খুঁজুন
                               
, ,
           

অপতথ্যের তাণ্ডব, সেনাবাহিনীর অটুট ঐক্য ও সেনাপ্রধানের ঐতিহাসিক নেতৃত্ব

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:১৩ অপরাহ্ণ
অপতথ্যের তাণ্ডব, সেনাবাহিনীর অটুট ঐক্য ও সেনাপ্রধানের ঐতিহাসিক নেতৃত্ব

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে ঘিরে কল্পকাহিনি ও গুজব ছড়ানোর প্রবণতা আবারও বেড়েছে। নানা অজুহাতে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালিয়ে সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ করার অপতৎপরতা বাড়বাড়ন্ত হয়ে উঠেছে। বাহিনীর সর্বোচ্চ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে কেউই এসব অপপ্রচারের লক্ষ্যবস্তু হওয়া থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইউটিউবে তথ্য-প্রমাণহীন মিথ্যাচার ও বিষোদ্গারের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানকে ঘিরেও অপপ্রচার চালানো হয়েছে। অসত্য, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট প্রতিবেদন ছড়িয়ে বিভ্রান্তির স্রোত তৈরির এই তৎপরতা যেন ভাড়াটে প্রোপাগান্ডা চক্রের ঘৃণ্য উল্লাস। কথিত নিরপেক্ষতার মুখোশে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য সামনে রেখে চটকদার শব্দচয়ন ও মনগড়া বয়ানের আড়ালে রচিত হচ্ছে ষড়যন্ত্রের নীলনকশা। সাজানো হচ্ছে মনগড়া কাহিনির মঞ্চ। যদিও এসব অপতৎপরতা দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী ও এর সর্বোচ্চ নেতৃত্বের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়। এসব মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর বয়ান সাধারণ মানুষের বিবেচনাবোধ এবং সেনাবাহিনীর প্রতি গভীর আস্থাকে কোনভাবেই টলিয়ে দিতে পারেনি।

বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীকে ঘিরে বিভ্রান্তি ছড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করা হচ্ছে। উদ্দেশ্যও স্পষ্ট—‘ঠাকুরমার ঝুলি’র মতো মনগড়া কাহিনি ফেঁদে দেশপ্রেমিক বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে অপপ্রচারের ডালপালা বিস্তার করা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বিনষ্টের লক্ষ্যে এমন অপতৎপরতা তীব্র হয়ে উঠেছিল। সশস্ত্র বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার সেই অপপ্রয়াস ব্যর্থ হলেও গুজব ও বিতর্কের জালে বাহিনীকে ঘায়েল করতে নতুন করে মরিয়া হয়ে উঠেছে কুচক্রী মহল।

সামরিক বাহিনীর সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা অব্যাহত রয়েছে। অথচ গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার এই বাস্তবতাই যেন গুজববাজদের কাছে অসহনীয়। তাই নতুন করে সাজানো হচ্ছে আজগুবি কাহিনি, ছড়ানো হচ্ছে ভিত্তিহীন অপতথ্যের ডালি। জাতির ঐক্য ও সংহতির প্রতীক সেনাবাহিনীকে ঘিরে এমন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা কেবল বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টাই নয়; বরং এর মধ্য দিয়ে উন্মোচিত হচ্ছে অপপ্রচারকারীদের বিকৃত রুচি, হীন অভিসন্ধি ও মনস্তাত্ত্বিক দীনতা।

দুনিয়াকে আলোড়িত করা চব্বিশের অবিস্মরণীয় গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তথা সশস্ত্র বাহিনীকে ঘিরে স্বরচিত মিথ্যাচার ও মনগড়া কাহিনি ছড়িয়ে আসছে দেশের বাইরে অবস্থানরত গুটিকয়েক সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্ট। সংঘবদ্ধ স্বার্থান্বেষী মহলের অসত্য বয়ানকে পুঁজি করে ক্রমেই বিস্তার ঘটেছে গুজবের মহামারির। আর এই অপতথ্যের সবচেয়ে বড় লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান।

৫ আগস্টের আগে তৎকালীন সরকারের সহিংস ভূমিকার প্রেক্ষাপটে যখন লাশ, বারুদের গন্ধ ও রক্তস্রোতে দেশ বিপর্যস্ত হওয়ার আশঙ্কা ঘনীভূত হচ্ছিল, তখন ছাত্র-জনতার গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রামের অন্তর্নিহিত আকাঙ্ক্ষাকে হৃদয়ঙ্গম করে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। তাঁর সময়োচিত সিদ্ধান্ত ও দূরদর্শী নেতৃত্ব দেশের ইতিহাসের এক কঠিনতম সন্ধিক্ষণে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। নানা উসকানি, ক্রমবর্ধমান গুজব ও শত প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি নিজ বাহিনীর মনোবল অটুট রাখেন। সংকটের প্রতিটি বাঁকে ধৈর্য, সংযম ও মানবিকতার পরিচয় দিয়ে দায়িত্বশীল নেতৃত্বের দৃঢ় স্বাক্ষর রাখেন। এমন নেতৃত্ব সত্যিই ইতিহাসে বিরল।

