গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী ঐতিহাসিক ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন বসছে আজ
গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বহুল কাঙ্ক্ষিত জাতীয় নির্বাচনের পর ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন আজ বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বসতে যাচ্ছে। এদিন সংসদ ভবনের সংসদ কক্ষে অধিবেশন আহ্বান করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। বেলা ১১ টায় অধিবেশন বসবে। নতুন সংসদের এই অধিবেশন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে কৌতূহলের শেষ নেই। মানুষের জিজ্ঞাসার কেন্দ্রবিন্দু এখন একটি প্রশ্ন—প্রথম দিনে অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন কে? এই আলোচনার মধ্যেই আরও বেশ কয়েকটি বিষয়ে সরকারি ও বিরোধী দল পরস্পর বিপরীতমুখী অবস্থান নিয়েছে। এর ফলে প্রথম দিন থেকেই সংসদে হট্টগোল তৈরির শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই অধিবেশনে সংসদ উপনেতা, স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকার কে হবেন, তাও জানা যাবে। অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের ভাগ্যও এই অধিবেশনে নির্ধারিত হবে। ঠিক এক মাস আগে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ভূমিধস জয় পায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। আর ইতিহাসে প্রথমবার সর্বোচ্চ ৬৮ আসন নিয়ে সংসদে প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা অর্জন করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। নিরঙ্কুশ জয়ের পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দলীয় চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করে বিএনপি।
আজ ত্রয়োদশ সংসদের উদ্বোধনী দিনে অধিবেশনে কে সভাপতিত্ব করবেন—তা নিয়ে রাজনৈতিক মহল ও সংসদসংশ্লিষ্টদের মধ্যে আলোচনা চলছে। সংবিধান অনুযায়ী সাধারণ নির্বাচনের ফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংসদের অধিবেশন আহ্বান করা বাধ্যতামূলক। সেই বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি প্রথম অধিবেশন আহ্বান করেছেন। কিন্তু এবার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। সংবিধান ও সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী সাধারণত নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন বিদায়ী সংসদের স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার। তাদের উপস্থিতিতেই নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হয়। তবে দ্বাদশ সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করেছেন এবং আত্মগোপনে রয়েছেন। অন্যদিকে ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু বিভিন্ন মামলায় কারান্তরীণ। ফলে উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব নিয়ে তৈরি হয়েছে জটিলতা। এ পরিস্থিতিতে বুধবার (১১ মার্চ) ক্ষমতাসীন দল বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সেখানে নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের নাম চূড়ান্ত করার পাশাপাশি প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্বের প্রক্রিয়াও নির্ধারণ করা হয়েছে। বৈঠক শেষে বিএনপির চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, প্রথম দিনে স্পিকারের চেয়ার খালি রেখে অধিবেশন শুরু হবে। শুরুতে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের পর সংসদ নেতা একজন জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্যকে সভায় সভাপতিত্ব করার জন্য প্রস্তাব করবেন। অন্য একজন সদস্য তা সমর্থন করলে ওই সদস্য সাময়িকভাবে অধিবেশনের সভাপতিত্ব করবেন। তার সভাপতিত্বেই নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবেন। এরপর তাদের শপথের মধ্য দিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হবে। এবারও একাধিকবার নির্বাচিত কোনো জ্যেষ্ঠ সংসদ-সদস্যকে দিয়ে অধিবেশন শুরু করার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংসদ সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
