খুঁজুন
                               
, ,
           

সেনাবাহিনীকে নিয়ে হাসনাতের অপরিপক্ব গল্পে সারজিসের ‘দ্বিমত’, উন্মোচিত প্রকৃত সত্য

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: রবিবার, ২৩ মার্চ, ২০২৫, ১১:৩২ অপরাহ্ণ
সেনাবাহিনীকে নিয়ে হাসনাতের অপরিপক্ব গল্পে সারজিসের ‘দ্বিমত’, উন্মোচিত প্রকৃত সত্য

কালের আলো রিপোর্ট:

বাংলাদেশের ইতিহাস পরম্পরায় এক নতুন সংযোজন ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থান। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া এক আন্দোলন ক্রমেই একটি গণজাগরণে রূপ নেয়। পতন ঘটে স্বৈরশাসনের। অভাবনীয় এই গণবিস্ফোরণে সামনের সারির সম্মুখ যোদ্ধা এবং জাতীয় বীর জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আব্দুল্লাহ। ‘রিফাইন্ড (সংশোধিত) আওয়ামী লীগ’ গঠনে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে চাপ দেওয়ার বিষয়ে তিনি সম্প্রতি ফেসবুকে একটি পোস্ট করেছেন। এরপর থেকেই নানান কানাঘুষা ও বিতর্ক তাঁর পিছু ছাড়ছে না। ফেসবুকে সেনানিবাসে বৈঠক নিয়ে তাঁর স্ট্যাটাসকে ‘শিষ্টাচারবর্জিত’ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন দলটির মুখ্য সমন্বয়কারী নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী। হাসনাতের সেই সঙ্গে বৈঠকে উপস্থিত জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলমও হাসনাতের বক্তব্যের সঙ্গে এবার দ্বিমত পোষণ করেছেন। রবিবার (২৩ মার্চ) দুপুরে দেওয়া তাঁর পোস্টটি এখন টক অব দ্য কান্ট্রি। সারজিস কিছু জায়গায় সংশোধন, সংযোজন ও বিয়োজনের কথা উল্লেখ করেছেন। এর আগেই অবশ্য হাসনাত দলীয় একটি কর্মসূচিতে সেনাবাহিনীর প্রতি নিজেদের পূর্ণ আস্থা ও সমর্থনের কথা জানিয়েছিলেন।

এদিকে, সুইডেনভিত্তিক অনলাইন নিউজপোর্টাল নেত্র নিউজের কাছে হাসনাতের দাবির বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে সেনাবাহিনী সদর দপ্তর। শনিবার (২২ মার্চ) প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে সেনাসদরকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, হাসনাত আবদুল্লাহর পোস্ট ‘সম্পূর্ণ রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজি বৈ অন্য কিছু নয়’। নেত্র নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বিষয়টি নিয়ে নেত্র নিউজ যোগাযোগ করলে একজন মুখপাত্রের মাধ্যমে বক্তব্য দেয় সেনাসদর। এছাড়া ২৭ বছর বয়সী এই ছাত্রনেতার বক্তব্যকে ‘অত্যন্ত হাস্যকর ও অপরিপক্ব গল্পের সম্ভার’ হিসেবেও আখ্যা দিয়েছে সেনাবাহিনী।’

হাসনাত আব্দুল্লাহ ক’দিন আগে তাঁর ফেসবুক পোস্টে ক্যান্টনমেন্ট থেকে রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ তত্ত্ব হাজির করেছেন। শুরুতেই এ নিয়ে গুজবের ডালপালা মেলতে শুরু করলেও এর পেছনে কোন রহস্য লুকিয়ে ছিল এটি অনেকটাই পরিস্কার ছিল। এর মাধ্যমে সেনাবাহিনী ও সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান’র নিষ্কলুষ জীবনেও কলঙ্ক লেপনের অপচেষ্টা হয়েছে। চটুল অনেক গল্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্য ও ইউটিউবের বয়ানে উত্থাপিত হচ্ছিল। এসব কথার সত্য-মিথ্যা নিয়ে অনেকের মনেই আবার ভীষণ আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। রীতিমতো তালগোল পাঁকানো এমন কর্মনৈপুণ্য তৈরি করে নানা প্রশ্নের। সবিনয়ে অনেকেই বলেছেন, হাসনাত সেনাবাহিনীর মতো একটি স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে জড়িয়ে আদতে একতরফা-একপক্ষীয় বয়ান উপস্থাপন করেছেন। আদৌ সেনাবাহিনী প্রধান তাকে ডেকেছিলেন না তিনি এবং সারজিস স্বপ্রণোদিত হয়েই সেখানে গিয়েছিলেন এই প্রশ্নের জবাব মিলছিল না সহজেই।

