খুঁজুন
                               
, ,
           

জাতীয় নিরাপত্তা: সামরিক সাফল্য ও সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি কৌশল

ড. মোঃ মিজানুর রহমান:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৫৮ অপরাহ্ণ
জাতীয় নিরাপত্তা: সামরিক সাফল্য ও সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি কৌশল

জাতীয় নিরাপত্তা একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, স্থিতিশীলতা এবং টেকসই উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। আধুনিক বিশ্বে নিরাপত্তার ধারণা কেবল সীমান্ত রক্ষা কিংবা সামরিক সক্ষমতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সামাজিক সম্প্রীতি, সুশাসন এবং জনগণের আস্থার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। যে রাষ্ট্র তার সমগ্র ভূখণ্ডে কার্যকর প্রশাসন, আইনের শাসন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, সেই রাষ্ট্রই বিনিয়োগ আকর্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, পর্যটন সম্প্রসারণ এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিবেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। ফলে জাতীয় নিরাপত্তাকে আজ একটি সমন্বিত রাষ্ট্রনৈতিক ও উন্নয়নমূলক কৌশল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এই প্রেক্ষাপটে বান্দরবানের দুর্গম রেতলাং এলাকায় পরিচালিত সাম্প্রতিক সফল সামরিক অভিযান বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার সক্ষমতা ও পেশাদারিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। দীর্ঘদিন ধরে দুর্গম পাহাড়, ঘন বনাঞ্চল এবং সীমান্তবর্তী ভৌগোলিক অবস্থানের সুযোগ নিয়ে কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠী সেখানে তাদের তৎপরতা পরিচালনার চেষ্টা করেছে। এসব কার্যক্রম শুধু স্থানীয় জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকেই ব্যাহত করেনি; বরং সীমান্ত নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছিল। এই বাস্তবতায় পরিচালিত অভিযান প্রমাণ করেছে যে, রাষ্ট্র তার সার্বভৌমত্ব ও আইনগত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং দেশের কোনো অঞ্চলই রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়।

রেতলাংয়ের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য এই অভিযানের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। খাড়া পাহাড়, ঘন বনাঞ্চল, সীমিত যোগাযোগব্যবস্থা এবং প্রতিকূল প্রাকৃতিক পরিবেশ দীর্ঘদিন ধরে এলাকাটিকে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর জন্য তুলনামূলক নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত করেছিল। বিশেষ করে বর্ষাকালে দুর্গম পথ এবং বিচ্ছিন্ন অবস্থান নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য অভিযান পরিচালনাকে অত্যন্ত কঠিন করে তোলে। এমন পরিস্থিতিতে নির্ভুল গোয়েন্দা তথ্য, আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাহিনী এবং আন্তঃসংস্থার কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমে সফল অভিযান পরিচালনা বাংলাদেশের নিরাপত্তা সক্ষমতার একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ। এটি কেবল একটি ঘাঁটি ধ্বংসের ঘটনা নয়; বরং প্রতিকূল পরিবেশেও রাষ্ট্রের কার্যকর উপস্থিতি নিশ্চিত করার সক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য চট্টগ্রাম ভৌগোলিক, কৌশলগত এবং অর্থনৈতিক—তিনটি দিক থেকেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি নিয়ে গঠিত এই অঞ্চল দেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় এক-দশমাংশজুড়ে বিস্তৃত এবং মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সীমান্ত ভাগ করে। বিশেষত বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের একটি বড় অংশ দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত, যেখানে প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা যেমন রয়েছে, তেমনি আন্তঃসীমান্ত অপরাধ, অবৈধ অস্ত্র ও মাদকপাচারের ঝুঁকিও বিদ্যমান। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের অভিজ্ঞতা দেখায়, এ ধরনের দুর্গম সীমান্ত এলাকাকে সশস্ত্র গোষ্ঠী ও সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র প্রায়ই তাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ব্যবহার করার চেষ্টা করে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা কেবল স্থানীয় বা আঞ্চলিক বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

