খুঁজুন
                               
, ,
           

জনবল সংকটে ধুঁকছে ছাতক বিদ্যুৎ বিভাগ, ভোগান্তিতে ৪৫ হাজার গ্রাহক

সুনামগঞ্জ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৪৫ অপরাহ্ণ
জনবল সংকটে ধুঁকছে ছাতক বিদ্যুৎ বিভাগ, ভোগান্তিতে ৪৫ হাজার গ্রাহক

জরুরি বিদ্যুৎ মেরামতের জন্য নেই পর্যাপ্ত লাইনম্যান, শূন্য ফোরম্যান ও ইলেকট্রিশিয়ানের পদ। মিটার পাঠক, স্টোর কিপার ও অভিযোগ গ্রহণকারীর পদেও নেই জনবল। জরুরি কাজে ব্যবহারের জন্য তিনটি গাড়ি থাকলেও নেই স্থায়ী চালক। অনুমোদিত ৯০টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ২৪ জন। এমন জনবল সংকট নিয়েই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে সুনামগঞ্জের ছাতক বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের কার্যক্রম।

এ পরিস্থিতিতে ছাতক উপজেলার পাশাপাশি দোয়ারাবাজার ও জগন্নাথপুর উপজেলার আংশিক এলাকার বিদ্যুৎসেবা পরিচালনা করতে হিমশিম খাচ্ছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ফলে বিভাগের আওতাধীন প্রায় ৪৫ হাজার ৩০০ গ্রাহক কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিশেষ করে বিদ্যুৎ লাইনে ত্রুটি দেখা দিলে তা মেরামতে দীর্ঘ সময় লাগছে। ঝড়-বৃষ্টির সময় এই ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়।

৯০টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ২৪ জন

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ছাতক বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের কার্যালয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন পদে অনুমোদিত জনবল ৯০ জন। কিন্তু স্থায়ীভাবে কর্মরত আছেন মাত্র ২৪ জন। অর্থাৎ অনুমোদিত জনবলের বড় একটি অংশই নেই। গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি ও প্রশাসনিক পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনায় তৈরি হয়েছে সংকট।

কার্যালয়ে সহকারী প্রকৌশলীর পদ শূন্য। উপসহকারী প্রকৌশলীর চারটি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র একজন। উচ্চমান সহকারী ও হিসাব সহকারীর পদও শূন্য রয়েছে। নিম্নমান সহকারীর চারটি পদের মধ্যে কর্মরত আছেন একজন। নিম্নমান সহকারী কাম মুদ্রাক্ষরিকের দুটি পদের একটি শূন্য।

এ ছাড়া চারটি মিটার পাঠকের পদে কেউ নেই। স্টোর কিপার ও অভিযোগ গ্রহণকারীর পদেও জনবল নেই। সাবস্টেশন-সংশ্লিষ্ট এসবিএর ১৮টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র একজন। ফলে কারিগরি কাজের পাশাপাশি দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

লাইনম্যান ও ফোরম্যানের সংকটে ব্যাহত মেরামতকাজ

বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং লাইনে ত্রুটি দেখা দিলে দ্রুত মেরামতের জন্য লাইনম্যান ও ফোরম্যান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু ছাতক বিদ্যুৎ বিভাগে এই জনবলই সবচেয়ে বেশি সংকটের মুখে রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ফোরম্যান ও তিন শ্রেণির লাইনম্যানের মোট ছয়টি পদ শূন্য। ইলেকট্রিশিয়ানের সব পদও খালি। বিদ্যুৎ লাইনের কাজে সহায়তাকারী ১৬টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র চারজন। জরুরি মেরামত ও সংরক্ষণকাজের জন্য প্রয়োজনীয় লোকবল না থাকায় নিয়মিত সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে বিভাগটিকে।

কার্যালয়ে জরুরি বিদ্যুৎ সরবরাহের কাজে ব্যবহারের জন্য তিনটি গাড়ি থাকলেও সেগুলো চালানোর স্থায়ী চালক নেই। পাশাপাশি এমএলএসএস কাম গার্ডের ছয়টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র একজন। নিরাপত্তা প্রহরীর ১৩টি পদের মধ্যে চারটি শূন্য। পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের এমএলএস পদেও জনবল সংকট রয়েছে।

