল। সেই সময় সেনাপ্রধানের দৃঢ় ও কুশলী নেতৃত্বে অভ্যুত্থান-পরবর্তী সংকটময় পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ পথ হারায়নি। এখনও রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধি কিংবা বিশেষ মহলের অনুগ্রহ লাভের অভিপ্রায়ে মনগড়া বয়ান ছড়িয়ে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করা এবং জনপরিসরে অস্থিরতা তৈরির অপতৎপরতায় সক্রিয় রয়েছে গুজবনির্ভর প্রচারচক্র।
রিউমর স্ক্যানারের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বাহিনীর উচ্চপদস্থ নেতৃত্বকে ঘিরে অন্তত ৯৬টি মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য শনাক্ত করা হয়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৭৪। অর্থাৎ, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সেনাবাহিনীকে লক্ষ্য করে ছড়ানো অপতথ্যের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাহিনীটিকে ঘিরে বিভ্রান্তিকর প্রচারণার ক্রমবর্ধমান প্রবণতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। একই সময়ে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানকে সরাসরি জড়িয়ে ২১টি সুনির্দিষ্ট ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়েছে, যা তথ্য যাচাইয়ের পর সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মনগড়া বলে প্রমাণিত হয়েছে। অর্থাৎ, অপতথ্যের বিস্তৃত পরিসরে সেনাপ্রধানকেও বারবার ব্যক্তিগতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
শুধু সেনাবাহিনী নয়, সামগ্রিকভাবে সশস্ত্র বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কেন্দ্র করে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে মোট ১৯৫টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এসব বাহিনীকে ঘিরে ছড়ানো অপতথ্যের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৭১ শতাংশ। পরিসংখ্যানের এই চিত্র সশস্ত্র বাহিনীকে ঘিরে অপতথ্য প্রচারের ক্রমবর্ধমান ব্যাপ্তিকে সামনে এনেছে। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরী সেনাবাহিনীর উজ্জ্বল ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখা এবং জনপরিসরে অপতথ্যের বিস্তার রোধে তথ্যের সত্যতা যাচাই ও নির্ভরযোগ্য সূত্রের ওপর আস্থা রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশ্লেষকেরাও।
ফেসবুক ও ইউটিউবকেন্দ্রিক এসব প্রচারকারীর নির্লজ্জ মিথ্যাচার প্রসঙ্গে বিশ্লেষকদের ভাষ্য, হিটলারের আমলে গুজব-প্রোপাগাণ্ডার কুখ্যাত প্রবক্তা জোসেফ গোয়েবলসও আজ বেঁচে থাকলে এদের আনাড়ি ও অথর্ব গুজব ছড়ানোর প্রবণতা দেখে রীতিমতো লজ্জা পেতেন! উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচারের এমন প্রবণতায় সংশ্লিষ্ট চক্রের বিকৃত রুচি, ভণ্ডামি ও কপটতা দেশের মানুষের সামনে উন্মোচিত হয়েছে। দেশের গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের দৃষ্টিতেও এমন ভূমিকা ভণ্ডামি ও কূপমণ্ডূকতারই বহিঃপ্রকাশ।
দেশের অভ্যন্তরে কিংবা দেশের বাইরে অবস্থানরত যেসব কুচক্রীমহল বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং গণতান্ত্রিক ও স্থিতিশীল পরিবেশকে ভালো চোখে দেখে না, সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার মাধ্যমে মূলত তারাই নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির ক্ষেত্র তৈরি করতে চায়। এ ধরনের অপতৎপরতায় সাধারণ মানুষের কোনো কল্যাণ নেই, রাষ্ট্রেরও কোনো অর্জন নেই। বরং এর অভিঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় জাতীয় স্থিতিশীলতা, জনআস্থা ও দেশের ভবিষ্যৎ। বিপদে, দুর্যোগে ও জননিরাপত্তা রক্ষায়—এমনকি চব্বিশে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে একটি তাৎপর্যপূর্ণ পরিণতির দিকে এগিয়ে নিতে যে সেনাবাহিনী অনবদ্য ভূমিকা রেখেছে, সেই বাহিনীর গায়ে অপপ্রচারের কালিমা লেপনের সাম্প্রতিক অপচেষ্টা কৃতজ্ঞতার পরিবর্তে কৃতঘ্নতারই বহিঃপ্রকাশ। সংকটের মুহূর্তে কারা প্রকৃত সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়, তা সচেতন মানুষের উপলব্ধিতে গভীরভাবে প্রোথিত। তাই প্রশ্ন ওঠে, যে বাহিনীর প্রতি জনসাধারণের আস্থা দুর্বল করে দেওয়া গেলে কিংবা যাকে বিতর্কিত করে তোলা গেলে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বিপন্ন হতে পারে, তাতে শেষ পর্যন্ত লাভবান হবে কারা?
