খুঁজুন
                               
, ,
           

দরের তালিকা এক, বাজারে ডলারের দাম আরেক

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:০৯ অপরাহ্ণ
দরের তালিকা এক, বাজারে ডলারের দাম আরেক

কাগজে-কলমে এক দর, বাস্তবে আরেক। মানি চেঞ্জার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এমসিএবি) ঘোষণায় খোলাবাজারে প্রতি ডলার বিক্রির সর্বোচ্চ দর ১২৬ টাকা ৫০ পয়সা। কিন্তু রাজধানীর বিভিন্ন মানি চেঞ্জারে সেই দামে ডলার পাওয়া যাচ্ছে না। গ্রাহককে গুনতে হচ্ছে ১২৭ টাকা ১০ পয়সা থেকে ১২৭ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত। অর্থাৎ সংগঠনটির নির্ধারিত দরের চেয়ে প্রতি ডলারে সর্বোচ্চ এক টাকা পর্যন্ত বেশি দিতে হচ্ছে ক্রেতাদের। অবশ্য এমসিএবির দাবি, তাদের সদস্যরা নির্ধারিত দরেই ডলার কেনাবেচা করছেন। ফলে ঘোষিত দর ও বাস্তব বাজারদরের এই ব্যবধান নিয়ে তৈরি হয়েছে এক ধরনের ধোঁয়াশা।

সরেজমিন রাজধানীর নয়াপল্টন, দিলকুশা ও গুলশানের বিভিন্ন মানি চেঞ্জার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল্যতালিকায় ডলারের ক্রয়মূল্য ১২৫ টাকা ৫০ পয়সা এবং বিক্রয়মূল্য ১২৬ টাকা ৫০ পয়সা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু তালিকায় থাকা দরে সব জায়গায় ডলার কিনতে পারছেন না গ্রাহক। নয়াপল্টনের ‘মন্ডাইল মানি এক্সচেঞ্জ’-এর মূল্যতালিকাতেও ডলারের ক্রয়মূল্য ১২৫ টাকা ৫০ পয়সা এবং বিক্রয়মূল্য ১২৬ টাকা ৫০ পয়সা লেখা রয়েছে। তবে ডলারের দাম জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় প্রতিনিধি জানান, ‘দাম লাগব ১২৬.৩০ টাকা।’ একই সঙ্গে তিনি জানতে চান, গ্রাহক ডলার কিনবেন নাকি বিক্রি করবেন।

এলাকাভেদে ভিন্ন দর
নয়াপল্টনের মতো রাজধানীর অন্য এলাকাতেও ঘোষিত দরের সঙ্গে বাস্তব লেনদেনে কিছুটা পার্থক্য দেখা গেছে। দিলকুশার ‘এসোসিয়েটেড মানি চেঞ্জার’ এবং ‘গ্লোরী মানি এক্সচেঞ্জ লিমিটেড’-এ প্রতি ডলার ১২৬ টাকা ৫০ পয়সা দরে বিক্রি করতে দেখা গেছে। অন্যদিকে গুলশানের ‘বিকেবি মানি এক্সচেঞ্জ প্রাইভেট লিমিটেড’-এ ডলারের বিক্রয়দর ছিল ১২৬ টাকা ৩০ পয়সা। তবে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রয়োজনের সময় তালিকায় উল্লেখ করা দরে ডলার না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে নগদ ডলারের চাহিদা থাকলে অনেক গ্রাহককে নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশি অর্থ দিতে হচ্ছে। এমসিএবির নির্ধারিত দরের বাইরে ডলার বিক্রির বিষয়ে সংগঠনটির মহাসচিব প্রকৌশলী গৌতম দে বলেন, ‘আমাদের সদস্যরা নির্ধারিত ক্রয়মূল্য ১২৫ টাকা ৫০ পয়সা এবং বিক্রয়মূল্য ১২৬ টাকা ৫০ পয়সাতেই লেনদেন করছে।’ তার বক্তব্যের সঙ্গে সরেজমিনে পাওয়া বাজারচিত্রের পার্থক্যই এখন প্রশ্ন তৈরি করেছে—তাহলে নির্ধারিত দরের বাইরে অতিরিক্ত দামে ডলার বিক্রি হচ্ছে কোথায় এবং কারা করছে?