অস্থায়ী শ্রমিক দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ, বাড়ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা

জনবল সংকট সামাল দিতে বাধ্য হয়ে অদক্ষ ও অস্থায়ী দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিকদের দিয়ে বিদ্যুৎ লাইনের কাজ করানো হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এতে ঝুঁকিপূর্ণ বৈদ্যুতিক কাজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এসব কাজে যুক্ত শ্রমিকেরা বিভিন্ন সময় দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

লাইনম্যানের অভাবে গ্রাহকদের সেবা দিতে অস্থায়ী শ্রমিকদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে নিয়মিত মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের অভিযোগও রয়েছে। বিদ্যুৎ লাইনে কাজের জন্য প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনবল নিশ্চিত করা না গেলে শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎসেবা—দুই ক্ষেত্রেই ঝুঁকি থেকে যায়।

বিস্তীর্ণ এলাকায় বিদ্যুৎ লাইন, ঝড়-বৃষ্টিতে বাড়ে দুর্ভোগ

ছাতক বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের আওতাধীন এলাকায় রয়েছে বিস্তীর্ণ ভৌগোলিক পরিসর। খাল-বিল ও হাওরের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ লাইন বিস্তৃত থাকায় বিভিন্ন স্থানে ত্রুটি দেখা দিলে দ্রুত সেখানে পৌঁছে মেরামত করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ঝড়-তুফানের সময় বিদ্যুৎ লাইনে সমস্যা দেখা দিলে জনবল সংকটের কারণে তা মেরামতে দীর্ঘ সময় লাগছে।

বিভাগটির আওতায় ছাতক ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড উপকেন্দ্র থেকে ছাতক উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। পাশাপাশি ছাতক ১৩২/৩৩ কেভি উপকেন্দ্র থেকে ১৩২ কেভি সার্কিটের মাধ্যমে সুনামগঞ্জ ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড উপকেন্দ্রেও বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়ে থাকে।

এ এলাকায় লাফার্জ-হোলসিম সিমেন্ট কারখানা, ছাতক সিমেন্ট কারখানা, সিলেট পাল্প অ্যান্ড পেপার মিলসহ বিভিন্ন ছোট-বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কলকারখানা ও সরকারি দপ্তর রয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখা এবং ত্রুটি দেখা দিলে দ্রুত মেরামত করা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় এসব দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।

বছরের পর বছর শূন্য পদ, চিঠি দিয়েও মিলছে না সমাধান

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, জনবল সংকট নিরসনে শূন্য পদগুলো পূরণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। জরুরি মেরামত, বিদ্যুৎ লাইন রক্ষণাবেক্ষণ ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার স্বার্থে দ্রুত জনবল নিয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। তবে দীর্ঘদিনেও সংকটের কার্যকর সমাধান হয়নি বলে তাঁদের অভিযোগ।

বারবার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে পর্যাপ্ত জনবল না পাওয়ায় কার্যক্রম পরিচালনায় জটিলতা থেকেই যাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে গ্রাহকসেবায়। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের পর দ্রুত সমস্যা শনাক্ত করা, মেরামতকাজ পরিচালনা এবং গ্রাহকদের অভিযোগের নিষ্পত্তি—সব ক্ষেত্রেই বাড়তি চাপ সামলাতে হচ্ছে সীমিতসংখ্যক কর্মীকে।

কর্তৃপক্ষ বলছে, নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান

ছাতক বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নুর মোহাম্মদ তারেক বলেন, জনবল স্বল্পতার কারণে গ্রাহকদের প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়া অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও এখন পর্যন্ত প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে সিলেট অঞ্চলের বিভাগীয় অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ইমাম হোসেন বলেন, জনবল সংকটের বিষয়টি তাঁদের জানা রয়েছে। এ নিয়ে বিদ্যুতের প্রধান কার্যালয়কে জানানো হয়েছে। বর্তমানে বিদ্যুৎ বিভাগের বড় একটি নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এটি সম্পন্ন হলে জনবল সংকট অনেকটা কমে আসবে বলে আশা করছেন তিনি।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে তিন্দু সড়ক, পর্যটকবাহী যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা

বান্দরবান সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:৪৯ অপরাহ্ণ
দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে তিন্দু সড়ক, পর্যটকবাহী যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা

বান্দরবানের থানচি উপজেলার পর্যটন এলাকা তিন্দুতে যাতায়াতের সংযোগ সড়কে পর্যটকবাহী যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। থানচি-আলীকদম সড়কের ২১ কিলোমিটার পয়েন্ট থেকে তিন্দু বাজার পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সড়কটির সংস্কারকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে। সড়কটির বিভিন্ন অংশ ভাঙাচোরা থাকায় পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সকাল ১০টার দিকে থানচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ-আল ফয়সালের সই করা এক গণবিজ্ঞপ্তিতে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়।

সংস্কার শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা

গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, থানচি-আলীকদম সড়কের ২১ কিলোমিটার পয়েন্ট থেকে তিন্দু বাজার পর্যন্ত সংযোগ সড়কটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এ কারণে সড়কটির সংস্কারকাজ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত পর্যটকবাহী যান চলাচল বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের এ সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য হলো ঝুঁকিপূর্ণ সড়কে পর্যটকদের যাতায়াত সীমিত করে সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়ানো। সড়কটির মেরামতকাজ চলমান থাকলেও এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। ফলে সংস্কারকাজ সম্পন্ন হওয়ার আগপর্যন্ত পর্যটকবাহী যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে।

ভাঙাচোরা সড়কে ঘটছে দুর্ঘটনা

থানচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুল্লাহ-আল ফয়সাল বলেন, তিন্দু বাজারের সংযোগ সড়কটির মেরামতকাজ এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। সংস্কারকাজ চলমান রয়েছে। সড়কের বিভিন্ন অংশ ভাঙাচোরা থাকায় পর্যটকেরা দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। তিনি আরও জানান, পর্যটকেরা আলীকদম হয়ে থানচির তিন্দু এলাকায় আসেন। এ পথে আসা পর্যটকদের বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে আগাম তথ্য থাকে না। ফলে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় ও ঘটনার সঠিক তথ্য সংগ্রহ করতে প্রশাসনকে সমস্যায় পড়তে হয়। সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা এবং দুর্ঘটনার পর তথ্য সংগ্রহের জটিলতা—দুই বিষয় বিবেচনায় নিয়ে পর্যটকবাহী যান চলাচল বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানান ইউএনও।

৫ অক্টোবর গাড়ি খাদে পড়ে দুই পর্যটক নিহত

এর আগে গত ৫ অক্টোবর বিকেলে আলীকদম-থানচি সড়কের ২১ কিলোমিটার পয়েন্টে তিন্দু সড়কে একটি গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাহাড়ের খাদে পড়ে যায়। ওই দুর্ঘটনায় দুই পর্যটক নিহত হন। আহত হন আরও পাঁচজন। এ দুর্ঘটনা ঝুঁকিপূর্ণ সড়কটিতে পর্যটকদের যাতায়াতের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। পাহাড়ি এলাকার আঁকাবাঁকা ও ভাঙাচোরা সড়কে যান চলাচলের সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকায় সড়ক সংস্কার এবং নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বান্দরবানের থানচি ও আশপাশের পাহাড়ি এলাকাগুলো পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় গন্তব্য। তবে এসব এলাকায় যাতায়াতের সড়কের অবস্থা, যানবাহনের নিরাপত্তা এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা পর্যটন ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিন্দু বাজারের সংযোগ সড়কে পর্যটকবাহী যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞার ফলে সংস্কারকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওই পথে পর্যটকদের যাতায়াত পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হতে পারে। তাই ভ্রমণের আগে স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা ও সড়কের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

 

এক প্রশ্নেই তোলপাড়, এক মন্তব্যেই ঝড়—করণের শোয়ের ১০ বিস্ফোরক মুহূর্ত

বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:৪৪ অপরাহ্ণ
এক প্রশ্নেই তোলপাড়, এক মন্তব্যেই ঝড়—করণের শোয়ের ১০ বিস্ফোরক মুহূর্ত
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বলিউড তারকাদের ব্যক্তিগত জীবন, প্রেম, বিচ্ছেদ, বন্ধুত্ব ও নানা বিতর্কিত মন্তব্যের সাক্ষী হয়েছে করণ জোহরের জনপ্রিয় সেলিব্রিটি চ্যাট শো ‘কফি উইথ করণ’। তারকাদের হাসি-ঠাট্টার আড়ালে কখনো বেরিয়ে এসেছে অজানা তথ্য, কখনো একটি মন্তব্য ঘিরে তৈরি হয়েছে তুমুল বিতর্ক। এবার নবম মৌসুমের মধ্য দিয়ে বিদায় নিতে যাচ্ছে অনুষ্ঠানটি। ২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর জিওহটস্টারে শুরু হয়েছে এর শেষ অধ্যায়।