মনগড়া তথ্য জুড়ে দিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান কিংবা সরাসরি সেনাবাহিনীকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া বিভিন্ন কনটেন্ট ও পোস্টকে বিচ্ছিন্ন সাইবার অপরাধ হিসেবে দেখার অবকাশ নেই। বরং এসব অপতৎপরতার মাধ্যমে সেনাবাহিনীকে ক্ষতিগ্রস্ত করা কিংবা রাষ্ট্রকে দুর্বল করার সুসংগঠিত প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে মনে করছেন সামরিক বিশেষজ্ঞ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন কনটেন্ট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিভ্রান্তিকর ও ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে অপপ্রচারের প্রধান লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। একই ধারায় বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর শীর্ষপর্যায়ের কর্মকর্তাদেরও জড়ানো হচ্ছে নানা ভিত্তিহীন প্রচারণায়।

বিশেষ করে দিন কয়েক ধরে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, দেশে সামরিক শাসন আসছে—এমন নানা গুজব ছড়িয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টা চলছে। এসব ভিত্তিহীন প্রচারণার বিষয়ে সতর্ক করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও সেনাপ্রধানকে ঘিরে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিকর, অসত্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্যে প্রভাবিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)। গত শনিবার (১০ অক্টোবর) প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আইএসপিআর জানায়, এসব তথ্য প্রচারের মাধ্যমে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়। এ ধরনের বিভ্রান্তিকর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচারে প্রভাবিত না হওয়ার জন্য সবার প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে সংস্থাটি।

আইএসপিআরের বক্তব্যের মূল তাৎপর্য হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত কোনো দাবি বা গুজব যাচাই ছাড়াই সত্য বলে গ্রহণ করা উচিত নয়। সেনাবাহিনী ও সেনাপ্রধানকে ঘিরে কোনো তথ্য প্রচারিত হলে তার সত্যতা নিশ্চিত করতে হবে আনুষ্ঠানিক ও নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে। একই সঙ্গে বাহিনীর চেইন অব কমান্ড, পারস্পরিক আস্থা, ঐক্য, শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্ব অটুট থাকার বিষয়টি তুলে ধরে আইএসপিআর জানিয়েছে, দেশ ও জনগণের প্রতি অর্পিত দায়িত্ব পালনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। অর্থাৎ, গুজবের ভিত্তিতে বাহিনীর অবস্থান বা নেতৃত্ব সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পরিবর্তে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ওপর আস্থা রাখার আহ্বানই সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মূল বার্তা।

দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখার পাশাপাশি জননিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলা সুরক্ষা, অনাকাঙ্ক্ষিত নৈরাজ্য-সহিংসতা প্রতিরোধ এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের অশুভ তৎপরতা রুখে দিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বারবার সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের স্বাক্ষর রেখেছে। চব্বিশের দুনিয়া কাঁপানো গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার পাশে দাঁড়িয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের ঐতিহাসিক ও সাহসী ভূমিকা মেনে নিতে পারেনি গুজবনির্ভর প্রচারণায় লিপ্ত ফেসবুক ও ইউটিউবকেন্দ্রিক একটি মহল। সেই সময় সেনাপ্রধানের দৃঢ় ও কুশলী নেতৃত্বে অভ্যুত্থান-পরবর্তী সংকটময় পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ পথ হারায়নি। এখনও রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধি কিংবা বিশেষ মহলের অনুগ্রহ লাভের অভিপ্রায়ে মনগড়া বয়ান ছড়িয়ে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করা এবং জনপরিসরে অস্থিরতা তৈরির অপতৎপরতায় সক্রিয় রয়েছে গুজবনির্ভর প্রচারচক্র।

রিউমর স্ক্যানারের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বাহিনীর উচ্চপদস্থ নেতৃত্বকে ঘিরে অন্তত ৯৬টি মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য শনাক্ত করা হয়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৭৪। অর্থাৎ, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সেনাবাহিনীকে লক্ষ্য করে ছড়ানো অপতথ্যের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাহিনীটিকে ঘিরে বিভ্রান্তিকর প্রচারণার ক্রমবর্ধমান প্রবণতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। একই সময়ে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানকে সরাসরি জড়িয়ে ২১টি সুনির্দিষ্ট ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়েছে, যা তথ্য যাচাইয়ের পর সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মনগড়া বলে প্রমাণিত হয়েছে। অর্থাৎ, অপতথ্যের বিস্তৃত পরিসরে সেনাপ্রধানকেও বারবার ব্যক্তিগতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।