গতকাল বুধবার (১১ মার্চ) জাতীয় সংসদ ভবনে সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের বৈঠকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে প্রার্থী চূড়ান্ত করার ভার সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর ছেড়ে দিয়েছে বিএনপির সংসদীয় দল। বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম জানান, বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বেলা ১১টায় শুরু হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন। বৈঠকের শুরুতে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে নির্বাচন হবে। চিপ হুইপ জানান, স্পিকারের চেয়ার খালি রেখে অধিবেশনের কার্যক্রম শুরু হবে। শুরুতে একজন পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করবেন। এরপর সংসদ নেতা এই সভায় সভাপতিত্ব করার জন্য কোনো একজন জ্যেষ্ঠ নেতার নাম প্রস্তাব করবেন। কোনো একজন সংসদ সদস্য তা সমর্থন করবেন। তারপর ওই সদস্য (যার নাম প্রস্তাব করা হবে) সভাপতিত্ব করবেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে অধিবেশন বসার সম্ভাবনা রয়েছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদের স্পিকারের পদত্যাগ এবং ওই সংসদের ডেপুটি স্পিকার কারাগারে আটক থাকায় জ্যেষ্ঠ সংসদ-সদস্য হিসাবে ড. মোশাররফ এই গুরু দায়িত্ব পালন করবেন। তার সভাপতিত্বে প্রথম দিনই নতুন সংসদের স্পিকার নির্বাচন করা হবে। ড. খন্দকার মোশাররফ কুমিল্লা থেকে বারবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য। তিনি এর আগে বিএনপি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সামলেছেন সফলভাবে। বিএনপিতে তিনি সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা ছেড়ে তিনি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে পুরোদস্তুর রাজনীতিতে আসেন। সব মহলে তার সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব স্পষ্ট।
- প্রথম অধিবেশনে ভাষণ দেবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন
- নতুন সংসদের এই অধিবেশন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে কৌতূহল
- প্রথম দিন থেকেই সংসদে হট্টগোল তৈরির শঙ্কা
- এই অধিবেশনে নির্ধারিত হবে অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের ভাগ্যও
- উদ্বোধনী দিনে অধিবেশনে কে সভাপতিত্ব করবেন—তা নিয়ে আলোচনা
- গণভোটের রায় ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়েও জল্পনা
- জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন চায় জামায়াত-এনসিপি
সংবিধান অনুযায়ী সংসদের প্রথম অধিবেশন বসার ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে অধ্যাদেশগুলোকে আইনে রূপান্তরের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তা না হলে এগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। প্রথম বৈঠকে স্পিকার নির্বাচনের পর অধিবেশন ২০ মিনিটের জন্য মুলতবি রেখে নতুন স্পিকারের শপথ অনুষ্ঠিত হবে। রাষ্ট্রপতি শপথ পাঠ করাবেন। এরপর নতুন স্পিকারের সভাপতিত্বে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন ও অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালিত হবে। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ২৯৭টি আসনের ফল প্রকাশ হয়েছে। এর মধ্যে বিএনপি ২০৯টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছে। জামায়াত পেয়েছে ৬৮টি আসন। এছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ কয়েকটি দল প্রতিনিধিত্ব করছে।
১৩৩ অধ্যাদেশের ভাগ্য নির্ধারণ
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকারের শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে সেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অবসান ঘটে। এই সরকারের প্রায় ১৮ মাস মেয়াদে যে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার যেসব অধ্যাদেশ জারি করেছে, তার মধ্যে একটি হলো, একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন (সংশোধন) অধ্যাদেশ। যেই সংশোধনীর মাধ্যমে এই ট্রাইব্যুনালের বিচারের আওতায় চব্বিশের আন্দোলনের হত্যাকাণ্ডসহ বিগত সময়ের গুম সংক্রান্ত বিচারকে আওতাভুক্ত করা হয়েছে। অধ্যাদেশের মাধ্যমে আইনটি একাধিকবার সংশোধন হয়েছে। ইতোমধ্যে এসব সংশোধনের ওপর ভিত্তি করে একাধিক মামলার রায়ও হয়ে গেছে। উচ্চ আদালতে বিচারকের শূন্যতা পূরণে ‘সুপ্রিম কোর্ট জাজেস অ্যাপয়েন্টমেন্ট অর্ডিন্যান্স’ জারি করা হয়। অধ্যাদেশটি সংসদে গৃহীত হওয়ার আগেই এই আইনে উচ্চ আদালতে অনেক বিচারক নিয়োগ করা হয়েছে।