২০০৪ সালে যাত্রা শুরু করা অনুষ্ঠানটির আটটি মৌসুমে প্রচারিত হয়েছে ১৬১টি পর্ব। দীর্ঘ এই সময়ে করণের বিখ্যাত ‘কফি কাউচে’ বসেছেন বলিউডের অসংখ্য তারকা। তাঁদের কেউ জানিয়েছেন প্রেমের গল্প, কেউ খুলে বলেছেন সম্পর্কের টানাপোড়েন, আবার কারও মন্তব্য জন্ম দিয়েছে জাতীয় পর্যায়ের বিতর্ক। অনুষ্ঠানটির আলোচিত ১০টি ঘটনা ফিরে দেখা যাক।

১. রণবীর কাপুরকে নিয়ে দীপিকা ও সোনমের মন্তব্য

 

 

২০১০ সালে ‘কফি উইথ করণ’-এর তৃতীয় মৌসুমে অতিথি হয়ে এসেছিলেন দীপিকা পাড়ুকোন ও সোনম কাপুর। কথোপকথনের একপর্যায়ে উঠে আসে দীপিকার সাবেক প্রেমিক রণবীর কাপুরের প্রসঙ্গ। রণবীরের ব্যক্তিগত জীবন ও স্টাইল নিয়ে তাঁদের মন্তব্য দ্রুত আলোচনায় আসে।

সোনম ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, রণবীরের একজন স্টাইলিস্ট প্রয়োজন। প্রেমিক হিসেবে তাঁকে নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্যও করেছিলেন তিনি। দুই অভিনেত্রীর কথাবার্তা ঘিরে সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হয়। তারকাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে টেলিভিশনের আড্ডা কীভাবে বড় বিতর্কে রূপ নিতে পারে, সেটির অন্যতম উদাহরণ হয়ে আছে এই পর্ব।

২. রণবীরকে কনডমের বিজ্ঞাপন করার পরামর্শ দীপিকার

একই মৌসুমে দ্রুত প্রশ্নোত্তরপর্বে করণ জোহর জানতে চেয়েছিলেন, কোন পণ্যের বিজ্ঞাপন করলে রণবীর কাপুরকে মানাবে। জবাবে দীপিকা বলেছিলেন, কনডমের বিজ্ঞাপন।

মন্তব্যটি প্রচারের পরপরই আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। অনেকে এটিকে সাবেক প্রেমিককে উদ্দেশ করে করা রসিকতা হিসেবে দেখেছিলেন। আবার কারও কাছে এটি ছিল ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে প্রকাশ্য খোঁচা। দীপিকা পরে জানান, তিনি কথাটি মজা করেই বলেছিলেন। তবে সেই সংক্ষিপ্ত মন্তব্য দীর্ঘদিন ধরে বলিউডের আলোচিত টেলিভিশন মুহূর্তগুলোর একটি হয়ে রয়েছে।

৩. করণ জোহরকে ‘স্বজনপ্রীতির পতাকাবাহক’ বলেছিলেন কঙ্গনা

২০১৭ সালে ‘রেঙ্গুন’ সিনেমার প্রচারে করণের অনুষ্ঠানে এসেছিলেন কঙ্গনা রনৌত ও সাইফ আলী খান। সেখানেই করণকে সরাসরি বলিউডের স্বজনপ্রীতির পতাকাবাহক বলে আখ্যা দেন কঙ্গনা।

তাঁর অভিযোগ ছিল, বলিউডে তারকা পরিবারের সন্তানরা তুলনামূলক বেশি সুযোগ পান, অথচ চলচ্চিত্রশিল্পের বাইরে থেকে আসা শিল্পীদের নানা বাধার মুখে পড়তে হয়। কঙ্গনার মন্তব্যে প্রথমে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হলেও পরে বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে বিতর্ক শুরু হয়।