শুধু সেনাবাহিনী নয়, সামগ্রিকভাবে সশস্ত্র বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কেন্দ্র করে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে মোট ১৯৫টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এসব বাহিনীকে ঘিরে ছড়ানো অপতথ্যের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৭১ শতাংশ। পরিসংখ্যানের এই চিত্র সশস্ত্র বাহিনীকে ঘিরে অপতথ্য প্রচারের ক্রমবর্ধমান ব্যাপ্তিকে সামনে এনেছে। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরী সেনাবাহিনীর উজ্জ্বল ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখা এবং জনপরিসরে অপতথ্যের বিস্তার রোধে তথ্যের সত্যতা যাচাই ও নির্ভরযোগ্য সূত্রের ওপর আস্থা রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশ্লেষকেরাও।

ফেসবুক ও ইউটিউবকেন্দ্রিক এসব প্রচারকারীর নির্লজ্জ মিথ্যাচার প্রসঙ্গে বিশ্লেষকদের ভাষ্য, হিটলারের আমলে গুজব-প্রোপাগাণ্ডার কুখ্যাত প্রবক্তা জোসেফ গোয়েবলসও আজ বেঁচে থাকলে এদের আনাড়ি ও অথর্ব গুজব ছড়ানোর প্রবণতা দেখে রীতিমতো লজ্জা পেতেন! উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচারের এমন প্রবণতায় সংশ্লিষ্ট চক্রের বিকৃত রুচি, ভণ্ডামি ও কপটতা দেশের মানুষের সামনে উন্মোচিত হয়েছে। দেশের গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের দৃষ্টিতেও এমন ভূমিকা ভণ্ডামি ও কূপমণ্ডূকতারই বহিঃপ্রকাশ।

দেশের অভ্যন্তরে কিংবা দেশের বাইরে অবস্থানরত যেসব কুচক্রীমহল বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং গণতান্ত্রিক ও স্থিতিশীল পরিবেশকে ভালো চোখে দেখে না, সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার মাধ্যমে মূলত তারাই নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির ক্ষেত্র তৈরি করতে চায়। এ ধরনের অপতৎপরতায় সাধারণ মানুষের কোনো কল্যাণ নেই, রাষ্ট্রেরও কোনো অর্জন নেই। বরং এর অভিঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় জাতীয় স্থিতিশীলতা, জনআস্থা ও দেশের ভবিষ্যৎ। বিপদে, দুর্যোগে ও জননিরাপত্তা রক্ষায়—এমনকি চব্বিশে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে একটি তাৎপর্যপূর্ণ পরিণতির দিকে এগিয়ে নিতে যে সেনাবাহিনী অনবদ্য ভূমিকা রেখেছে, সেই বাহিনীর গায়ে অপপ্রচারের কালিমা লেপনের সাম্প্রতিক অপচেষ্টা কৃতজ্ঞতার পরিবর্তে কৃতঘ্নতারই বহিঃপ্রকাশ। সংকটের মুহূর্তে কারা প্রকৃত সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়, তা সচেতন মানুষের উপলব্ধিতে গভীরভাবে প্রোথিত। তাই প্রশ্ন ওঠে, যে বাহিনীর প্রতি জনসাধারণের আস্থা দুর্বল করে দেওয়া গেলে কিংবা যাকে বিতর্কিত করে তোলা গেলে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বিপন্ন হতে পারে, তাতে শেষ পর্যন্ত লাভবান হবে কারা?

বাস্তবতা হলো, এমন অপতৎপরতার মাশুল দিতে হয় রাষ্ট্র, জনগণ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে। বিপরীতে, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতার পরিপন্থী শক্তিগুলোই এতে স্বার্থ উদ্ধারের সুযোগ পায়। এ কারণেই সেনাবাহিনীকে ঘিরে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টা কিংবা সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের অপপ্রয়াস—কোনোটিই বাংলাদেশের ইতিহাসে স্থায়ী সাফল্য পায়নি। বরং এমন অপচেষ্টা শেষ পর্যন্ত বুমেরাং হয়েছে। যারা এই পথে এগিয়েছে, তাদের অনেককেই শেষ পর্যন্ত পতন, বিতাড়ন কিংবা দেশত্যাগের মতো পরিণতির মুখোমুখি হতে হয়েছে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতীক। বহিঃশত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করা, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা দেওয়া তাদের দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীর অবদান জাতির গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের অংশ। পরবর্তী সময়েও দুর্যোগ, সংকট ও জননিরাপত্তার প্রয়োজনে বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেছেন। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময়ও সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। শৃঙ্খলা, পেশাদারিত্ব, পারস্পরিক আস্থা ও দেশপ্রেম সশস্ত্র বাহিনীর শক্তির মূল ভিত্তি। গুজব ও অপপ্রচার দিয়ে এই দৃঢ় বন্ধন দুর্বল করা সম্ভব নয়। সংকটের সময়ে দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানো, রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা রক্ষায় দায়িত্ব পালন এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সশস্ত্র বাহিনীর অবদান অনস্বীকার্য। এ কারণেই দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী বাংলাদেশের মানুষের আস্থা ও নির্ভরতার অন্যতম প্রধান জায়গা। এই বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা তাই দেশের মানুষ ঘৃণাভরেই প্রত্যাখ্যান করেছে।

