আরও দৃঢ় হবে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র সেনাবাহিনীর সম্পর্ক, শান্তি মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শীর্ষস্থানের প্রশংসা মার্কিন রাষ্ট্রদূতের
বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:
বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান মিত্র। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা, সন্ত্রাস দমন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে ব্যাপক সহযোগিতা বিদ্যমান রয়েছে। সম্পর্কের দিক থেকেও বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র সেনাবাহিনী নতুন এক উচ্চতায় পৌঁছেছে। নিজেদের মধ্যে নতুন দক্ষতা সংযোজিত করতে আগে থেকেই ঘোষণা ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং যুক্তরাষ্ট্র সামরিক বাহিনী চলতি বছর তিনটি যৌথ মহড়া করবে। দুই দেশের সামরিক বাহিনীর অভিন্ন নিরাপত্তা লক্ষ্যকে আরও দৃঢ় করতে দীর্ঘদিনের অংশীদারিত্ব বজায় রাখার ধারাবাহিকতায় প্রথমেই আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে চলতি বছরের ‘এক্সারসাইজ টাইগার লাইটনিং (টিএল)’।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও যুক্তরাষ্ট্রের প্যাসিফিক আর্মি কমান্ডের (ইউএসএআরপিএসি) যৌথ উদ্যোগে গত বৃহস্পতিবার (২৪ জুলাই) এই মহড়াটি শুরু হয়। গত শুক্রবার (২৫ জুলাই) সিলেটের জালালাবাদ সেনানিবাসে প্যারা কমান্ডো ব্রিগেড সদর দপ্তরে এটির উদ্বোধন হয়। বুধবার (৩০ জুলাই) সিলেটের জালালাবাদ সেনানিবাসে সপ্তাহব্যাপী এই মহড়াটি শেষ হয়েছে। ‘কাউন্টার টেররিজম, শান্তিরক্ষা, জঙ্গলে অপারেশন ও বিস্ফোরক’ বিষয়ে বাংলাদেশ ও মার্কিন সেনাবাহিনীর যৌথ এই প্রশিক্ষণ মহড়া বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতিশীল সহযোগিতার একটি প্রতীক বলে সমাপনী অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে মন্তব্য করেন ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসন। তিনি বলেন, ‘এটি বঙ্গোপসাগর ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিরাপত্তা, শান্তি ও সমৃদ্ধি অর্জনে দুই দেশের লক্ষ্যকে তুলে ধরে।’ রাষ্ট্রদূত জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মানের দিক থেকে শীর্ষস্থান অধিকার করায় উচ্ছ্বসিত প্রশংসাও করেন।
অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ১৭ পদাতিক ডিভিশনের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (জিওসি) ও সিলেটের এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল এ এস এম রিদওয়ানুর রহমান। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা বিধান, সন্ত্রাস দমন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং মানবিক সহায়তা ইত্যাদি বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা বিদ্যমান রয়েছে। বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ যেকোন বৈশ্বিক হুমকি মোকাবিলায় বদ্ধপরিকর এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য অংশীদারদের সঙ্গে সমবেতভাবে কাজ করে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, কৌশলগত যৌথ আভিযানিক সক্ষমতা উন্নয়ন এবং প্রস্তুতি জোরদার করার লক্ষ্য নিয়ে এক্সারসাইজ টাইগার লাইটনিং-২০২৫ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এই অনুশীলন অংশগ্রহণকারী সেনাসদস্যদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করতে কার্যকরী অবদান রাখবে।’