এরপর স্বজনপ্রীতি নিয়ে করণ ও কঙ্গনার মতবিরোধ আরও আলোচনায় আসে। বলিউডে সুযোগের বণ্টন, তারকা সন্তানদের সুবিধা এবং বহিরাগত শিল্পীদের সংগ্রাম নিয়ে যে বিতর্ক দীর্ঘদিন ধরে চলছে, এই ঘটনা সেটিকে আরও সামনে নিয়ে আসে।

৪. হার্দিক পান্ডিয়া ও লোকেশ রাহুলের মন্তব্যে ক্রিকেটেও বিতর্ক

২০১৯ সালে ক্রিকেটার হার্দিক পান্ডিয়া ও লোকেশ রাহুলের অংশগ্রহণে প্রচারিত পর্বটি অনুষ্ঠানটির সবচেয়ে বড় বিতর্কগুলোর একটি হয়ে ওঠে। নারীদের নিয়ে হার্দিকের কিছু মন্তব্যকে অসম্মানজনক বলে সমালোচনা করেন দর্শকদের অনেকে।

বিষয়টি শুধু বিনোদনজগতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; ক্রিকেটাঙ্গনেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের প্রশাসক কমিটি দুজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় এবং তাঁদের সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। পরে তাঁদের জরিমানাও করা হয় বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। বিতর্কের পর সংশ্লিষ্ট পর্বটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।

এই ঘটনা দেখিয়ে দেয়, জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠানে করা মন্তব্য একজন তারকার পেশাগত জীবনেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

৫. রাষ্ট্রপতির নাম ভুল বলে মিমের শিকার আলিয়া ভাট

২০১৩ সালে ‘স্টুডেন্ট অব দ্য ইয়ার’ সিনেমার সহশিল্পী বরুণ ধাওয়ান ও সিদ্ধার্থ মালহোত্রার সঙ্গে ‘কফি উইথ করণ’-এ এসেছিলেন আলিয়া ভাট। দ্রুত প্রশ্নোত্তরপর্বে তাঁকে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতির নাম জিজ্ঞেস করা হয়। উত্তরে তিনি ভুল নাম বলেছিলেন; তখন ভারতের রাষ্ট্রপতি ছিলেন প্রণব মুখার্জি।

পর্বটি প্রচারের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলিয়ার সাধারণ জ্ঞান নিয়ে অসংখ্য মিম তৈরি হয়। দীর্ঘদিন তাঁকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ চলে। তবে আলিয়া বিষয়টিকে এড়িয়ে যাননি। নিজের ভুলকে কেন্দ্র করে তৈরি হাস্যরসেও পরে অংশ নেন। ‘জিনিয়াস অব দ্য ইয়ার’ নামের একটি ব্যঙ্গাত্মক ভিডিওতেও দেখা যায় তাঁকে।

৬. ঐশ্বরিয়া রাইকে ‘প্লাস্টিক’ বলেছিলেন ইমরান হাশমি

২০১৪ সালে ‘কফি উইথ করণ’-এর দ্রুত প্রশ্নোত্তরপর্বে ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চনের নাম শুনে ইমরান হাশমি এক শব্দে উত্তর দিয়েছিলেন—‘প্লাস্টিক’। মন্তব্যটি ঐশ্বরিয়ার চেহারা ও সৌন্দর্য নিয়ে অপমানজনক ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচিত হয়।

ঘটনাটি নিয়ে পরে আলোচনা অব্যাহত থাকে। ঐশ্বরিয়া এক সাক্ষাৎকারে তাঁর সম্পর্কে বলা সবচেয়ে খারাপ কথাগুলোর মধ্যে ‘প্লাস্টিক’ মন্তব্যটির কথা উল্লেখ করেছিলেন। ইমরানও পরে এ মন্তব্যের জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করেন। একটি শব্দের উত্তর কীভাবে দীর্ঘস্থায়ী বিতর্ক তৈরি করতে পারে, ঘটনাটি তার উদাহরণ।

৭. কারিনা কাপুর ও প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার অ্যাকসেন্ট নিয়ে খোঁচা

