ক্ষমতায় এসে বিএনপির সামনে এখন নতুন এক সাংগঠনিক পরীক্ষা। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত নেতাদের ওপর নির্ভরতার পাশাপাশি দল ও সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে এবার স্বচ্ছ ভাবমূর্তি, জনগ্রহণযোগ্যতা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং তৃণমূলের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটগুলোতে নেতৃত্ব বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ‘কে কতদিন রাজনীতি করেছেন’—এই প্রশ্নের পাশাপাশি ‘কে কতটা গ্রহণযোগ্য’ এবং ‘কার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ রয়েছে’—সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
বিএনপির একাধিক দায়িত্বশীল নেতার সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের ভাষ্য, ক্ষমতাসীন দল হিসেবে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ড এখন সরাসরি দলের ভাবমূর্তির সঙ্গে যুক্ত। ফলে নেতৃত্বে ভুল নির্বাচন শুধু সাংগঠনিক দুর্বলতা তৈরি করবে না, এর রাজনৈতিক প্রভাবও পড়তে পারে। এ কারণে নতুন কমিটি গঠনে তাড়াহুড়া না করে যাচাই-বাছাইয়ের ওপর জোর দিচ্ছে দলটির হাইকমান্ড।
- বিএনপির নতুন কমিটিতে গ্রহণযোগ্যতাই বড় মাপকাঠি
- ঢাকা মহানগরসহ চার সংগঠনে নেতৃত্ব বদলের আভাস
- আলোচনায় একাধিক নতুন-পুরোনো মুখ
জানতে চাইলে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও ময়মনসিংহ জেলা পরিষদ প্রশাসক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স জানিয়েছেন, দলের প্রতি আন্তরিকতা, ত্যাগ, স্বচ্ছ ভাবমূর্তি এবং জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা—সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই নেতৃত্ব নির্বাচন করা হবে। তাঁর মতে, কমিটি গঠনের কাজ প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং যেকোনো সময় ঘোষণা আসতে পারে। অন্যদিকে, যুবদল সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না জানিয়েছেন, সংগঠনের নতুন কমিটি নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি। তাঁর বক্তব্যেও নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনে ইতিবাচক ভাবমূর্তি ও জনগ্রহণযোগ্যতার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।
ঢাকা মহানগরেই প্রথম বড় পরীক্ষা
বিএনপির সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাসে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে ঢাকা মহানগর। রাজধানীর উত্তর ও দক্ষিণ ইউনিট রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন থেকে শুরু করে ওয়ার্ড-থানা পর্যায়ের সংগঠন পরিচালনা এবং ভবিষ্যৎ স্থানীয় সরকার নির্বাচন—সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির কমিটি বিলুপ্ত হওয়ায় নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা তীব্র হয়েছে। সম্ভাব্য নেতৃত্বের আলোচনায় সদ্য বিলুপ্ত কমিটির আহ্বায়ক আমিনুল হক, সদস্যসচিব মোস্তফা জামান, যুগ্ম আহ্বায়ক আফাজ উদ্দিন, এস এ সিদ্দিকী সাজু, ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর, আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ার, এ বি এম রাজ্জাক এবং যুবদলের সহসভাপতি শরিফ উদ্দিন জুয়েলের নাম রয়েছে।
দক্ষিণ মহানগরেও সম্ভাব্য নেতৃত্ব নিয়ে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। সাধারণ সম্পাদক পদে তানভীর আহমেদ রবিনের নাম আলোচনায় রয়েছে। পাশাপাশি লিটন মাহমুদ, আ ন ম সাইফুল ইসলাম, সাইদুর রহমান মিন্টু, আবদুল কাদির ভুঁইয়া জুয়েল, আবদুল মোনায়েম মুন্না ও এস এম জিলানীর নামও বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনায় আছে। তবে দলীয় সূত্রগুলো বলছে, এসব নাম এখনো সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে আরও যাচাই-বাছাই হতে পারে।
যুবদলে শীর্ষ পদ ঘিরে নানা সমীকরণ
কেন্দ্রীয় যুবদলের নতুন কমিটি নিয়েও আলোচনা দীর্ঘ হচ্ছে। সম্ভাব্য নেতৃত্বের তালিকায় গোলাম মাওলা শাহীন, শরীফ উদ্দিন জুয়েল, সাইদ ইকবাল টিটু, মামুন হাসান, রেজাউল কবীর পল, আকরামুল হাসান, কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ, ফজলুর রহমান খোকন ও ইকবাল হোসেন শ্যামলের নাম রয়েছে। ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলেও শরীফ উদ্দিন জুয়েলের নাম গুরুত্বপূর্ণ পদে আলোচনায় রয়েছে। পাশাপাশি মিজানুর রহমান রাজ, মনিরুল ইসলাম মনির, তসলিম আহসান মাসুম, আমিনুল হক হিমেল, মাহবুবুর রহমান মাহবুব ও মেহেদী হাসান রুয়েলের নাম রয়েছে। দক্ষিণ যুবদলের নেতৃত্বে এনামুল হক এনাম, রবিউল ইসলাম নয়ন, মো. আসাদুজ্জামান আসলাম, ওমর ফারুক মুন্না, ফয়সাল আহমেদ সজল, শেখ খালিদ হাসান জ্যাকি, আবদুল গাফফার, নূরে আলম সিদ্দিকী সোহাগ ও আসিফুর রহমান বিপ্লবের নামও আলোচনায় রয়েছে।
স্বেচ্ছাসেবক দলেও নতুন কমিটির অপেক্ষা
স্বেচ্ছাসেবক দলের নতুন কমিটি নিয়েও কয়েক মাস ধরে আলোচনা চলছে। বর্তমান সভাপতি এস এম জিলানী ও সাধারণ সম্পাদক রাজিব আহসানের রাজনৈতিক ও সরকারি দায়িত্বের কারণে সংগঠনের জন্য নতুন নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
সম্ভাব্য নতুন কমিটিতে জহির উদ্দিন তুহিন, ইয়াসিন আলী, নাজমুল হাসান, ফখরুল ইসলাম রবিন, কাজী মোখতার হোসেন ও গোলাম মোর্শেদ রাসেলের নাম রয়েছে। তবে সংগঠনটির নেতৃত্বে কারা আসবেন, তা নির্ভর করছে হাইকমান্ডের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর।
ছাত্রদলে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান কবে?
বিএনপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী সংগঠন ছাত্রদলের নতুন কমিটি নিয়েও অপেক্ষা চলছে। নতুন নেতৃত্বের আলোচনায় আমান উল্লাহ আমান,
শ্যামল মালুম, মনিরুল ইসলাম জিসান, মঞ্জুরুল আলম রিয়াদ, রিয়াদ রহমান, এজাজুল কবির রুয়েল, মোস্তাফিজুর রহমান, শরীফ প্রধান শুভ, ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল, কাজী জিয়া উদ্দিন বাসিত, রাজু আহমেদ, গণেশ চন্দ্র রায় সাহস, আনিসুর রহমান খন্দকার অনিক, মাসুম বিল্লাহ, মিনহাজ আহমেদ প্রিন্স, গাজী সাদ্দাম হোসেন, ইব্রাহিম খলিল ও তারেক হাসান মামুনের নাম রয়েছে। বিদায়ী নেতৃত্বের দায়িত্ব শেষ হওয়ার ইঙ্গিতের পর থেকেই পদপ্রত্যাশীদের তৎপরতা বেড়েছে। ফলে ছাত্রদলের নতুন কমিটিও বিএনপির নেতৃত্ব বাছাইয়ের নতুন নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে।
বলয়ের বাইরে গিয়ে বাছাইয়ের চেষ্টা
বিএনপির দায়িত্বশীল একটি সূত্রের দাবি, এবার কমিটি গঠনে কোনো নির্দিষ্ট বলয়কে প্রাধান্য দিতে চাইছে না হাইকমান্ড। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান সাংগঠনিক বিষয়গুলোতে সরাসরি যুক্ত থাকছেন এবং সম্ভাব্য নেতৃত্ব যাচাই-বাছাই করছেন। দলের ভেতরে লবিং-গ্রুপিং থাকলেও কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে তার প্রভাব কতটা থাকবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ ক্ষমতায় থাকার সময়ে সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হলে তার প্রভাব মাঠের রাজনীতি থেকে শুরু করে সরকারের ভাবমূর্তিতেও পড়তে পারে।
ত্যাগ বনাম গ্রহণযোগ্যতার নতুন সমীকরণ
বিএনপির বর্তমান সাংগঠনিক তৎপরতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হচ্ছে নেতৃত্বের মানদণ্ডে। একসময় দীর্ঘদিনের আন্দোলন, মামলা-হামলা ও রাজপথের সক্রিয়তাই ছিল নেতৃত্ব নির্বাচনের বড় পরিচয়। এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জনসম্পৃক্ততা, ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং বিতর্কমুক্ত থাকার প্রশ্ন।
ঢাকা মহানগরসহ গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটগুলোর নতুন কমিটি সেই পরিবর্তনের বাস্তব পরীক্ষা। অভিজ্ঞ ও পরীক্ষিত নেতৃত্বকে ধরে রাখার পাশাপাশি তরুণদের জায়গা দেওয়া এবং একই সঙ্গে বিতর্কমুক্ত ভাবমূর্তি নিশ্চিত করা—এই তিনটি লক্ষ্য একসঙ্গে পূরণ করাই হবে বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। শেষ পর্যন্ত নতুন কমিটিগুলো শুধু পদবণ্টনের তালিকা হবে, নাকি ক্ষমতাসীন বিএনপির নতুন সাংগঠনিক দর্শনের প্রতিফলন ঘটাবে—তার উত্তর মিলবে ঘোষণার পরই।
কালের আলো/এমএসএএকে/এমকে
আপনার মতামত লিখুন
Array