সরকারের ওয়েবসাইট পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৫ আগস্টের পর থেকে ২০২৪ সালে মোট ১৭টি, ২০২৫ সালে ৮০টি এবং ২০২৬ সালে ৩৬টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। এসব অধ্যাদেশের মধ্যে ৯২টির মাধ্যমে পূর্ববর্তী আইন সংশোধন করা হয়। একই আইনে একাধিকবার সংশোধনী আনতে একাধিক অধ্যাদেশের নজিরও আছে। যেমন—আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে একাধিকবার সংশোধনী এনে তিনটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংক্রান্ত বিষয়ে সন্ত্রাস বিরোধী আইনে সংশোধনী সংক্রান্ত একাধিক অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। পূর্ববর্তী আইন রহিত করতে জারি করা হয়েছে তিনটি অধ্যাদেশ। আর নতুন আইন প্রণয়নের লক্ষ্যে জারি করা হয়েছে ৩৮টি অধ্যাদেশ। যার মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার মতো বিষয় রয়েছে।
সংসদের অধিবেশন না থাকলে বা সংসদ ভেঙে যাওয়া অবস্থায় সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতিকে এই অধ্যাদেশে জারির ক্ষমতা দিয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী এসব অধ্যাদেশ সংসদের প্রথম অধিবেশনেই পাস হতে হবে। না হয় অধিবেশন শুরুর ৩০ দিনের মধ্যে লোপ পাবে অধ্যাদেশের কার্যকারিতা। এই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ৯৩। (১) [সংসদ ভাঙ্গিয়া যাওয়া অবস্থায় অথবা উহার অধিবেশনকাল ব্যতীত] কোন সময়ে রাষ্ট্রপতির নিকট আশু ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি বিদ্যমান রহিয়াছে বলিয়া সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হইলে তিনি উক্ত পরিস্থিতিতে যেরূপ প্রয়োজনীয় বলিয়া মনে করিবেন, সেইরূপ অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও জারি করিতে পারিবেন এবং জারি হইবার সময় হইতে অনুরূপভাবে প্রণীত অধ্যাদেশ সংসদের আইনের ন্যায় ক্ষমতাসম্পন্ন হইবে।
তবে রাষ্ট্রপতির এই অধ্যাদেশ জারির ক্ষমতা অবারিত নয়। এই অনুচ্ছেদেই বলা হয়েছে, তবে শর্ত থাকে যে, এই দফার অধীন কোনো অধ্যাদেশে এমন কোনো বিধান করা হইবে না, (ক) যাহা এই সংবিধানের অধীন সংসদের আইন-দ্বারা আইনসঙ্গতভাবে করা যায় না; (খ) যাহাতে এই সংবিধানের কোন বিধান পরিবর্তিত বা রহিত হইয়া যায়; অথবা (গ) যাহার দ্বারা পূর্বে প্রণীত কোন অধ্যাদেশের যে কোন বিধানকে অব্যাহতভাবে বলবৎ করা যায়। অধ্যাদেশ সংসদে গৃহীত হওয়ার বিধান সম্পর্কে এই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, (২) এই অনুচ্ছেদের (১) দফার অধীন প্রণীত কোন অধ্যাদেশ জারি হইবার পর অনুষ্ঠিত সংসদের প্রথম বৈঠকে তাহা উপস্থাপিত হইবে এবং ইতঃপূর্বে বাতিল না হইয়া থাকিলে অধ্যাদেশটি অনুরূপভাবে উপস্থাপনের পর ত্রিশ দিন অতিবাহিত হইলে কিংবা অনুরূপ মেয়াদ উত্তীর্ণ হইবার পূর্বে তাহা অননুমোদন করিয়া সংসদে প্রস্তাব গৃহীত হইলে অধ্যাদেশটির কার্যকারিতা লোপ পাইবে। (৩) সংসদ ভাঙ্গিয়া যাওয়া অবস্থার কোন সময়ে রাষ্ট্রপতির নিকট ব্যবস্থা-গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি বিদ্যমান রহিয়াছে বলিয়া সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হইলে তিনি এমন অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও জারি করিতে পারিবেন, যাহাতে সংবিধান-দ্বারা সংযুক্ত তহবিলের ওপর কোন ব্যয় দায়যুক্ত হউক বা না হউক, উক্ত তহবিল হইতে সেইরূপ ব্যয়নির্বাহের কর্তৃত্ব প্রদান করা যাইবে এবং অনুরূপভাবে প্রণীত কোন অধ্যাদেশ জারি হইবার সময় হইতে তাহা সংসদের আইনের ন্যায় ক্ষমতাসম্পন্ন হইবে। (৪) এই অনুচ্ছেদের (৩) দফার অধীন জারীকৃত প্রত্যেক অধ্যাদেশ যথাশীঘ্র সংসদে উপস্থাপিত হইবে এবং সংসদ পুনর্গঠিত হইবার তারিখ হইতে ত্রিশ দিনের মধ্যে এই সংবিধানের ৮৭, ৮৯ ও ৯০ অনুচ্ছেদ সমূহের বিধানাবলী প্রয়োজনীয় উপযোগীকরণসহ পালিত হইবে।
সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি
১২ মার্চ সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা হয়েছে। সেই অধিবেশনেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জারি হওয়া ১৩৩টি অধ্যাদেশ জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হবে। এ বিষয়ে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সাংবিধানিকভাবে যতগুলো অধ্যাদেশ হয়েছে, প্রত্যেকটা অধ্যাদেশই আমরা বিল আকারে পেশ করবো। সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে করা ১৩৩ অধ্যাদেশের প্রত্যেকটিই পেশ করা হবে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, ১৩৩টি অধ্যাদশে প্রণয়ন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সাংবিধানিকভাবে আমরা এসব উপস্থাপন করতে বাধ্য। কিন্তু সেই ১৩৩টি অধ্যাদেশের কোনটা কিভাবে গৃহীত হবে তা সংসদের এখতিয়ার। কিন্তু আপনারা সবাই জানেন, ওর বাইরে আরও একটি আদেশ জারি করা হয়েছে। সেই আদেশটার নাম হল জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ। ইহা মাস্কুলিন না ফ্যামিনিন নাকি কমন জেন্ডার আমি জানি না। কারণ বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হওয়ার আগে আদেশ জারির এখতিয়ার ছিল। যার ভিত্তি ছিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদের নির্বাচনের পর সেশনে বসা এবং মুলতবির পর অর্ডিন্যান্স জারির ক্ষমতা পেল রাষ্ট্রপতি। সংবিধান গৃহীত হওয়ার পর অর্ডারের জামানা শেষ। এখন কিভাবে রাষ্ট্রপতি অর্ডার জারি করলেন? আমরা তখন প্রশ্ন তুলেছিলাম। আমি বলেছিলাম, আমরা এই সমস্ত আরোপিত জবরদস্তি কোন আদেশের বলে সার্বভৌম জাতীয় সংসদের কোন ক্ষমতা খর্ব হতে দেব না। কারণ জাতীয় সংসদের যে নির্বাচন সেটা সংবিধানিক নির্বাচন।
আলোচনায় গণভোটের রায় ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ
ছাত্রুজনতার গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এর তিন দিন পরে ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। দায়িত্ব নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ স্বাক্ষরিত হয়। রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে ঐকমত্যের একটি রাজনৈতিক দলিল হলো জুলাই জাতীয় সনদ। সংস্কার-সম্পর্কিত কিছু প্রস্তাবের বিষয়ে জনগণের সম্মতি রয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের জন্য গণভোটের বিধান প্রণয়নে ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর অধ্যাদেশ জারি করা হয়।
রাষ্ট্রপতির জারি করা জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হলে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা একই সাথে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও কাজ করবেন। ওই আদেশের ভিত্তিতে গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই একই সঙ্গে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে অনুষ্ঠিত এ গণভোটে বিপুল ভোট ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়। ‘না’ ভোটের দ্বিগুণের বেশি ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়ে নির্বাচনে। নিয়ম অনুযায়ী, একই দিনে অনুষ্ঠিত দুটি নির্বাচনে বিজয়ী সংসদ সদস্যদের দুটি শপথ নেওয়ার কথা থাকলেও বিএনপির নির্বাচিতরা শুধু সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ তাঁরা নেননি। ১৭ ফেব্রুয়ারির ওই শপথ অনুষ্ঠানে জামায়াত-এনসিপিসহ বিরোধী জোটের ৭৭ জন সংসদ সদস্য দুটি শপথই গ্রহণ করেন। সংস্কার পরিষদের শপথ না নেওয়ায় তাঁরা মন্ত্রিপরিষদের শপথ অনুষ্ঠান বর্জন করেন। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পরে দুই পক্ষ মৃদু আপত্তিসহ ফলাফল মেনে নেয়। কিন্তু শপথ পাঠের এই ভিন্নমত রাজনীতিতে নতুন নাটকীয়তা তৈরি করে। এরপর থেকে দুই পক্ষই নিজেদের যুক্তি কমবেশি তুলে ধরছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে এই বিষয়টি আলোচনার ও তর্কবিতর্কের অন্যতম বিষয় হতে যাচ্ছে।
বুধবার (১১ মার্চ) জাতীয় সংসদ ভবনে বিরোধীদলীয় নেতার কক্ষে হওয়া বৈঠক থেকে বেরিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, এবার জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি আরেকটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে- একটি সংসদ নির্বাচন এবং অন্যটি সংস্কার নির্বাচন। ফলাফল আপনারা দেখেছেন। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আমরা সেই ফলাফল মেনে নিয়েছি। তিনি বলেন, এই দুটি নির্বাচন একে অপরের পরিপূরক। প্রথমে সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু হবে। নির্ধারিত মেয়াদ শেষে তাঁরাই আবার সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এ কারণেই একই অর্ডিন্যান্সের প্রতি সম্মান রেখে আমরা প্রথম দিন দুটি শপথ গ্রহণ করেছি- প্রথমে সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে এবং পরে সংসদ সদস্য হিসেবে।
একই সভা থেকে বেরিয়ে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম জানিয়েছেন, বর্তমান সংসদকে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ হিসেবে কার্যকর করার জোর দাবি জানাবেন তাঁরা। নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছি, যদিও সরকারি দল তা নেয়নি। আমাদের অন্যতম প্রধান দাবি হলো সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেওয়া এবং এই সংসদকে সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে কার্যকর করা।’
ঊুধবার (১১ মার্চ) ‘গণভোটের রায় বাস্তবায়নে অনীহা: উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ’ শিরোনামের আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নিয়ে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেছেন, সরকার জনগণকে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ভুলিয়ে দিতে চায়। নির্বাচনের আগে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করা এবং গণভোট আয়োজনের পক্ষে থাকা বিএনপি এখন সনদ বাস্তবায়ন করছে না জানিয়ে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত একই অনুষ্ঠানে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, ‘রহস্যজনকভাবে কেন বর্তমান সরকার ১৮০ ডিগ্রি বিপরীত দিকে হাঁটছে, সেই রহস্য আমাদের উদঘাটন করতে হবে। সংবিধান অনুযায়ী ৫০% ভোট পেলে অবশ্যই গণভোট জয়যুক্ত হবে।’
খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের বলেছেন, বিএনপি ঐকমত্য কমিশনের প্রতিটি মিটিংয়েই ছিল। তারা গণভোটে একমত হয়েছে এবং জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে। জুলাই সনদ একটি মীমাংসিত বিষয়, এখানে বিতর্কের কোনো কিছু নেই। এরপরেও জুলাই সনদের যারা বিরোধিতা করবে, জাতি কখনো তাদেরকে ক্ষমা করবে না। তারা ক্ষমতায় আসতে পেরেছে, কিন্তু এই ক্ষমতায় চিরদিন থাকবে না।

প্রথম অধিবেশনে ভাষণ দেবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন
আজ বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ভাষণ দেবেন। বুধবার (১১ মার্চ) দুপুরে সংসদ থেকে বের হয়ে এ কথা জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি আরও জানিয়েছেন, এই অধিবেশনেই সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হবে এবং তাদের শপথ গ্রহণ করাবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। জাতীয় সংসদ ভবনে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সরকারি দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সংসদীয় দলের বৈঠক থেকে বেরিয়ে এসব তথ্য দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। প্রায় একই সময়ে জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের এমপিদের নিয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠক থেকে বেরিয়ে সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতা ও জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, তাঁরা মনে করেন, বর্তমান রাষ্ট্রপতির সংসদে ভাষণ দেওয়ার কোনো অধিকার নেই। তিনি স্বৈরাচারের দোসর। বিএনপি কেন যে তাঁকে দিয়ে ভাষণ দেওয়াচ্ছে, তা তাঁদের কাছে বোধগম্য নয়। এ বিষয়ে তাঁরা কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেটা কাল জানা যাবে।
জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন চায় জামায়াত-এনসিপি
বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বুধবার সংসদ ভবনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, আমরা চাই জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন হোক। আমরা খণ্ডিতভাবে এটা চাচ্ছি না। আমরা চাই প্যাকেজ, আমরা চাই পিসফুলি (শান্তিপূর্ণভাবে) পুরাটাই সেখানে গ্রহণ ও বাস্তবায়ন হোক। এর ভিত্তিতেই আমরা যেন ন্যায্য দায়িত্ব পালন করতে পারি। তিনি বলেন, মনে রাখতে হবে- বাংলাদেশে যারা ভোট দিয়েছেন, তাদের প্রায় ঊনসত্তর শতাংশ এ প্রক্রিয়ার পক্ষে রায় দিয়েছেন। এটিকে অগ্রাহ্য করার কোনো সুযোগ নেই। জামায়াত আমির বলেন, ‘গণভোটে যে চারটি বিষয় উত্থাপিত হয়েছিল, আমরা চাই সেগুলো হুবহু গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হোক। এ বিষয়ে আমাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা থাকবে। ওই সনদেই আছে একজন ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দল থেকে হবেন। ইতিমধ্যে সরকার মৌখিকভাবে বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহের কথা জানিয়েছে। তবে শুরুতে জামায়াত এ ব্যাপারে লিখিতভাবে প্রস্তাব দেওয়ার কথা বললেও পরে বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্তের কথা জানায়নি দলটি।’
কালের আলো/এসআইপি/এমকে


আপনার মতামত লিখুন
Array