বলিউডের দুই অভিনেত্রী কারিনা কাপুর ও প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার গুঞ্জন একসময় বেশ আলোচিত ছিল। ‘কফি উইথ করণ’-এর তৃতীয় মৌসুমে সাইফ আলী খানের সঙ্গে এসে কারিনা প্রিয়াঙ্কার উচ্চারণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। জানতে চেয়েছিলেন, প্রিয়াঙ্কা ওই ধরনের অ্যাকসেন্ট কোথা থেকে পেয়েছেন।

পরে শহীদ কাপুরের সঙ্গে অনুষ্ঠানে এসে প্রিয়াঙ্কাও পাল্টা জবাব দেন। তিনি বলেন, কারিনার তৎকালীন প্রেমিক সাইফ আলী খান যেখান থেকে তাঁর উচ্চারণ পেয়েছেন, তিনিও সেখান থেকেই পেয়েছেন।

দুই অভিনেত্রীর এই কথার লড়াই বিনোদনমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ব্যক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে গুঞ্জন থাকলেও তাঁদের মন্তব্যগুলো অনুষ্ঠানটির স্মরণীয় মুহূর্তের তালিকায় জায়গা করে নেয়।

৮. আনুশকা শর্মাকে নিয়ে রণবীর সিংয়ের মন্তব্য

‘ব্যান্ড বাজা বারাত’ সিনেমার সাফল্যের পর রণবীর সিং ও আনুশকা শর্মা একসঙ্গে ‘কফি উইথ করণ’-এ হাজির হয়েছিলেন। সেই পর্বে আনুশকাকে উদ্দেশ করে রণবীরের একটি যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য দর্শকদের একাংশের কাছে আপত্তিকর মনে হয়েছিল।

আনুশকাও তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, তাঁর সঙ্গে এভাবে কথা না বলতে। পরবর্তী সময়ে পুরোনো ভিডিও ক্লিপটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাটি আবার আলোচনায় আসে। বিশেষ করে অনুষ্ঠানে তারকাদের কথাবার্তার সীমা ও পারস্পরিক সম্মান নিয়ে বিতর্কের সময় এই পর্বের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে।

৯. ‘আমি এখনো ভার্জিন’—সালমান খানের মন্তব্য

২০১৩ সালে ‘কফি উইথ করণ’-এর চতুর্থ মৌসুমের প্রথম পর্বে অতিথি হয়েছিলেন সালমান খান। তাঁর বিয়ে না করা ও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে দর্শকদের কৌতূহল দীর্ঘদিনের। করণের প্রশ্নের জবাবে সালমান বলেছিলেন, তিনি এখনো ভার্জিন।

সালমানের এই মন্তব্য সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ভক্তদের মধ্যে শুরু হয় নানা জল্পনা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হয় মিম। ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সাধারণত সংযত থাকা সালমানের এমন বক্তব্য তাই বিশেষভাবে নজর কেড়েছিল।

১০. তুষার কাপুরের ‘বোটক্স’ উত্তর নিয়ে বিতর্ক

 

 

অনুষ্ঠানের তৃতীয় মৌসুমে দ্রুত প্রশ্নোত্তরপর্বে ‘বোটক্স’ শব্দের সঙ্গে অভিনেতা তুষার কাপুর প্রীতি জিনতার নাম উল্লেখ করেছিলেন। মন্তব্যটি প্রীতির চেহারা ও সম্ভাব্য প্রসাধনী চিকিৎসা নিয়ে ব্যক্তিগত ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়।

পরে তুষার এ মন্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। তাঁর ব্যাখ্যা ছিল, দ্রুত উত্তর দেওয়ার খেলায় চিন্তাভাবনার সময় খুব কম থাকে। তবু ঘটনাটি আলোচনায় আসে তারকাদের ব্যক্তিগত চেহারা নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে।

শেষ মৌসুমে বিদায় নিচ্ছে ‘কফি উইথ করণ’

২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর করণ জোহর ঘোষণা করেন, নবম মৌসুমের পর আর ফিরবে না ‘কফি উইথ করণ’। ১৪ অক্টোবর জিওহটস্টারে শুরু হয়েছে অনুষ্ঠানটির বিদায়ী মৌসুম। প্রথম পর্বের অতিথি হিসেবে এসেছেন সালমান খান।

