যুদ্ধের ময়দান সব সময় চোখে দেখা যায় না। কখনও তা চলে সাইবার জগতে, কখনও আকাশের স্যাটেলাইটে। আর এবার আশঙ্কার কেন্দ্র হাজার হাজার মিটার গভীর সমুদ্র—যেখানে নীরবে ছড়িয়ে আছে বিশ্বের যোগাযোগ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ধমনি। আর্কটিকের বরফঢাকা জলের নিচে সেই অদৃশ্য অবকাঠামোকে ঘিরেই রাশিয়া ও পশ্চিমের মধ্যে নতুন উত্তেজনার ইঙ্গিত মিলেছে।
পশ্চিমা কর্মকর্তাদের দাবি, নরওয়ের স্ভালবার্ড দ্বীপপুঞ্জের কাছে রাশিয়ার গভীর সমুদ্র যুদ্ধ ইউনিট জিইউজিআইয়ের তৎপরতা শনাক্ত করে ব্রিটেন, নরওয়ে ও যুক্তরাষ্ট্র। তাদের অভিযোগ, রুশ বাহিনী এমন একটি প্রযুক্তি পরীক্ষা করছিল, যা ভবিষ্যৎ সংঘাতের সময় সমুদ্রতলের গুরুত্বপূর্ণ কেবল ক্ষতিগ্রস্ত করতে ব্যবহার করা যেতে পারে।
তবে ঘটনাটি নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কোনও কেবল কাটা হয়নি। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ছিল মূলত প্রযুক্তি পরীক্ষার একটি মহড়া। কিন্তু সেই মহড়াই পশ্চিমা নিরাপত্তা মহলে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
স্ভালবার্ডের কেবল গুরুত্বপূর্ণ
সমুদ্রতলের ফাইবার-অপটিক কেবলকে সাধারণত ইন্টারনেটের অবকাঠামো হিসেবে দেখা হলেও এর গুরুত্ব তার চেয়ে অনেক বেশি। আন্তর্জাতিক যোগাযোগের পাশাপাশি এসব কেবলের মাধ্যমে সামরিক তথ্য, স্যাটেলাইট-নির্ভর ডেটা এবং রাষ্ট্রীয় ও বাণিজ্যিক যোগাযোগও প্রবাহিত হয়।
স্ভালবার্ডের সঙ্গে নরওয়ের মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ রক্ষাকারী কেবলগুলো তাই আর্কটিকের একটি কৌশলগত সম্পদ। সেখানে কোনও বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে শুধু ইন্টারনেট সংযোগ নয়, গোয়েন্দা ও সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থাতেও চাপ তৈরি হতে পারে। এ কারণেই সমুদ্রের নিচের অবকাঠামো এখন ন্যাটোর কাছে স্থলভাগের সামরিক স্থাপনার মতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
‘চিহ্নহীন’ হামলার ভয়
এই ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক প্রযুক্তিটি। পশ্চিমা কর্মকর্তাদের দাবি, রাশিয়ার গভীর সমুদ্র ইউনিট এমন সক্ষমতা নিয়ে কাজ করছে, যার মাধ্যমে সমুদ্রের তলদেশে থাকা কেবল ক্ষতিগ্রস্ত করা সম্ভব হতে পারে, অথচ হামলার উৎস শনাক্ত করা কঠিন হবে। প্রচলিত সামরিক হামলার ক্ষেত্রে আক্রমণের প্রমাণ থাকে।
কিন্তু সমুদ্রের গভীরে কোনও কেবল অচল হয়ে গেলে প্রথম মুহূর্তে বোঝাই কঠিন হতে পারে—এটি দুর্ঘটনা, প্রযুক্তিগত ত্রুটি, নাকি পরিকল্পিত নাশকতা। এই ‘অস্বীকারযোগ্যতা’ই হাইব্রিড যুদ্ধের বড় অস্ত্র। সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা না করেও প্রতিপক্ষের অর্থনীতি, যোগাযোগ ও সামরিক সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করা যায়।
ন্যাটোর নজরদারি বাড়ছে
ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়া ও পশ্চিমের সম্পর্ক এমনিতেই তলানিতে। এর মধ্যে বাল্টিক সাগর থেকে উত্তর ইউরোপীয় জলসীমা—সর্বত্র সমুদ্রতলের কেবল, গ্যাস পাইপলাইন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
ব্রিটেন ও নরওয়ে আগেই অভিযোগ করেছে, রাশিয়ার জিইউজিআই আর্কটিক ও উত্তর ইউরোপের জলসীমায় গোপন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এবারের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রও নজরদারি অভিযানে যুক্ত ছিল বলে পশ্চিমা কর্মকর্তাদের দাবি।
নরওয়ের প্রতিরক্ষামন্ত্রী টোরে স্যান্ডভিকের বক্তব্যও পরিস্থিতির গুরুত্ব স্পষ্ট করে। তাঁর ভাষায়, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করার যেকোনও প্রচেষ্টা শনাক্ত করা হবে এবং তার পরিণতি হবে। এই বার্তাটি শুধু রাশিয়ার উদ্দেশে নয়; সমুদ্রতলের অবকাঠামো যে এখন ন্যাটোর নিরাপত্তা কৌশলের অংশ, সেটিও স্পষ্ট করা হয়েছে।
সামনে ‘অদৃশ্য যুদ্ধ’
রাশিয়া এ ধরনের অভিযোগ নিয়মিত অস্বীকার করে এসেছে। ফলে আর্কটিকের এবারের ঘটনাকে সরাসরি নাশকতার প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি বড় একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত—ভবিষ্যৎ সংঘাতে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার জন্য সামরিক ঘাঁটি বা শহর আক্রমণই একমাত্র পথ নাও হতে পারে। একটি কেবল বিচ্ছিন্ন হলে তার প্রভাব পড়তে পারে ব্যাংকিং, ইন্টারনেট, সামরিক যোগাযোগ, স্যাটেলাইট ডেটা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে। আর হামলাটি যদি এমনভাবে করা যায়, যার উৎস শনাক্ত করাই কঠিন, তাহলে প্রতিক্রিয়া জানানোও হয়ে উঠবে জটিল।
এই কারণেই আর্কটিকের বরফের নিচে রুশ তৎপরতা এখন শুধু একটি সামরিক মহড়ার গল্প নয়। এটি ভবিষ্যৎ যুদ্ধের একটি সম্ভাব্য নতুন মানচিত্রের ইঙ্গিত—যেখানে গোলাবারুদের শব্দ শোনা যাবে না, বিস্ফোরণের আগুন দেখা যাবে না; অথচ একদিন হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে যেতে পারে একটি দেশের যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ ধমনি।
কালের আলো/এম/এএইচ
আপনার মতামত লিখুন
Array