প্রার্থনা থেকে প্রাঙ্গণ—উন্নয়নের আওতায় ৫৩ হাজার স্থাপনা
একটি এলাকার উন্নয়ন শুধু সড়ক, সেতু কিংবা বিদ্যুৎ অবকাঠামোর হিসাবেই মাপা যায় না। মানুষের সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনের সঙ্গে যুক্ত স্থানগুলোও স্থানীয় জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেই বিবেচনায় দেশের ৬৪ জেলার সব উপজেলায় সামাজিক ও ধর্মীয় অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন করে বড় বিনিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
- মসজিদ, মন্দির, চার্চ, প্যাগোডা, কবরস্থান ও ঈদগাহে অবকাঠামোগত উন্নয়নে বড় সরকারি উদ্যোগ
- ৬৪ জেলার উপজেলা পর্যায়ে ছড়াবে উন্নয়নের পরিধি
- উপজেলা পর্যায়ে সামাজিক ও ধর্মীয় অবকাঠামো উন্নয়নে ২,৫৯০ কোটি টাকার প্রকল্প
প্রস্তাবিত ‘সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন’ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা। এর আওতায় কবরস্থান, শ্মশান, মসজিদ, মন্দির, চার্চ, প্যাগোডা, গুরুদুয়ারা ও ঈদগাহসহ ৫৩ হাজার সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন, সংস্কার ও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) মাধ্যমে বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা প্রকল্পটির পুরো অর্থই সরকারি অর্থায়নে দেওয়ার কথা।
উন্নয়নের পরিধি যাবে প্রান্তিক জনপদেও
প্রকল্পটির বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর ভৌগোলিক বিস্তৃতি। দেশের আট বিভাগের ৬৪ জেলার সব উপজেলা এতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে। সিটি করপোরেশন এলাকা এর বাইরে রাখা হলেও উপজেলা পর্যায়ে প্রকল্পটির বিস্তৃতি স্থানীয় জনপদে সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
গ্রামীণ ও উপজেলা পর্যায়ের অনেক সামাজিক-ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে সীমিত অবকাঠামো নিয়ে কার্যক্রম চালায়। কোথাও সীমানাপ্রাচীর প্রয়োজন, কোথাও সংস্কার, আবার কোথাও মানুষের সমাগমের উপযোগী জায়গার ঘাটতি রয়েছে। পরিকল্পিতভাবে এসব প্রয়োজন চিহ্নিত করা গেলে প্রকল্পের অর্থ স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
অবকাঠামোর সঙ্গে সম্প্রীতির লক্ষ্য
প্রকল্প প্রস্তাবে শুধু স্থাপনা নির্মাণ বা সংস্কারকে লক্ষ্য হিসেবে রাখা হয়নি। স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক কল্যাণ, ধর্মীয় চেতনা ও সম্প্রীতি সুসংহত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। সামাজিক সমাবেশ, ধর্মীয় আচার ও বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি হলে এসব প্রতিষ্ঠান স্থানীয় মানুষের মিলনস্থল হিসেবেও ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের নিজস্ব উপাসনালয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান উন্নত হলে পারস্পরিক সহাবস্থান ও সম্প্রীতির পরিবেশ শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এদিক থেকে প্রকল্পটির গুরুত্ব কেবল অবকাঠামোগত নয়। স্থানীয় সামাজিক পরিসরকে আরও সক্রিয় করার সম্ভাবনাও এতে রয়েছে।
৫৩ হাজার স্থাপনায় বড় কর্মযজ্ঞ
প্রকল্পের আওতায় ৫৩ হাজার স্থাপনা উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা নিঃসন্দেহে বড় পরিসরের কর্মযজ্ঞ। এর মাধ্যমে নির্মাণ ও সংস্কারকাজে স্থানীয় পর্যায়ে স্বল্পমেয়াদি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে উন্নত অবকাঠামো দীর্ঘমেয়াদে সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের ব্যবহারিক সুবিধা বাড়াতে পারে।
তবে এত বড় সংখ্যক প্রতিষ্ঠানকে প্রকল্পের আওতায় আনতে হলে অগ্রাধিকার নির্ধারণ হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোন প্রতিষ্ঠানে অবকাঠামোগত ঘাটতি বেশি, কোথায় মানুষের ব্যবহার বেশি এবং কোথায় সরকারি সহায়তার প্রয়োজন সবচেয়ে জরুরি—এসব সূচক অনুসরণ করে নির্বাচন করা হলে বিনিয়োগের সুফলও বেশি বিস্তৃত হতে পারে।
বাছাইয়ে স্বচ্ছতার ওপর জোর
প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির পর্যবেক্ষণে প্রতিষ্ঠান বাছাইয়ের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। জনস্বার্থ ও বাস্তব প্রয়োজনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠান নির্বাচন এবং কোনো ব্যক্তিগত বা পারিবারিক প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একইভাবে আগে সরকারি সহায়তা পাওয়া প্রতিষ্ঠানকে নতুন করে বরাদ্দ না দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাবের বদলে প্রয়োজনভিত্তিক নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারলে প্রকল্পটির সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। একই সঙ্গে এলাকাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা ডিপিপিতে যুক্ত করার নির্দেশনা বাস্তবায়ন হলে প্রকল্পের আওতা ও বরাদ্দ সম্পর্কে স্বচ্ছতাও বাড়তে পারে।
সৌন্দর্য নয়, প্রয়োজনই হোক অগ্রাধিকার
পরিকল্পনা কমিশন আরও স্পষ্ট করেছে, প্রকল্পের অর্থ সীমানাপ্রাচীরে টাইলস বসানো, বাইরের দেয়াল সাজানো কিংবা ফটক দৃষ্টিনন্দন করার মতো সৌন্দর্যবর্ধনমূলক কাজে ব্যবহার করা যাবে না। অর্থাৎ সীমিত সরকারি সম্পদকে দৃশ্যমান সাজসজ্জার বদলে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
একই সঙ্গে সফটওয়্যার, যানবাহন, প্রচার, ভ্রমণসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক খাতের ব্যয় পুনর্বিবেচনার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। এতে প্রকল্পের মূল লক্ষ্য—সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন—আরও স্পষ্টভাবে অগ্রাধিকার পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
পুরোনোর অভিজ্ঞতা, নতুন প্রকল্পে শিক্ষা
নতুন প্রকল্পটির সঙ্গে চলমান ‘সর্বজনীন সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন-২’ প্রকল্পের মিল রয়েছে। তাই পুরোনো প্রকল্পের বাস্তবায়ন অভিজ্ঞতা নতুন উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হিসেবে কাজ করতে পারে। চলমান প্রকল্পটির জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত অগ্রগতি ৪৪ দশমিক ০৪ শতাংশ হওয়ায় এর ধীরগতির কারণ পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।
নতুন প্রকল্পের সফলতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে প্রয়োজনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন, স্বচ্ছ বরাদ্দ, সময়মতো বাস্তবায়ন এবং ব্যয়ের কঠোর নজরদারির ওপর। এসব বিষয় নিশ্চিত করা গেলে ২ হাজার ৫৯০ কোটি টাকার বিনিয়োগ শুধু হাজার হাজার সামাজিক ও ধর্মীয় স্থাপনার অবকাঠামো বদলাবে না; স্থানীয় পর্যায়ে মানুষের মিলন, সামাজিক অংশগ্রহণ ও সম্প্রীতির পরিসরও আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি করবে।
এম/এএইচ

আপনার মতামত লিখুন
Array