খুঁজুন
                               
, ,
           

জ্বালানি সংকট কাটাতে সরকারের পরিকল্পনা জানালেন প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:১২ অপরাহ্ণ
জ্বালানি সংকট কাটাতে সরকারের পরিকল্পনা জানালেন প্রধানমন্ত্রী

বিগত সরকারের আমলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে পঙ্গু করে রাখার ফলেই দেশে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংকট ও আমদানিনির্ভরতা তৈরি হয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই সংকট কাটিয়ে দেশকে জ্বালানিতে স্বনির্ভর ও টেকসই ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে নিতে বর্তমান সরকার বহুমাত্রিক ও সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে বলে জানান তিনি।

বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে কুমিল্লা-১০ আসনের সংসদ সদস্য মো. মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ কথা জানান। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা সুসংহতকরণ, নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসার এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার রূপরেখা তুলে ধরেন।

দীর্ঘদিনের অপর্যাপ্ত অনুসন্ধান এবং আমদানিনির্ভরতার ফলে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটকে স্থায়ীভাবে নিরসন করে দেশকে স্বনির্ভর ও টেকসই ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে নিতে একাধিক যুগান্তকারী পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হচ্ছে বলে প্রধানমন্ত্রী জানান।

সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশের জ্বালানি ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কর্মসূচির আওতায় ৩০টি কূপের খননকাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে, যা থেকে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন ১৪০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) নতুন গ্যাস যুক্ত হয়েছে। বর্তমানে আরও ৭টি কূপের খনন কাজ অব্যাহত রয়েছে এবং এগুলোর কাজ শেষ হলে গ্রিডে অতিরিক্ত ৮৫ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ সম্ভব হবে।

অবশিষ্ট কূপগুলো পর্যায়ক্রমে খননের জন্য নতুন নতুন প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে।

এছাড়া নতুন গ্যাসের অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করতে ৪,৫০০ লাইন কিলোমিটার ২ডি সাইসমিক সার্ভে এবং ৪,২০০ বর্গ কিলোমিটার ৩ডি সাইসমিক সার্ভে পরিচালনার বৃহৎ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। একইসঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে আরও শক্তিশালী ও সক্ষম করে তুলতে নতুন দুটি আধুনিক রিগ ক্রয়ের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, দেশে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে অফশোর ও অনশোর মডেল পিএসসি (প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্যাক্ট)-এর আওতায় ব্যাপক অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে।

পিএসসি ২০২৬ অনুমোদনের পর আন্তর্জাতিক বিড রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে এবং অনশোর মডেল পিএসসি অনুমোদনের প্রক্রিয়াও শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এর মাধ্যমে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হলে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বহুগুণ বাড়বে। পাশাপাশি সামুদ্রিক এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে কক্সবাজারের মহেশখালীর কুতুবজোমে একটি নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনে আগ্রহী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে, যা থেকে ২০২৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে রিগ্যাসিফাইড এলএনজি সরবরাহ সম্ভব হবে। এর ফলে আগামী দুই বছরের মধ্যে এলএনজি আমদানি ক্ষমতা আরও ৬০০ এমএমসিএফডি বাড়বে।

এছাড়া জরুরি ভিত্তিতে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল কিংবা পায়রা ও মোংলা বন্দর এলাকায় আরও এক থেকে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে।

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়াতে সরকার যে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিয়েছে তা সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনির প্রশ্নের উত্তরে বিস্তারিত উঠে আসে।