ব্যাংকে ১২৫, খোলাবাজারে ১২৭.৫০
ডলারের বাজারে এই ব্যবধান আরও স্পষ্ট হয় ব্যাংকের দরের সঙ্গে তুলনা করলে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২ সেপ্টেম্বর আন্তঃব্যাংক বাজারে প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৭৯ পয়সা দরে লেনদেন হয়েছে। একই দিনে ব্যাংকগুলো নগদ ডলার সর্বোচ্চ ১২৫ টাকা দরে বিক্রি করেছে। বেসরকারি খাতের দ্য সিটি ব্যাংকের তথ্যও একই চিত্র দেখায়। ব্যাংকটি ১২৩ টাকা ৭৫ পয়সা দরে ডলার কিনে নগদ ডলার বিক্রি করেছে ১২৫ টাকা দরে। অর্থাৎ ব্যাংক থেকে বৈধভাবে নগদ ডলার কেনার সুযোগ থাকলেও বাস্তবে পর্যাপ্ত ডলার না পাওয়ার কারণে অনেক গ্রাহককে খোলাবাজারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। আর সেখানেই তৈরি হচ্ছে অতিরিক্ত দামের চাপ। খোলাবাজারে সর্বোচ্চ ১২৭ টাকা ৫০ পয়সা দরে ডলার কিনলে ব্যাংকের সর্বোচ্চ বিক্রয়দর ১২৫ টাকার তুলনায় প্রতি ডলারে গ্রাহকের বাড়তি খরচ হচ্ছে ২ টাকা ৫০ পয়সা। বড় অঙ্কের ডলার কেনার ক্ষেত্রে এই পার্থক্য দাঁড়াচ্ছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে।

চাহিদার চাপেই কি বাড়তি দর?
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ কেউ মনে করছেন, ব্যাংকগুলো প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত নগদ ডলার দিতে না চাওয়ায় খোলাবাজারের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। ফলে সেখানে নগদ ডলারের চাহিদা বাড়ছে এবং সেই সুযোগে কোনো কোনো মানি চেঞ্জার বাড়তি দামে ডলার বিক্রি করছে। তবে বাজারে ডলারের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে চাহিদা ও সরবরাহের বিষয়টিকেই গুরুত্ব দিচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক এক্সচেঞ্জ রেটের ওপর কোনো নির্দেশনা দেবে না। কারণ বাজারে ডলারের দাম চাহিদা ও সরবরাহের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে। তবে কেউ কারসাজি করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ফলে এখন মূল নজর থাকবে বাজারে ডলারের প্রকৃত সরবরাহ, মানি চেঞ্জারগুলোর লেনদেন এবং ঘোষিত দরের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার বিষয়টির ওপর। ডলারের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা না থাকলেও ঘোষিত দর ও বাস্তব লেনদেনের মধ্যে এই পার্থক্য সাধারণ গ্রাহকের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে যারা চিকিৎসা, শিক্ষা, ভ্রমণ কিংবা জরুরি প্রয়োজনে নগদ ডলার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন, তাদেরই দিতে হচ্ছে অতিরিক্ত অর্থ। বাজারে ডলারের দাম চাহিদা-সরবরাহের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে—বাংলাদেশ ব্যাংকের এই অবস্থান স্পষ্ট। তবে সেই বাজারে নির্ধারিত নিয়ম মানা হচ্ছে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কারসাজি হলে ব্যবস্থা নেওয়ার যে সতর্কবার্তা কেন্দ্রীয় ব্যাংক দিয়েছে, তার বাস্তব প্রয়োগই পারে ঘোষিত দর আর গ্রাহকের পকেট থেকে বেরিয়ে যাওয়া দামের ব্যবধান কমাতে।

কালের আলো/এম/এএইচ

মার্কিন নির্বাচনের সময় ইরান হামলা চালাতে পারে: সাবেক রাষ্ট্রদূত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৩৬ পূর্বাহ্ণ
মার্কিন নির্বাচনের সময় ইরান হামলা চালাতে পারে: সাবেক রাষ্ট্রদূত

আগামী ছয় সপ্তাহের মধ্যে ইরান আকস্মিক কোনো হামলা চালাতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিউনিশিয়ায় দায়িত্ব পালন করা যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত জোয়ে হুড। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের সময়কে ইরান সম্ভাব্য হামলার জন্য বেছে নিতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।

শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ আশঙ্কার কথা জানান সাবেক এই মার্কিন কূটনীতিক।