এই অঞ্চলের গুরুত্ব শুধু নিরাপত্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, জীববৈচিত্র্য এবং পর্যটন সম্ভাবনার কারণে বান্দরবান বাংলাদেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন অঞ্চল। পাশাপাশি কৃষি, বনজ সম্পদ, ক্ষুদ্র শিল্প এবং সীমান্ত বাণিজ্য এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। কিন্তু নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিলে পর্যটন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিপরীতে নিরাপদ পরিবেশ প্রতিষ্ঠিত হলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি দ্রুত বিস্তৃত হয় এবং স্থানীয় জনগণের কর্মসংস্থান ও আয়ের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়। এ কারণেই নিরাপত্তা ও উন্নয়নকে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতাও একই বাস্তবতার সাক্ষ্য দেয়। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও নিরাপত্তাহীনতা কোনো দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে, অন্যদিকে স্থিতিশীল নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পর্যটনের প্রসারে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তাই আধুনিক রাষ্ট্রগুলো নিরাপত্তাকে কেবল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিষয় হিসেবে দেখে না; বরং এটি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, উন্নয়ন কৌশল এবং রাষ্ট্র পরিচালনার একটি মৌলিক উপাদান হিসেবে বিবেচনা করে।

বান্দরবানের সাম্প্রতিক অভিযানও সেই বৃহত্তর বাস্তবতার অংশ। এটি শুধু একটি সফল সামরিক অভিযান নয়; বরং পরিকল্পনা, গোয়েন্দা তথ্য, প্রযুক্তি, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ এবং আন্তঃসংস্থার সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিচালিত একটি কৌশলগত নিরাপত্তা কার্যক্রম। সামরিক কৌশলবিদ সান জু তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ The Art of War-এ উল্লেখ করেছেন, যুদ্ধক্ষেত্রে প্রকৃত বিজয় অনেকাংশেই নির্ভর করে পূর্বপ্রস্তুতি, তথ্য এবং সঠিক পরিকল্পনার ওপর। আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এই নীতির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর গোয়েন্দা কার্যক্রম, বিশেষায়িত বাহিনীর দক্ষতা এবং সমন্বিত পরিকল্পনাই আজকের নিরাপত্তা অভিযানের সফলতার প্রধান ভিত্তি।

রেতলাং অভিযানের আরেকটি তাৎপর্য হলো এটি স্থানীয় জনগণের কাছে রাষ্ট্রের কার্যকর উপস্থিতির বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ভয়, অনিশ্চয়তা কিংবা সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাবের মধ্যে বসবাসকারী মানুষের জন্য নিরাপত্তা শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়; এটি নাগরিক অধিকার ও উন্নয়নের পূর্বশর্ত। যখন রাষ্ট্র জনগণের জীবন, সম্পদ ও চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়, তখন জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পায় এবং উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়। ফলে সামরিক সাফল্যের প্রকৃত মূল্যায়ন শুধু অভিযানের ফলাফলে নয়, বরং সেই সাফল্য কতটা স্থায়ী নিরাপত্তা, জনআস্থা এবং উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে, তার ওপর নির্ভর করে।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, সামরিক সাফল্য কোনো সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় হলেও তা কখনোই এককভাবে যথেষ্ট নয়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, সুশাসন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণকে সমান গুরুত্ব দিতে হয়। অন্যথায় সাময়িক নিরাপত্তা অর্জিত হলেও দীর্ঘমেয়াদে অস্থিতিশীলতা পুনরায় ফিরে আসার আশঙ্কা থেকে যায়।

কলম্বিয়ার অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কয়েক দশক ধরে রেভল্যুশনারি আর্মড ফোর্সেস অব কলম্বিয়া (Revolutionary Armed Forces of Colombia–FARC) নামের মার্ক্সবাদী গেরিলা সংগঠন দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে সশস্ত্র বিদ্রোহ, অপহরণ, চাঁদাবাজি, মাদকপাচার এবং সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে সহিংস কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে, যা দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। সরকার একদিকে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম সীমিত করে, অন্যদিকে রাজনৈতিক সংলাপ, গ্রামীণ উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং পুনর্বাসন কর্মসূচির মাধ্যমে সংঘাতপ্রবণ এলাকাগুলোকে মূলধারার অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করে। এর ফলে পর্যটন, কৃষি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে এবং বহু অঞ্চল ধীরে ধীরে উন্নয়নের নতুন কেন্দ্রে পরিণত হয়।

শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের অবসানের পর দেশটি উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে যোগাযোগব্যবস্থা, অবকাঠামো এবং পর্যটন উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করে। যদিও যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্মিলন প্রক্রিয়ায় নানা চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে, তবু নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। একইভাবে ফিলিপাইনের মিন্ডানাও অঞ্চলের অভিজ্ঞতা দেখায়, নিরাপত্তা অভিযানকে রাজনৈতিক সংলাপ, স্থানীয় শাসনব্যবস্থা এবং উন্নয়ন কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয় না করলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে। এসব অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ শিক্ষা বহন করে।

এই প্রেক্ষাপটে বান্দরবানের সফল অভিযানকে একটি বৃহত্তর জাতীয় কৌশলের সূচনা হিসেবে দেখা উচিত। সামরিক সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে সন্ত্রাস, অবৈধ অস্ত্র, চাঁদাবাজি, অপহরণ এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধের বিরুদ্ধে সমন্বিত ও ধারাবাহিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আধুনিক গোয়েন্দা সক্ষমতা, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, ড্রোন, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা এবং বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার কার্যকর সমন্বয় নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকায় নিয়মিত নজরদারি ও তথ্যভিত্তিক অভিযান ভবিষ্যতে একই ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
সীমান্ত ব্যবস্থাপনার উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের দুর্গম এলাকাগুলোতে অবৈধ অস্ত্র, মাদকপাচার এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনে প্রযুক্তিনির্ভর সীমান্ত নজরদারি, তথ্য বিনিময় এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। কারণ বর্তমান বিশ্বে অনেক নিরাপত্তা হুমকি জাতীয় সীমারেখা অতিক্রম করে আঞ্চলিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

তবে নিরাপত্তা কৌশলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো স্থানীয় জনগণের আস্থা অর্জন। পার্বত্য অঞ্চলের জনগণ নিজেদের রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও নিরাপত্তা কার্যক্রমের সক্রিয় অংশীদার বলে অনুভব করলে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা অনেক সহজ হবে। এজন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, যোগাযোগব্যবস্থা, ডিজিটাল সংযোগ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন। উন্নয়নের সুযোগ বৃদ্ধি পেলে সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রও সংকুচিত হবে। তাই নিরাপত্তা ও উন্নয়নকে প্রতিযোগী নয়, বরং পরস্পর-সম্পূরক নীতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানোও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে। পরিবেশসম্মত পর্যটন, উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্য, ফল ও বনজ সম্পদের টেকসই ব্যবহার, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ এবং সীমান্ত বাণিজ্যের সম্প্রসারণ এই অঞ্চলের অর্থনীতিকে নতুন গতি দিতে পারে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যত সম্প্রসারিত হবে, কর্মসংস্থান তত বাড়বে এবং সামাজিক স্থিতিশীলতাও তত শক্তিশালী হবে। নিরাপত্তা ও উন্নয়নের এই পারস্পরিক সম্পর্কই আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মৌলিক নীতি।
একই সঙ্গে পার্বত্য অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়েও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। উন্নয়ন কার্যক্রম এমনভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত, যাতে অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং পরিবেশগত ভারসাম্য পাশাপাশি বজায় থাকে। অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, সুশাসন এবং ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদি শান্তির জন্য অপরিহার্য।

বান্দরবানের সাম্প্রতিক অভিযান বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার সক্ষমতা, পেশাদারিত্ব এবং কৌশলগত প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। এটি প্রমাণ করেছে যে, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ এবং সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে রাষ্ট্র দেশের যেকোনো অঞ্চলে তার আইনগত কর্তৃত্ব ও সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম। তবে এই সামরিক সাফল্যকে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও টেকসই নিরাপত্তায় রূপ দিতে হলে একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশল গ্রহণ করা অপরিহার্য।

এ লক্ষ্যে সীমান্ত নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সক্ষমতা আরও আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে, যাতে সশস্ত্র গোষ্ঠী, অবৈধ অস্ত্র, মাদকপাচার এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করা যায়। একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণকে উন্নয়ন ও নিরাপত্তা কার্যক্রমের অংশীদার করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, কর্মসংস্থান এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটনে পরিকল্পিত বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। স্থানীয় প্রশাসনের সক্ষমতা বৃদ্ধি, আন্তঃসংস্থার কার্যকর সমন্বয়, আইনের শাসন নিশ্চিতকরণ এবং সীমান্ত বাণিজ্যের বৈধ সুযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো সম্ভব। সামরিক সক্ষমতা, সুশাসন, জনগণের আস্থা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের সমন্বিত প্রয়াসই পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ অঞ্চলে পরিণত করবে এবং বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলকে আরও কার্যকর, টেকসই ও ভবিষ্যতমুখী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করবে।

