কালো ধোঁয়ার গাড়িতে এবার ডিএমপির কড়া নজর
রাজধানীর সড়কে কালো ধোঁয়া ছড়ানো যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। অতিরিক্ত কালো ধোঁয়া নির্গমনকারী কোনো গাড়ি চোখে পড়লেই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ বলছে, শুধু মামলা ও জরিমানা নয়, দূষণ কমাতে গাড়ির মালিকদের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করাও জরুরি।
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) আনিছুর রহমান জানান, গত জুলাই মাসে কালো ধোঁয়া নির্গমনকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে ৯১৫টি মামলা করা হয়েছে। এসব গাড়ির বড় অংশ বাস ও কাভার্ডভ্যান। তার ভাষ্য, কালো ধোঁয়া নির্গমন দৃশ্যমান হওয়ায় তা শনাক্ত করতে আলাদা কোনো যন্ত্রের প্রয়োজন হয় না। সড়কে কোনো গাড়িকে অতিরিক্ত কালো ধোঁয়া ছাড়তে দেখা গেলেই সড়ক পরিবহন আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তবে এখানেই সমস্যার মূল সমাধান হচ্ছে না। কারণ, অনেক গাড়ির বিরুদ্ধে একাধিকবার মামলা হলেও মালিকরা যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করছেন না। ফলে জরিমানা দেওয়ার পরও একই গাড়ি আবার দূষণ ছড়াচ্ছে। এমনকি কোনো গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা করার পর সেটি পুনরায় একই অপরাধ করতে দেখা গেলে দ্বিগুণ জরিমানার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।
ডিএমপির বক্তব্যে উঠে এসেছে সমস্যাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক—দায়িত্বের বিভাজন। গাড়ির ফিটনেস বা মান নিশ্চিত করা ট্রাফিক পুলিশের সরাসরি দায়িত্ব নয়। যানবাহনগুলো প্রতি বছর বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কাছ থেকে ফিটনেস সনদ নেয়। কিন্তু বাস্তবে ফিটনেস সনদ পাওয়ার পরও কোনো কোনো গাড়ি রাস্তায় কালো ধোঁয়া ছড়াচ্ছে। এতে ফিটনেস পরীক্ষার কার্যকারিতা, গাড়ির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং মালিকদের দায়বদ্ধতা—তিনটিই প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
সাধারণত ইঞ্জিনে ত্রুটি থাকলে কালো ধোঁয়া তৈরি হয়। নিম্নমানের জ্বালানি ব্যবহারেও ইঞ্জিন দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে দূষণ বাড়তে পারে। অর্থাৎ সড়কে একটি কালো ধোঁয়ার গাড়ি ধরা পড়া মূলত বৃহত্তর রক্ষণাবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার দুর্বলতারও ইঙ্গিত দেয়।
পরিবেশের পাশাপাশি এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে জনস্বাস্থ্যে। সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছেন ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা। সাধারণ মানুষ কিছু সময় পর দূষিত সড়ক থেকে সরে যেতে পারলেও দায়িত্ব পালনের কারণে ট্রাফিক পুলিশকে দীর্ঘ সময় রাস্তায় থাকতে হয়। কালো ধোঁয়ার কারণে চোখে জ্বালাপোড়া এবং শ্বাসের সঙ্গে দূষিত কণা ফুসফুসে প্রবেশ করে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
কালো ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণে ডিএমপি বিআরটিএ ও পরিবেশ অধিদফতরের সঙ্গে সমন্বয় করে যৌথ চেকপোস্টও পরিচালনা করছে। কিন্তু এখানেও রয়েছে বাস্তব সমস্যা। চেকপোস্টের খবর পেয়ে অনেক দূষণকারী যানবাহন সাময়িকভাবে রাস্তায় চলাচল বন্ধ রেখে আড়ালে চলে যায়। অভিযান শেষ হলে আবার সড়কে নামে। পুলিশের প্রতিদিন প্রতিটি গাড়ি পরীক্ষা বা মামলা করার মতো পর্যাপ্ত সক্ষমতাও নেই।
তাই ডিএমপির এই অভিযান গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন। গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষার মান বাড়ানো, ত্রুটিপূর্ণ গাড়ির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা, নিম্নমানের জ্বালানি ব্যবহারের বিরুদ্ধে নজরদারি এবং মালিক-শ্রমিকদের জবাবদিহির আওতায় আনা—সবকিছুকে একই কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।
কালো ধোঁয়ার মতো দৃশ্যমান দূষণ শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি নগরবাসীর স্বাস্থ্য ও পরিবেশের প্রশ্ন। ফলে মামলা-জরিমানার পাশাপাশি দূষণের উৎস বন্ধ করাই এখন ডিএমপি, বিআরটিএ ও পরিবেশ অধিদফতরের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
একই সঙ্গে অতিরিক্ত হর্ন ও শব্দদূষণের বিরুদ্ধেও অভিযান চালাচ্ছে ডিএমপি। রাজধানীর নীরব এলাকায় সাইনবোর্ড থাকলেও তা অমান্য করে নিয়মিত হর্ন বাজানোর অভিযোগ রয়েছে। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে পুলিশ। উন্নত বিশ্বে ব্যবহৃত ‘হর্ন পি’ প্রযুক্তির মাধ্যমে অতিরিক্ত হর্ন বাজানো যান শনাক্ত করার উদ্যোগ ভবিষ্যতে ঢাকার শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
কালের আলো/এম/এএইচ

আপনার মতামত লিখুন
Array