জোয়ে হুড বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলার ক্ষেত্রে ইরানের একটি ইতিহাস রয়েছে। অতীতের বিভিন্ন মার্কিন প্রশাসনের সময়ও নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তেহরান এমন পদক্ষেপ নিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

তিনি বলেন, আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এ সময় জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করাকে ইরান একটি সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।

সাবেক এই রাষ্ট্রদূতের মতে, মার্কিন ভোটাররা পেট্রোলের দামের বিষয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল। ফলে তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলে তা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।

এদিকে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো সরাসরি আলোচনা চলছে না। দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন জোয়ে হুড। তবে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো কার্যকর উদ্যোগ নিলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

তিনি বলেন, মধ্যস্থতাকারীরা যদি চমকপ্রদ কোনো উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসতে না পারে, তাহলে চলমান কূটনৈতিক তৎপরতার কার্যকারিতা খুব বেশি হবে না।

হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা কমাতেও তৃতীয় পক্ষের উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। তার ভাষ্য, মক্কা চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো তাদের নৌশক্তি নিয়ে উপসাগর ও উত্তর আরব সাগরে উপস্থিত হয়ে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। এতে জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধের প্রয়োজনীয়তাও কমতে পারে।

তবে জোয়ে হুডের বক্তব্যটি একটি আশঙ্কা ও বিশ্লেষণ, ইরানের হামলার নিশ্চিত ঘোষণা নয়।

সূত্র: আলজাজিরা

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি

সরবরাহ সংকটে বিশ্ববাজারে খাদ্যের দাম বাড়ছে: এফএও

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৪৮ অপরাহ্ণ
সরবরাহ সংকটে বিশ্ববাজারে খাদ্যের দাম বাড়ছে: এফএও

বিশ্বজুড়ে খাদ্যপণ্যের দাম চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। যুদ্ধ, চরম আবহাওয়া ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্নের কারণে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)।

শুক্রবার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে এফএওর খাদ্যমূল্য সূচক টানা তৃতীয় মাসের মতো বেড়ে ১৩৩ দশমিক ৩ পয়েন্টে পৌঁছেছে। ২০২২ সালের শেষ দিকের পর এটিই সূচকটির সর্বোচ্চ অবস্থান।

এফএও জানিয়েছে, শস্য, উদ্ভিজ্জ তেল, চিনি, মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্য—সব প্রধান খাদ্যপণ্যের দামই আগস্টে বেড়েছে। এর মধ্যে চিনির দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে, যা জুলাইয়ের তুলনায় প্রায় ১২ শতাংশ বেশি। গত এক বছরের মধ্যে চিনির দামও সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

খাদ্যশস্যের দাম দুই শতাংশের বেশি বেড়ে দুই বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। কৃষ্ণসাগরে সামরিক হামলার কারণে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে গম ও ভুট্টা রপ্তানিতেও প্রভাব পড়ছে।

এফএওর প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরো বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার ফলে খাদ্য সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এদিকে সার সরবরাহ নিয়েও নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধার কারণে আন্তর্জাতিক সার বাণিজ্যে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য সরবরাহ আরও চাপে পড়তে পারে।

বিশ্ব উষ্ণায়ন ও এল নিনোর প্রভাবে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। ইউরোপে তীব্র তাপপ্রবাহে ফসলের উৎপাদন কমেছে। একই সঙ্গে এশিয়ায় খাদ্যশস্য উৎপাদনও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি সতর্ক করে বলেছে, চরম আবহাওয়ার কারণে আগামী বছরের শেষ নাগাদ আরও প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ তীব্র ক্ষুধার মুখে পড়তে পারে।

বিশ্ববাজারে পাইকারি খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লে কয়েক মাসের মধ্যে এর প্রভাব সাধারণ ভোক্তার ওপরও পড়ে। ফলে খাদ্যমূল্যের এই ঊর্ধ্বগতি বিশ্বজুড়ে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি 

খাদ্যগুদাম প্রকল্পে শুধু সময়ই বাড়ে

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:৩৭ অপরাহ্ণ
খাদ্যগুদাম প্রকল্পে শুধু সময়ই বাড়ে

