অপরাধের ঢেউ, পুলিশের ভেতরে নতুন হিসাব
অপরাধীর চোখে পুলিশের ভয় কমেছে। আর সাধারণ মানুষের চোখে কমেছে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সাম্প্রতিক চিত্র পর্যালোচনা করতে গিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের মর্নিং মিটিংয়ে এমন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা। তাঁদের আলোচনায় উঠে এসেছে চাঁদাবাজি, মাদক, সন্ত্রাস, জমি দখল, কিশোর গ্যাং থেকে শুরু করে একের পর এক সহিংস ঘটনার চিত্র। একই সঙ্গে উঠে এসেছে পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা ফেরানোর তাগিদ।
- সদর দপ্তরের বৈঠকে সাম্প্রতিক অপরাধের চিত্র নিয়ে তীব্র উদ্বেগ
- চাঁদাবাজি-মাদক-সন্ত্রাস ঠেকাতে কঠোর পদক্ষেপের আলোচনা
- ডিটেনশন ও প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিংয়ে জোর
মঙ্গলবারের (২৯ সেপ্টেম্বর) ওই বৈঠকে অপরাধ দমনে বিদ্যমান আইনি সীমাবদ্ধতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়। ‘ক্রসফায়ার’ না থাকায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অপরাধীদের ডিটেনশনে নেওয়ার প্রস্তাব আসে। দ্রুত জামিন পাওয়া আসামিদের ক্ষেত্রে তদন্তের দুর্বলতা চিহ্নিত করার পাশাপাশি মাদক নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ভূমিকা বাড়ানোর পরামর্শও দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পুলিশের গোপনীয় শাখার উদ্যোগে আয়োজিত সভায় সভাপতিত্ব করেন আইজিপি আলী হোসেন ফকির। উপস্থিত ছিলেন সব অতিরিক্ত আইজিপি, বিভিন্ন ইউনিটপ্রধান, ডিআইজি (ক্রাইম), ডিআইজি (প্রশাসন)সহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
বৈঠকের টেবিলে উঠে এল ‘ডিটেনশন’ প্রস্তাব
অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে কীভাবে আরও কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায়, আলোচনার একটি বড় অংশজুড়ে ছিল সেই প্রশ্ন। অতিরিক্ত আইজিপি (এইচআরএম) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে ‘ক্রসফায়ার’ নেই। তাই বিশেষ ক্ষমতা আইনের আওতায় অপরাধীদের ডিটেনশনে নেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
তবে ঢালাও আটকের বদলে সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পক্ষে মত দেন রেলওয়ে পুলিশের প্রধান ব্যারিস্টার জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড বা অপরাধে জড়িত থাকার নির্ভরযোগ্য তথ্যের ডেটাবেজ তৈরি করে আইন অনুযায়ী ডিটেনশন দেওয়া উচিত। সিআইডিপ্রধান ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মোশাররফ হোছাইনও ডিটেনশনকে কার্যকর একটি পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনার কথা বলেন।
গ্রেফতারের পরও কেন ফিরে আসে আসামি
পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই অনেক আসামি জামিনে বেরিয়ে আসছেন—বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ প্রকাশ পায়। তবে আলোচনায় উঠে আসে এর ভেতরের আইনি ও তদন্তগত বাস্তবতাও। এক অতিরিক্ত আইজিপি বলেন, আইনি বাধ্যবাধকতার পাশাপাশি তদন্তে দুর্বলতার কারণেও আসামিরা দ্রুত জামিন পাচ্ছেন। অর্থাৎ শুধু গ্রেফতার বাড়ালেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না; মামলার তদন্ত, প্রমাণ সংগ্রহ ও চার্জশিটের মানও বাড়াতে হবে।
রেলওয়ে পুলিশের প্রধান ব্যারিস্টার জিল্লুর রহমান জানান, ফৌজদারি কার্যবিধির নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা বা বিচার শেষ না হলে আসামির জামিনের সুযোগ তৈরি হয়। ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ও সেশন কোর্টে বিচার শেষ করার জন্য নির্ধারিত সময়সীমাও বাস্তবে নানা কারণে রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
মাদক নিয়ে পুলিশের ভেতরেই নতুন ভাবনা
অপরাধের নেপথ্যে মাদকের ভূমিকা নিয়ে প্রায় একমত ছিলেন কর্মকর্তারা। ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, মাদক কেনাবেচা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। মাদক থেকেই বহু অপরাধের জন্ম হচ্ছে। তাই মাদক নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
রেলওয়ে পুলিশের প্রধান ব্যারিস্টার জিল্লুর রহমান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে পুলিশের প্রত্যক্ষ কমান্ড বা অধীনে আনার প্রস্তাব দেন। তাঁর পরামর্শ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে একজন অতিরিক্ত আইজিপিকে ডিএনসির মহাপরিচালক করা যেতে পারে। প্রস্তাবটির মূল যুক্তি—মাদক নিয়ন্ত্রণে পুলিশ মাঠপর্যায়ে যে অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা নিয়ে কাজ করে, সেটিকে আরও সমন্বিতভাবে কাজে লাগানো।
বাইরে চাপ, ভেতরেও ‘কনফিউশন’