প্রধানমন্ত্রী জানান, জনমনে আগ্রহ তৈরি ও এ খাতের দ্রুত প্রসারে ২০২৬ সালের ৮ জুন তারিখে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারিসহ সব প্রয়োজনীয় উপাদানের ওপর থেকে কাস্টমস ডিউটি, রেগুলেটরি ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক, আগাম কর এবং অতিরিক্ত অগ্রীম আয়করসহ সব ধরনের শুল্ক সম্পূর্ণ ছাড় দেওয়া হয়েছে। এছাড়া রুফটপ সোলার প্যানেল স্থাপনকারীদের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় আর্থিক মডেল ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী ৬ মাসের মধ্যে যারা বাসাবাড়ি বা প্রতিষ্ঠানের ছাদে সোলার স্থাপন করবেন, তাদের উৎপাদিত উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ সরকার প্রতি ইউনিট ১০.১৫ টাকা দরে কিনে নেবে। বর্তমান গড়ে প্রতি ইউনিট ৬ থেকে ৭ টাকা উৎপাদন খরচের বিপরীতে এই বাল্ক রেট ও সরকারি প্রণোদনার ফলে উদ্যোক্তারা ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত (৪০ শতাংশ মুনাফা ও ৫ শতাংশ প্রিমিয়াম) নিট মুনাফা অর্জনের সুযোগ পাবেন, যা পরবর্তী তিন বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারের অংশ হিসেবে সরকারি ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালে সোলার প্যানেল বসাতে জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে দেশের সব জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে রুফটপ সোলার সফলভাবে স্থাপন করা হয়েছে এবং অন্যান্য সরকারি দপ্তরে বাস্তবায়নের জন্য বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সোলারের পাশাপাশি বায়ু বিদ্যুৎ, জলবিদ্যুৎ এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সমন্বিত পরিকল্পনাও এগিয়ে চলছে।

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ

মিসাইল-ড্রোন হামলা: কুয়েত প্রবাসীদের সতর্ক করল বাংলাদেশ দূতাবাস

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৫৯ অপরাহ্ণ
মিসাইল-ড্রোন হামলা: কুয়েত প্রবাসীদের সতর্ক করল বাংলাদেশ দূতাবাস

কুয়েতে নতুন করে মিসাইল ও ড্রোন হামলার প্রেক্ষাপটে দেশটিতে বসবাসরত বাংলাদেশি নাগরিকদের বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ দূতাবাস।

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে এ আহ্বান জানানো হয়।

দূতাবাসের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, নিরাপত্তার স্বার্থে কুয়েতে বসবাসরত বাংলাদেশিদের সামরিক স্থাপনা ও এর আশপাশের এলাকা থেকে দূরে থাকতে হবে। একই সঙ্গে কুয়েতের আইন মেনে চলার পাশাপাশি দেশটির সরকারের দেওয়া নিরাপত্তা নির্দেশনা অনুসরণের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

এ ছাড়া মিসাইল ও ড্রোন হামলা সংক্রান্ত কোনো ছবি বা ভিডিও ধারণ না করার জন্যও প্রবাসীদের সতর্ক করেছে দূতাবাস।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। বর্তমান আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে কোনো ছবি বা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপলোড কিংবা শেয়ার না করার জন্যও প্রবাসীদের অনুরোধ করেছে বাংলাদেশ দূতাবাস।

নিরাপত্তার স্বার্থে কুয়েতে অবস্থানরত সব বাংলাদেশি নাগরিককে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলার পাশাপাশি সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানানো হয়েছে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

দরের তালিকা এক, বাজারে ডলারের দাম আরেক

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:০৯ অপরাহ্ণ
দরের তালিকা এক, বাজারে ডলারের দাম আরেক

কাগজে-কলমে এক দর, বাস্তবে আরেক। মানি চেঞ্জার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এমসিএবি) ঘোষণায় খোলাবাজারে প্রতি ডলার বিক্রির সর্বোচ্চ দর ১২৬ টাকা ৫০ পয়সা। কিন্তু রাজধানীর বিভিন্ন মানি চেঞ্জারে সেই দামে ডলার পাওয়া যাচ্ছে না। গ্রাহককে গুনতে হচ্ছে ১২৭ টাকা ১০ পয়সা থেকে ১২৭ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত। অর্থাৎ সংগঠনটির নির্ধারিত দরের চেয়ে প্রতি ডলারে সর্বোচ্চ এক টাকা পর্যন্ত বেশি দিতে হচ্ছে ক্রেতাদের। অবশ্য এমসিএবির দাবি, তাদের সদস্যরা নির্ধারিত দরেই ডলার কেনাবেচা করছেন। ফলে ঘোষিত দর ও বাস্তব বাজারদরের এই ব্যবধান নিয়ে তৈরি হয়েছে এক ধরনের ধোঁয়াশা।