চলতি বছরের ৫ মে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ডিসি সম্মেলনে দেশের সব বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘দেশের জন্য ত্যাগ ও সেবার ব্রত প্রতিটি সামরিক সদস্যের। এটি নিছক চাকরি নয়; দেশপ্রেম, শৃঙ্খলা, ত্যাগ ও সাহসিকতার এক অনন্য জীবনধারা। সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের পেশাগত মর্যাদা ও সামাজিক সম্মান যেকোনো দেশের জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি সম্পৃক্ত।’ প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার এই পর্যবেক্ষণ সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এ কারণেই সতর্ক করে তিনি বলেছেন, ‘বেসামরিক পরিমণ্ডলে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের যথাযথ মর্যাদা প্রদান না করলে ভবিষ্যতে দেশপ্রেমিক ও যোগ্য তরুণ-তরুণীদের সামরিক পেশায় আকৃষ্ট করা কঠিন হয়ে পড়বে।

এর ফলে জনবিচ্ছিন্ন ও অকার্যকর সশস্ত্র বাহিনী তৈরির ঝুঁকি দেখা দিতে পারে, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অশনিসংকেত।’ তাঁর বক্তব্যের তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনী গড়ে ওঠে কেবল অস্ত্র, সরঞ্জাম ও জনবলের ভিত্তিতে নয়; সদস্যদের মনোবল, নেতৃত্বের প্রতি আস্থা, পেশাগত সম্মান, পারস্পরিক সংহতি এবং জনগণের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্কও এর অপরিহার্য ভিত্তি। সামরিক সদস্যদের মর্যাদা নিশ্চিত করা তাই কেবল তাঁদের ব্যক্তিগত সম্মানের বিষয় নয়; দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, সার্বভৌমত্ব ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিয়ে কথা বলার সময় আরও একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন—ইউনিফর্মের পেছনে যারা রয়েছেন তাঁরা মানুষ। তাঁরা কারও ভাই, কারও সন্তান, কারও বাবা, কারও স্বামী। দেশের জন্য দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁরা দীর্ঘ সময় পরিবার থেকে দূরে থাকেন। পাহাড়, দুর্গম এলাকা, বিদেশের শান্তিরক্ষা মিশন কিংবা জাতীয় জরুরি পরিস্থিতি—যেখানেই দায়িত্ব, সেখানেই তাঁদের অঙ্গীকার একটাই—দেশ। এই দেশপ্রেমের মূল্য সবচেয়ে বেশি উপলব্ধি করা যায় তখনই, যখন দেশ কোনো সংকটের মুখোমুখি হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতি মানুষের যে আস্থা, তা এক দিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিনের দায়িত্ব, আত্মত্যাগ, শৃঙ্খলা ও দেশের প্রতি অঙ্গীকারের মধ্য দিয়েই এই আস্থা গড়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কয়েকটি পোস্ট, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভিডিও বয়ান, কিছু বেনামি অ্যাকাউন্ট কিংবা প্রযুক্তির কারসাজিতে তৈরি কনটেন্ট সেই দীর্ঘ বাস্তবতাকে বদলে দিতে পারে না। গুজবের সবচেয়ে বড় শক্তি মানুষের অসচেতনতা; আর গুজবের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সত্য। তাই আমাদের দায়িত্ব সত্যকে সামনে রাখা।

নিশ্চিত গৃহযুদ্ধের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করা, ক্ষমতাকে আলিঙ্গন না করা একজন নির্লোভ জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এর যুগশ্রেষ্ঠ নেতৃত্ব, শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অর্জন, দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ইতিহাস কিংবা দেশের নিরাপত্তায় সশস্ত্র বাহিনীর অবদান—এসব বাস্তবতার সামনে মনগড়া কোন কাহিনি টিকতে পারে না। দেশের প্রতি ভালোবাসা শুধু আবেগের বিষয় নয়; এটি দায়িত্বেরও বিষয়। সেনাবাহিনীর মতো একটি স্পর্শকাতর ও সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে কথা বলার সময় দায়িত্বশীল হওয়া, যাচাই ছাড়া তথ্য না ছড়ানো এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া সেই দায়িত্বেরই অংশ। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আমাদের দেশের। এই বাহিনীর সদস্যরা আমাদেরই মানুষ। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের সুরক্ষায় যাঁরা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করার শপথ নিয়েছেন, তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা, আস্থা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা আমাদের জাতীয় চেতনারই অংশ।