অতএব, সামরিক সাফল্যকে একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশলে রূপান্তর করা এখন সময়ের দাবি। এ লক্ষ্যে সীমান্ত নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সক্ষমতা আরও আধুনিক করা, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদার করা, স্থানীয় জনগণকে নিরাপত্তা ও উন্নয়ন কার্যক্রমের অংশীদার করা এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, কর্মসংস্থান ও পরিবেশবান্ধব পর্যটনে পরিকল্পিত বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আন্তঃসংস্থার সমন্বয়, স্থানীয় প্রশাসনের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সীমান্ত বাণিজ্যের বৈধ সুযোগ সম্প্রসারণ পার্বত্য অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। সামরিক সক্ষমতা, সুশাসন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সামাজিক সম্প্রীতির এই সমন্বিত প্রয়াসই পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ অঞ্চলে পরিণত করবে এবং বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলকে আরও কার্যকর, টেকসই ও ভবিষ্যতমুখী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করবে।

লেখক: অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট।ড. মোঃ মিজানুর রহমান
Mizan12bd@yahoo.com

দিল্লিতে শেখ হাসিনাকে কথা বলতে দেওয়ায় ক্ষুব্ধ ঢাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২৬, ১২:১৪ পূর্বাহ্ণ
দিল্লিতে শেখ হাসিনাকে কথা বলতে দেওয়ায় ক্ষুব্ধ ঢাকা

বুধবার (৫ আগস্ট) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে এই ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আত্মগোপনে থাকা দণ্ডপ্রাপ্ত গণহত্যাকারী শেখ হাসিনাকে আজ (বুধবার) সন্ধ্যায় নয়াদিল্লিতে গণমাধ্যমের সঙ্গে সরাসরি আলাপচারিতার অনুমতি দেওয়ায় বাংলাদেশ ক্ষুব্ধ।

ঢাকা গভীরভাবে দুঃখ প্রকাশ করে যে, আমাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পুনর্গঠনে এই ঘটনার সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে ভারত সরকারকে উদ্বেগ জানানো সত্ত্বেও এই প্রকাশ্য অনুষ্ঠান আয়োজনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার এই আলাপচারিতা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা এবং জুলাই বিপ্লবের শহীদদের প্রতি মারাত্মক অপমান।

ফ্যাসিবাদী শাসন দ্বারা ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে শিশুসহ নিরীহ বেসামরিক লোকদের নৃশংস হত্যাকাণ্ড-সংক্রান্ত জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত তথ্য অস্বীকার করা পলাতক দোষী সাব্যস্ত গণহত্যাকারী হাসিনা এবং তার অপরাধী সহযোগীদের ইতিহাসের জোয়ারকে বিপরীত করার একটি বৃথা প্রচেষ্টা। বাংলাদেশের জনগণ অতীতে এ ধরনের জঘন্য প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করেছিল এবং এখনো করছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে সমুন্নত রেখে দেশের জনগণ দৃঢ় সংকল্প নিয়েছে যে, জাতি আর কখনো ফ্যাসিবাদের অন্ধকার দিনগুলোতে ফিরে যাবে না এবং বাংলাদেশ কখনো ক্লায়েন্ট রাষ্ট্র হবে না। সাজাপ্রাপ্ত গণহত্যাকারী শেখ হাসিনা ও তার মাফিয়া প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের রাজনীতিতে কখনো স্থান পাবে না।

বিবৃতির শেষাংশে বলা হয়েছে, সার্বভৌম সাম্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং জাতীয় মর্যাদার ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে গঠনমূলক, পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট ও দূরদর্শী সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় বাংলাদেশ।

দুঃখজনকভাবে, ২০১৩ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রত্যর্পণ চুক্তির অধীনে দোষী সাব্যস্ত অপরাধী হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারত সরকারের কাছে বারবার অনুরোধ করা হলেও এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। বিপরীতে, যে কোনো অজুহাতে তাকে গণমাধ্যমের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলার সুযোগ দেওয়া আমাদের জনগণের অনুভূতির জন্য গভীরভাবে ক্ষতিকর এবং বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিকাশের জন্যও ক্ষতিকর।