বাস্তবতা হলো, এমন অপতৎপরতার মাশুল দিতে হয় রাষ্ট্র, জনগণ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে। বিপরীতে, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতার পরিপন্থী শক্তিগুলোই এতে স্বার্থ উদ্ধারের সুযোগ পায়। এ কারণেই সেনাবাহিনীকে ঘিরে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টা কিংবা সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের অপপ্রয়াস—কোনোটিই বাংলাদেশের ইতিহাসে স্থায়ী সাফল্য পায়নি। বরং এমন অপচেষ্টা শেষ পর্যন্ত বুমেরাং হয়েছে। যারা এই পথে এগিয়েছে, তাদের অনেককেই শেষ পর্যন্ত পতন, বিতাড়ন কিংবা দেশত্যাগের মতো পরিণতির মুখোমুখি হতে হয়েছে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতীক। বহিঃশত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করা, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা দেওয়া তাদের দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীর অবদান জাতির গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের অংশ। পরবর্তী সময়েও দুর্যোগ, সংকট ও জননিরাপত্তার প্রয়োজনে বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেছেন। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময়ও সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। শৃঙ্খলা, পেশাদারিত্ব, পারস্পরিক আস্থা ও দেশপ্রেম সশস্ত্র বাহিনীর শক্তির মূল ভিত্তি। গুজব ও অপপ্রচার দিয়ে এই দৃঢ় বন্ধন দুর্বল করা সম্ভব নয়। সংকটের সময়ে দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানো, রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা রক্ষায় দায়িত্ব পালন এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সশস্ত্র বাহিনীর অবদান অনস্বীকার্য। এ কারণেই দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী বাংলাদেশের মানুষের আস্থা ও নির্ভরতার অন্যতম প্রধান জায়গা। এই বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা তাই দেশের মানুষ ঘৃণাভরেই প্রত্যাখ্যান করেছে।
চলতি বছরের ৫ মে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ডিসি সম্মেলনে দেশের সব বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘দেশের জন্য ত্যাগ ও সেবার ব্রত প্রতিটি সামরিক সদস্যের। এটি নিছক চাকরি নয়; দেশপ্রেম, শৃঙ্খলা, ত্যাগ ও সাহসিকতার এক অনন্য জীবনধারা। সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের পেশাগত মর্যাদা ও সামাজিক সম্মান যেকোনো দেশের জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি সম্পৃক্ত।’ প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার এই পর্যবেক্ষণ সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এ কারণেই সতর্ক করে তিনি বলেছেন, ‘বেসামরিক পরিমণ্ডলে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের যথাযথ মর্যাদা প্রদান না করলে ভবিষ্যতে দেশপ্রেমিক ও যোগ্য তরুণ-তরুণীদের সামরিক পেশায় আকৃষ্ট করা কঠিন হয়ে পড়বে।
এর ফলে জনবিচ্ছিন্ন ও অকার্যকর সশস্ত্র বাহিনী তৈরির ঝুঁকি দেখা দিতে পারে, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অশনিসংকেত।’ তাঁর বক্তব্যের তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনী গড়ে ওঠে কেবল অস্ত্র, সরঞ্জাম ও জনবলের ভিত্তিতে নয়; সদস্যদের মনোবল, নেতৃত্বের প্রতি আস্থা, পেশাগত সম্মান, পারস্পরিক সংহতি এবং জনগণের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্কও এর অপরিহার্য ভিত্তি। সামরিক সদস্যদের মর্যাদা নিশ্চিত করা তাই কেবল তাঁদের ব্যক্তিগত সম্মানের বিষয় নয়; দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, সার্বভৌমত্ব ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিয়ে কথা বলার সময় আরও একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন—ইউনিফর্মের পেছনে যারা রয়েছেন তাঁরা মানুষ। তাঁরা কারও ভাই, কারও সন্তান, কারও বাবা, কারও স্বামী। দেশের জন্য দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁরা দীর্ঘ সময় পরিবার থেকে দূরে থাকেন। পাহাড়, দুর্গম এলাকা, বিদেশের শান্তিরক্ষা মিশন কিংবা জাতীয় জরুরি পরিস্থিতি—যেখানেই দায়িত্ব, সেখানেই তাঁদের অঙ্গীকার একটাই—দেশ। এই দেশপ্রেমের মূল্য সবচেয়ে বেশি উপলব্ধি করা যায় তখনই, যখন দেশ কোনো সংকটের মুখোমুখি হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতি মানুষের যে আস্থা, তা এক দিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিনের দায়িত্ব, আত্মত্যাগ, শৃঙ্খলা ও দেশের প্রতি অঙ্গীকারের মধ্য দিয়েই এই আস্থা গড়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কয়েকটি পোস্ট, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভিডিও বয়ান, কিছু বেনামি অ্যাকাউন্ট কিংবা প্রযুক্তির কারসাজিতে তৈরি কনটেন্ট সেই দীর্ঘ বাস্তবতাকে বদলে দিতে পারে না। গুজবের সবচেয়ে বড় শক্তি মানুষের অসচেতনতা; আর গুজবের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সত্য। তাই আমাদের দায়িত্ব সত্যকে সামনে রাখা।
নিশ্চিত গৃহযুদ্ধের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করা, ক্ষমতাকে আলিঙ্গন না করা একজন নির্লোভ জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এর যুগশ্রেষ্ঠ নেতৃত্ব, শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অর্জন, দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ইতিহাস কিংবা দেশের নিরাপত্তায় সশস্ত্র বাহিনীর অবদান—এসব বাস্তবতার সামনে মনগড়া কোন কাহিনি টিকতে পারে না। দেশের প্রতি ভালোবাসা শুধু আবেগের বিষয় নয়; এটি দায়িত্বেরও বিষয়। সেনাবাহিনীর মতো একটি স্পর্শকাতর ও সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে কথা বলার সময় দায়িত্বশীল হওয়া, যাচাই ছাড়া তথ্য না ছড়ানো এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া সেই দায়িত্বেরই অংশ। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আমাদের দেশের। এই বাহিনীর সদস্যরা আমাদেরই মানুষ। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের সুরক্ষায় যাঁরা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করার শপথ নিয়েছেন, তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা, আস্থা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা আমাদের জাতীয় চেতনারই অংশ।
গুজব আসবে, অপতথ্য ছড়াবে, প্রযুক্তির নতুন নতুন কৌশল ব্যবহৃত হবে। কিন্তু সত্য তার জায়গায় অটুট থাকবে। বাংলাদেশের মানুষও জানে, দেশের প্রয়োজনে, মানুষের প্রয়োজনে এবং জাতীয় সংকটে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দায়িত্বের জায়গা থেকে কখনো পিছপা হয়নি। তাই গুজবের কোলাহলে নয়, বাস্তবতার আলোতেই সেনাবাহিনীকে দেখতে হবে। অপতথ্যের প্রচারে নয়, তাঁদের দীর্ঘদিনের দায়িত্ব ও আত্মত্যাগের ইতিহাসে আস্থা রাখতে হবে। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও জাতীয় মর্যাদার প্রহরীদের প্রতি এই আস্থা আমাদের শক্তি। ভুলে গেলে চলবে না—বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের গর্ব। তাঁদের দেশপ্রেম, দায়িত্ববোধ ও আত্মত্যাগের প্রতি জাতির শ্রদ্ধা অটুট থাকুক। গুজবের কুয়াশা কেটে সত্য, আস্থা ও দেশপ্রেমের শাণিত আলোয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী হোক আরও শক্তিশালী ও দুর্বার এবং বিশ্বের শ্রেষ্ঠ এক সামরিক বাহিনী।
কালের আলো /এমএএএমকে

আপনার মতামত লিখুন
Array