গুজব আসবে, অপতথ্য ছড়াবে, প্রযুক্তির নতুন নতুন কৌশল ব্যবহৃত হবে। কিন্তু সত্য তার জায়গায় অটুট থাকবে। বাংলাদেশের মানুষও জানে, দেশের প্রয়োজনে, মানুষের প্রয়োজনে এবং জাতীয় সংকটে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দায়িত্বের জায়গা থেকে কখনো পিছপা হয়নি। তাই গুজবের কোলাহলে নয়, বাস্তবতার আলোতেই সেনাবাহিনীকে দেখতে হবে। অপতথ্যের প্রচারে নয়, তাঁদের দীর্ঘদিনের দায়িত্ব ও আত্মত্যাগের ইতিহাসে আস্থা রাখতে হবে। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও জাতীয় মর্যাদার প্রহরীদের প্রতি এই আস্থা আমাদের শক্তি। ভুলে গেলে চলবে না—বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের গর্ব। তাঁদের দেশপ্রেম, দায়িত্ববোধ ও আত্মত্যাগের প্রতি জাতির শ্রদ্ধা অটুট থাকুক। গুজবের কুয়াশা কেটে সত্য, আস্থা ও দেশপ্রেমের শাণিত আলোয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী হোক আরও শক্তিশালী ও দুর্বার এবং বিশ্বের শ্রেষ্ঠ এক সামরিক বাহিনী।

কালের আলো /এমএএএমকে

ভুলে যাওয়া ক্যান-ক্যামেরায় ৮ বছরের সূর্যের বিরল দৃশ্য

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:৩৬ অপরাহ্ণ
ভুলে যাওয়া ক্যান-ক্যামেরায় ৮ বছরের সূর্যের বিরল দৃশ্য
একটি সাধারণ পানীয়ের ক্যান, সামান্য ফটোগ্রাফিক কাগজ আর সূর্যের আলো—এই তিনের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে বিজ্ঞানের জগতে বিস্ময় জাগানো এক ছবি। কোনো আধুনিক ক্যামেরা কিংবা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নয়, বরং ভুলে পড়ে থাকা একটি ক্যান-ক্যামেরা টানা আট বছরেরও বেশি সময় ধরে ধারণ করেছে আকাশে সূর্যের চলার পথ। ছবিটিতে সূর্যের ২ হাজার ৯৫৩টি আলাদা আলোর রেখা দেখা গেছে, যা পৃথিবীর ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সূর্যের অবস্থানের পরিবর্তনকে তুলে ধরে।

যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব হার্টফোর্ডশায়ারের বেফোর্ডবেরি অবজারভেটরিতে ঘটে এই ব্যতিক্রমী ঘটনা। আলোকচিত্রী রেজিনা ভালকেনবর্গ ২০১২ সালে সেখানে একটি সাধারণ পানীয়ের ক্যান দিয়ে তৈরি পিনহোল ক্যামেরা স্থাপন করেছিলেন। কিন্তু ক্যামেরাটি যে এত দীর্ঘ সময় ধরে সূর্যের গতিপথের ছবি ধারণ করবে, তা তাঁর পরিকল্পনায় ছিল না।

কীভাবে তৈরি হলো আট বছরের ছবি?

২০১২ সালে অবজারভেটরিতে ক্যান দিয়ে তৈরি ক্যামেরাটি স্থাপন করেন রেজিনা ভালকেনবর্গ। ক্যামেরাটির ভেতরে রাখা হয়েছিল আলোকসংবেদনশীল ফটোগ্রাফিক কাগজ। ছোট একটি ছিদ্র দিয়ে আলো প্রবেশ করে সেই কাগজে ছবি তৈরি করার কথা ছিল। এই পদ্ধতিকে বলা হয় পিনহোল ফটোগ্রাফি।

তবে ক্যামেরাটি স্থাপনের পর সেটি দীর্ঘদিন সেখানেই পড়ে থাকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটির কথা ভুলে যান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এদিকে ক্যামেরার ভেতরে থাকা ফটোগ্রাফিক কাগজে সূর্যের আলো ধীরে ধীরে জমা হতে থাকে। এভাবেই একটি সাধারণ ক্যান হয়ে ওঠে দীর্ঘমেয়াদি আলোকচিত্র ধারণের মাধ্যম।

সূর্যের গতিপথে ধরা পড়ল ঋতু পরিবর্তনের ছাপ

পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে পরিভ্রমণ করে এবং পৃথিবীর অক্ষের হেলানো অবস্থানের কারণে বছরের বিভিন্ন সময়ে আকাশে সূর্যের আপাত অবস্থান ও দৈনিক পথ বদলে যায়। গ্রীষ্মে সূর্য সাধারণত আকাশে তুলনামূলক উঁচু পথে চলে, আর শীতকালে তার পথ থাকে নিচু।

ক্যান-ক্যামেরায় ধারণ করা ছবিতে এই পরিবর্তনের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দীর্ঘ সময় ধরে সূর্যের আলো ফটোগ্রাফিক কাগজে পড়ায় তৈরি হয় একের পর এক উজ্জ্বল রেখা। রেখাগুলোর অবস্থান ও দৈর্ঘ্যের পার্থক্য থেকে বছরের বিভিন্ন সময়ে সূর্যের আকাশপথের পরিবর্তন বোঝা যায়।

