সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে মানবিক বন্ধন, দুর্গাপূজায় সম্প্রীতির বার্তা রিজভীর
শারদীয় দুর্গাপূজা শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের উৎসব নয়, বরং সব ধর্মের মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ ও সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ় করার উপলক্ষ বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেছেন, কোনো উৎসবই মানুষকে সাম্প্রদায়িক ভেদরেখা বা সীমানার মধ্যে আটকে রাখে না; বরং সব বিভেদ অতিক্রম করে মানুষকে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে একত্র করে। শনিবার (১৭ অক্টোবর) বেলা পৌনে ১১টার দিকে রাজধানীর মিরপুর কেন্দ্রীয় মন্দিরে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে পূজামণ্ডপ পরিদর্শন ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
‘দুর্গাপূজা সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে’
রুহুল কবির রিজভী বলেন, নবান্নের এই দেশে দুর্গাপূজা কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়। মানুষের ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু উৎসবের আনন্দ সবাইকে একসূত্রে বাঁধে। তিনি বলেন, উৎসবের মূল মর্মবাণীই হচ্ছে মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ জাগিয়ে তোলা এবং পারস্পরিক দূরত্ব কমিয়ে আনা। ধর্মীয় পরিচয়ের ভিন্নতা যেন মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ও সৌহার্দ্যের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সেই বার্তাও তুলে ধরেন তিনি। রিজভীর মতে, দুর্গাপূজায় বিভিন্ন ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে, উৎসবের আনন্দ একটি সম্প্রদায়ের গণ্ডি পেরিয়ে সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
শৈশবের স্মৃতিতে দুর্গাপূজার মেলা
দুর্গাপূজাকে ঘিরে নিজের শৈশবের স্মৃতিও তুলে ধরেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব। তিনি বলেন, ছোটবেলায় বাড়ির পাশে দুর্গাপূজার মেলা বসত। সেই মেলায় রঙিন বেলুন, খেলনা পিস্তল ও বিভিন্ন ধরনের মিষ্টান্নের প্রতি আকর্ষণ ছিল তাঁর। প্রতিবছর দুর্গাপূজার সময়টির জন্য অপেক্ষা করতেন তাঁরা। শৈশবের সেই স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে তিনি বোঝাতে চান, উৎসবের আনন্দ মানুষের ব্যক্তিগত স্মৃতি ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকে। এই আনন্দ ধর্মীয় পরিচয়ের সীমা ছাড়িয়ে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও সৌহার্দ্য গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখে।
প্রদীপের আলোয় সংকীর্ণতা দূর করার আহ্বান
প্রদীপ প্রজ্বালনের তাৎপর্য তুলে ধরে রিজভী বলেন, আগুন যেমন অনেক কিছুকে পরিশুদ্ধ করে, তেমনি আগুন মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করারও প্রতীক। এ প্রসঙ্গে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে’ গানের কথা উল্লেখ করেন তিনি। রিজভী বলেন, প্রজ্বলিত প্রদীপের প্রতীকী উত্তাপ যদি প্রতিটি প্রাণে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তাহলে মানুষ সব ধরনের ক্লেদ, গ্লানি ও সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে একই মানবিক বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে। তাঁর বক্তব্যে উৎসবের আধ্যাত্মিক তাৎপর্যের পাশাপাশি মানুষের মধ্যে উদারতা, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
আতিথেয়তা ও উদারতার প্রশংসা
মিরপুর কেন্দ্রীয় মন্দিরের আয়োজকদের আতিথেয়তা ও উদারতার প্রশংসা করেন রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, অন্য সম্প্রদায়ের মানুষকে অভ্যর্থনা জানানো, শুভেচ্ছা বিনিময় করা এবং বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া উদারতা ও সম্প্রীতির প্রকাশ। তাঁর মতে, বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সৌহার্দ্য বাড়ানোর এমন উদ্যোগ সামাজিক ঐক্যকে শক্তিশালী করে। উৎসবের আয়োজন সবার জন্য উন্মুক্ত থাকলে ভ্রাতৃত্ববোধ আরও দৃঢ় হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
দুর্গাপূজার নিরাপত্তায় আগাম উদ্যোগের কথা
শারদীয় দুর্গাপূজার নিরাপত্তা প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পূজার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এক মাস আগে থেকেই বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছেন। দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদেরও এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। রিজভী আরও বলেন, বিএনপির পক্ষ থেকে এ উপলক্ষে জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং জেলায় জেলায় নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। স্থানীয় নেতাকর্মীরা পূজা উদযাপন কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ করছেন এবং তাদের প্রয়োজন ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা করছেন। উৎসব নিরাপদ রাখতে কী ধরনের ব্যবস্থা প্রয়োজন, তা নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করা হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পূজামণ্ডপ ও মন্দিরগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দলীয় পর্যায়ের উদ্যোগের পাশাপাশি প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ছুটি, চাল ও মন্দিরের বরাদ্দ নিয়ে বক্তব্য
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন দাবির প্রসঙ্গ তুলে রিজভী বলেন, তিন দিনের ছুটির দাবির বিপরীতে পাঁচ দিনের ছুটি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিটি পূজামণ্ডপে ৫০০ কেজির পরিবর্তে ৬০০ কেজি চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তিনি আরও জানান, প্রতিটি মন্দিরের জন্য মাসিক আট হাজার টাকা বরাদ্দ এবং পুরোহিত ও সেবায়েতদের সরকারি ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রিজভী বলেন, মন্দিরে ভক্তরা তাঁদের ইষ্টদেবতার কাছে প্রার্থনা করেন এবং পরিবারের সদস্যদের মঙ্গল কামনা করেন। সেই প্রার্থনা যেন নির্বিঘ্নে করতে পারেন, সে জন্য মন্দিরে শান্তি ও সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। নিরাপত্তার অভাব থাকলে ভক্তদের প্রার্থনায় মনোযোগ বিঘ্নিত হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নিরাপদ ও আনন্দময় উৎসবের প্রত্যাশা
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, দলীয়ভাবে প্রতিটি পূজামণ্ডপ ও মন্দিরের খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকার প্রশাসনের মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় দুর্গাপূজার শুভেচ্ছা জানিয়ে রিজভী প্রত্যাশা করেন, এবারের উৎসব সাফল্যমণ্ডিত ও আনন্দময় হবে। সবার জীবনে নতুন আনন্দের দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
Array