তবে অনেকেই অনুমান করছিলেন, তাঁরা নিজের ইচ্ছাতেই সেদিন ক্যান্টনমেন্টে গিয়েছিলেন। সারজিস নিজের পোস্টেও সেই কথা স্বীকার করেছেন। তৃতীয় মাত্রার উপস্থাপক ও দেশের সিনিয়র সাংবাদিক জিল্লুর রহমান হাসনাতের এই বিষয়টিকে অতিকথন হিসেবেই সজ্ঞায়িত করেছেন। হাসনাতকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেছেন, আপনি সীমা লঙ্ঘন করেছেন। দেশটাকে একটি বিপর্যয়ের মধ্যে নিয়ে গেছেন, নিয়ে যাচ্ছেন। একটি আলোচনায় অনেক বিষয়েই আলোচনা হয়। আপনি কি সব আলোচনা পাবলিক করেন? সার্বিক পরিস্থিতিকে তিনি দুর্ভাগ্যজনক হিসেবেও উল্লেখ করেন।

নেত্র নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গতকাল (শনিবার) নেত্র নিউজকে দেওয়া সেনাসদরের এক বিবৃতিতে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে যে সেনানিবাসে খোদ সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামানের সঙ্গেই ১১ মার্চ বৈঠকটি হয়েছিল। তবে হাসনাত আবদুল্লাহকে ‘ডেকে নিয়ে যাওয়া এবং আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের বিষয় নিয়ে তাদেরকে প্রস্তাব বা চাপ প্রয়োগের’ অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। বরং হাসনাত আবদুল্লাহ ও তাঁর দলের আরেক মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলমের আগ্রহেই ওই বৈঠকটি হয়েছিল বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিবেদনটিতে নেত্র নিউজ সেনাসদরের বিবৃতি উল্লেখ করে বলেছে, ‘হাসনাত আবদুল্লাহ এবং সারজিস আলম দীর্ঘদিন যাবৎ সেনাবাহিনী প্রধানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের জন্য ইচ্ছা পোষণ করছিলেন। পরবর্তীতে সারজিস আলম ১১ই মার্চ ২০২৫ তারিখে সেনাপ্রধানের মিলিটারি এডভাইজারকে ফোন দিয়ে সেনাপ্রধানের সাথে সাক্ষাতের জন্য সময় চান। এর প্রেক্ষিতে মিলিটারি এডভাইজার তাদেরকে সেনাসদরে আসার জন্য বলেন। অতঃপর ১১ই মার্চ দুপুরে সারজিস আলম এবং হাসনাত আবদুল্লাহ সেনাসদরে না এসে সরাসরি সেনাভবনে সেনাবাহিনীর প্রধানের সঙ্গে দেখা করার জন্য অপেক্ষা করেন। পরবর্তীতে সেনাপ্রধান অফিস কার্যক্রম শেষ করে সেনা ভবনে এসে তাদের সঙ্গে দেখা করেন।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে এর আগে যতগুলো রাজনৈতিক পরিবর্তন এসেছে, তার পেছনে সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা ছিল। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান সফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল নুরুদ্দিন। একইভাবে আত্মীয়তার বন্ধনকে গুরুত্ব না দিয়ে ছাত্র-জনতার পাশে দাঁড়িয়ে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানকে স্বার্থক মোড় দিয়েছেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। ৫ আগস্টের পরিবর্তনে সেনাবাহিনীর ইতিবাচক ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও তাঁরা রাজনীতি বা বেসামরিক প্রশাসনে কোন নাক গলায়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের দেওয়া ম্যাজিষ্ট্রেসি ক্ষমতায় সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বারবার বলেছেন, ক্ষমতায় আসার কোনো ইচ্ছা তাঁদের নেই। অন্তর্বর্তী সরকার যে সেনাবাহিনীর অব্যাহত সহযোগিতা পেয়ে আসছে এটি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড.মুহাম্মদ ইউনূসও স্বীকার করেছেন দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠেই। এরপরও সেনাবাহিনী ও সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধে নানা রকম প্রচারণা ও উসকানি দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন মহল থেকে। কেউ কেউ অন্তর্বর্তী সরকার ও সেনাবাহিনীকে মুখোমুখি অবস্থানে নিয়ে আসারও অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। এসব দেশকে আরও অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। এই বিষয়ে আমাদের সবাইকে সতর্ক হতে হবে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও সেনাপ্রধানকে নিয়ে হাসনাত আব্দুল্লাহ’র দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে তাঁরই রাজনৈতিক সহযোদ্ধা সারজিস আলম একমত হতে পারেননি। তিনি প্রকাশ্যে দ্বিমত পোষণ করে ফেসবুক পোস্টে এই সংক্রান্ত সংশোধনীর কথা জানিয়েছেন। হাসনাত আব্দুল্লাহর দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে এ বিষয়ে কিছু জায়গায় সংশোধন, সংযোজন ও বিয়োজনের কথা উল্লেখ করেছেন। সারজিস রাখঢাক না করেই নিজেদের আত্মসমালোচনা করেছেন। তিনি ‘১১ মার্চ সেনাপ্রধানের সাথে সাক্ষাৎ নিয়ে আমার জায়গা থেকে কিছু সংশোধন, সংযোজন ও বিয়োজন’ শিরোনামে একটি পোস্টে লিখেছেন- ‘সেদিন আমি এবং হাসনাত সেনাপ্রধানের সাথে গিয়ে কথা বলি। আমাদের সাথে আমাদের দলের গুরুত্বপূর্ণ আরেকজন সদস্যেরও যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যাওয়ার পূর্ব মুহূর্তে ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে তিনি যেতে পারেননি। প্রথমেই স্পষ্ট করে জানিয়ে রাখি, সেদিন সেনানিবাসে আমাদের ডেকে নেওয়া হয়নি বরং সেনাপ্রধানের মিলিটারি এডভাইজারের সাথে যখন প্রয়োজন হতো তখন ম্যাসেজের মাধ্যমে আমাদের কিছু জিজ্ঞাসা ও উত্তর আদান-প্রদান হতো।’