কালের আলো/জেএন/এমএসআইপি

জুলাইয়ের চেতনায় বৈষম্যহীন ও মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে : তথ্যমন্ত্রী

বরিশাল প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৫৩ অপরাহ্ণ
জুলাইয়ের চেতনায় বৈষম্যহীন ও মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে : তথ্যমন্ত্রী

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনাকে ধারণ করে একটি বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক এবং মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন।

বুধবার (৫ আগস্ট) বরিশাল জেলা শিল্পকলা একাডেমি অডিটোরিয়ামে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভা এবং জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পেরিয়েছে। সমগ্র বাংলাদেশে শ্রদ্ধা ও ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে এই ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি ও চেতনা স্মরণ করা হচ্ছে। আমরা চাই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আদর্শ ও চেতনা দেশের প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে জাগ্রত থাকুক।’

তিনি বলেন, ‘হাজারো মানুষের আত্মত্যাগ, সংগ্রাম ও প্রত্যাশার মধ্য দিয়ে অর্জিত এই চেতনাকে যেন কোনো অপশক্তি ভুল পথে পরিচালিত করতে না পারে, সেজন্য সবাইকে সচেতন, ঐক্যবদ্ধ ও সজাগ থাকতে হবে।’

গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ‘স্বাধীন বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকারকে দীর্ঘদিন ধরে একটি গোষ্ঠী ও একটি পরিবার কুক্ষিগত করে রেখেছিল। জনগণের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছিল এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এ দেশের তরুণ প্রজন্ম, ছাত্রসমাজ, কৃষক, শ্রমিক ও পেশাজীবীসহ সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ সেই অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেনি।’

তিনি আরও বলেন, ‘তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী প্রলোভন, পদ-পদবির লোভ ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে মানুষকে বিভক্ত করার চেষ্টা চালিয়েছিল। এমনকি অনেককে মন্ত্রী বানানোর প্রলোভনও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দেশের সচেতন মানুষ সেই প্রলোভনে পা দেয়নি। তারা ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে দেশের স্বার্থকে বড় করে দেখেছে এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অটল থেকেছে।’

জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ‘আমাদের গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে, এটি কেবল কয়েকজন সাহসী তরুণের আন্দোলন ছিল না। এটি ছিল সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধ এবং দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, অন্যায় ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে জনগণের ঐক্যবদ্ধ ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। এই আন্দোলনের মূল শক্তিই ছিল জনগণের ঐক্য, সাহস এবং গণতন্ত্রের প্রতি অটল বিশ্বাস।’

বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন অতিরিক্ত ডিআইজি ড. মো. সাইফুল্লাহ বিন আনোয়ার, জেলা প্রশাসক মো. মামুন খন্দকার, পুলিশ সুপার এ.জেড.এম. মোস্তাফিজুর রহমান, প্রবীণ রাজনৈতিক নেতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা এবায়দুল হক চাঁন, বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল আলম ফরিদ, মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান খান ফারুক এবং সদস্য সচিব জিয়া উদ্দিন সিকদার।

বরিশাল বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসনের যৌথ আয়োজনে এ অনুষ্ঠানে জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্য এবং জুলাই যোদ্ধারা উপস্থিত ছিলেন। আলোচনার শুরুতে জুলাই শহীদ যোদ্ধাদের স্মরণে একটি তথ্যচিত্র (ডকুমেন্টারি) প্রদর্শন করা হয়।

কালের আলো/আর/এমএইচ

দিল্লির ভুল কূটনীতি কি হারাচ্ছে ঢাকার আস্থা?

আহসান হাবিব বরুন:
প্রকাশিত: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৫০ অপরাহ্ণ
দিল্লির ভুল কূটনীতি কি হারাচ্ছে ঢাকার আস্থা?