- এটি বঙ্গোপসাগর ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিরাপত্তা, শান্তি ও সমৃদ্ধি অর্জনে দুই দেশের লক্ষ্যকে তুলে ধরে
ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসন
ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত
আন্ত:বাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) ও বিভিন্ন সূত্র জানায়, সপ্তাহব্যাপী এই মহড়াটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো ব্রিগেড এবং যুক্তরাষ্ট্রের নেভাডা ন্যাশনাল গার্ড এর যৌথ অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়। মহড়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেভাডা ন্যাশনাল গার্ড এর ৬৬ জন এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো ব্রিগেডের ১০০ জন সদস্য অংশগ্রহণ করেন। সমাপনী অনুষ্ঠানে ‘অপারেশন টাইগার লাইটনিং’ প্রশিক্ষণের তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয় এবং অংশগ্রহণকারীদের মাঝে সনদপত্র বিতরণ করা হয়। এছাড়াও স্মারক হিসেবে প্রত্যেককে ইনসিগনিয়া প্রদান করা হয়। প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন ইউএস মেজর উইস্টিসেন ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেজর মাহমুদুল হাসান। পরে ফটোসেশন ও ভিজিটরস বইয়ে স্বাক্ষর করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত।
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্যারা-কমান্ডো ব্রিগেডের প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল হাসান। এ সময় তিনি বলেন, ‘মহড়ার প্রতিটি ধাপে অংশগ্রহণকারীরা সমন্বয়, প্রতিক্রিয়াশীলতা এবং পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে নানাবিধ কৌশলগত ও প্রায়োগিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন।’
সমাপনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসন বলেন, ‘বাংলাদেশ সবসময় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর অন্যতম বড় প্রেরণকারী দেশ এবং মানের দিক থেকে সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে। বর্তমানে শান্তিমিশনে কর্মরত রয়েছেন প্রায় ১ হাজার ৮০০ নারী সেনাসদস্য।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের দুই দেশের মধ্যে একটি মহান সম্পর্ক গড়ে উঠছে। একেকজন বাংলাদেশি ও আমেরিকান নাগরিক-হাতে হাত রেখে, হৃদয়ে হৃদয় মিলিয়ে-এই বন্ধন আরও দৃঢ় করছেন।’ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত ‘টাইগার লাইটনিং’ নামক এই যৌথ মহড়ার বিষয়ে বলেন, ‘এটি একটি ধারাবাহিক মহড়ার অংশ। বর্তমানে ‘টাইগার শার্ক’ নামে একটি মহড়া চলছে, যেখানে স্পেশাল ফোর্সের সঙ্গে নৌবাহিনী অংশ নিচ্ছে। এই বছরের শেষ দিকে বিমান বাহিনীর সঙ্গে ‘প্যাসিফিক অ্যাঞ্জেল’ মহড়া অনুষ্ঠিত হবে।’

- এক্সারসাইজ টাইগার লাইটনিং অনুশীলন অংশগ্রহণকারী সেনাসদস্যদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে
মেজর জেনারেল এ এস এম রিদওয়ানুর রহমান
জিওসি, ১৭ পদাতিক ডিভিশন
ও এরিয়া কমান্ডার, সিলেট
এর আগে গত ২০ জুলাই এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন দূতাবাস জানায়, টাইগার শার্ক (ফ্ল্যাশ বেঙ্গল সিরিজের অংশ) একটি যৌথ প্রশিক্ষণ মহড়া, যেখানে আমাদের বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী যুদ্ধকৌশল অনুশীলন করে। ২০০৯ সাল থেকে চলমান এই মহড়ায় প্যাট্রোল বোট পরিচালনা এবং স্বল্পপাল্লার অস্ত্রের লক্ষ্যভেদে দক্ষতা অর্জনের অনুশীলন অন্তর্ভুক্ত থাকবে, যা বাংলাদেশ স্পেশাল ওয়ারফেয়ার ডাইভিং অ্যান্ড স্যালভেজ এবং প্যারা কমান্ডো ব্রিগেডকে সঙ্কট মোকাবিলায় আরও দক্ষ করে তুলবে। এই যৌথ মহড়ার বিশেষ আকর্ষণ হলো উভয় দেশের ব্যবহৃত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরঞ্জাম। এছাড়া প্যাসিফিক অ্যাঞ্জেল মহড়া সম্পর্কে বলা হয়, বাংলাদেশে এটি চতুর্থবারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই মহড়ায় আমাদের প্রতিরক্ষা সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, আমাদের সি-১৩০ বহরকে তুলে ধরা হবে, যা দুর্যোগকালে আকাশপথে সরঞ্জাম সরবরাহ ও চলাচল সংক্রান্ত অভিযানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই মহড়াটি অনুসন্ধান ও উদ্ধার (এসএআর) এবং অ্যারোমেডিকেল কার্যক্রমের উপরও গুরুত্ব দেয়, যা মানবিক বিপর্যয় মোকাবিলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়াবে।
কালের আলো/এমএএএমকে



আপনার মতামত লিখুন
Array