সরেজমিন রাজধানীর নয়াপল্টন, দিলকুশা ও গুলশানের বিভিন্ন মানি চেঞ্জার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল্যতালিকায় ডলারের ক্রয়মূল্য ১২৫ টাকা ৫০ পয়সা এবং বিক্রয়মূল্য ১২৬ টাকা ৫০ পয়সা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু তালিকায় থাকা দরে সব জায়গায় ডলার কিনতে পারছেন না গ্রাহক। নয়াপল্টনের ‘মন্ডাইল মানি এক্সচেঞ্জ’-এর মূল্যতালিকাতেও ডলারের ক্রয়মূল্য ১২৫ টাকা ৫০ পয়সা এবং বিক্রয়মূল্য ১২৬ টাকা ৫০ পয়সা লেখা রয়েছে। তবে ডলারের দাম জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় প্রতিনিধি জানান, ‘দাম লাগব ১২৬.৩০ টাকা।’ একই সঙ্গে তিনি জানতে চান, গ্রাহক ডলার কিনবেন নাকি বিক্রি করবেন।

এলাকাভেদে ভিন্ন দর
নয়াপল্টনের মতো রাজধানীর অন্য এলাকাতেও ঘোষিত দরের সঙ্গে বাস্তব লেনদেনে কিছুটা পার্থক্য দেখা গেছে। দিলকুশার ‘এসোসিয়েটেড মানি চেঞ্জার’ এবং ‘গ্লোরী মানি এক্সচেঞ্জ লিমিটেড’-এ প্রতি ডলার ১২৬ টাকা ৫০ পয়সা দরে বিক্রি করতে দেখা গেছে। অন্যদিকে গুলশানের ‘বিকেবি মানি এক্সচেঞ্জ প্রাইভেট লিমিটেড’-এ ডলারের বিক্রয়দর ছিল ১২৬ টাকা ৩০ পয়সা। তবে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রয়োজনের সময় তালিকায় উল্লেখ করা দরে ডলার না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে নগদ ডলারের চাহিদা থাকলে অনেক গ্রাহককে নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশি অর্থ দিতে হচ্ছে। এমসিএবির নির্ধারিত দরের বাইরে ডলার বিক্রির বিষয়ে সংগঠনটির মহাসচিব প্রকৌশলী গৌতম দে বলেন, ‘আমাদের সদস্যরা নির্ধারিত ক্রয়মূল্য ১২৫ টাকা ৫০ পয়সা এবং বিক্রয়মূল্য ১২৬ টাকা ৫০ পয়সাতেই লেনদেন করছে।’ তার বক্তব্যের সঙ্গে সরেজমিনে পাওয়া বাজারচিত্রের পার্থক্যই এখন প্রশ্ন তৈরি করেছে—তাহলে নির্ধারিত দরের বাইরে অতিরিক্ত দামে ডলার বিক্রি হচ্ছে কোথায় এবং কারা করছে?

ব্যাংকে ১২৫, খোলাবাজারে ১২৭.৫০
ডলারের বাজারে এই ব্যবধান আরও স্পষ্ট হয় ব্যাংকের দরের সঙ্গে তুলনা করলে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২ সেপ্টেম্বর আন্তঃব্যাংক বাজারে প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৭৯ পয়সা দরে লেনদেন হয়েছে। একই দিনে ব্যাংকগুলো নগদ ডলার সর্বোচ্চ ১২৫ টাকা দরে বিক্রি করেছে। বেসরকারি খাতের দ্য সিটি ব্যাংকের তথ্যও একই চিত্র দেখায়। ব্যাংকটি ১২৩ টাকা ৭৫ পয়সা দরে ডলার কিনে নগদ ডলার বিক্রি করেছে ১২৫ টাকা দরে। অর্থাৎ ব্যাংক থেকে বৈধভাবে নগদ ডলার কেনার সুযোগ থাকলেও বাস্তবে পর্যাপ্ত ডলার না পাওয়ার কারণে অনেক গ্রাহককে খোলাবাজারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। আর সেখানেই তৈরি হচ্ছে অতিরিক্ত দামের চাপ। খোলাবাজারে সর্বোচ্চ ১২৭ টাকা ৫০ পয়সা দরে ডলার কিনলে ব্যাংকের সর্বোচ্চ বিক্রয়দর ১২৫ টাকার তুলনায় প্রতি ডলারে গ্রাহকের বাড়তি খরচ হচ্ছে ২ টাকা ৫০ পয়সা। বড় অঙ্কের ডলার কেনার ক্ষেত্রে এই পার্থক্য দাঁড়াচ্ছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে।