ছবিটিতে মোট ২ হাজার ৯৫৩টি আলোর রেখা শনাক্ত করা হয়েছিল বলে প্রকাশিত তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। কিছু রেখার মধ্যে ফাঁকও দেখা যায়। মেঘ সূর্যের আলো আটকে দেওয়ায় এমন ফাঁক তৈরি হয়ে থাকতে পারে।

২০২০ সালে খুঁজে পাওয়া গেল ভুলে যাওয়া ক্যামেরা

২০১২ সালে স্থাপন করা ক্যামেরাটি ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে আবার খুঁজে পাওয়া যায়। তখন সেটির ভেতরে তৈরি হওয়া ছবিটি পরীক্ষা করে দেখা যায়, দীর্ঘ সময়ের সূর্যপথ একটিমাত্র আলোকচিত্রে ধরা পড়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্যামেরাটির এক্সপোজারের সময় ছিল প্রায় আট বছর ৩০ দিন। এত দীর্ঘ সময় ধরে আলো ধারণ করার কারণে ছবিটি বিশেষ গুরুত্ব পায়। এটি শুধু একটি সুন্দর দৃশ্য নয়; দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আকাশের পরিবর্তন নথিবদ্ধ করারও এক অনন্য উদাহরণ।

ছবিটির নাম সোলারগ্রাফ

দীর্ঘ সময় ধরে সূর্যের আপাত গতিপথ ধারণ করার এই বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরি ছবিকে বলা হয় ‘সোলারগ্রাফ’। এতে সাধারণত একটি ছোট ছিদ্রযুক্ত ক্যামেরা ও আলোকসংবেদনশীল কাগজ ব্যবহার করা হয়। সূর্যের আলো প্রতিদিন কাগজে রেখা তৈরি করে, আর দীর্ঘ সময় ধরে সেই রেখাগুলো একত্র হয়ে একটি ছবিতে পরিণত হয়।

এই পদ্ধতির বিশেষত্ব হলো, এতে ব্যয়বহুল ক্যামেরা বা জটিল যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হয় না। তবে দীর্ঘ সময় ধরে সূর্যের আলো পড়তে থাকায় আলোকসংবেদনশীল কাগজের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য ও আবহাওয়ার প্রভাব ছবির ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে।

সাধারণ ক্যান থেকে অসাধারণ বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ

গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই ছবির এক্সপোজারের সময় ছিল প্রায় আট বছর ৩০ দিন। দীর্ঘতম ফটোগ্রাফিক এক্সপোজারের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে ছবিটি আলোচনায় আসে।

ঘটনাটি দেখিয়ে দেয়, বিজ্ঞান ও আলোকচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণের জন্য সব সময় অত্যাধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োজন হয় না। কখনো সাধারণ উপকরণ, দীর্ঘ সময় এবং প্রকৃতির নিজস্ব নিয়ম মিলেই তৈরি করতে পারে ব্যতিক্রমী ফলাফল।

যে ক্যান-ক্যামেরাটি একসময় ভুলে পড়ে ছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত আট বছরেরও বেশি সময়ের সূর্যপথকে এক ফ্রেমে ধরে রাখে। ছবিটি যেন একটি মুহূর্তের দৃশ্য নয়, বরং সময়ের সঙ্গে আকাশের পরিবর্তনের দীর্ঘ ইতিহাস—যেখানে প্রতিটি আলোর রেখা সূর্যের আরেকটি দিনের সাক্ষ্য বহন করে।

কালের আলো/এএন/এসএ

৪০০ পরিবারের এক বছরের খাবারের দায়িত্ব নিলেন রাশমিকা মান্দানা

বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:১২ অপরাহ্ণ
৪০০ পরিবারের এক বছরের খাবারের দায়িত্ব নিলেন রাশমিকা মান্দানা
দক্ষিণী সিনেমার জনপ্রিয় অভিনেত্রী রাশমিকা মান্দানা এবার আলোচনায় এসেছেন ব্যতিক্রমী এক মানবিক উদ্যোগের কারণে। ৪০০টি পরিবারের এক বছরের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীর খরচ বহনের দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী এক বছর প্রতি তিন মাস পরপর এসব পরিবারের বাজারের খরচ জোগাবেন এই অভিনেত্রী। তাঁর আশা, এই উদ্যোগ অন্যদেরও অসচ্ছল মানুষের পাশে দাঁড়াতে উৎসাহিত করবে।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের এই উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন রাশমিকা। এত দিন ব্যক্তিগত উদ্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ালেও সেসব কাজ প্রকাশ্যে আনতেন না তিনি। তবে এবার মনে হয়েছে, তাঁর কাজের কথা জানলে অন্যরাও মানবিক কর্মকাণ্ডে এগিয়ে আসতে পারেন। সেই ভাবনা থেকেই সহায়তা কর্মসূচির বিস্তারিত তুলে ধরেছেন অভিনেত্রী।