খাদ্যশস্য রাখার জায়গা বাড়াতে একের পর এক প্রকল্প। বরাদ্দ হচ্ছে হাজার কোটি টাকা। কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হচ্ছে, বাড়ছে ব্যয়, তবু বাড়ছে না কাঙ্ক্ষিত সংরক্ষণ সক্ষমতা। কোথাও তিন বছরেও কাজ এগিয়েছে মাত্র ২৫ শতাংশ, কোথাও এক যুগ পেরিয়েও শেষ হয়নি নির্মাণ। আবার রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া একটি প্রকল্পে মাটি খোঁড়ার পরই থেমে গেছে কাজ। পরে যৌক্তিকতা না পাওয়ায় সেটি অসমাপ্ত রেখেই সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারি খাদ্যগুদামের সক্ষমতা বাড়ানোর নামে নেওয়া চার প্রকল্পে মোট ৫ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। অথচ প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি, দফায় দফায় সংশোধন, মেয়াদ বৃদ্ধি এবং কোথাও কোথাও স্থান পরিবর্তনের কারণে এসব বিনিয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। খাদ্য সংরক্ষণ সক্ষমতার ঘাটতি কাটাতে গিয়ে সরকারি অর্থের অপচয় কিংবা অনিয়মের সুযোগ তৈরি হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও এখন সামনে। খাদ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য এবং পরিকল্পনা কমিশন ও বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) পর্যবেক্ষণে এসব চিত্র উঠে এসেছে।

তিন বছরেও এক-চতুর্থাংশ কাজ
২০২৩ সালের জুলাইয়ে ৮৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫৩ জেলায় নতুন খাদ্যগুদাম নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। ১৪৫টি স্থাপনায় মোট ১৯৫টি গুদাম নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিক ব্যয় ৮১৪ কোটি টাকা থাকলেও পরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৫৫ কোটি টাকা। শুধু ব্যয়ই বাড়েনি, বেড়েছে সময়ও। ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। আইএমইডির হিসাবে, ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ২৫ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ২১ দশমিক ১১ শতাংশ। এরই মধ্যে ব্যয় হয়েছে ১৭৮ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। আইএমইডির পর্যবেক্ষণে মাদারীপুরের কালকিনি ও বাগেরহাট প্যাকেজে ধীরগতি দেখা গেছে। গাছ ও পুরোনো অবকাঠামো সরাতেও সময় লেগেছে। শরীয়তপুরের আঙ্গারিয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল, দিনাজপুরের ফুলবাড়ী ও বিরল এবং মোংলা এলএসডিতে জায়গার সংকট রয়েছে। এ ছাড়া লে-আউট জটিলতা, প্রকল্পের স্থান পরিবর্তন, প্রশাসনিক অনুমোদন ও দরপত্র প্রক্রিয়াতেও বিলম্ব হয়েছে। প্রকল্প পরিচালক মো. সোহেলুর রহমান খান বলেন, সময়মতো পরিচালক নিয়োগ না হওয়া, নির্ধারিত স্থানে কাজ করতে না পারা, স্থান পরিবর্তন এবং রেট শিডিউলের কারণে ব্যয় কিছুটা বেড়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন প্রকল্প পরিচালক টেন্ডারের উদ্যোগ নিলেও কাজ করা সম্ভব হয়নি। তবে বর্তমানে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা তিনি দাবি করেন, আগের প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে প্রকল্পের কার্যক্রম এখন সন্তোষজনকভাবে এগোচ্ছে।

এক যুগেও শেষ হয়নি ৩ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকার প্রকল্প
সরকারি খাদ্য সংরক্ষণ অবকাঠামোর সবচেয়ে বড় প্রকল্পগুলোর একটি শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালে। ৩ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪ লাখ ৮৭ হাজার টন ধারণক্ষমতার সাতটি আধুনিক স্টিল সাইলো নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। বরিশাল, নারায়ণগঞ্জ, আশুগঞ্জ, ময়মনসিংহ, খুলনার মহেশ্বরপাশা, চট্টগ্রাম ও মধুপুরে এসব সাইলো নির্মাণের কথা। প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের ঋণ রয়েছে ৩ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা। চার দফা সংশোধনের পর মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়েও পুরো কাজ শেষ হয়নি। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৬৯৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ মোট ব্যয়ের ৯৫ দশমিক ০৫ শতাংশই খরচ হয়ে গেছে। তারপরও বাকি কাজ শেষ করতে আবারও মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে। প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন জানান, প্রকল্পের মূল কার্যালয় ঢাকার প্রবাসী কল্যাণ ভবনে। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিয়মিত বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না বলেও জানান তিনি।