‘যেদিন সেনাপ্রধান পিলখানা হত্যাকাণ্ড দিবসে অনেকটা কড়া ভাষায় বক্তব্য দিলেন এবং বললেন ‘এনাফ ইজ এনাফ’ তখন আমি সেনাপ্রধানের মিলিটারি এডভাইসরকে জিজ্ঞাসা করি আপনাদের দৃষ্টিতে অনাকাক্সিক্ষত কিছু দেখছেন কিনা? সেনাপ্রধানের বক্তব্য তুলনামূলক Straight-forward এবং Harsh মনে হচ্ছে। তিনি আমাকে বললেন, তোমরা কি এ বিষয়ে সরাসরি কথা বলতে চাও? আমি বললাম- বলা যেতে পারে। এরপরে সেদিন সেনাপ্রধানের সাথে আমাদের সাক্ষাৎ হয় । সেনাভবনে সেই রুমে আমরা তিনজনই ছিলাম। সেনাপ্রধান, হাসনাত এবং আমি।’

‘মানুষ হিসেবে যেকোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তির অভিমতকে একেকজন একেকভাবে অবজার্ভ করে। হাসনাত সেদিন তার জায়গা থেকে যেভাবে সেনাপ্রধানের বক্তব্যকে অবজার্ভ ও রিসিভ করেছে এবং ফেসবুকে লিখেছে আমার সেক্ষেত্রে কিছুটা দ্বিমত আছে।’ ‘আমার জায়গা থেকে আমি সেদিনের বক্তব্যকে সরাসরি ‘প্রস্তাব’ দেওয়ার আঙ্গিকে দেখি না বরং ‘সরাসরি অভিমত প্রকাশের’ মতো করে দেখি। ‘অভিমত প্রকাশ’ এবং ‘প্রস্তাব দেওয়া’ দুটি বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। যদিও পূর্বের তুলনায় সেদিন সেনাপ্রধান অনেকটা স্ট্রেইট-ফরোয়ার্ড ভাষায় কথা বলছিলেন । পাশাপাশি ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগের জন্য ‘চাপ দেওয়ার’ যে বিষয়টি এসেছে সেখানে ‘চাপ দেওয়া হয়েছে’- এমনটি আমার মনে হয়নি। বরং রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ না আসলে দীর্ঘ মেয়াদে দেশের পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে সমস্যার সৃষ্টি হবে, সেটা তিনি অতি আত্মবিশ্বাসের সাথে বলছিলেন।’

‘হাসনাতের বক্তব্যে যে টপিকগুলো এসেছিল, যেমন- ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ, সাবের হোসেন, শিরিন শারমিন চৌধুরী, সোহেল তাজ; এসব নিয়ে কথা হয়েছিল। আওয়ামী লীগ ফিরে আসবে কিনা, এই ইলেকশনে আওয়ামী লীগ থাকলে কী হবে, না থাকলে কী হবে, আওয়ামী লীগ এই ইলেকশন না করলে কবে ফিরে আসতে পারে কিংবা আদৌ আসবে কিনা- এসব বিষয় নিয়ে কথা হয়েছিল। এসব সমীকরণে দেশের উপরে কী প্রভাব পড়তে পারে, স্থিতিশীলতা কিংবা অস্থিতিশীলতা কোন পর্যায়ে যেতে পারে সেসব নিয়ে কথা হয়েছিল।’

‘কিন্তু যেই টোনে হাসনাতের ফেসবুক লেখা উপস্থাপন করা হয়েছে, আমি মনে করি- কনভারসেশন ততটা এক্সট্রিম ছিল না। তবে অন্য কোনো এক দিনের চেয়ে অবশ্যই স্ট্রেইট-ফরওয়ার্ড এবং সো-কনফিডেন্ট ছিল। দেশের স্থিতিশীলতার জন্য রিফাইন্ড আওয়ামী লীগের ইলেকশনে অংশগ্রহণ করা যে প্রয়োজনীয়, সেই বিষয়ে সরাসরি অভিমত ছিল।’