চাহিদার চাপেই কি বাড়তি দর?
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ কেউ মনে করছেন, ব্যাংকগুলো প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত নগদ ডলার দিতে না চাওয়ায় খোলাবাজারের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। ফলে সেখানে নগদ ডলারের চাহিদা বাড়ছে এবং সেই সুযোগে কোনো কোনো মানি চেঞ্জার বাড়তি দামে ডলার বিক্রি করছে। তবে বাজারে ডলারের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে চাহিদা ও সরবরাহের বিষয়টিকেই গুরুত্ব দিচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক এক্সচেঞ্জ রেটের ওপর কোনো নির্দেশনা দেবে না। কারণ বাজারে ডলারের দাম চাহিদা ও সরবরাহের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে। তবে কেউ কারসাজি করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ফলে এখন মূল নজর থাকবে বাজারে ডলারের প্রকৃত সরবরাহ, মানি চেঞ্জারগুলোর লেনদেন এবং ঘোষিত দরের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার বিষয়টির ওপর। ডলারের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা না থাকলেও ঘোষিত দর ও বাস্তব লেনদেনের মধ্যে এই পার্থক্য সাধারণ গ্রাহকের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে যারা চিকিৎসা, শিক্ষা, ভ্রমণ কিংবা জরুরি প্রয়োজনে নগদ ডলার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন, তাদেরই দিতে হচ্ছে অতিরিক্ত অর্থ। বাজারে ডলারের দাম চাহিদা-সরবরাহের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে—বাংলাদেশ ব্যাংকের এই অবস্থান স্পষ্ট। তবে সেই বাজারে নির্ধারিত নিয়ম মানা হচ্ছে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কারসাজি হলে ব্যবস্থা নেওয়ার যে সতর্কবার্তা কেন্দ্রীয় ব্যাংক দিয়েছে, তার বাস্তব প্রয়োগই পারে ঘোষিত দর আর গ্রাহকের পকেট থেকে বেরিয়ে যাওয়া দামের ব্যবধান কমাতে।

কালের আলো/এম/এএইচ

ট্রাম্পের চিঠি: বোয়িংয়ের আড়ালে বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণ

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড. একেএম শামছুল ইসলাম, পিএসসি, জি (অব.)
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:৪১ অপরাহ্ণ
ট্রাম্পের চিঠি: বোয়িংয়ের আড়ালে বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণ

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দেয়া সাম্প্রতিক চিঠিটি আকারে ছোট হলেও এর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তাৎপর্য বেশ গভীর। চিঠির তাৎক্ষণিক কারণ বাংলাদেশের বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত। কিন্তু এর ভাষা ও সময় বিবেচনা করলে এটি কেবল একটি বাণিজ্যিক লেনদেনের জন্য ধন্যবাদজ্ঞাপন নয়; বরং বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সম্ভাব্য নতুন গতিপথের একটি গুরুত্বপূর্ণ সবুজ সংকেত।

ডোনাল্ড ট্রাম্প চিঠিতে বোয়িং কেনার সিদ্ধান্তের জন্য জনাব তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন এবং বলেছেন, “Boeing will not let you down, and I will not forget।” এরপর বাংলাদেশের জনগণের প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা বলেছেন।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হলো, মার্কিন প্রেসিডেন্ট অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ একজন রাষ্ট্রপ্রধানের এমন ব্যক্তিগত বার্তা তাই নিছক প্রটোকল নয়; এর মধ্যে রাজনৈতিক আস্থা এবং ভবিষ্যৎ উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের ইঙ্গিত রয়েছে।

বোয়িং যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান। একটি বড় বিমান ক্রয় শুধু উড়োজাহাজ কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার সম্পর্ক তৈরি হয়। ফলে এ ধরনের চুক্তি দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে দীর্ঘস্থায়ী করার সুযোগ সৃষ্টি করে। তবে এর সম্ভাবনা শুধু বিমান ক্রয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বোয়িং-এর সঙ্গে সম্পর্ককে Aviation Maintenance, Repair and Overhaul (MRO), প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তি এবং Aerospace-Related Supply Chain-এ বাংলাদেশের অংশগ্রহণের সুযোগ হিসেবেও কাজে লাগানো যেতে পারে। অর্থাৎ চুক্তিটির দীর্ঘমেয়াদি মূল্য নির্ভর করবে এটি বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্বে কতটা রূপ নেয় তার ওপর।

