এক রাতের ভাবনা থেকে শেকৃবিতে ফিল্ম সোসাইটির জন্ম
রাত তখন গভীর। সিনেমা দেখা শেষ, কিন্তু ভাবনা থামছে না। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফারহা তাহসিনের মনে হচ্ছিল, সিনেমা শুধু একা বসে দেখার বিষয় নয়। সিনেমা নিয়ে আলোচনা, নির্মাণের পেছনের গল্প জানা এবং নিজের ভাবনা অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়াও সিনেমা উপভোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সেই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ফিল্ম সোসাইটি (এসএইউএফএস)। ফারহা তাহসিন সংগঠনটির সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক।
কৃষিভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিল্ম সোসাইটি কেন—শুরুতেই এমন প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছিল তাঁদের। কথায় বোঝাতে না পেরে কাজ দিয়েই নিজেদের উদ্দেশ্য প্রমাণ করার সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা। নবীনবরণ উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করেন সংগঠনের কোর সদস্যরা। এরপর প্রশাসনের কাছ থেকে সংগঠন পরিচালনার অনুমতি মেলে।
শুরুতে লক্ষ্য ছিল খুব সাধারণ—বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যেন একসঙ্গে বড় পর্দায় ভালো সিনেমা দেখতে পারেন এবং সিনেমা নিয়ে আলোচনা করার একটি জায়গা পান।
প্রথম প্রদর্শনী থেকেই সাড়া
প্রথম প্রদর্শনীর দিনই বড় পরীক্ষা দিতে হয় সংগঠনটিকে। ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের মিলনায়তনে বড় পর্দা, পপকর্ন, পানি ও আসন ব্যবস্থার আয়োজন করা হয়। প্রদর্শিত হয় রায়হান রাফীর ‘তাণ্ডব’ ও তানিম নূরের ‘উৎসব’। এতে অংশ নেন প্রায় সাড়ে সাত শ শিক্ষার্থী ও শিক্ষক।
এরপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে সংগঠনের কার্যক্রম। প্রতি বৃহস্পতিবার নিয়মিত মিটিং, চিত্রনাট্য লেখা, চিত্রধারণ ও সম্পাদনার কর্মশালা আয়োজনের পাশাপাশি শুরু হয় ফ্ল্যাগশিপ আয়োজন ‘চলচ্চিত্র উৎসব’। এরই মধ্যে দুটি উৎসব আয়োজন করেছে এসএইউএফএস।
‘চলচ্চিত্র উৎসব ২.০’-তে অতিথি হিসেবে এসেছিলেন রেদওয়ান রনি, রায়হান রাফী ও খন্দকার সুমনের মতো নির্মাতারা। উৎসবে ‘সাঁতাও’ সিনেমা নিয়ে খন্দকার সুমনের একটি মন্তব্যও সদস্যদের মনে দাগ কাটে। তাঁর মতে, সিনেমাটি নির্মাণের বহু বছর পর যেন মাটি ও কৃষির সঙ্গে যুক্ত মানুষের কাছে নিজের আসল জায়গায় পৌঁছেছে।
দর্শক থেকে নির্মাতা
এসএইউএফএসের কাজ শুধু সিনেমা প্রদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সংগঠনের সদস্যরা এখন নিজেরাই চিত্রনাট্য লেখা, শুটিং ও সম্পাদনার মতো কাজ শিখছেন।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ও সহপ্রতিষ্ঠাতা নওশিন মাইশার চোখে পরিবর্তনটা সবচেয়ে স্পষ্ট হয় তখন, যখন কেউ প্রথমে শুধু সিনেমা দেখতে আসে, পরে সিনেমাটোগ্রাফি, চরিত্র নির্মাণ কিংবা গল্প বলার ধরন নিয়ে আলোচনা শুরু করে।
সভাপতি ও সহপ্রতিষ্ঠাতা মো. আল আমিনও সংগঠনের সক্রিয় সদস্য। তিনি ‘তাণ্ডব’ সিনেমার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সংগঠনের একাংশ ‘দম’ চলচ্চিত্রেও কাজ করেছে।
এসএইউএফএস ইতিমধ্যে কাজের স্বীকৃতিও পেয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও ইউনেসকো আয়োজিত ‘লেটস টক ওয়েলবিয়িং’ ভিডিও প্রতিযোগিতায় ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়কে পেছনে ফেলে প্রথম হয় সংগঠনটি। জাতীয় চলচ্চিত্র সংসদ সম্মেলন ২০২৬-এ অংশ নেওয়ার পাশাপাশি জাতীয় চলচ্চিত্র আর্কাইভের কর্মশালাতেও যুক্ত হয়েছে তারা।
সীমাবদ্ধতার মধ্যেও স্বপ্ন
বড় আয়োজন করতে প্রয়োজন বড় বাজেট। কিন্তু পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে অনেক সময় নিজেদের পরিকল্পনা ছোট করতে হয়েছে সদস্যদের। কখনো মাসিক চাঁদা, কখনো শিক্ষকদের অনুদান, আবার কখনো নিজেদের পকেটের টাকা দিয়েই আয়োজন করতে হয়েছে বিভিন্ন অনুষ্ঠান।
তবু থামতে চান না তাঁরা। আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে এসএইউএফএসকে দেশের অন্যতম সক্রিয় ফিল্ম সোসাইটি হিসেবে দেখতে চান আল আমিন। জাতীয় পর্যায়ে একটি চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজনের স্বপ্নও রয়েছে তাঁদের।
নওশিনের কাছে অবশ্য এই সংগঠনের সাফল্য শুধু পুরস্কার বা দর্শকসংখ্যায় মাপার বিষয় নয়। তাঁর ভাষায়, এটি এমন একটি জায়গা, যেখানে একজন মানুষ নিজের গল্প বলার সাহস পাবে।
কালের আলো/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
Array