হাসনাত তার বক্তব্যে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করেছে- আলোচনার এক পর্যায়ে বলি- যেই দল এখনো ক্ষমা চায় নাই, অপরাধ স্বীকার করে নাই,সেই দলকে আপনারা কিভাবে ক্ষমা করে দেবেন! অপরপক্ষ থেকে রেগে গিয়ে উত্তর আসে, ‘ইউ পিপল নো নাথিং। ইউ ল্যাক উইজডোম অ্যান্ড এক্সপেরিয়েন্স। উই আর ইন দিজ সার্ভিস ফর অ্যাটলিস্ট ফোর্টি ইয়ার্স। তোমার বয়সের থেকে বেশি।’ ‘এই কনভারসেশনটা হয়েছে, এটা সত্য। কিন্তু আমাদের রুমে বসে হওয়া কনভারসেশন হঠাৎ এককভাবে শেষ করে যখন সেনাপ্রধান উঠে দাঁড়ালেন এবং রুম থেকে কথা বলতে বলতে বের হয়ে এসে যখন আমরা গাড়িতে করে ফিরবো, তার পূর্বে বিদায় নেওয়ার সময় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এই কনভারসেশন হয়েছে। সেনাপ্রধান রেগে যাওয়ার সুরে এই কথা বলেছেন বলে আমার মনে হয়নি বরং বয়সে তুলনামূলক বেশ সিনিয়র কেউ জুনিয়রদেরকে যেভাবে অভিজ্ঞতার ভারের কথা ব্যক্ত করে, সেই টোন এবং এক্সপ্রেশনে বলেছেন।’

‘হাসনাত না ওয়াকার’- এই ন্যারেটিভ এবং স্লোগানকে আমি প্রত্যাশা করি না। হাসনাতের জায়গা ভিন্ন এবং সেনাপ্রধান জনাব ওয়াকার-উজ-জামানের জায়গাও ভিন্ন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাথে জাতীয় নাগরিক পার্টি, অন্যান্য রাজনৈতিক দল কিংবা জনগণকে মুখোমুখি দাঁড় করানোও কখনো প্রাসঙ্গিক নয়। পাশাপাশি সেনাপ্রধানের পদত্যাগ নিয়ে যে কথা দুয়েক জায়গায় আসছে সেটিও আমাদের বক্তব্য নয়।’

এসবের পাশাপাশি আমি আমার ব্যক্তিগত জায়গা থেকে একটি অভিমত প্রকাশ করতে চাই। আমি ভুল হতে পারি, কিন্তু এই মুহূর্তে আমার এটিই সঠিক মনে হচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাথে অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর কেউ না কেউ যোগাযোগ রক্ষা করে। সেই প্রাইভেসি তারা বজায় রাখে। আমাদের সাথে সেনাপ্রধানের যে বিষয়গুলো নিয়ে কথা হয়েছে, সেগুলোর সাথে আমাদের সরাসরি দ্বিমত থাকলেও আমরা সেগুলো নিয়ে আমাদের দলের ফোরামে বিস্তারিত আলোচনা করতে পারতাম, সিদ্ধান্ত নিতে পারতাম, সে অনুযায়ী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে পারতাম। কিংবা অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনার মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে আওয়ামী লীগের যেকোনো ভার্সনের বিরুদ্ধে এখনকার মতই রাজপথে নামতে পারতাম। অথবা অন্য রাজনৈতিক দলগুলো সরাসরি আমাদের সাথে ঐক্যমতে না পৌঁছালে আমরা শুধুমাত্র আমাদের দলের পক্ষ থেকেই এই দাবি নিয়ে রাজপথে নামতে পারতাম।’

‘কিন্তু যেভাবে এই কথাগুলো ফেসবুকে স্ট্যাটাসের মাধ্যমে এসেছে, এই প্রক্রিয়াটি আমার সমীচীন মনে হয়নি বরং এর ফলে পরবর্তীতে যেকোনো স্টেকহোল্ডারের সাথে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা আস্থার সংকটে পড়তে পারে।’ ‘আমার এই বক্তব্যে আমার সহযোদ্ধা হাসনাতের বক্তব্যের সাথে বেশ কিছু ক্ষেত্রে দ্বিমত এসেছে। এটার জন্য অনেকে আমার সমালোচনা করতে পারেন। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, আমাদের ব্যক্তিত্ব স্রোতে গা ভাসানোর মত কখনোই ছিল না। ছিল না বলেই আমরা হাসিনা রেজিমের বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলাম।’

‘আজও কেউ হাসনাতের দিকে বন্দুক তাক করলে তার সামনে দাঁড়িয়ে যাওয়ার কমিটমেন্ট আমাদের আছে। কিন্তু সহযোদ্ধার কোনো বিষয় যখন নিজের জায়গা থেকে সংশোধন দেওয়ার প্রয়োজন মনে করি, তখন সেটাও আমি করব। সেই বিবেকবোধটুকু ছিল বলেই ৬ জুন প্রথম যেদিন শহীদ মিনারে কয়েকজন কোটা প্রথার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়, তাদের মধ্যে সামনের সারিতে আমরা ছিলাম।’ ‘আমি বিশ্বাস করি আমাদের এই বিবেকবোধের জায়গাটুকুই আমাদেরকে সঠিক পথে রাখবে। আত্মসমালোচনা করার এই মানসিকতাই আমাদেরকে আমাদের কাক্সিক্ষত গন্তব্যে নিয়ে যাবে।’ ‘জুলাই গণহত্যা, বিডিআর হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বরের হত্যাকাণ্ড ঘটানো ‘আওয়ামী লীগের যেকোনো ভার্সনের’ বাংলাদেশের রাজনীতিতে আসার বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই অব্যাহত থাকবে। Truth shall prevail.