নতুন মৌসুমে আরও কয়েকজন জনপ্রিয় বলিউড ও দক্ষিণি চলচ্চিত্র তারকার উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে অনুষ্ঠানটির বিদায়ের ঘোষণাই এখন ভক্তদের কাছে সবচেয়ে বড় খবর। দুই দশকের বেশি সময় ধরে তারকাদের ব্যক্তিগত গল্প ও বিতর্ককে দর্শকের সামনে তুলে ধরা এই শো শেষ হওয়ার মধ্য দিয়ে ভারতীয় বিনোদনজগতের একটি পরিচিত অধ্যায়েরও সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে।

কালের আলো/জেএন/এসএ

 

কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে ডিজিটাল রেজিস্ট্রি করবে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:৩১ অপরাহ্ণ
কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে ডিজিটাল রেজিস্ট্রি করবে সরকার

কৃষকের উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং ভোক্তাদের জন্য সহনীয় দামে খাদ্য সরবরাহের লক্ষ্যে বাজার ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে কৃষকের উৎপাদনসংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল তথ্যভান্ডার বা রেজিস্ট্রি তৈরির পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। তাঁর মতে, উৎপাদন ও বাজারের চাহিদার মধ্যে সমন্বয় করা গেলে একদিকে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে অতিরিক্ত দামের চাপ থেকেও ভোক্তাদের সুরক্ষা দেওয়া যাবে। একই সঙ্গে বিষমুক্ত, নিরাপদ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদনে গবেষক ও বিজ্ঞানীদের আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। কৃষি গবেষণায় যুগান্তকারী উদ্ভাবনের স্বীকৃতি হিসেবে বিজ্ঞানীদের জন্য বিশেষ সম্মাননার ব্যবস্থার কথাও তুলে ধরেছেন মন্ত্রী।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাজধানীর ফার্মগেটে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলে বিশ্ব খাদ্য দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন কৃষিমন্ত্রী। কৃষি মন্ত্রণালয় আয়োজিত এ সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন কৃষি সচিব মো. সেলিম খান।

কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাই চ্যালেঞ্জ

কৃষিমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতিকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে এবং কৃষকের ভাগ্যোন্নয়ন নিশ্চিত করতে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য পাওয়া জরুরি। কিন্তু দেশের কৃষি খাতে অন্যতম বড় সমস্যা হলো উৎপাদিত পণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনা। উৎপাদন বেশি হলে যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে অনেক পণ্য নষ্ট হয়ে যায়। আবার বাজারে সরবরাহ কমে গেলে একই পণ্য ভোক্তাদের বেশি দামে কিনতে হয়। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন কৃষক। উৎপাদন খরচ, শ্রম ও সময় ব্যয় করে ফসল ফলানোর পরও অনেক সময় তাঁরা ন্যায্য দাম পান না। অন্যদিকে মধ্যবর্তী পর্যায়ের বাজার ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহের বিভিন্ন সমস্যার কারণে ভোক্তাদেরও বাড়তি মূল্য দিতে হয়। মন্ত্রী বলেন, এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে কৃষকের স্বার্থ রক্ষা এবং ভোক্তাদের জন্য সহনীয় মূল্যে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে একটি স্থিতিশীল বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।

মৌসুমে ফসলের দাম পড়ে, পরে বাড়ে

কৃষিপণ্যের বাজারে দামের ওঠানামার উদাহরণ হিসেবে টমেটোর কথা তুলে ধরেন কৃষিমন্ত্রী। তিনি জানান, বর্তমানে বাজারে টমেটো অনেক বেশি দামে বিক্রি হলেও ভরা মৌসুমে পর্যাপ্ত দাম না পাওয়ায় কৃষকদের উৎপাদিত টমেটো খেতেই পচে নষ্ট হয়। এ ধরনের পরিস্থিতি কৃষক ও ভোক্তা—উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর। মৌসুমে উৎপাদন বেশি হলে সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে পণ্য বিক্রি করেন, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েন। আবার পরবর্তী সময়ে সরবরাহ কমে গেলে সেই পণ্যের দাম বেড়ে যায়। কৃষিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, উৎপাদন, সংরক্ষণ, সরবরাহ ও বাজারের চাহিদার মধ্যে সমন্বয় না থাকায় এ ধরনের সংকট তৈরি হয়। তাই শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, উৎপাদিত পণ্য কীভাবে সংরক্ষণ ও সঠিক সময়ে বাজারে সরবরাহ করা হবে, সেটিও কৃষি খাতের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