তবে চিঠিটির প্রকৃত তাৎপর্য বোঝার জন্য বাংলাদেশের বর্তমান ভূরাজনৈতিক অবস্থান বিবেচনা করা জরুরি।

বাংলাদেশ এমন এক অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত প্রতিযোগিতার প্রভাব সরাসরি পড়তে পারে। বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগরীয় যোগাযোগ, আঞ্চলিক বাণিজ্য, বন্দর, সমুদ্রপথ এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তার কারণে বাংলাদেশের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। ফলে ঢাকা এখন শুধু একটি আঞ্চলিক রাষ্ট্র নয়; বৃহত্তর Indo-Pacific ভূরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অবকাঠামো, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক দীর্ঘদিনের এবং সাম্প্রতিক সময়ে তা আরও বিস্তৃত হয়েছে। বাংলাদেশের উন্নয়ন অবকাঠামো, শিল্প, যোগাযোগ ও বিভিন্ন প্রকল্পে চীনা সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি বাজার এবং প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সম্ভাব্য বড় অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র। ফলে বাংলাদেশের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো এই দুই বৃহৎ শক্তির সঙ্গে সম্পর্ককে পরস্পরবিরোধী না করে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালনা করা।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর এবং একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার উদ্যোগের পাশাপাশি ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই চিঠি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনে-বাংলাদেশ সম্ভবত ‘Multi-alignment’ বা বহুমুখী কৌশলগত ভারসাম্যের পথে এগোচ্ছে। এর অর্থ কোনো একটি পক্ষকে বেছে নেওয়া নয়; বরং বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সহযোগিতা করে বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।

এদিকে, চীন–যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতা যতো বাড়ছে, বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রগুলোর কৌশলগত গুরুত্বও ততো বাড়ছে। ওয়াশিংটন স্বাভাবিকভাবেই চাইবে Indo-Pacific অঞ্চলে চীনের প্রভাব যেন একচেটিয়া না হয়। অন্যদিকে বেইজিংও বাংলাদেশের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানের দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর করতে আগ্রহী। এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমান নীতি হতে পারে কারও প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে উভয়ের সঙ্গে স্বার্থভিত্তিক সহযোগিতা করা।

এখানেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের চিঠির তাৎপর্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক যখন নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে, তখন মার্কিন প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে বোয়িং কেনার জন্য ব্যক্তিগত ধন্যবাদ, বাংলাদেশের নেতৃত্বের প্রশংসা এবং জনাব তারেক রহমানের সঙ্গে অদূর ভবিষ্যতে সাক্ষাতের আগ্রহ— সব মিলিয়ে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করার আগ্রহের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে এটিকে বাংলাদেশকে চীনের বিপরীতে দাঁড় করানোর সরাসরি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা অতিরঞ্জিত হবে। বরং এটি দেখায় যে, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে দুই বৃহৎ শক্তির আগ্রহ বাড়ছে।

চিঠিতে জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রশংসাও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের নতুন সরকারের জন্য আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রকাশ্য ইতিবাচক মন্তব্য সরকারের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি শক্তিশালী করতে পারে। তবে এটিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের আনুষ্ঠানিক সমর্থন হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। বরং এটি নতুন সরকারের সঙ্গে ওয়াশিংটনের ইতিবাচক সম্পর্ক তৈরির একটি রাজনৈতিক সংকেত হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিযুক্ত।

চিঠির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হলো সম্ভাব্য সাক্ষাতের কথা। ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তারেক রহমানের সরাসরি বৈঠক হলে সেটি দুই দেশের সম্পর্ককে আরও উচ্চপর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। সেখানে শুধু বোয়িং নয়, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা, রোহিঙ্গা সংকট এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মতো বিষয় আলোচনায় আসতে পারে। বাংলাদেশের উচিত হবে এমন বৈঠককে সৌজন্য সাক্ষাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সুস্পষ্ট অর্থনৈতিক ও কৌশলগত Agenda সামনে রাখা।

বিশেষ করে বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করার সুযোগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও বাজারকে বাংলাদেশের শিল্পায়ন, দক্ষ জনশক্তি এবং উচ্চমূল্যের রপ্তানি খাত সম্প্রসারণের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে সম্পর্কটি শুধু পণ্য আমদানি-রপ্তানির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি Economic Partnership-এ রূপ নিতে পারে।

