ক্যালিফোর্নিয়ায় ছিল রাশিয়ার উপনিবেশ, আজও দাঁড়িয়ে ফোর্ট রস
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে আজও দাঁড়িয়ে আছে রাশিয়ার এক বিস্মৃত উপনিবেশের স্মৃতি—ফোর্ট রস। ১৮১২ থেকে ১৮৪২ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩০ বছর এই অঞ্চলের একটি অংশ রুশ সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। সেই সময় এটি ‘রাশিয়ান আমেরিকা’র অংশ হিসেবে পরিচালিত হতো। সোনোমা থেকে সান ফ্রান্সিসকোর দিকে প্রায় দুই ঘণ্টার পথ এগোলেই দেখা মেলে ছোট্ট একটি অর্থোডক্স গির্জা ও কাঠের দুর্গসদৃশ স্থাপনার। রুশ ভাষায় যার নাম ‘ক্রেপস্ত রস’।
আলাস্কার খাদ্যসংকট থেকেই ক্যালিফোর্নিয়ায় রুশদের আগমন
১৬০০ ও ১৭০০-এর দশকে রুশ পশম ব্যবসায়ীরা সাইবেরিয়া পেরিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলে পৌঁছান। পরে আলাস্কায় রুশ বসতি গড়ে ওঠে। তবে সেখানে কৃষিকাজ কঠিন হওয়ায় খাদ্যসংকট ছিল বড় সমস্যা। ১৮০৬ সালে রুশ-আমেরিকান কোম্পানির পরিচালক নিকোলাই রেজানোভ সান ফ্রান্সিসকো উপসাগরে আসেন। আলাস্কার খাদ্যসংকট মোকাবিলায় ক্যালিফোর্নিয়ার উষ্ণ ও কৃষির উপযোগী পরিবেশ তাঁকে আকৃষ্ট করে। এরপর উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ায় স্থায়ী ঘাঁটি তৈরির পরিকল্পনা নেয় রুশরা। ১৮১২ সালে তৈরি হয় ফোর্ট রস। শুরুতে সেখানে ২৫ জন রুশ ও প্রায় ৮০ জন স্থানীয় আলাস্কান শিকারি ছিলেন।
বহুজাতিক জনপদে পরিণত হয়েছিল ফোর্ট রস
সময়ের সঙ্গে ফোর্ট রস শুধু সামরিক ঘাঁটি না থেকে বহুজাতিক বাণিজ্যিক ও উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত হয়। ১৮৩০-এর দশকে সেখানে প্রায় ৪০০ মানুষ বসবাস করতেন। রুশ ও আলাস্কানদের পাশাপাশি স্থানীয় কাশায়া পোমো ও কোস্ট মিউক জনগোষ্ঠীর মানুষও সেখানে বসবাস করতেন। বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিয়ে ও পারিবারিক সম্পর্কও গড়ে উঠেছিল। ফিনল্যান্ড ও হাওয়াই থেকেও দক্ষ কারিগরেরা সেখানে কাজ করতে আসতেন।
জাহাজ, কাচ ও ইট তৈরির কেন্দ্র
ফোর্ট রসে কৃষির পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের উৎপাদন কর্মকাণ্ড চলত। এখানে ক্যালিফোর্নিয়ার প্রথম সমুদ্রগামী জাহাজ নির্মিত হয়। তৈরি করা হতো ইট ও কাচ। ছিল বাতাসচালিত কলও। ক্যালিফোর্নিয়ার ওয়াইন শিল্পের ইতিহাসেও ফোর্ট রসের নাম রয়েছে। ১৮১৭ সালে বর্তমান সোনোমা কাউন্টিতে রুশরা প্রথম আঙুরগাছ রোপণ করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয় আঙুর দিয়ে তারা অল্প পরিমাণে ওয়াইনও তৈরি করত।
কেন টিকল না রুশ উপনিবেশ?
বাণিজ্যিক ও কৃষি কর্মকাণ্ড চললেও ফোর্ট রস শেষ পর্যন্ত রুশদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। এটি যথেষ্ট লাভজনক হয়ে ওঠেনি এবং আলাস্কার বসতিগুলোতেও পর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি। অতিরিক্ত শিকারের কারণে সমুদ্রভোঁদড়ের সংখ্যা কমে যায়। পাশাপাশি উপকূলের কুয়াশা ও ইঁদুরের উপদ্রবে কৃষি উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হয়। ১৮৩৯ সালে হাডসনস বে কোম্পানি রুশ আলাস্কায় খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহে রাজি হলে ক্যালিফোর্নিয়ায় রুশ কৃষি ও উৎপাদনকেন্দ্র রাখার প্রয়োজন আরও কমে যায়। ১৮৪১ সালে সুইস অভিবাসী জন সাটার রুশদের কাছ থেকে ফোর্ট রসের ভবন ও অন্যান্য সম্পদ কিনে নেন। এর মধ্য দিয়েই ক্যালিফোর্নিয়ায় রুশ উপনিবেশের অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।
ইতিহাসের পাতায় রয়ে গেছে রুশদের ছাপ
রুশরা চলে গেলেও ফোর্ট রস ও আশপাশের অঞ্চলে তাদের উপস্থিতির চিহ্ন রয়ে গেছে। সান ফ্রান্সিসকোর রুশ হিল, রুশ রিভার ও বডেগা বে—এসব নামেও সেই ইতিহাসের প্রতিফলন দেখা যায়। আজ ফোর্ট রস তুলনামূলক নির্জন হলেও কাঠের দুর্গ, অর্থোডক্স গির্জা ও পুরোনো স্থাপনাগুলো ক্যালিফোর্নিয়ার ইতিহাসের এক বিস্মৃত অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে আছে। প্রায় দুই শতাব্দী আগে ক্যালিফোর্নিয়ার এই উপকূলে রাশিয়ার যে ছোট্ট উপনিবেশ গড়ে উঠেছিল, তার গল্প আজও ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে এক বিস্ময়কর অধ্যায়।
কালের আলো/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
Array