রাজনৈতিক প্রকল্প, শেষ পর্যন্ত বাতিল
খাদ্য সংরক্ষণ অবকাঠামো নির্মাণে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগও রয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের নির্বাচনি এলাকা নওগাঁর মহাদেবপুরে ৩৬৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪৮ হাজার টন ধারণক্ষমতার চালের সাইলো নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হয়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রকল্পটি পর্যালোচনায় আসে। এরপর দেখা যায়, ভূমি অধিগ্রহণ ও মাটি খোঁড়া ছাড়া বাস্তবে আর কোনো কাজ এগোয়নি। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি ছিল শূন্য। প্রকল্প পরিচালক মোস্তাক আহমেদ জানান, নতুন ফিজিবিলিটি স্টাডিতে মহাদেবপুরে প্রকল্পটি নেওয়ার যৌক্তিকতা পাওয়া যায়নি। ফলে অসমাপ্ত অবস্থায় রেখেই প্রকল্পটি সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—যে প্রকল্পের যৌক্তিকতাই শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেল না, সেটির পেছনে প্রাথমিক পর্যায়ে ৩৬৭ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রয়োজন কেন হয়েছিল?

মেরামতের প্রকল্পেও ধীরগতি
ক্ষতিগ্রস্ত খাদ্যগুদাম ও আনুষঙ্গিক অবকাঠামো মেরামতে ২৫৫ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এটি শেষ করার কথা। লক্ষ্য ছিল সরকারি খাদ্য সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানো, খাদ্যশস্যের অপচয় কমানো, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। কিন্তু ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি ৩২ শতাংশ হলেও আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ৩ শতাংশ। প্রকল্প পরিচালক এ টি এম কাউছার হোসেন জানান, সময়মতো বাজেট বরাদ্দ না পাওয়ায় কাজ কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোয়নি। ঠিকাদারদের বিলও আটকে রয়েছে।

সরকারি গুদাম বনাম বেসরকারি সক্ষমতা
স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও সরকারি খাদ্য সংরক্ষণ সক্ষমতা প্রয়োজনের তুলনায় কম। সরকারি গুদামে বর্তমানে প্রায় ২২ থেকে ২৩ লাখ টন খাদ্যশস্য রাখা যায়। বিপরীতে বেসরকারি খাতের ধারণক্ষমতা প্রায় ১ কোটি টন। অর্থাৎ বিপুল সরকারি বিনিয়োগের পরও সংরক্ষণ সক্ষমতার বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। বাংলাদেশ অ্যাগ্রোকেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কৃষিবিদ কে এস এম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শুধু সরকারি ব্যবস্থাপনায় গুদাম নির্মাণ টেকসই সমাধান নয়। সহজ শর্তে ঋণ, কর অবকাশ ও ভর্তুকির মাধ্যমে বেসরকারি খাতকে খাদ্য সংরক্ষণে যুক্ত করা যেতে পারে। তার মতে, প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়তে থাকলে সরকারি অর্থ অপচয়ের পাশাপাশি অনিয়ম-দুর্নীতির আশঙ্কাও তৈরি হয়। তাই ব্যয় নির্ধারণ, দরপত্র, নির্মাণকাজের মান এবং অর্থ ব্যয়ে কঠোর নজরদারি জরুরি।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের নজরদারি কতটা?
খাদ্যশস্যের সরবরাহ ও মজুদ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম কিংবা গাফিলতি পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা। সম্প্রতি মানিকগঞ্জে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, দুর্যোগ কিংবা জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ রাখতে হবে। দায়িত্ব পালনে গাফিলতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে বাস্তবতা হলো, একদিকে খাদ্য সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ, অন্যদিকে সেই লক্ষ্যেই নেওয়া প্রকল্পের ধীরগতি। কোথাও ব্যয় বাড়ছে, কোথাও মেয়াদ; কোথাও আবার প্রকল্পের যৌক্তিকতাই প্রশ্নের মুখে। ৫ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকার এই চার প্রকল্প তাই শুধু গুদাম নির্মাণের হিসাব নয়—এটি সরকারি প্রকল্প পরিকল্পনা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিরও পরীক্ষা। খাদ্য নিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর খাতে জনগণের অর্থ খরচ করে যদি সময়মতো গুদামই না হয়, তাহলে সেই বিনিয়োগের সুফল শেষ পর্যন্ত যাবে কোথায়—এ প্রশ্নের উত্তর এখন সংশ্লিষ্টদেরই দিতে হবে।

কালের আলো/এম/এএইচ