প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের সামনে বড় সুযোগ রয়েছে। আধুনিকায়নের জন্য বাংলাদেশকে বিভিন্ন দেশের প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম বিবেচনা করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ইউরোপসহ সব পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে প্রতিযোগিতামূলকভাবে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহ করলে বাংলাদেশের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়বে এবং কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি কমবে। একই সঙ্গে প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদী সরবরাহ-নিরাপত্তাকেও সিদ্ধান্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ করতে হবে।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতাকে নিজের উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করা। চীন থেকে অবকাঠামো ও শিল্প সহযোগিতা, যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও বাজার সুবিধা এবং ইউরোপ, জাপান ও অন্যান্য অংশীদারের কাছ থেকে উন্নত প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ – এ সবকিছুকে একটি সমন্বিত জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের আওতায় আনা সম্ভব।

তবে এই নীতি বাস্তবায়নের জন্য সূক্ষ্ম কূটনৈতিক ভারসাম্য প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা চীনের উদ্বেগ বাড়াতে পারে, আবার চীনের সঙ্গে অতিরিক্ত সামরিক বা কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা যুক্তরাষ্ট্রের সন্দেহ সৃষ্টি করতে পারে। তাই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত কোনো শক্তির পক্ষে অবস্থান নয়, বরং কৌশলগত স্বাধীনতা এবং জাতীয় স্বার্থ।

এই নীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ব্যক্তিগত সম্পর্কের পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক গড়ে তোলা। ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তারেক রহমানের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ইতিবাচক হলেও সেটি যেনো দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের একমাত্র ভিত্তি না হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন পরিবর্তিত হতে পারে, তাই কংগ্রেস, স্টেট ডিপার্টমেন্ট, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত মহলসহ বিভিন্ন স্তরে বাংলাদেশের সম্পর্ক গভীর করা প্রয়োজন।

একইভাবে চীনের সঙ্গেও সম্পর্ককে শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্বের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না রেখে অর্থনীতি, শিল্প, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও অবকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতায় পরিণত করা প্রয়োজন। এতে সরকার পরিবর্তন বা আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন হলেও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তি স্থিতিশীল থাকবে।

সব মিলিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চিঠিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মৌলিক পরিবর্তনের ঘোষণা বলা যাবে না। বোয়িং ক্রয়ও একা যুক্তরাষ্ট্রের দিকে বাংলাদেশের কৌশলগত ঝুঁকে পড়ার প্রমাণ নয়। বরং এটি এমন একটি সময়ে দুই দেশের সম্পর্কের ইতিবাচক গতিপথের সংকেত, যখন বাংলাদেশ একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে তার দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব বজায় রেখে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করছে।

চিঠির মূল তাৎপর্য তাই বোয়িংয়ের বাইরে। এটি দেখাচ্ছে যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, ভৌগোলিক অবস্থান এবং আঞ্চলিক গুরুত্ব যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের কাছে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও ওয়াশিংটনের কাছে ঢাকার কৌশলগত মূল্য বাড়াচ্ছে।

সফল কূটনীতি হবে সেটিই, যেখানে বাংলাদেশ কারও প্রতিপক্ষ না হয়ে সবার সঙ্গে কাজ করবে, কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা যেমন চীনের বিরুদ্ধে হওয়া উচিত নয়, তেমনি চীনের সঙ্গে সহযোগিতাও যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী হওয়ার প্রয়োজন নেই।

বাংলাদেশের প্রতিটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের চূড়ান্ত মানদণ্ড হওয়া উচিত দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থ।

বর্তমানে বহুমেরু (Multipolar) বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে তার ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান– কোনো একক শক্তির অনুসারী নয়, বরং নিজের জাতীয় স্বার্থে বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সহযোগিতায় সক্ষম একটি স্বাধীন রাষ্ট্র।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের চিঠি তাই শেষ কথা নয়, বরং একটি সম্ভাব্য নতুন অধ্যায়ের সূচনা। বোয়িং দিয়ে যে কথোপকথন শুরু হয়েছে, সেটি যদি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সহযোগিতায় বিস্তৃত করা যায়, তাহলে এই ছোট চিঠিটিই ভবিষ্যতে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

লেখক : মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড. একেএম শামছুল ইসলাম, পিএসসি, জি (অব.)।