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি ও আন্তর্জাতিক প্রটোকলের ইতিহাসে প্রতিবেশীর প্রতি আধিপত্যবাদী আচরণের বহু দৃষ্টান্ত থাকলেও, অতি সম্প্রতি ভারত সরকার কর্তৃক বাংলাদেশের সঙ্গে প্রদর্শিত কূটনৈতিক অনাচার সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছে। দীর্ঘ দেড় দশকের একপাক্ষিক ও স্বৈরাচারভিত্তিক সুবিধাবাদী কাঠামোর অবসানের পর বাংলাদেশে যে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তাকে মেনে নিতে সাউথ ব্লকের নিদারুণ মানসিক অস্বস্তি আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট। সম্প্রতি ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অত্যন্ত নাটকীয় ভঙ্গিতে জানিয়েছিলেন—ভারতের মাটি বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে স্বাগত জানানোর জন্য ‘অধীর আগ্রহে’ অপেক্ষা করছে। কিন্তু কূটনীতির খাতা খুলতেই প্রকাশ পেল দিল্লির সেই পুরানো ছদ্মবেশ। কথা ও কাজের যোজন যোজন দূরত্ব প্রমাণ করে, ভারত এখনো তাদের গতানুগতিক ছদ্ম-কূটনীতি ও আধিপত্যবাদী মনস্তাত্ত্বিক খেলা থেকে সরে আসতে পারেনি।

আগামী ১২ ও ১৩ই সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বিশ্বরাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী জোট ব্রিকস (BRICS)-এর ১৮তম শীর্ষ সম্মেলনের ‘আউটরিচ’ পর্বে অংশ নেওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে যে আনুষ্ঠানিক দাওয়াতপত্র পাঠানো হয়েছে, তার ভাষা ও প্রটোকল আন্তর্জাতিক সম্পর্কের চরম অবমাননা।

আমন্ত্রণপত্রে তারেক রহমানকে ১৮ কোটি মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের ‘প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে সম্বোধন না করে, কেবল একটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোট ‘বিমসটেক (BIMSTEC)-এর চেয়ার’ হিসেবে সম্বোধন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক ভিয়েনা কনভেনশন এবং প্রথাগত ডিপ্লোমেটিক কাস্টমসের এটি কেবল চরম লঙ্ঘনই নয়, বরং এটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জনগণের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সত্যকে অস্বীকৃতি জানানোর অসৎ প্রয়াস ছাড়া আর কিছুই নয়।

আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে প্রতিটি শব্দের প্রয়োগ, সম্বোধন এবং বাক্যবিন্যাস নিখুঁত হিসাব-নিকাশের পর নির্ধারিত হয়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো একটি প্রবীণ সংস্থায় এই ধরনের ভুল দুর্ঘটনাবশত ঘটেছে কিংবা এটি একটি ‘প্রযুক্তিগত অসাবধানতা’—এই যুক্তি শিশুসুলভ। এটি কোনো অনিচ্ছাকৃত বিচ্যুতি নয়, বরং সাউথ ব্লকের একটি ঠান্ডা মাথার সুপরিকল্পিত মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির অপপ্রয়াস।

নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সাপ্তাহিক প্রেস ব্রিফিংয়ে যখন একাধিক দেশি-বিদেশি সাংবাদিক মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালকে চেপে ধরেন এবং প্রশ্ন তোলেন—কেন বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর পদবি এড়িয়ে তাঁকে বিমসটেক প্রধান হিসেবে কার্ড পাঠানো হলো? তখন তিনি কোনো যৌক্তিক বা প্রশাসনিক ব্যাখ্যা দেওয়ার পরিবর্তে কৌশলে এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, “প্রস্তুতি চলছে, কারিগরি বিষয় নিয়ে পরে কথা বলা যাবে।” মুখপাত্রের এই বিভ্রান্তিকর ও পাশ কাটানো উত্তরই প্রমাণ করে যে, এটি কোনো ‘টাইপিং ভুল’ ছিল না। এটি ছিল ঢাকাকে একটি বার্তা দেওয়ার সুপরিকল্পিত কৌশল, যার মূল উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের সার্বভৌম নেতৃত্বের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করা এবং বাংলাদেশ সরকারকে ভূরাজনৈতিকভাবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে কিছুটা ছোট করে উপস্থাপন করা।