‘জয়াম্মার সঙ্গে আমার মিল রয়েছে’

ইনস্টাগ্রামে নিজের উদ্যোগের কথা জানাতে গিয়ে রাশমিকা তাঁর আসন্ন সিনেমা ‘রণবালি’র চরিত্রের প্রসঙ্গ টেনেছেন। ছবিটিতে জয়াম্মা চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। এই চরিত্রের সঙ্গে নিজের ব্যক্তিত্বের মিল রয়েছে বলেও জানিয়েছেন অভিনেত্রী।

রাশমিকা লেখেন, ‘আপনারা অনেকেই জানতে চান, জয়াম্মার সঙ্গে আমার কোনো মিল আছে কি না। আমার উত্তর—হ্যাঁ। আর এটি তার মধ্যে অন্যতম। আমি সব সময়ই এমন ছিলাম, জয়াম্মাও এমন।’

অন্যের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতাকে নিজের ব্যক্তিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, মানুষের জন্য কিছু করার এই আগ্রহ নতুন নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরেই এমন কাজে যুক্ত রয়েছেন তিনি।

এক বছর সহায়তা পাবে ৪০০ পরিবার

রাশমিকার ঘোষিত কর্মসূচির আওতায় প্রথম পর্যায়ে ৪০০টি পরিবারকে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। আগামী এক বছর প্রতি তিন মাস পরপর এসব পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজারের খরচ বহন করবেন তিনি। অর্থাৎ একবার সহায়তা দিয়েই দায়িত্ব শেষ না করে নির্দিষ্ট বিরতিতে পরিবারগুলোর পাশে থাকার পরিকল্পনা করেছেন অভিনেত্রী।

নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী কেনার ব্যয় অনেক পরিবারের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়ায়। এই খাতে সহায়তা পেলে পরিবারগুলো অন্য প্রয়োজন মেটাতে কিংবা ভবিষ্যতের জন্য কিছু অর্থ সঞ্চয় করতে পারবে বলে আশা করছেন রাশমিকা।

কর্মসূচির আওতায় কী কী খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হবে, তার একটি তালিকাও প্রকাশ করেছেন তিনি। তবে প্রতিটি পরিবারের জন্য কত টাকা ব্যয় করা হবে কিংবা পুরো কর্মসূচিতে মোট কত অর্থ খরচ হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

‘ছোট্ট একটি ভালো কাজও বদলে দিতে পারে জীবন’

নিজের উদ্যোগের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রাশমিকা জানান, আগে এ ধরনের কাজের কথা সাধারণত প্রকাশ্যে আনতেন না। বিষয়গুলো তাঁর নিজের এবং দলের কয়েকজন সদস্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত। কিন্তু এবার মনে হয়েছে, উদ্যোগটি প্রকাশ্যে এলে অন্যরাও অনুপ্রাণিত হতে পারেন।

অভিনেত্রীর মতে, মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সব সময় বড় কোনো উদ্যোগের প্রয়োজন নেই। সামর্থ্য অনুযায়ী ছোট একটি ভালো কাজও কারও জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই যাঁদের পক্ষে সম্ভব, তাঁদের সংকটে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

ভক্তদের কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসার প্রতিদান হিসেবেও এমন উদ্যোগকে দেখছেন রাশমিকা। তাঁর আশা, নিজের কাজের কথা জানার পর অনুসারীদের কেউ কেউ ব্যক্তিগত উদ্যোগে অসচ্ছল পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে উৎসাহিত হবেন।

পরিবারগুলোর মুখের হাসিই বড় প্রাপ্তি

পেশাগত জীবনে নানা চ্যালেঞ্জ, কঠোর পরিশ্রম, শারীরিক আঘাত ও মানসিক কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে রাশমিকাকে। তবে সহায়তা পাওয়া পরিবারগুলোর মুখে হাসি দেখতে পারাকে নিজের জন্য বিশেষ আনন্দের বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।

রাশমিকার ভাষ্য অনুযায়ী, মানুষের উপকার করতে পারার তৃপ্তি অন্য অনেক প্রাপ্তির চেয়ে আলাদা। সহায়তা পাওয়া পরিবারগুলোর আনন্দ তাঁর নিজের কষ্টকেও সার্থক করে তোলে। এই অনুভূতিই তাঁকে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কাজে আরও উৎসাহিত করে।

অভিনেত্রীর এই উদ্যোগ বিনোদনজগতের তারকাদের সামাজিক দায়িত্ব ও ব্যক্তিগত মানবিক কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। তবে কর্মসূচির বাস্তবায়ন, সহায়তার পরিমাণ এবং উপকারভোগী পরিবারগুলোর পরিচয় সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।

মুক্তির অপেক্ষায় ‘রণবালি’