কালের আলো/আরআই/এমএসএএকে

খাদ্যগুদাম প্রকল্পে শুধু সময়ই বাড়ে

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:৩৭ অপরাহ্ণ
খাদ্যগুদাম প্রকল্পে শুধু সময়ই বাড়ে

খাদ্যশস্য রাখার জায়গা বাড়াতে একের পর এক প্রকল্প। বরাদ্দ হচ্ছে হাজার কোটি টাকা। কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হচ্ছে, বাড়ছে ব্যয়, তবু বাড়ছে না কাঙ্ক্ষিত সংরক্ষণ সক্ষমতা। কোথাও তিন বছরেও কাজ এগিয়েছে মাত্র ২৫ শতাংশ, কোথাও এক যুগ পেরিয়েও শেষ হয়নি নির্মাণ। আবার রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া একটি প্রকল্পে মাটি খোঁড়ার পরই থেমে গেছে কাজ। পরে যৌক্তিকতা না পাওয়ায় সেটি অসমাপ্ত রেখেই সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারি খাদ্যগুদামের সক্ষমতা বাড়ানোর নামে নেওয়া চার প্রকল্পে মোট ৫ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। অথচ প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি, দফায় দফায় সংশোধন, মেয়াদ বৃদ্ধি এবং কোথাও কোথাও স্থান পরিবর্তনের কারণে এসব বিনিয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। খাদ্য সংরক্ষণ সক্ষমতার ঘাটতি কাটাতে গিয়ে সরকারি অর্থের অপচয় কিংবা অনিয়মের সুযোগ তৈরি হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও এখন সামনে। খাদ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য এবং পরিকল্পনা কমিশন ও বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) পর্যবেক্ষণে এসব চিত্র উঠে এসেছে।

তিন বছরেও এক-চতুর্থাংশ কাজ
২০২৩ সালের জুলাইয়ে ৮৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫৩ জেলায় নতুন খাদ্যগুদাম নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। ১৪৫টি স্থাপনায় মোট ১৯৫টি গুদাম নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিক ব্যয় ৮১৪ কোটি টাকা থাকলেও পরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৫৫ কোটি টাকা। শুধু ব্যয়ই বাড়েনি, বেড়েছে সময়ও। ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। আইএমইডির হিসাবে, ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ২৫ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ২১ দশমিক ১১ শতাংশ। এরই মধ্যে ব্যয় হয়েছে ১৭৮ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। আইএমইডির পর্যবেক্ষণে মাদারীপুরের কালকিনি ও বাগেরহাট প্যাকেজে ধীরগতি দেখা গেছে। গাছ ও পুরোনো অবকাঠামো সরাতেও সময় লেগেছে। শরীয়তপুরের আঙ্গারিয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল, দিনাজপুরের ফুলবাড়ী ও বিরল এবং মোংলা এলএসডিতে জায়গার সংকট রয়েছে। এ ছাড়া লে-আউট জটিলতা, প্রকল্পের স্থান পরিবর্তন, প্রশাসনিক অনুমোদন ও দরপত্র প্রক্রিয়াতেও বিলম্ব হয়েছে। প্রকল্প পরিচালক মো. সোহেলুর রহমান খান বলেন, সময়মতো পরিচালক নিয়োগ না হওয়া, নির্ধারিত স্থানে কাজ করতে না পারা, স্থান পরিবর্তন এবং রেট শিডিউলের কারণে ব্যয় কিছুটা বেড়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন প্রকল্প পরিচালক টেন্ডারের উদ্যোগ নিলেও কাজ করা সম্ভব হয়নি। তবে বর্তমানে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা তিনি দাবি করেন, আগের প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে প্রকল্পের কার্যক্রম এখন সন্তোষজনকভাবে এগোচ্ছে।

এক যুগেও শেষ হয়নি ৩ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকার প্রকল্প
সরকারি খাদ্য সংরক্ষণ অবকাঠামোর সবচেয়ে বড় প্রকল্পগুলোর একটি শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালে। ৩ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪ লাখ ৮৭ হাজার টন ধারণক্ষমতার সাতটি আধুনিক স্টিল সাইলো নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। বরিশাল, নারায়ণগঞ্জ, আশুগঞ্জ, ময়মনসিংহ, খুলনার মহেশ্বরপাশা, চট্টগ্রাম ও মধুপুরে এসব সাইলো নির্মাণের কথা। প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের ঋণ রয়েছে ৩ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা। চার দফা সংশোধনের পর মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়েও পুরো কাজ শেষ হয়নি। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৬৯৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ মোট ব্যয়ের ৯৫ দশমিক ০৫ শতাংশই খরচ হয়ে গেছে। তারপরও বাকি কাজ শেষ করতে আবারও মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে। প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন জানান, প্রকল্পের মূল কার্যালয় ঢাকার প্রবাসী কল্যাণ ভবনে। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিয়মিত বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না বলেও জানান তিনি।

রাজনৈতিক প্রকল্প, শেষ পর্যন্ত বাতিল
খাদ্য সংরক্ষণ অবকাঠামো নির্মাণে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগও রয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের নির্বাচনি এলাকা নওগাঁর মহাদেবপুরে ৩৬৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪৮ হাজার টন ধারণক্ষমতার চালের সাইলো নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হয়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রকল্পটি পর্যালোচনায় আসে। এরপর দেখা যায়, ভূমি অধিগ্রহণ ও মাটি খোঁড়া ছাড়া বাস্তবে আর কোনো কাজ এগোয়নি। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি ছিল শূন্য। প্রকল্প পরিচালক মোস্তাক আহমেদ জানান, নতুন ফিজিবিলিটি স্টাডিতে মহাদেবপুরে প্রকল্পটি নেওয়ার যৌক্তিকতা পাওয়া যায়নি। ফলে অসমাপ্ত অবস্থায় রেখেই প্রকল্পটি সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—যে প্রকল্পের যৌক্তিকতাই শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেল না, সেটির পেছনে প্রাথমিক পর্যায়ে ৩৬৭ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রয়োজন কেন হয়েছিল?

মেরামতের প্রকল্পেও ধীরগতি
ক্ষতিগ্রস্ত খাদ্যগুদাম ও আনুষঙ্গিক অবকাঠামো মেরামতে ২৫৫ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এটি শেষ করার কথা। লক্ষ্য ছিল সরকারি খাদ্য সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানো, খাদ্যশস্যের অপচয় কমানো, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। কিন্তু ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি ৩২ শতাংশ হলেও আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ৩ শতাংশ। প্রকল্প পরিচালক এ টি এম কাউছার হোসেন জানান, সময়মতো বাজেট বরাদ্দ না পাওয়ায় কাজ কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোয়নি। ঠিকাদারদের বিলও আটকে রয়েছে।

সরকারি গুদাম বনাম বেসরকারি সক্ষমতা
স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও সরকারি খাদ্য সংরক্ষণ সক্ষমতা প্রয়োজনের তুলনায় কম। সরকারি গুদামে বর্তমানে প্রায় ২২ থেকে ২৩ লাখ টন খাদ্যশস্য রাখা যায়। বিপরীতে বেসরকারি খাতের ধারণক্ষমতা প্রায় ১ কোটি টন। অর্থাৎ বিপুল সরকারি বিনিয়োগের পরও সংরক্ষণ সক্ষমতার বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। বাংলাদেশ অ্যাগ্রোকেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কৃষিবিদ কে এস এম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শুধু সরকারি ব্যবস্থাপনায় গুদাম নির্মাণ টেকসই সমাধান নয়। সহজ শর্তে ঋণ, কর অবকাশ ও ভর্তুকির মাধ্যমে বেসরকারি খাতকে খাদ্য সংরক্ষণে যুক্ত করা যেতে পারে। তার মতে, প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়তে থাকলে সরকারি অর্থ অপচয়ের পাশাপাশি অনিয়ম-দুর্নীতির আশঙ্কাও তৈরি হয়। তাই ব্যয় নির্ধারণ, দরপত্র, নির্মাণকাজের মান এবং অর্থ ব্যয়ে কঠোর নজরদারি জরুরি।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের নজরদারি কতটা?
খাদ্যশস্যের সরবরাহ ও মজুদ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম কিংবা গাফিলতি পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা। সম্প্রতি মানিকগঞ্জে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, দুর্যোগ কিংবা জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ রাখতে হবে। দায়িত্ব পালনে গাফিলতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে বাস্তবতা হলো, একদিকে খাদ্য সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ, অন্যদিকে সেই লক্ষ্যেই নেওয়া প্রকল্পের ধীরগতি। কোথাও ব্যয় বাড়ছে, কোথাও মেয়াদ; কোথাও আবার প্রকল্পের যৌক্তিকতাই প্রশ্নের মুখে। ৫ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকার এই চার প্রকল্প তাই শুধু গুদাম নির্মাণের হিসাব নয়—এটি সরকারি প্রকল্প পরিকল্পনা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিরও পরীক্ষা। খাদ্য নিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর খাতে জনগণের অর্থ খরচ করে যদি সময়মতো গুদামই না হয়, তাহলে সেই বিনিয়োগের সুফল শেষ পর্যন্ত যাবে কোথায়—এ প্রশ্নের উত্তর এখন সংশ্লিষ্টদেরই দিতে হবে।

কালের আলো/এম/এএইচ

ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ: ত্রিশালকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন ঈশ্বরগঞ্জ

ময়মনসিংহ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:০৮ অপরাহ্ণ
ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ: ত্রিশালকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন ঈশ্বরগঞ্জ

ময়মনসিংহ থেকে ১৪ দলের দীর্ঘ লড়াই শেষে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের শিরোপা ঘরে তুলেছে ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা দল। রোমাঞ্চকর ফাইনালে ত্রিশাল উপজেলা দলকে ২-১ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ঈশ্বরগঞ্জ।

শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৪টায় ময়মনসিংহ জেলা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনালে শুরু থেকেই দুই দলের মধ্যে ছিল তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা। আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে জমে ওঠা ম্যাচে দর্শকদের করতালি ও সমর্থকদের উচ্ছ্বাসে স্টেডিয়াম হয়ে ওঠে উৎসবমুখর।
ঈশ্বরগঞ্জের হয়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেন ১১ নম্বর জার্সিধারী রাব্বুল। তাঁর জোড়া গোলেই শিরোপা নিশ্চিত করে ঈশ্বরগঞ্জ। ত্রিশাল একটি গোল শোধ করলেও শেষ পর্যন্ত সমতায় ফিরতে পারেনি। ফলে ২-১ গোলের জয় নিয়ে গোল্ডকাপ নিজেদের করে নেয় ঈশ্বরগঞ্জ।
ফাইনালের আগে ও ম্যাচ চলাকালে ঈশ্বরগঞ্জ দলের খেলোয়াড়দের উৎসাহ দিতে মাঠে উপস্থিত ছিলেন ঈশ্বরগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু। তাঁর উপস্থিতি ও অনুপ্রেরণা খেলোয়াড়দের বাড়তি আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের স্বীকৃতি হিসেবে ফাইনালের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন ঈশ্বরগঞ্জের রাব্বুল। অন্যদিকে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন ত্রিশালের ১০ নম্বর জার্সিধারী ফাহাদ। ফেয়ার প্লে ট্রফি পেয়েছে হালুয়াঘাট উপজেলা দল।
৭০ মিনিটের ফাইনাল দেখতে বিকেল থেকেই ময়মনসিংহ জেলা স্টেডিয়ামে ভিড় করেন ক্রীড়াপ্রেমীরা। ম্যাচ শুরুর পর কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় গ্যালারি। দুই দলের সমর্থকদের স্লোগান, উল্লাস ও করতালিতে পুরো স্টেডিয়ামে সৃষ্টি হয় উৎসবের আমেজ।
ফাইনাল শেষে বিজয়ী ঈশ্বরগঞ্জ ও রানার্সআপ ত্রিশাল দলের হাতে ট্রফি তুলে দেওয়া হয়। দুই দলের মধ্যে মোট এক লাখ ৫০ হাজার টাকার পুরস্কারও বিতরণ করা হয়।
পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন। ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ময়মনসিংহ-৭ (ত্রিশাল) আসনের সংসদ সদস্য ডা. মো. মাহাবুবুর রহমান এবং ঈশ্বরগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু।

এ সময় বিভিন্ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের কর্মকর্তা, জেলা ক্রীড়া সংস্থার কর্মকর্তারা, খেলোয়াড়, কোচ, ম্যানেজার, ক্রীড়াপ্রেমী দর্শক ও গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
‘ক্রীড়া হলে পেশা, পরিবার পাবে ভরসা’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে এবং জেলা ক্রীড়া সংস্থার সহযোগিতায় গত ২৫ আগস্ট শুরু হয় এবারের জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট।

ময়মনসিংহ সদর উপজেলাসহ জেলার ১৪টি দল এতে অংশ নেয়। দীর্ঘ প্রতিযোগিতার প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে ফাইনালে ত্রিশালকে হারিয়ে শেষ হাসি হাসে ঈশ্বরগঞ্জ। রাব্বুলের জোড়া গোল ও দলের লড়াকু পারফরম্যান্সে গোল্ডকাপ এখন ঈশ্বরগঞ্জের ঘরে। শিরোপা জয়ের পথে খেলোয়াড়দের পাশে থেকে উৎসাহ-অনুপ্রেরণা জোগানো এমপি মাজেদ বাবুর ভূমিকাও প্রশংসা পেয়েছে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি 

ভয়মুক্ত সাংবাদিকতার পরিবেশ তৈরিতে দৃঢ় অঙ্গীকার তথ্য প্রতিমন্ত্রীর

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:৪৬ অপরাহ্ণ
ভয়মুক্ত সাংবাদিকতার পরিবেশ তৈরিতে দৃঢ় অঙ্গীকার তথ্য প্রতিমন্ত্রীর

সাংবাদিকদের স্বাধীন ও নির্ভয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারের দৃঢ় প্রত্যয়ের কথা পুনরায় উচ্চারণ করেছেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এমপি। তিনি বলেছেন, ‘বর্তমান সরকার সংবাদমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতায় বিশ্বাসী এবং সাংবাদিকরা যেন কোনো ভয়ভীতি ছাড়াই নির্বিঘ্নে তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সরকার সেই পরিবেশ নিশ্চিত করেছে।’ একই সঙ্গে সাংবাদিকদের পেশাগত কল্যাণে সরকারি সহায়তা বাড়ানোর উদ্যোগ গণমাধ্যমবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সরকারের অগ্রাধিকারকে আরও স্পষ্ট করেছে।

শুক্রবার (০৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে নেত্রকোণার কেন্দুয়া উপজেলা পাবলিক হলে ‘রফিক হিলালী ইংলিশ এক্সিলেন্স প্রোগ্রাম-২০২৬’-এর ওরিয়েন্টেশন ক্লাস এবং এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষায় কৃতিত্ব অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

  • সংবাদমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ
  • সাংবাদিক কল্যাণে বরাদ্দ বাড়ানোর উদ্যোগ—গণমাধ্যমকে শক্তিশালী করার প্রত্যাশা

একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক বিকাশে স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের কোন বিকল্প নেই। জনগণের কথা বলা, অনিয়ম তুলে ধরা, রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের স্বাধীনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই স্বাধীনতাকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দিতে সরকার কাজ করছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে তথ্য প্রতিমন্ত্রীর এমন পরিস্কার অবস্থানকে দেশের সাংবাদিকতার বিকাশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য গণমাধ্যম অঙ্গনেও একটি ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।

সাংবাদিক কল্যাণে বরাদ্দ বাড়ানোর উদ্যোগ
সাংবাদিকদের পেশাগত ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টিও প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের পেশাগত কল্যাণ ও বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তথ্য প্রতিমন্ত্রী জানান, সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের নির্ধারিত বাজেট বরাদ্দ ৬ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ কোটি টাকায় উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এ সংক্রান্ত প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে সাংবাদিক সমাজের মাঝে আশার সঞ্চার করেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে সাংবাদিকতা পেশা নানা ধরনের অর্থনৈতিক ও পেশাগত চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে মফস্বল সাংবাদিকদের সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে দায়িত্ব পালন করতে হয়। কল্যাণমূলক কার্যক্রমে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা সম্ভব হলে অসচ্ছল ও সংকটে থাকা সাংবাদিকদের পাশাপাশি তাদের পরিবারের জন্যও তা বাস্তব সহায়তা তৈরি করতে পারে।

হলুদ সাংবাদিকতা ও অপসাংবাদিকতা প্রতিরোধ
প্রতিমন্ত্রী সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রেস কাউন্সিলের মাধ্যমে ‘হলুদ সাংবাদিকতা’ ও অপসাংবাদিকতা প্রতিরোধের কথাও বলেছেন। বিষয়টি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীলতার মধ্যে প্রয়োজনীয় ভারসাম্যের দিকটি সামনে আনে। তিনি বলেছেন, ‘সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রেস কাউন্সিলের মাধ্যমে ‘হলুদ সাংবাদিকতা’ ও অপসাংবাদিকতা রোধে পেশাগত মানদণ্ড বজায় রাখার কাজ চলছে।’

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা যেমন অপরিহার্য, তেমনি সংবাদ প্রকাশে তথ্যের যথার্থতা, নিরপেক্ষতা, পেশাগত নৈতিকতা ও জনস্বার্থের বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীন সাংবাদিকতা কখনোই দায়িত্বহীন সাংবাদিকতার সমার্থক নয়। বরং স্বাধীনতা যত বেশি থাকবে, সাংবাদিকদের পেশাগত মান ও নৈতিকতার চর্চাও তত বেশি শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন। এতে করে গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা আরও বাড়াতে পারে।

হাওর শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ভাবনা
এ সময় হাওর অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের সুবিধা ও আলাদা একাডেমি ক্যালেন্ডার প্রণয়নের বিষয়ে সাংবাদিকরা দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তথ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, এটি একটি জাতীয় বিষয়। হাওরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ও পড়ালেখার সুবিধার বিষয়টি সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করছে এবং শিগগিরই ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরীর এই বক্তব্য প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের শিক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারের বাস্তবতাভিত্তিক চিন্তার ইঙ্গিত দেয়। প্রতিমন্ত্রী বিষয়টিকে ‘জাতীয় বিষয়’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন—এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে হাওরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের সমস্যাকে শুধু স্থানীয় সমস্যা হিসেবে না দেখে জাতীয় শিক্ষানীতির অংশ হিসেবে বিবেচনার বার্তা মিলেছে।

শিক্ষার্থীদের মানবিক ও আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে হবে
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে প্রতিমন্ত্রী বলেন, শুধু জিপিএ-৫ বা ভালো ফলাফল অর্জন করলেই চলবে না, শিক্ষার্থীদের মানবিক ও আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে হবে। পরিবার, শিক্ষক ও দেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে নৈতিকতার চর্চা করলেই প্রকৃত সাফল্য আসবে।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ভালো ফলাফলের পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধের চর্চার ওপর প্রতিমন্ত্রীর গুরুত্বারোপ শিক্ষার বৃহত্তর উদ্দেশ্যকে সামনে এনেছে। পরিবার, শিক্ষক ও দেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার যে আহ্বান তিনি জানিয়েছেন, তা শিক্ষাকে শুধু পরীক্ষাকেন্দ্রিক না রেখে চরিত্র ও মূল্যবোধ গঠনের সঙ্গে যুক্ত করার একটি দৃষ্টিভঙ্গি বলে মনে করছেন অনেকেই।

তথ্য প্রতিমন্ত্রী জানান, তৃণমূলের যুবসমাজকে খেলাধুলায় সম্পৃক্ত করতে মাঠের আধুনিকায়ন করা হচ্ছে এবং অনলাইনে ও টিভিতে চাইনিজ ও অ্যারাবিক ভাষা শিক্ষার বিশেষ কার্যক্রম চালু করা হচ্ছে।

নেত্রকোণা-৩ (কেন্দুয়া-আটপাড়া) আসনের সংসদ সদস্য ড. রফিকুল ইসলাম হিলালীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন ময়মনসিংহ-৮ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মুন মুন জাহান লিজা, কেন্দুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা চৌধুরী এবং জেলা প্রেসক্লাবের সম্পাদক মাহবুবুল কিবরিয়া চৌধুরী হেলিম।

কালের আলো/এম/এএইচ