দিল্লির মূল সমস্যা হলো—তারা এখনো ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক বাস্তবতা অনুধাবন করতে পারছে না, অথবা বুঝতে পেরেও তা মেনে নিতে অস্বীকার করছে। শেখ হাসিনা সরকারের টানা দেড় দশকে দিল্লি বাংলাদেশের ভূখণ্ড, প্রটোকল, অর্থনৈতিক বাজার এবং ট্রানজিট সুবিধা একচেটিয়াভাবে ব্যবহার করেছে, যার বিনিময়ে বাংলাদেশ পেয়েছে সীমান্তে ফেলানীদের লাশ, অসম তিস্তা চুক্তি আর বাণিজ্য বৈষম্য। সেই সময় বাংলাদেশকে ভারতের একটি ‘অঙ্গরাজ্য সমতুল্য’ প্রটোকলে মূল্যায়ন করার যে বদঅভ্যাস সাউথ ব্লকে তৈরি হয়েছিল, সেখান থেকে ভারতীয় নীতি-নির্ধারকেরা বের হতে পারছেন না।

ভারতের নীতি-নির্ধারকদের মনস্তত্ত্ব এখনো হাসিনাকেন্দ্রিক সেই পুরনো একপাক্ষিক অক্ষেই আটকে আছে। তারা ভুলে গেছে যে, গণ-অভ্যুত্থান ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে আজ এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। এই নতুন বাংলাদেশে সরকার পরিচালিত হয় জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছায়, দিল্লির সাউথ ব্লকের কোনো প্রেসক্রিপশনে নয়। ভারত যদি ভেবে থাকে যে আগের মতোই অবমূল্যায়ন আর অসৌজন্যমূলক প্রটোকল দিয়ে ঢাকাকে পদানত রাখা যাবে, তবে তারা মহা ভুলের স্বর্গে বাস করছে।

দিল্লিকে বুঝতে হবে, ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশ আর ২০০৯ বা ২০১৪ সালের জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল এবং বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত ভৌগোলিক কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বাংলাদেশ আজ বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর মনোযোগের কেন্দ্রে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, যুক্তরাজ্য এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের উদীয়মান শক্তিগুলো এখন বাংলাদেশকে সর্বোচ্চ স্তরের সার্বভৌম গুরুত্ব দিচ্ছে। তারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি সমমর্যাদার ভিত্তিতে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগ রক্ষা করছে।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নতুন বাংলাদেশ আর কোনো একক দেশের ওপর নির্ভরশীল নয়। ভারত যখন একের পর এক কূটনৈতিক ভুল করছে, তখন বিশ্বরাজনীতিতে অন্যান্য পরাশক্তিগুলো বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামরিক সমীকরণে সমমর্যাদার সম্পর্কে এগিয়ে আসছে।

বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা, বাণিজ্য পথ এবং ভূরাজনৈতিক সুরক্ষার জন্য ভারতকে দিনশেষে বাংলাদেশের ওপরই নির্ভর করতে হবে। বাংলাদেশের আত্মসম্মানে আঘাত দিয়ে ভারত কেবল নিজের ভূরাজনৈতিক নিরাপত্তাকেই চরম ঝুঁকিতে ফেলছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরিচিতি সব সময় দুই ধারায় বিভক্ত ছিল—একপক্ষ ছিল নতজানু ও দাসত্বপ্রবণ, আর অপরপক্ষ ছিল স্বাধীন, আত্মমর্যাদাশীল ও সার্বভৌম। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্রথম বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন ও স্বাবলম্বী রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড় করিয়েছিলেন। তিনি কেবল সার্ক (SAARC) গঠনের মাধ্যমে আঞ্চলিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেননি, বরং বড় কোনো পরাশক্তির রক্তচক্ষুকে পরোয়া না করে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াও সেই একই ধারাবাহিকতা রক্ষা করে প্রতিবেশীর সব ধরনের আধিপত্যবাদী মনস্তাত্ত্বিক চাপকে দৃঢ়ভাবে মোকাবেলা করেছিলেন।

তাদের যোগ্য উত্তরসূরি এবং আজকের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পিতা-মাতার সেই বীরত্বপূর্ণ ও সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতির পথেই হাঁটছেন। তাঁর পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্রই হলো—সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে দাসত্ব নয়। দেশের কোটি কোটি জনগণের স্পষ্ট অনুভূতির প্রতিফলন ঘটিয়ে আজ প্রধানমন্ত্রীকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যে কূটনৈতিক কাঠামোয় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে তাঁর রাষ্ট্রীয় পদবি দিতে ভারতের হাত কাঁপে, যে প্রটোকলে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকে কোনো আঞ্চলিক সংস্থার ছায়ায় ঢেকে দেওয়ার চক্রান্ত হয়—সেই আমন্ত্রণে সাড়া দেওয়া হবে শহীদ জিয়া ও বেগম খালেদা জিয়ার আত্মমর্যাদাশীল নীতির পরিপন্থী। সুতরাং দেশের জাতীয় স্বার্থ এবং আত্মসম্মানকে বিকিয়ে দিয়ে কোনো প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে ‘প্রহসনের বন্ধুত্ব’ বিএনপি বা তারেক রহমান কোনো দিন বরদাশ করেননি, ভবিষ্যতেও করবেন না।