কৃষকের উৎপাদনের তথ্য নিয়ে তৈরি হবে ডিজিটাল রেজিস্ট্রি

কৃষিপণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনতে উৎপাদনসংক্রান্ত তথ্যভান্ডার তৈরির পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। তিনি বলেন, কোন কৃষক কী ধরনের পণ্য কতটুকু উৎপাদন করছেন, তার একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল তথ্য বা রেজিস্ট্রি সরকারের কাছে থাকবে। এ ধরনের তথ্যের ভিত্তিতে উৎপাদনের পরিমাণ, সম্ভাব্য সরবরাহ এবং বাজারের চাহিদা সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়া সহজ হবে।

পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে কোন এলাকায় কোন কৃষিপণ্যের উৎপাদন বেশি হচ্ছে, কোথায় সরবরাহের ঘাটতি তৈরি হতে পারে এবং কোন পণ্যের জন্য সংরক্ষণ বা বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা প্রয়োজন—এসব বিষয়ে পরিকল্পনা করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। কৃষিমন্ত্রীর মতে, উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে সমন্বয় করা গেলে কৃষিপণ্যের বেচাকেনায় টেকসই ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। তবে এ উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে তথ্য সংগ্রহ, হালনাগাদ, সংরক্ষণ এবং সেই তথ্য ব্যবহার করে বাজার ব্যবস্থাপনার বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর।

নিরাপদ ও আন্তর্জাতিক মানের কৃষিপণ্য উৎপাদনে গুরুত্ব

কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনেও গুরুত্ব দিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে অর্গানিক ও নন-জিএমও কৃষিপণ্যের চাহিদা তৈরি হয়েছে। এ বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়াতে বাংলাদেশকে নিরাপদ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদনে আরও মনোযোগী হতে হবে। মন্ত্রী উল্লেখ করেন, এশিয়ার জলবায়ু ও পরিবেশগত বাস্তবতায় শতভাগ অর্গানিক চাষাবাদ চ্যালেঞ্জিং হলেও কীটনাশকমুক্ত ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন সম্ভব। এ ক্ষেত্রে কৃষি গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উৎপাদন পদ্ধতির উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে। তিনি আরও বলেন, দেশের তরুণ শিক্ষিত প্রজন্ম ও নতুন উদ্যোক্তারা কৃষিতে যুক্ত হয়ে যে সাফল্য দেখাচ্ছেন, তা আশাব্যঞ্জক। কৃষিতে নতুন উদ্যোগ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

উদ্ভাবনী বিজ্ঞানীদের বিশেষ সম্মাননা দেওয়ার পরিকল্পনা

কৃষি গবেষণাকে উৎসাহিত করতে বিজ্ঞানীদের জন্য নতুন স্বীকৃতির ব্যবস্থার কথাও জানান কৃষিমন্ত্রী। তিনি বলেন, কৃষিক্ষেত্রে যুগান্তকারী উদ্ভাবনকারী বিজ্ঞানী ও তাঁদের দলকে এককালীন সম্মাননা দেওয়ার পাশাপাশি মূল উদ্ভাবককে আমৃত্যু বিশেষ সম্মাননা দেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, ফসলের উন্নত জাত উদ্ভাবন, রোগবালাই মোকাবিলা এবং পরিবেশবান্ধব চাষাবাদ পদ্ধতি বিকাশে গবেষকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের উদ্ভাবনের যথাযথ স্বীকৃতি বিজ্ঞানীদের গবেষণায় উৎসাহিত করতে পারে। এ ছাড়া অবসর-পরবর্তী সুযোগ-সুবিধা এবং মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি। কৃষি উৎপাদন দীর্ঘমেয়াদে টেকসই রাখতে মাটির উর্বরতা ও গুণাগুণ সংরক্ষণের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন মন্ত্রী।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করে টেকসই কৃষির আহ্বান

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, মাটির গুণাগুণ বজায় রাখা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী। তিনি বলেন, একটি সুন্দর, বাসযোগ্য ও টেকসই বাংলাদেশ এবং পৃথিবী গড়ে তুলতে কৃষি গবেষক, বিজ্ঞানী, কৃষক, উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশ্ব খাদ্য দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, কৃষি গবেষণায় উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা এবং মাটির স্বাস্থ্য রক্ষার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি