খুঁজুন
                               
, ,
           

গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী ঐতিহাসিক ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন বসছে আজ

কালের আলো রিপোর্ট
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ, ২০২৬, ১২:১০ পূর্বাহ্ণ
গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী ঐতিহাসিক ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন বসছে আজ

গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বহুল কাঙ্ক্ষিত জাতীয় নির্বাচনের পর ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন আজ বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বসতে যাচ্ছে। এদিন সংসদ ভবনের সংসদ কক্ষে অধিবেশন আহ্বান করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। বেলা ১১ টায় অধিবেশন বসবে। নতুন সংসদের এই অধিবেশন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে কৌতূহলের শেষ নেই। মানুষের জিজ্ঞাসার কেন্দ্রবিন্দু এখন একটি প্রশ্ন—প্রথম দিনে অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন কে? এই আলোচনার মধ্যেই আরও বেশ কয়েকটি বিষয়ে সরকারি ও বিরোধী দল পরস্পর বিপরীতমুখী অবস্থান নিয়েছে। এর ফলে প্রথম দিন থেকেই সংসদে হট্টগোল তৈরির শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই অধিবেশনে সংসদ উপনেতা, স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকার কে হবেন, তাও জানা যাবে। অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের ভাগ্যও এই অধিবেশনে নির্ধারিত হবে। ঠিক এক মাস আগে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ভূমিধস জয় পায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। আর ইতিহাসে প্রথমবার সর্বোচ্চ ৬৮ আসন নিয়ে সংসদে প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা অর্জন করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। নিরঙ্কুশ জয়ের পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দলীয় চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করে বিএনপি।

আজ ত্রয়োদশ সংসদের উদ্বোধনী দিনে অধিবেশনে কে সভাপতিত্ব করবেন—তা নিয়ে রাজনৈতিক মহল ও সংসদসংশ্লিষ্টদের মধ্যে আলোচনা চলছে। সংবিধান অনুযায়ী সাধারণ নির্বাচনের ফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংসদের অধিবেশন আহ্বান করা বাধ্যতামূলক। সেই বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি প্রথম অধিবেশন আহ্বান করেছেন। কিন্তু এবার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। সংবিধান ও সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী সাধারণত নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন বিদায়ী সংসদের স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার। তাদের উপস্থিতিতেই নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হয়। তবে দ্বাদশ সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করেছেন এবং আত্মগোপনে রয়েছেন। অন্যদিকে ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু বিভিন্ন মামলায় কারান্তরীণ। ফলে উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব নিয়ে তৈরি হয়েছে জটিলতা। এ পরিস্থিতিতে বুধবার (১১ মার্চ) ক্ষমতাসীন দল বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সেখানে নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের নাম চূড়ান্ত করার পাশাপাশি প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্বের প্রক্রিয়াও নির্ধারণ করা হয়েছে। বৈঠক শেষে বিএনপির চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, প্রথম দিনে স্পিকারের চেয়ার খালি রেখে অধিবেশন শুরু হবে। শুরুতে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের পর সংসদ নেতা একজন জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্যকে সভায় সভাপতিত্ব করার জন্য প্রস্তাব করবেন। অন্য একজন সদস্য তা সমর্থন করলে ওই সদস্য সাময়িকভাবে অধিবেশনের সভাপতিত্ব করবেন। তার সভাপতিত্বেই নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবেন। এরপর তাদের শপথের মধ্য দিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হবে। এবারও একাধিকবার নির্বাচিত কোনো জ্যেষ্ঠ সংসদ-সদস্যকে দিয়ে অধিবেশন শুরু করার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংসদ সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

গতকাল বুধবার (১১ মার্চ) জাতীয় সংসদ ভবনে সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের বৈঠকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে প্রার্থী চূড়ান্ত করার ভার সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর ছেড়ে দিয়েছে বিএনপির সংসদীয় দল। বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম জানান, বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বেলা ১১টায় শুরু হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন। বৈঠকের শুরুতে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে নির্বাচন হবে। চিপ হুইপ জানান, স্পিকারের চেয়ার খালি রেখে অধিবেশনের কার্যক্রম শুরু হবে। শুরুতে একজন পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করবেন। এরপর সংসদ নেতা এই সভায় সভাপতিত্ব করার জন্য কোনো একজন জ্যেষ্ঠ নেতার নাম প্রস্তাব করবেন। কোনো একজন সংসদ সদস্য তা সমর্থন করবেন। তারপর ওই সদস্য (যার নাম প্রস্তাব করা হবে) সভাপতিত্ব করবেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে অধিবেশন বসার সম্ভাবনা রয়েছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদের স্পিকারের পদত্যাগ এবং ওই সংসদের ডেপুটি স্পিকার কারাগারে আটক থাকায় জ্যেষ্ঠ সংসদ-সদস্য হিসাবে ড. মোশাররফ এই গুরু দায়িত্ব পালন করবেন। তার সভাপতিত্বে প্রথম দিনই নতুন সংসদের স্পিকার নির্বাচন করা হবে। ড. খন্দকার মোশাররফ কুমিল্লা থেকে বারবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য। তিনি এর আগে বিএনপি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সামলেছেন সফলভাবে। বিএনপিতে তিনি সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা ছেড়ে তিনি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে পুরোদস্তুর রাজনীতিতে আসেন। সব মহলে তার সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব স্পষ্ট।

  • প্রথম অধিবেশনে ভাষণ দেবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন
  • নতুন সংসদের এই অধিবেশন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে কৌতূহল
  • প্রথম দিন থেকেই সংসদে হট্টগোল তৈরির শঙ্কা
  • এই অধিবেশনে নির্ধারিত হবে অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের ভাগ্যও
  • উদ্বোধনী দিনে অধিবেশনে কে সভাপতিত্ব করবেন—তা নিয়ে আলোচনা
  • গণভোটের রায় ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়েও জল্পনা
  • জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন চায় জামায়াত-এনসিপি

সংবিধান অনুযায়ী সংসদের প্রথম অধিবেশন বসার ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে অধ্যাদেশগুলোকে আইনে রূপান্তরের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তা না হলে এগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। প্রথম বৈঠকে স্পিকার নির্বাচনের পর অধিবেশন ২০ মিনিটের জন্য মুলতবি রেখে নতুন স্পিকারের শপথ অনুষ্ঠিত হবে। রাষ্ট্রপতি শপথ পাঠ করাবেন। এরপর নতুন স্পিকারের সভাপতিত্বে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন ও অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালিত হবে। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ২৯৭টি আসনের ফল প্রকাশ হয়েছে। এর মধ্যে বিএনপি ২০৯টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছে। জামায়াত পেয়েছে ৬৮টি আসন। এছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ কয়েকটি দল প্রতিনিধিত্ব করছে।

১৩৩ অধ্যাদেশের ভাগ্য নির্ধারণ
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকারের শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে সেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অবসান ঘটে। এই সরকারের প্রায় ১৮ মাস মেয়াদে যে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার যেসব অধ্যাদেশ জারি করেছে, তার মধ্যে একটি হলো, একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন (সংশোধন) অধ্যাদেশ। যেই সংশোধনীর মাধ্যমে এই ট্রাইব্যুনালের বিচারের আওতায় চব্বিশের আন্দোলনের হত্যাকাণ্ডসহ বিগত সময়ের গুম সংক্রান্ত বিচারকে আওতাভুক্ত করা হয়েছে। অধ্যাদেশের মাধ্যমে আইনটি একাধিকবার সংশোধন হয়েছে। ইতোমধ্যে এসব সংশোধনের ওপর ভিত্তি করে একাধিক মামলার রায়ও হয়ে গেছে। উচ্চ আদালতে বিচারকের শূন্যতা পূরণে ‘সুপ্রিম কোর্ট জাজেস অ্যাপয়েন্টমেন্ট অর্ডিন্যান্স’ জারি করা হয়। অধ্যাদেশটি সংসদে গৃহীত হওয়ার আগেই এই আইনে উচ্চ আদালতে অনেক বিচারক নিয়োগ করা হয়েছে।

সরকারের ওয়েবসাইট পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৫ আগস্টের পর থেকে ২০২৪ সালে মোট ১৭টি, ২০২৫ সালে ৮০টি এবং ২০২৬ সালে ৩৬টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। এসব অধ্যাদেশের মধ্যে ৯২টির মাধ্যমে পূর্ববর্তী আইন সংশোধন করা হয়। একই আইনে একাধিকবার সংশোধনী আনতে একাধিক অধ্যাদেশের নজিরও আছে। যেমন—আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে একাধিকবার সংশোধনী এনে তিনটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংক্রান্ত বিষয়ে সন্ত্রাস বিরোধী আইনে সংশোধনী সংক্রান্ত একাধিক অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। পূর্ববর্তী আইন রহিত করতে জারি করা হয়েছে তিনটি অধ্যাদেশ। আর নতুন আইন প্রণয়নের লক্ষ্যে জারি করা হয়েছে ৩৮টি অধ্যাদেশ। যার মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার মতো বিষয় রয়েছে।

সংসদের অধিবেশন না থাকলে বা সংসদ ভেঙে যাওয়া অবস্থায় সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতিকে এই অধ্যাদেশে জারির ক্ষমতা দিয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী এসব অধ্যাদেশ সংসদের প্রথম অধিবেশনেই পাস হতে হবে। না হয় অধিবেশন শুরুর ৩০ দিনের মধ্যে লোপ পাবে অধ্যাদেশের কার্যকারিতা। এই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ৯৩। (১) [সংসদ ভাঙ্গিয়া যাওয়া অবস্থায় অথবা উহার অধিবেশনকাল ব্যতীত] কোন সময়ে রাষ্ট্রপতির নিকট আশু ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি বিদ্যমান রহিয়াছে বলিয়া সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হইলে তিনি উক্ত পরিস্থিতিতে যেরূপ প্রয়োজনীয় বলিয়া মনে করিবেন, সেইরূপ অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও জারি করিতে পারিবেন এবং জারি হইবার সময় হইতে অনুরূপভাবে প্রণীত অধ্যাদেশ সংসদের আইনের ন্যায় ক্ষমতাসম্পন্ন হইবে।

তবে রাষ্ট্রপতির এই অধ্যাদেশ জারির ক্ষমতা অবারিত নয়। এই অনুচ্ছেদেই বলা হয়েছে, তবে শর্ত থাকে যে, এই দফার অধীন কোনো অধ্যাদেশে এমন কোনো বিধান করা হইবে না, (ক) যাহা এই সংবিধানের অধীন সংসদের আইন-দ্বারা আইনসঙ্গতভাবে করা যায় না; (খ) যাহাতে এই সংবিধানের কোন বিধান পরিবর্তিত বা রহিত হইয়া যায়; অথবা (গ) যাহার দ্বারা পূর্বে প্রণীত কোন অধ্যাদেশের যে কোন বিধানকে অব্যাহতভাবে বলবৎ করা যায়। অধ্যাদেশ সংসদে গৃহীত হওয়ার বিধান সম্পর্কে এই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, (২) এই অনুচ্ছেদের (১) দফার অধীন প্রণীত কোন অধ্যাদেশ জারি হইবার পর অনুষ্ঠিত সংসদের প্রথম বৈঠকে তাহা উপস্থাপিত হইবে এবং ইতঃপূর্বে বাতিল না হইয়া থাকিলে অধ্যাদেশটি অনুরূপভাবে উপস্থাপনের পর ত্রিশ দিন অতিবাহিত হইলে কিংবা অনুরূপ মেয়াদ উত্তীর্ণ হইবার পূর্বে তাহা অননুমোদন করিয়া সংসদে প্রস্তাব গৃহীত হইলে অধ্যাদেশটির কার্যকারিতা লোপ পাইবে। (৩) সংসদ ভাঙ্গিয়া যাওয়া অবস্থার কোন সময়ে রাষ্ট্রপতির নিকট ব্যবস্থা-গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি বিদ্যমান রহিয়াছে বলিয়া সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হইলে তিনি এমন অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও জারি করিতে পারিবেন, যাহাতে সংবিধান-দ্বারা সংযুক্ত তহবিলের ওপর কোন ব্যয় দায়যুক্ত হউক বা না হউক, উক্ত তহবিল হইতে সেইরূপ ব্যয়নির্বাহের কর্তৃত্ব প্রদান করা যাইবে এবং অনুরূপভাবে প্রণীত কোন অধ্যাদেশ জারি হইবার সময় হইতে তাহা সংসদের আইনের ন্যায় ক্ষমতাসম্পন্ন হইবে। (৪) এই অনুচ্ছেদের (৩) দফার অধীন জারীকৃত প্রত্যেক অধ্যাদেশ যথাশীঘ্র সংসদে উপস্থাপিত হইবে এবং সংসদ পুনর্গঠিত হইবার তারিখ হইতে ত্রিশ দিনের মধ্যে এই সংবিধানের ৮৭, ৮৯ ও ৯০ অনুচ্ছেদ সমূহের বিধানাবলী প্রয়োজনীয় উপযোগীকরণসহ পালিত হইবে।

সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি
১২ মার্চ সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা হয়েছে। সেই অধিবেশনেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জারি হওয়া ১৩৩টি অধ্যাদেশ জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হবে। এ বিষয়ে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সাংবিধানিকভাবে যতগুলো অধ্যাদেশ হয়েছে, প্রত্যেকটা অধ্যাদেশই আমরা বিল আকারে পেশ করবো। সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে করা ১৩৩ অধ্যাদেশের প্রত্যেকটিই পেশ করা হবে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, ১৩৩টি অধ্যাদশে প্রণয়ন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সাংবিধানিকভাবে আমরা এসব উপস্থাপন করতে বাধ্য। কিন্তু সেই ১৩৩টি অধ্যাদেশের কোনটা কিভাবে গৃহীত হবে তা সংসদের এখতিয়ার। কিন্তু আপনারা সবাই জানেন, ওর বাইরে আরও একটি আদেশ জারি করা হয়েছে। সেই আদেশটার নাম হল জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ। ইহা মাস্কুলিন না ফ্যামিনিন নাকি কমন জেন্ডার আমি জানি না। কারণ বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হওয়ার আগে আদেশ জারির এখতিয়ার ছিল। যার ভিত্তি ছিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদের নির্বাচনের পর সেশনে বসা এবং মুলতবির পর অর্ডিন্যান্স জারির ক্ষমতা পেল রাষ্ট্রপতি। সংবিধান গৃহীত হওয়ার পর অর্ডারের জামানা শেষ। এখন কিভাবে রাষ্ট্রপতি অর্ডার জারি করলেন? আমরা তখন প্রশ্ন তুলেছিলাম। আমি বলেছিলাম, আমরা এই সমস্ত আরোপিত জবরদস্তি কোন আদেশের বলে সার্বভৌম জাতীয় সংসদের কোন ক্ষমতা খর্ব হতে দেব না। কারণ জাতীয় সংসদের যে নির্বাচন সেটা সংবিধানিক নির্বাচন।

আলোচনায় গণভোটের রায় ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ
ছাত্রুজনতার গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এর তিন দিন পরে ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। দায়িত্ব নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ স্বাক্ষরিত হয়। রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে ঐকমত্যের একটি রাজনৈতিক দলিল হলো জুলাই জাতীয় সনদ। সংস্কার-সম্পর্কিত কিছু প্রস্তাবের বিষয়ে জনগণের সম্মতি রয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের জন্য গণভোটের বিধান প্রণয়নে ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর অধ্যাদেশ জারি করা হয়।

রাষ্ট্রপতির জারি করা জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হলে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা একই সাথে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও কাজ করবেন। ওই আদেশের ভিত্তিতে গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই একই সঙ্গে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে অনুষ্ঠিত এ গণভোটে বিপুল ভোট ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়। ‘না’ ভোটের দ্বিগুণের বেশি ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়ে নির্বাচনে। নিয়ম অনুযায়ী, একই দিনে অনুষ্ঠিত দুটি নির্বাচনে বিজয়ী সংসদ সদস্যদের দুটি শপথ নেওয়ার কথা থাকলেও বিএনপির নির্বাচিতরা শুধু সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ তাঁরা নেননি। ১৭ ফেব্রুয়ারির ওই শপথ অনুষ্ঠানে জামায়াত-এনসিপিসহ বিরোধী জোটের ৭৭ জন সংসদ সদস্য দুটি শপথই গ্রহণ করেন। সংস্কার পরিষদের শপথ না নেওয়ায় তাঁরা মন্ত্রিপরিষদের শপথ অনুষ্ঠান বর্জন করেন। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পরে দুই পক্ষ মৃদু আপত্তিসহ ফলাফল মেনে নেয়। কিন্তু শপথ পাঠের এই ভিন্নমত রাজনীতিতে নতুন নাটকীয়তা তৈরি করে। এরপর থেকে দুই পক্ষই নিজেদের যুক্তি কমবেশি তুলে ধরছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে এই বিষয়টি আলোচনার ও তর্কবিতর্কের অন্যতম বিষয় হতে যাচ্ছে।

বুধবার (১১ মার্চ) জাতীয় সংসদ ভবনে বিরোধীদলীয় নেতার কক্ষে হওয়া বৈঠক থেকে বেরিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, এবার জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি আরেকটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে- একটি সংসদ নির্বাচন এবং অন্যটি সংস্কার নির্বাচন। ফলাফল আপনারা দেখেছেন। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আমরা সেই ফলাফল মেনে নিয়েছি। তিনি বলেন, এই দুটি নির্বাচন একে অপরের পরিপূরক। প্রথমে সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু হবে। নির্ধারিত মেয়াদ শেষে তাঁরাই আবার সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এ কারণেই একই অর্ডিন্যান্সের প্রতি সম্মান রেখে আমরা প্রথম দিন দুটি শপথ গ্রহণ করেছি- প্রথমে সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে এবং পরে সংসদ সদস্য হিসেবে।

একই সভা থেকে বেরিয়ে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম জানিয়েছেন, বর্তমান সংসদকে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ হিসেবে কার্যকর করার জোর দাবি জানাবেন তাঁরা। নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছি, যদিও সরকারি দল তা নেয়নি। আমাদের অন্যতম প্রধান দাবি হলো সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেওয়া এবং এই সংসদকে সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে কার্যকর করা।’

ঊুধবার (১১ মার্চ) ‘গণভোটের রায় বাস্তবায়নে অনীহা: উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ’ শিরোনামের আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নিয়ে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেছেন, সরকার জনগণকে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ভুলিয়ে দিতে চায়। নির্বাচনের আগে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করা এবং গণভোট আয়োজনের পক্ষে থাকা বিএনপি এখন সনদ বাস্তবায়ন করছে না জানিয়ে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত একই অনুষ্ঠানে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, ‘রহস্যজনকভাবে কেন বর্তমান সরকার ১৮০ ডিগ্রি বিপরীত দিকে হাঁটছে, সেই রহস্য আমাদের উদঘাটন করতে হবে। সংবিধান অনুযায়ী ৫০% ভোট পেলে অবশ্যই গণভোট জয়যুক্ত হবে।’

খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের বলেছেন, বিএনপি ঐকমত্য কমিশনের প্রতিটি মিটিংয়েই ছিল। তারা গণভোটে একমত হয়েছে এবং জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে। জুলাই সনদ একটি মীমাংসিত বিষয়, এখানে বিতর্কের কোনো কিছু নেই। এরপরেও জুলাই সনদের যারা বিরোধিতা করবে, জাতি কখনো তাদেরকে ক্ষমা করবে না। তারা ক্ষমতায় আসতে পেরেছে, কিন্তু এই ক্ষমতায় চিরদিন থাকবে না।

প্রথম অধিবেশনে ভাষণ দেবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন
আজ বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ভাষণ দেবেন। বুধবার (১১ মার্চ) দুপুরে সংসদ থেকে বের হয়ে এ কথা জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি আরও জানিয়েছেন, এই অধিবেশনেই সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হবে এবং তাদের শপথ গ্রহণ করাবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। জাতীয় সংসদ ভবনে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সরকারি দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সংসদীয় দলের বৈঠক থেকে বেরিয়ে এসব তথ্য দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। প্রায় একই সময়ে জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের এমপিদের নিয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠক থেকে বেরিয়ে সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতা ও জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, তাঁরা মনে করেন, বর্তমান রাষ্ট্রপতির সংসদে ভাষণ দেওয়ার কোনো অধিকার নেই। তিনি স্বৈরাচারের দোসর। বিএনপি কেন যে তাঁকে দিয়ে ভাষণ দেওয়াচ্ছে, তা তাঁদের কাছে বোধগম্য নয়। এ বিষয়ে তাঁরা কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেটা কাল জানা যাবে।

জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন চায় জামায়াত-এনসিপি
বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বুধবার সংসদ ভবনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, আমরা চাই জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন হোক। আমরা খণ্ডিতভাবে এটা চাচ্ছি না। আমরা চাই প্যাকেজ, আমরা চাই পিসফুলি (শান্তিপূর্ণভাবে) পুরাটাই সেখানে গ্রহণ ও বাস্তবায়ন হোক। এর ভিত্তিতেই আমরা যেন ন্যায্য দায়িত্ব পালন করতে পারি। তিনি বলেন, মনে রাখতে হবে- বাংলাদেশে যারা ভোট দিয়েছেন, তাদের প্রায় ঊনসত্তর শতাংশ এ প্রক্রিয়ার পক্ষে রায় দিয়েছেন। এটিকে অগ্রাহ্য করার কোনো সুযোগ নেই। জামায়াত আমির বলেন, ‘গণভোটে যে চারটি বিষয় উত্থাপিত হয়েছিল, আমরা চাই সেগুলো হুবহু গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হোক। এ বিষয়ে আমাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা থাকবে। ওই সনদেই আছে একজন ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দল থেকে হবেন। ইতিমধ্যে সরকার মৌখিকভাবে বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহের কথা জানিয়েছে। তবে শুরুতে জামায়াত এ ব্যাপারে লিখিতভাবে প্রস্তাব দেওয়ার কথা বললেও পরে বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্তের কথা জানায়নি দলটি।’

কালের আলো/এসআইপি/এমকে

খাদ্যগুদাম প্রকল্পে শুধু সময়ই বাড়ে

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:৩৭ অপরাহ্ণ
খাদ্যগুদাম প্রকল্পে শুধু সময়ই বাড়ে

খাদ্যশস্য রাখার জায়গা বাড়াতে একের পর এক প্রকল্প। বরাদ্দ হচ্ছে হাজার কোটি টাকা। কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হচ্ছে, বাড়ছে ব্যয়, তবু বাড়ছে না কাঙ্ক্ষিত সংরক্ষণ সক্ষমতা। কোথাও তিন বছরেও কাজ এগিয়েছে মাত্র ২৫ শতাংশ, কোথাও এক যুগ পেরিয়েও শেষ হয়নি নির্মাণ। আবার রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া একটি প্রকল্পে মাটি খোঁড়ার পরই থেমে গেছে কাজ। পরে যৌক্তিকতা না পাওয়ায় সেটি অসমাপ্ত রেখেই সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারি খাদ্যগুদামের সক্ষমতা বাড়ানোর নামে নেওয়া চার প্রকল্পে মোট ৫ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। অথচ প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি, দফায় দফায় সংশোধন, মেয়াদ বৃদ্ধি এবং কোথাও কোথাও স্থান পরিবর্তনের কারণে এসব বিনিয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। খাদ্য সংরক্ষণ সক্ষমতার ঘাটতি কাটাতে গিয়ে সরকারি অর্থের অপচয় কিংবা অনিয়মের সুযোগ তৈরি হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও এখন সামনে। খাদ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য এবং পরিকল্পনা কমিশন ও বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) পর্যবেক্ষণে এসব চিত্র উঠে এসেছে।

তিন বছরেও এক-চতুর্থাংশ কাজ
২০২৩ সালের জুলাইয়ে ৮৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫৩ জেলায় নতুন খাদ্যগুদাম নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। ১৪৫টি স্থাপনায় মোট ১৯৫টি গুদাম নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিক ব্যয় ৮১৪ কোটি টাকা থাকলেও পরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৫৫ কোটি টাকা। শুধু ব্যয়ই বাড়েনি, বেড়েছে সময়ও। ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। আইএমইডির হিসাবে, ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ২৫ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ২১ দশমিক ১১ শতাংশ। এরই মধ্যে ব্যয় হয়েছে ১৭৮ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। আইএমইডির পর্যবেক্ষণে মাদারীপুরের কালকিনি ও বাগেরহাট প্যাকেজে ধীরগতি দেখা গেছে। গাছ ও পুরোনো অবকাঠামো সরাতেও সময় লেগেছে। শরীয়তপুরের আঙ্গারিয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল, দিনাজপুরের ফুলবাড়ী ও বিরল এবং মোংলা এলএসডিতে জায়গার সংকট রয়েছে। এ ছাড়া লে-আউট জটিলতা, প্রকল্পের স্থান পরিবর্তন, প্রশাসনিক অনুমোদন ও দরপত্র প্রক্রিয়াতেও বিলম্ব হয়েছে। প্রকল্প পরিচালক মো. সোহেলুর রহমান খান বলেন, সময়মতো পরিচালক নিয়োগ না হওয়া, নির্ধারিত স্থানে কাজ করতে না পারা, স্থান পরিবর্তন এবং রেট শিডিউলের কারণে ব্যয় কিছুটা বেড়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন প্রকল্প পরিচালক টেন্ডারের উদ্যোগ নিলেও কাজ করা সম্ভব হয়নি। তবে বর্তমানে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা তিনি দাবি করেন, আগের প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে প্রকল্পের কার্যক্রম এখন সন্তোষজনকভাবে এগোচ্ছে।

এক যুগেও শেষ হয়নি ৩ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকার প্রকল্প
সরকারি খাদ্য সংরক্ষণ অবকাঠামোর সবচেয়ে বড় প্রকল্পগুলোর একটি শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালে। ৩ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪ লাখ ৮৭ হাজার টন ধারণক্ষমতার সাতটি আধুনিক স্টিল সাইলো নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। বরিশাল, নারায়ণগঞ্জ, আশুগঞ্জ, ময়মনসিংহ, খুলনার মহেশ্বরপাশা, চট্টগ্রাম ও মধুপুরে এসব সাইলো নির্মাণের কথা। প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের ঋণ রয়েছে ৩ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা। চার দফা সংশোধনের পর মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়েও পুরো কাজ শেষ হয়নি। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৬৯৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ মোট ব্যয়ের ৯৫ দশমিক ০৫ শতাংশই খরচ হয়ে গেছে। তারপরও বাকি কাজ শেষ করতে আবারও মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে। প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন জানান, প্রকল্পের মূল কার্যালয় ঢাকার প্রবাসী কল্যাণ ভবনে। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিয়মিত বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না বলেও জানান তিনি।

রাজনৈতিক প্রকল্প, শেষ পর্যন্ত বাতিল
খাদ্য সংরক্ষণ অবকাঠামো নির্মাণে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগও রয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের নির্বাচনি এলাকা নওগাঁর মহাদেবপুরে ৩৬৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪৮ হাজার টন ধারণক্ষমতার চালের সাইলো নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হয়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রকল্পটি পর্যালোচনায় আসে। এরপর দেখা যায়, ভূমি অধিগ্রহণ ও মাটি খোঁড়া ছাড়া বাস্তবে আর কোনো কাজ এগোয়নি। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি ছিল শূন্য। প্রকল্প পরিচালক মোস্তাক আহমেদ জানান, নতুন ফিজিবিলিটি স্টাডিতে মহাদেবপুরে প্রকল্পটি নেওয়ার যৌক্তিকতা পাওয়া যায়নি। ফলে অসমাপ্ত অবস্থায় রেখেই প্রকল্পটি সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—যে প্রকল্পের যৌক্তিকতাই শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেল না, সেটির পেছনে প্রাথমিক পর্যায়ে ৩৬৭ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রয়োজন কেন হয়েছিল?

মেরামতের প্রকল্পেও ধীরগতি
ক্ষতিগ্রস্ত খাদ্যগুদাম ও আনুষঙ্গিক অবকাঠামো মেরামতে ২৫৫ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এটি শেষ করার কথা। লক্ষ্য ছিল সরকারি খাদ্য সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানো, খাদ্যশস্যের অপচয় কমানো, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। কিন্তু ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি ৩২ শতাংশ হলেও আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ৩ শতাংশ। প্রকল্প পরিচালক এ টি এম কাউছার হোসেন জানান, সময়মতো বাজেট বরাদ্দ না পাওয়ায় কাজ কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোয়নি। ঠিকাদারদের বিলও আটকে রয়েছে।

সরকারি গুদাম বনাম বেসরকারি সক্ষমতা
স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও সরকারি খাদ্য সংরক্ষণ সক্ষমতা প্রয়োজনের তুলনায় কম। সরকারি গুদামে বর্তমানে প্রায় ২২ থেকে ২৩ লাখ টন খাদ্যশস্য রাখা যায়। বিপরীতে বেসরকারি খাতের ধারণক্ষমতা প্রায় ১ কোটি টন। অর্থাৎ বিপুল সরকারি বিনিয়োগের পরও সংরক্ষণ সক্ষমতার বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। বাংলাদেশ অ্যাগ্রোকেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কৃষিবিদ কে এস এম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শুধু সরকারি ব্যবস্থাপনায় গুদাম নির্মাণ টেকসই সমাধান নয়। সহজ শর্তে ঋণ, কর অবকাশ ও ভর্তুকির মাধ্যমে বেসরকারি খাতকে খাদ্য সংরক্ষণে যুক্ত করা যেতে পারে। তার মতে, প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়তে থাকলে সরকারি অর্থ অপচয়ের পাশাপাশি অনিয়ম-দুর্নীতির আশঙ্কাও তৈরি হয়। তাই ব্যয় নির্ধারণ, দরপত্র, নির্মাণকাজের মান এবং অর্থ ব্যয়ে কঠোর নজরদারি জরুরি।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের নজরদারি কতটা?
খাদ্যশস্যের সরবরাহ ও মজুদ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম কিংবা গাফিলতি পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা। সম্প্রতি মানিকগঞ্জে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, দুর্যোগ কিংবা জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ রাখতে হবে। দায়িত্ব পালনে গাফিলতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে বাস্তবতা হলো, একদিকে খাদ্য সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ, অন্যদিকে সেই লক্ষ্যেই নেওয়া প্রকল্পের ধীরগতি। কোথাও ব্যয় বাড়ছে, কোথাও মেয়াদ; কোথাও আবার প্রকল্পের যৌক্তিকতাই প্রশ্নের মুখে। ৫ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকার এই চার প্রকল্প তাই শুধু গুদাম নির্মাণের হিসাব নয়—এটি সরকারি প্রকল্প পরিকল্পনা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিরও পরীক্ষা। খাদ্য নিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর খাতে জনগণের অর্থ খরচ করে যদি সময়মতো গুদামই না হয়, তাহলে সেই বিনিয়োগের সুফল শেষ পর্যন্ত যাবে কোথায়—এ প্রশ্নের উত্তর এখন সংশ্লিষ্টদেরই দিতে হবে।

কালের আলো/এম/এএইচ

ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ: ত্রিশালকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন ঈশ্বরগঞ্জ

ময়মনসিংহ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:০৮ অপরাহ্ণ
ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ: ত্রিশালকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন ঈশ্বরগঞ্জ

ময়মনসিংহ থেকে ১৪ দলের দীর্ঘ লড়াই শেষে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের শিরোপা ঘরে তুলেছে ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা দল। রোমাঞ্চকর ফাইনালে ত্রিশাল উপজেলা দলকে ২-১ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ঈশ্বরগঞ্জ।

শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৪টায় ময়মনসিংহ জেলা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনালে শুরু থেকেই দুই দলের মধ্যে ছিল তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা। আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে জমে ওঠা ম্যাচে দর্শকদের করতালি ও সমর্থকদের উচ্ছ্বাসে স্টেডিয়াম হয়ে ওঠে উৎসবমুখর।
ঈশ্বরগঞ্জের হয়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেন ১১ নম্বর জার্সিধারী রাব্বুল। তাঁর জোড়া গোলেই শিরোপা নিশ্চিত করে ঈশ্বরগঞ্জ। ত্রিশাল একটি গোল শোধ করলেও শেষ পর্যন্ত সমতায় ফিরতে পারেনি। ফলে ২-১ গোলের জয় নিয়ে গোল্ডকাপ নিজেদের করে নেয় ঈশ্বরগঞ্জ।
ফাইনালের আগে ও ম্যাচ চলাকালে ঈশ্বরগঞ্জ দলের খেলোয়াড়দের উৎসাহ দিতে মাঠে উপস্থিত ছিলেন ঈশ্বরগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু। তাঁর উপস্থিতি ও অনুপ্রেরণা খেলোয়াড়দের বাড়তি আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের স্বীকৃতি হিসেবে ফাইনালের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন ঈশ্বরগঞ্জের রাব্বুল। অন্যদিকে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন ত্রিশালের ১০ নম্বর জার্সিধারী ফাহাদ। ফেয়ার প্লে ট্রফি পেয়েছে হালুয়াঘাট উপজেলা দল।
৭০ মিনিটের ফাইনাল দেখতে বিকেল থেকেই ময়মনসিংহ জেলা স্টেডিয়ামে ভিড় করেন ক্রীড়াপ্রেমীরা। ম্যাচ শুরুর পর কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় গ্যালারি। দুই দলের সমর্থকদের স্লোগান, উল্লাস ও করতালিতে পুরো স্টেডিয়ামে সৃষ্টি হয় উৎসবের আমেজ।
ফাইনাল শেষে বিজয়ী ঈশ্বরগঞ্জ ও রানার্সআপ ত্রিশাল দলের হাতে ট্রফি তুলে দেওয়া হয়। দুই দলের মধ্যে মোট এক লাখ ৫০ হাজার টাকার পুরস্কারও বিতরণ করা হয়।
পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন। ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ময়মনসিংহ-৭ (ত্রিশাল) আসনের সংসদ সদস্য ডা. মো. মাহাবুবুর রহমান এবং ঈশ্বরগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু।

এ সময় বিভিন্ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের কর্মকর্তা, জেলা ক্রীড়া সংস্থার কর্মকর্তারা, খেলোয়াড়, কোচ, ম্যানেজার, ক্রীড়াপ্রেমী দর্শক ও গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
‘ক্রীড়া হলে পেশা, পরিবার পাবে ভরসা’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে এবং জেলা ক্রীড়া সংস্থার সহযোগিতায় গত ২৫ আগস্ট শুরু হয় এবারের জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট।

ময়মনসিংহ সদর উপজেলাসহ জেলার ১৪টি দল এতে অংশ নেয়। দীর্ঘ প্রতিযোগিতার প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে ফাইনালে ত্রিশালকে হারিয়ে শেষ হাসি হাসে ঈশ্বরগঞ্জ। রাব্বুলের জোড়া গোল ও দলের লড়াকু পারফরম্যান্সে গোল্ডকাপ এখন ঈশ্বরগঞ্জের ঘরে। শিরোপা জয়ের পথে খেলোয়াড়দের পাশে থেকে উৎসাহ-অনুপ্রেরণা জোগানো এমপি মাজেদ বাবুর ভূমিকাও প্রশংসা পেয়েছে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি 

ভয়মুক্ত সাংবাদিকতার পরিবেশ তৈরিতে দৃঢ় অঙ্গীকার তথ্য প্রতিমন্ত্রীর

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:৪৬ অপরাহ্ণ
ভয়মুক্ত সাংবাদিকতার পরিবেশ তৈরিতে দৃঢ় অঙ্গীকার তথ্য প্রতিমন্ত্রীর

সাংবাদিকদের স্বাধীন ও নির্ভয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারের দৃঢ় প্রত্যয়ের কথা পুনরায় উচ্চারণ করেছেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এমপি। তিনি বলেছেন, ‘বর্তমান সরকার সংবাদমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতায় বিশ্বাসী এবং সাংবাদিকরা যেন কোনো ভয়ভীতি ছাড়াই নির্বিঘ্নে তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সরকার সেই পরিবেশ নিশ্চিত করেছে।’ একই সঙ্গে সাংবাদিকদের পেশাগত কল্যাণে সরকারি সহায়তা বাড়ানোর উদ্যোগ গণমাধ্যমবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সরকারের অগ্রাধিকারকে আরও স্পষ্ট করেছে।

শুক্রবার (০৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে নেত্রকোণার কেন্দুয়া উপজেলা পাবলিক হলে ‘রফিক হিলালী ইংলিশ এক্সিলেন্স প্রোগ্রাম-২০২৬’-এর ওরিয়েন্টেশন ক্লাস এবং এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষায় কৃতিত্ব অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

  • সংবাদমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ
  • সাংবাদিক কল্যাণে বরাদ্দ বাড়ানোর উদ্যোগ—গণমাধ্যমকে শক্তিশালী করার প্রত্যাশা

একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক বিকাশে স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের কোন বিকল্প নেই। জনগণের কথা বলা, অনিয়ম তুলে ধরা, রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের স্বাধীনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই স্বাধীনতাকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দিতে সরকার কাজ করছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে তথ্য প্রতিমন্ত্রীর এমন পরিস্কার অবস্থানকে দেশের সাংবাদিকতার বিকাশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য গণমাধ্যম অঙ্গনেও একটি ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।

সাংবাদিক কল্যাণে বরাদ্দ বাড়ানোর উদ্যোগ
সাংবাদিকদের পেশাগত ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টিও প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের পেশাগত কল্যাণ ও বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তথ্য প্রতিমন্ত্রী জানান, সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের নির্ধারিত বাজেট বরাদ্দ ৬ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ কোটি টাকায় উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এ সংক্রান্ত প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে সাংবাদিক সমাজের মাঝে আশার সঞ্চার করেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে সাংবাদিকতা পেশা নানা ধরনের অর্থনৈতিক ও পেশাগত চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে মফস্বল সাংবাদিকদের সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে দায়িত্ব পালন করতে হয়। কল্যাণমূলক কার্যক্রমে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা সম্ভব হলে অসচ্ছল ও সংকটে থাকা সাংবাদিকদের পাশাপাশি তাদের পরিবারের জন্যও তা বাস্তব সহায়তা তৈরি করতে পারে।

হলুদ সাংবাদিকতা ও অপসাংবাদিকতা প্রতিরোধ
প্রতিমন্ত্রী সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রেস কাউন্সিলের মাধ্যমে ‘হলুদ সাংবাদিকতা’ ও অপসাংবাদিকতা প্রতিরোধের কথাও বলেছেন। বিষয়টি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীলতার মধ্যে প্রয়োজনীয় ভারসাম্যের দিকটি সামনে আনে। তিনি বলেছেন, ‘সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রেস কাউন্সিলের মাধ্যমে ‘হলুদ সাংবাদিকতা’ ও অপসাংবাদিকতা রোধে পেশাগত মানদণ্ড বজায় রাখার কাজ চলছে।’

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা যেমন অপরিহার্য, তেমনি সংবাদ প্রকাশে তথ্যের যথার্থতা, নিরপেক্ষতা, পেশাগত নৈতিকতা ও জনস্বার্থের বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীন সাংবাদিকতা কখনোই দায়িত্বহীন সাংবাদিকতার সমার্থক নয়। বরং স্বাধীনতা যত বেশি থাকবে, সাংবাদিকদের পেশাগত মান ও নৈতিকতার চর্চাও তত বেশি শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন। এতে করে গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা আরও বাড়াতে পারে।

হাওর শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ভাবনা
এ সময় হাওর অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের সুবিধা ও আলাদা একাডেমি ক্যালেন্ডার প্রণয়নের বিষয়ে সাংবাদিকরা দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তথ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, এটি একটি জাতীয় বিষয়। হাওরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ও পড়ালেখার সুবিধার বিষয়টি সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করছে এবং শিগগিরই ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরীর এই বক্তব্য প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের শিক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারের বাস্তবতাভিত্তিক চিন্তার ইঙ্গিত দেয়। প্রতিমন্ত্রী বিষয়টিকে ‘জাতীয় বিষয়’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন—এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে হাওরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের সমস্যাকে শুধু স্থানীয় সমস্যা হিসেবে না দেখে জাতীয় শিক্ষানীতির অংশ হিসেবে বিবেচনার বার্তা মিলেছে।

শিক্ষার্থীদের মানবিক ও আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে হবে
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে প্রতিমন্ত্রী বলেন, শুধু জিপিএ-৫ বা ভালো ফলাফল অর্জন করলেই চলবে না, শিক্ষার্থীদের মানবিক ও আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে হবে। পরিবার, শিক্ষক ও দেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে নৈতিকতার চর্চা করলেই প্রকৃত সাফল্য আসবে।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ভালো ফলাফলের পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধের চর্চার ওপর প্রতিমন্ত্রীর গুরুত্বারোপ শিক্ষার বৃহত্তর উদ্দেশ্যকে সামনে এনেছে। পরিবার, শিক্ষক ও দেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার যে আহ্বান তিনি জানিয়েছেন, তা শিক্ষাকে শুধু পরীক্ষাকেন্দ্রিক না রেখে চরিত্র ও মূল্যবোধ গঠনের সঙ্গে যুক্ত করার একটি দৃষ্টিভঙ্গি বলে মনে করছেন অনেকেই।

তথ্য প্রতিমন্ত্রী জানান, তৃণমূলের যুবসমাজকে খেলাধুলায় সম্পৃক্ত করতে মাঠের আধুনিকায়ন করা হচ্ছে এবং অনলাইনে ও টিভিতে চাইনিজ ও অ্যারাবিক ভাষা শিক্ষার বিশেষ কার্যক্রম চালু করা হচ্ছে।

নেত্রকোণা-৩ (কেন্দুয়া-আটপাড়া) আসনের সংসদ সদস্য ড. রফিকুল ইসলাম হিলালীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন ময়মনসিংহ-৮ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মুন মুন জাহান লিজা, কেন্দুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা চৌধুরী এবং জেলা প্রেসক্লাবের সম্পাদক মাহবুবুল কিবরিয়া চৌধুরী হেলিম।

কালের আলো/এম/এএইচ