ওষুধ নয়, প্রয়োজন মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগ
অসুস্থ হলে আমরা সাধারণত চিকিৎসকের কাছে যাই, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করি এবং ওষুধ খাই। কিন্তু সব ধরনের অসুস্থতার সমাধান কি ওষুধে সম্ভব? একাকিত্ব, দুশ্চিন্তা, আর্থিক সংকট, বেকারত্ব, বাসস্থানের সমস্যা কিংবা সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মতো বিষয়ও মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। এসব সমস্যার সমাধান সবসময় প্রেসক্রিপশনে লেখা ওষুধ দিয়ে করা যায় না। এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে সোশ্যাল প্রেসক্রাইবিং।
কী এই সোশ্যাল প্রেসক্রাইবিং?
সহজ ভাষায়, সোশ্যাল প্রেসক্রাইবিং হলো একজন মানুষকে তাঁর স্বাস্থ্য ও সুস্থতার জন্য উপযোগী ব্যক্তি, সংগঠন, কার্যক্রম বা কমিউনিটি-ভিত্তিক সেবার সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল একাডেমি ফর সোশ্যাল প্রেসক্রাইবিংয়ের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মানুষের প্রয়োজন ও পছন্দ বুঝে তাঁকে এমন সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করাই এর মূল লক্ষ্য, যা তাঁর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়ক। একই সঙ্গে সামাজিক সংযোগ বাড়ানোও এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
ধরা যাক, একজন বয়স্ক মানুষ দীর্ঘদিন ধরে একা থাকছেন। বড় কোনো শারীরিক অসুস্থতা না থাকলেও নিঃসঙ্গতার কারণে তিনি বিষণ্ন হয়ে পড়ছেন। এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসক শুধু ওষুধের ওপর নির্ভর না করে তাঁকে একজন সোশ্যাল প্রেসক্রাইবিং লিংক ওয়ার্কারের কাছে পাঠাতে পারেন।
লিংক ওয়ার্কার ওই ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে তাঁর পছন্দ, প্রয়োজন ও সমস্যাগুলো বোঝার চেষ্টা করবেন। এরপর তাঁর জন্য উপযোগী কোনো স্থানীয় কার্যক্রম বা সেবার সঙ্গে যুক্ত করে দিতে পারেন।
যেমন, তাঁকে স্থানীয় বন্ধুত্বমূলক গ্রুপ, বাগান করার দল, ছবি আঁকা বা শিল্পচর্চার ক্লাস কিংবা কোনো কমিউনিটি কার্যক্রমে যুক্ত করা যেতে পারে।
একইভাবে ঋণের চাপে থাকা কাউকে আর্থিক পরামর্শকেন্দ্রে, চাকরি হারানো কাউকে কর্মসংস্থান সহায়তা কর্মসূচিতে কিংবা শরীরচর্চায় আগ্রহী কাউকে স্থানীয় হাঁটা বা ব্যায়ামের গ্রুপে যুক্ত করা যেতে পারে।
অর্থাৎ, এখানে ‘প্রেসক্রিপশন’টি কোনো ওষুধের নয়; বরং সম্পর্ক, সামাজিক অংশগ্রহণ, অর্থপূর্ণ কাজ এবং কমিউনিটির সঙ্গে সংযোগের।
কতটা কার্যকর?
সোশ্যাল প্রেসক্রাইবিং কতটা কার্যকর—এ প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। ২০২২ সালে প্রকাশিত কিছু গবেষণায় মানসিক স্বাস্থ্য, সুস্থতা ও জীবনমানের উন্নতির ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও অনেক গবেষণারই পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতা ছিল।
২০২৪ সালের একটি সিস্টেম্যাটিক রিভিউতেও বলা হয়েছে, কোন ধরনের সোশ্যাল প্রেসক্রাইবিং কার জন্য এবং কোন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি কার্যকর, তা বোঝার জন্য আরও শক্তিশালী গবেষণা প্রয়োজন।
তবে ২০২২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত আটটি উল্লেখযোগ্য গবেষণার মধ্যে পাঁচটিতে স্বাস্থ্য ও মানসিক সুস্থতার ক্ষেত্রে সোশ্যাল প্রেসক্রাইবিংয়ের ইতিবাচক প্রভাব পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সর্বশেষ গবেষণাটি ২০২৬ সালের জুলাইয়ে নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।
একাকিত্বের সঙ্গে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের নানা সমস্যার সম্পর্কও রয়েছে। দীর্ঘ সময় সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকা হৃদ্রোগ ও মস্তিষ্কের বিভিন্ন সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ফলে স্বাস্থ্যসেবায় মানুষের সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক বাস্তবতাকে বিবেচনায় নেওয়ার গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে।
চিকিৎসার বিকল্প নয়
সোশ্যাল প্রেসক্রাইবিংকে কোনোভাবেই চিকিৎসাব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়। গুরুতর শারীরিক বা মানসিক অসুস্থতার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, ওষুধ বা থেরাপি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ।
বরং সোশ্যাল প্রেসক্রাইবিং হলো চিকিৎসার পাশাপাশি একজন মানুষের সামাজিক বাস্তবতা, সম্পর্ক, আগ্রহ ও জীবনযাপনের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার একটি পদ্ধতি।
কারণ অনেক সময় সুস্থ থাকার জন্য শুধু রোগের চিকিৎসাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগ, অর্থপূর্ণ কাজে যুক্ত থাকা এবং নিজের চারপাশের কমিউনিটির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা। সোশ্যাল প্রেসক্রাইবিং সেই জায়গাটিতেই নতুন করে গুরুত্ব দিচ্ছে।
সূত্র: সোশ্যাল প্রেসক্রাইবিং একাডেমি
কালের আলো/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
Array