আসন্ন ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন হতে পারত বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে থমকে যাওয়া পারস্পরিক কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনর্গঠন ও সুসংহত করার এক সোনালী সুযোগ। দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন, বিভ্রান্তি এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের মেঘ কাটিয়ে দুটি প্রতিবেশী দেশ সমমর্যাদার ভিত্তিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারত। ঢাকাও ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছিল যে, যদি সমমর্যাদা নিশ্চিত হয়, তবে আন্তর্জাতিক স্বার্থে ভারত সফরে প্রধানমন্ত্রী ইতিবাচক চিন্তা করতে পারেন। কিন্তু দিল্লি তাদের ঐতিহ্যগত ‘দাদাগিরি’ ও আধিপত্যবাদী আচরণের কারণে সেই ঐতিহাসিক সুযোগটিকে ধূলিসাৎ করে দিল।

একটি শীর্ষ আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দাওয়াত পাঠানোর মতো সংবেদনশীল বিষয়েও তারা যে সংকীর্ণতা ও কূটচালের পরিচয় দিয়েছে, তা প্রমাণ করে যে ভারত এখনো সম মর্যাদার প্রতিবেশীকে গ্রহণ করতে মানসিকভাবে প্রস্তুত নয়। তারা সম্পর্ক উন্নয়ন বলতে বোঝায় আধিপত্য বজায় রাখা।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া কেমন হওয়া উচিত? কূটনীতিতে নীরবতা অনেক সময় সম্মতির লক্ষণ হিসেবে গণ্য হয়। তাই ভারতের এই অরুচিকর এবং অপমানজনক আমন্ত্রণের বিপরীতে নমনীয়তা দেখানোর কোনো সুযোগ বাংলাদেশের সামনে নেই।

বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচিত অবিলম্বে ভারতের এই দাওয়াতপত্রকে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রটোকলবিরোধী আখ্যা দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করা।প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সেপ্টেম্বরের নির্ধারিত ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে নয়াদিল্লি সফর থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা উচিত।

নয়াদিল্লিকে পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিতে হবে যে, বিমসটেক চেয়ার হিসেবে নয়, বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সমমর্যাদা দেওয়া হলেই কেবল ভবিষ্যতে কোনো দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক সম্মেলনে বাংলাদেশ অংশ নেবে।

ভারত সফর থেকে বিরত থাকা কোনো আবেগী সিদ্ধান্ত হবে না, বরং এটি হবে আন্তর্জাতিক কূটনীতির ভাষায় একটি অতি শক্তিশালী ‘কূটনৈতিক প্রতিবাদ’ (Diplomatic Protest)। সাউথ ব্লককে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে যে—’নতুন বাংলাদেশ’ তার আত্মসম্মান, প্রটোকল এবং সার্বভৌম মর্যাদার প্রশ্নে কোনো আপস করবে না।

পরিশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশের জনগণ ভারতের সঙ্গে একটি সুসংহত, সুস্থ ও বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী সম্পর্ক চায়, কিন্তু তা হতে হবে সমমর্যাদা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে। কোনো প্রটোকলভিত্তিক কারসাজি বা কূটনৈতিক হেয় করার প্রয়াস বাংলাদেশের সচেতন জনগণ মেনে নেবে না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি দেশবাসীর আজ পূর্ণ আস্থা রয়েছে। তিনি যদি দিল্লির এই অপমানজনক দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করে ভারত সফর থেকে বিরত থাকেন, তবে তা হবে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও জাতীয় আত্মমর্যাদা সমুন্নত রাখার ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। দিল্লির এই অসৌজন্যমূলক ও আধিপত্যবাদী আচরণের এর চেয়ে কঠোর, সময়োপযোগী এবং সমুচিত জবাব আর কিছুই হতে পারে না।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।