প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার সদস্যের বিশাল বাহিনীকে ঘিরে অভ্যন্তরীণ অস্বস্তির কথাও বৈঠকে উঠে আসে। এক অতিরিক্ত আইজিপি বলেন, নানা বিষয়ে সদস্যদের মধ্যে দ্বিধা বা ‘কনফিউশন’ তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অডিও-ভিডিও প্রচার, নানা গুঞ্জন এবং মনস্তাত্ত্বিক চাপের প্রভাব পড়ছে বাহিনীর মনোবলেও।
তাঁর মতে, পুরো পুলিশ বাহিনীকে ‘স্ট্রিমলাইনিং’ বা সুসংগঠিত করা এখন জরুরি। একদিনে অলৌকিক পরিবর্তন আসবে না। স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং নীতিগত সংস্কার প্রয়োজন। এই বক্তব্যে পুলিশের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা ও মনোবলকে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দেখার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
যে ঘটনাগুলো নাড়া দিয়েছে সদর দপ্তরকে
মর্নিং মিটিংয়ে সাম্প্রতিক বেশ কয়েকটি আলোচিত ঘটনাও সামনে আনা হয়। রাড্ডা ম্যাটার্নাল অ্যান্ড চাইল্ড হেলথ-ফ্যামিলি প্ল্যানিং সেন্টারে হামলা, মোহাম্মদপুরে জমি দখলকে কেন্দ্র করে সশস্ত্র মব হামলা, দক্ষিণ মানিকদীতে নিউগিনি প্রোপার্টিজে হামলা, সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে ভাঙচুর এবং আদাবরে বাড়ি দখলের চেষ্টা—এসব ঘটনা নিয়ে আলোচনা হয়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় ২৫ মামলার আসামি মাদক কারবারি ‘পিচ্চি রাজা’র প্রিজনভ্যান থেকে পালিয়ে যাওয়া, চট্টগ্রামে কিশোর গ্যাংয়ের সংঘর্ষ, লালমাইয়ে স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যা, মিরপুরে চলন্ত বাসে অগ্নিসংযোগ এবং ময়মনসিংহ ও নাটোরে জমি দখলকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ। ঘটনাগুলো আলাদা হলেও কর্মকর্তাদের আলোচনায় একটি অভিন্ন প্রশ্নই সামনে আসে—মাঠপর্যায়ে পুলিশের প্রতিরোধমূলক উপস্থিতি কতটা কার্যকর?
সংখ্যার চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে মানুষের আস্থা
বৈঠকে কর্মকর্তারা মনে করেন, শুধু ছিনতাই-ডাকাতির সংখ্যা কিংবা গ্রেফতারের হিসাব দিয়ে পুলিশের সাফল্য মাপলে বাস্তব চিত্র ধরা পড়বে না। এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, পুলিশি সেবার মূল ভিত্তি জনগণের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক। মানুষের অসন্তোষ বা ভুল বোঝাবুঝি কমাতে হলে সরাসরি জনসংযোগ বাড়াতে হবে। পুলিশের কাজের স্বচ্ছতা বাড়লে এবং মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি হলে জনমনে স্বস্তিও ফিরবে। এই জায়গাটিই বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাগুলোর একটি—আইনশৃঙ্খলা শুধু অপরাধী ধরার বিষয় নয়; নাগরিকের মনে নিরাপত্তার অনুভূতি তৈরি করাও পুলিশের দায়িত্বের অংশ।
আইজিপির বার্তা—পরিচয় নয়, অপরাধই বিবেচ্য
মর্নিং মিটিংয়ের পর অনুষ্ঠিত মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভা বা ক্রাইম কনফারেন্সেও অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থানের বার্তা দেন আইজিপি আলী হোসেন ফকির। মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের কঠোরভাবে আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, অপরাধীর দলীয় পরিচয় বিবেচনার কোনো সুযোগ নেই। অপরাধীর একমাত্র পরিচয়—সে অপরাধী। কিশোর অপরাধীদের বিরুদ্ধেও যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নিতে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন তিনি।
গুজব ও অপপ্রচার ঠেকাতে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি দায়িত্ব পালনের সময় পুলিশ সদস্যদের বডি-ওর্ন ক্যামেরার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। অতিরিক্ত আইজি সাইদুর রহমান কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ছায়া আছে কি না, তা খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
সামনে শুধু অপরাধী নয়, আস্থার লড়াইও
পুলিশ সদর দপ্তরের বৈঠকের আলোচনায় যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চ্যালেঞ্জটি একমাত্র অপরাধীর বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তদন্তের দুর্বলতা কাটানো, আইনি প্রক্রিয়াকে কার্যকর করা, মাদক নিয়ন্ত্রণ, বাহিনীর ভেতরের সমন্বয় এবং জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক—সবকিছুকেই একই সূত্রে আনতে হবে।
অপরাধীর কাছে পুলিশের ভয় এবং সাধারণ মানুষের কাছে পুলিশের ওপর আস্থা—দুটিই আইনশৃঙ্খলার নেপথ্য শক্তি। এই দুই জায়গায় ঘাটতি তৈরি হলে অপরাধের বিস্তার ঠেকানো যেমন কঠিন হয়, তেমনি পুলিশের প্রতিটি পদক্ষেপও পড়ে জনআস্থার কঠিন পরীক্ষায়। সদর দপ্তরের টেবিলে সেই পরীক্ষার কথাই এবার সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
কালের আলো/এমএইচ/এমকে

আপনার মতামত লিখুন
Array