এদিকে পেশাগত জীবনেও ব্যস্ত সময় পার করছেন রাশমিকা মান্দানা। তাঁর নতুন সিনেমা ‘রণবালি’ মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে। ছবিটিতে জয়াম্মা চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। চরিত্রটির সঙ্গে নিজের ব্যক্তিত্বের বিশেষ মিল রয়েছে বলে জানিয়েছেন অভিনেত্রী।

সিনেমাটিতে রাশমিকার সহশিল্পী তাঁর স্বামী বিজয় দেবেরাকোন্ডা। ‘গীতা গোবিন্দম’ ও ‘ডিয়ার কমরেড’-এর পর এটি তাঁদের তৃতীয় যৌথ সিনেমা। ছবিটি পরিচালনা করেছেন রাহুল সাংকৃত্যায়ন।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে নির্মিত ‘রণবালি’র গল্পে ১৮৭৬ থেকে ১৮৭৮ সালের ‘গ্রেট মাদ্রাজ দুর্ভিক্ষ’-এর পটভূমি তুলে ধরা হয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সিনেমাটি ১৬ অক্টোবর প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়ার কথা রয়েছে। অন্যদিকে, রজনীকান্ত অভিনীত ‘জেলার ২’ সিনেমাটি ১৫ অক্টোবর মুক্তির কথা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

একদিকে নতুন সিনেমা নিয়ে দর্শকের আগ্রহ, অন্যদিকে ৪০০ পরিবারের খাদ্যসামগ্রীর ব্যয় বহনের উদ্যোগ—দুই কারণেই এখন আলোচনায় রাশমিকা। অভিনয়ের বাইরে মানুষের জন্য কাজ করার যে আগ্রহের কথা তিনি জানিয়েছেন, তাঁর সাম্প্রতিক উদ্যোগে সেই মানসিকতারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

কালের আলো/জেএন/এসএ

৫ দিনে বাতিল ১০৩ ফ্লাইট, ঢাকায় আটকা ১৫ হাজার ৭৭৯ যাত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:০৯ অপরাহ্ণ
৫ দিনে বাতিল ১০৩ ফ্লাইট, ঢাকায় আটকা ১৫ হাজার ৭৭৯ যাত্রী

নিরাপত্তাজনিত কারণে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গত পাঁচ দিনে ১০৩টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এতে এখন পর্যন্ত ১৫ হাজার ৭৭৯ জন যাত্রী আটকা পড়েছেন। ফ্লাইট বাতিলের কারণে আন্তর্জাতিক রুটের যাত্রীদের যাত্রা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এ অবস্থা চলতে পারে বলে জানিয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) দুপুরে বেবিচকের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক কাওছার মাহমুদ এ তথ্য জানান।

সরাসরি ফ্লাইট বাতিল ৪২টি

বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ দিনে বাতিল হওয়া ১০৩টি ফ্লাইটের মধ্যে ৪২টি ছিল সরাসরি ফ্লাইট। এসব ফ্লাইটের মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ১৭টি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ১০টি, সৌদিয়া এয়ারের আটটি এবং রিয়াদ এয়ারের সাতটি ফ্লাইট রয়েছে।

সরাসরি ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় সংশ্লিষ্ট রুটের যাত্রীদের যাত্রাসূচিতে বিঘ্ন ঘটেছে। বিশেষ করে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যগামী যাত্রীদের জন্য পরিস্থিতি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ট্রানজিট ফ্লাইট বাতিল ৬১টি

সরাসরি ফ্লাইটের পাশাপাশি বাতিল হয়েছে ৬১টি ট্রানজিট ফ্লাইট। এর মধ্যে ইন্ডিগোর ২২টি, সালাম এয়ারের সাতটি, ইজিপ্ট এয়ারের একটি, এমিরেটস এয়ারের ১৪টি, কাতার এয়ারওয়েজের আটটি, ফ্লাই দুবাইয়ের ছয়টি এবং এয়ার ইন্ডিয়ার তিনটি ফ্লাইট রয়েছে।

ট্রানজিট ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় শুধু ঢাকা থেকে যাত্রা করা যাত্রীরাই নন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গন্তব্যে সংযোগকারী ফ্লাইটে যাওয়ার পরিকল্পনা করা যাত্রীরাও সমস্যায় পড়তে পারেন। ফ্লাইটের সময়সূচি পরিবর্তন হলে পরবর্তী সংযোগকারী ফ্লাইট, হোটেল বুকিং ও অন্যান্য ভ্রমণ পরিকল্পনাতেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত অনিশ্চয়তা

বেবিচক জানিয়েছে, নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ফ্লাইট চলাচলে এ ধরনের বিঘ্ন অব্যাহত থাকতে পারে। তবে পরিস্থিতি কখন স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময় জানানো হয়নি।

এ অবস্থায় যাত্রীদের বিমান সংস্থা থেকে ফ্লাইটের সর্বশেষ সময়সূচি ও বাতিলের তথ্য জেনে বিমানবন্দরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। যাঁদের ট্রানজিট ফ্লাইট রয়েছে, তাঁদেরও সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করে পরবর্তী যাত্রার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি