খুঁজুন
                               
, ,
           

রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ফের হামলার ঘোষণা জেলেনস্কির

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ২:২১ অপরাহ্ণ
রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ফের হামলার ঘোষণা জেলেনস্কির

রাশিয়ার তেল শোধনাগার ও জ্বালানি অবকাঠামোয় আবারও হামলা চালানোর ঘোষণা দিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তিনি জানিয়েছেন, এসব স্থাপনায় হামলা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে কিয়েভ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের স্বার্থে হামলা বন্ধ রাখার বিষয়ে আলোচনার সুযোগ থাকলেও এর বিনিময়ে আরও মার্কিন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা পাওয়াকে ন্যূনতম শর্ত হিসেবে দেখছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর ২০২৬) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যানশিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি এসব কথা বলেন। রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় হামলা, ওয়াশিংটনের সঙ্গে কিয়েভের সম্পর্ক এবং ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান—সব মিলিয়ে দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়েনের বিষয়টিও উঠে এসেছে তাঁর বক্তব্যে।

‘তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ রাখছি না’

সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘তেল শোধনাগারে হামলার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। আমরা আর হামলা বন্ধ রাখছি না।’

ইউক্রেন দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে আসছে। এসব স্থাপনায় আঘাত হানার মাধ্যমে রাশিয়ার জ্বালানি উৎপাদন, সরবরাহ এবং যুদ্ধ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরির চেষ্টা করছে কিয়েভ।

তবে জেলেনস্কির সাম্প্রতিক বক্তব্যের মধ্য দিয়ে হামলা বন্ধ রাখার সাময়িক সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তাঁর এই অবস্থান এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্য এবং ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির প্রশ্নে ওয়াশিংটন ও কিয়েভের মধ্যে মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে।

ট্রাম্পের রাশিয়া নীতি নিয়ে অসন্তোষ

ফিন্যানশিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার সঙ্গে ব্যবসায়িক চুক্তি করতে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের সমালোচনা করেছেন জেলেনস্কি। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রকাশ্য সমর্থন নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন তিনি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত শনিবার ট্রাম্প ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট পদ থেকে জেলেনস্কিকে সরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় ইউক্রেনের হামলার সমালোচনাও করেন তিনি।

এর এক দিন আগে রাশিয়ার কাছ থেকে ডিজেল সরবরাহের একটি চুক্তির কথা জানান ট্রাম্প। গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানির দাম বেড়ে যায়। সেই মূল্যবৃদ্ধির চাপ সামাল দেওয়ার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই রাশিয়ার কাছ থেকে ডিজেল সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জেলেনস্কির দৃষ্টিতে, একদিকে ইউক্রেনকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হচ্ছে, অন্যদিকে মস্কোর সঙ্গে ওয়াশিংটনের জ্বালানি ও ব্যবসায়িক সম্পর্কের উদ্যোগ কিয়েভের অবস্থানকে জটিল করে তুলছে।

ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির পর দুই দিন হামলা বন্ধ রেখেছিল ইউক্রেন

চলতি সপ্তাহের শুরুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জেলেনস্কি জানান, জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধ রাখতে ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়ার পর ইউক্রেন দুই দিনের জন্য রাশিয়ার তেল শোধনাগার ও অন্যান্য জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ রেখেছিল।

তবে ওই বিরতির সময়ও ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগাম সতর্কবার্তা পাচ্ছিল না বলে ফিন্যানশিয়াল টাইমসকে জানিয়েছেন জেলেনস্কি।

একই সময়ে ইউক্রেনজুড়ে ইলন মাস্কের স্যাটেলাইটভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থা স্টারলিংকের গতি কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলেও তিনি দাবি করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এতে যুদ্ধের সম্মুখসারিতে ইউক্রেনীয় সেনাদের কার্যক্রম এবং রাশিয়ার সামরিক স্থাপনায় মাঝারি পাল্লার হামলা পরিচালনা বাধাগ্রস্ত হয়।

ইউক্রেনের জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগব্যবস্থা ও গোয়েন্দা তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। এসব সুবিধা সীমিত হলে সেনাদের মধ্যে সমন্বয়, প্রতিপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিষয়ে আগাম প্রস্তুতি এবং দূরপাল্লার সামরিক অভিযান পরিচালনায় জটিলতা তৈরি হতে পারে।

গোয়েন্দা তথ্য বন্ধের হুঁশিয়ারির অভিযোগ

জেলেনস্কির দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা ইউক্রেনের সামরিক কর্মকর্তাদের জানিয়েছিলেন, জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ না করলে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, পরে কিয়েভকে জানানো হয়েছিল, গোয়েন্দা তথ্যসংক্রান্ত সমস্যাটি একটি কারিগরি ত্রুটির কারণে ঘটেছে। তবে স্টারলিংক ব্যবস্থায় কোনো কারিগরি ত্রুটির কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল বলে তিনি মনে করেন না।

ফিন্যানশিয়াল টাইমসকে জেলেনস্কি বলেন, ‘এটি কোনো কারিগরি সমস্যা ছিল না, এটি ছিল ইচ্ছাকৃত সিদ্ধান্ত।’

তবে তাঁর এই অভিযোগের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ ও স্টারলিংকের গতি কমানোর ঘটনাগুলোর পেছনে কী কারণ ছিল, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ সীমিত।

হামলা বন্ধের বিনিময়ে আরও প্যাট্রিয়ট চান জেলেনস্কি

হোয়াইট হাউসের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করতে রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ রাখতে ইউক্রেন রাজি কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে জেলেনস্কি বলেন, এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি আরও প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা পেলে তিনি বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন।

তিনি বলেন, আরও প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাওয়া হবে তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য সর্বনিম্ন শর্ত।

প্যাট্রিয়ট একটি উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, যা ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন ধরনের আকাশপথের হুমকি মোকাবিলায় ব্যবহৃত হয়। রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা থেকে গুরুত্বপূর্ণ শহর, সামরিক স্থাপনা এবং অন্যান্য অবকাঠামো রক্ষায় ইউক্রেনের জন্য এ ধরনের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম গুরুত্বপূর্ণ।

জেলেনস্কির বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ রাখার বিষয়টি কেবল যুদ্ধবিরতির প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তাও জড়িত।

ওয়াশিংটন-কিয়েভ সম্পর্কে নতুন চাপ

রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধ রাখা, গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ এবং স্টারলিংক ব্যবহারের মতো বিষয়গুলো ইউক্রেনের যুদ্ধ পরিচালনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এসব ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত কিয়েভের সামরিক পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্য নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্যোগ এবং পুতিনের প্রতি ট্রাম্পের অবস্থান ইউক্রেনের নেতৃত্বের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে বলে জেলেনস্কির বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

এ অবস্থায় রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা পুনরায় শুরু করার ঘোষণা এবং হামলা বন্ধের বিনিময়ে আরও প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষাব্যবস্থা চাওয়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র-ইউক্রেন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তবে জেলেনস্কির ঘোষণার পর রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় নতুন হামলা কখন বা কী মাত্রায় চালানো হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে তাঁর প্রস্তাবের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়াও এখনো স্পষ্ট নয়।

কালের আলো/জেএন/এসএ

ব্যাংকক থেকে ঢাকায় কুশের চালান, নেপথ্যে ত্রিদেশীয় সিন্ডিকেট

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:০৪ অপরাহ্ণ
ব্যাংকক থেকে ঢাকায় কুশের চালান, নেপথ্যে ত্রিদেশীয় সিন্ডিকেট

বাংলাদেশকে নতুন মাদকের বাজারে পরিণত করার পরিকল্পনা নিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একটি আন্তর্জাতিক পাচারচক্র। থাইল্যান্ড থেকে ভারতীয় নাগরিকদের মাধ্যমে আকাশপথে কুশ এনে দেশের ভেতরে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে চক্রটি। পাচারের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে পোশাক, প্রসাধনীসহ বিভিন্ন পণ্যের আড়াল। বিমানবন্দরে ধারাবাহিক অভিযানে একাধিক চালান ও বিদেশি নাগরিক গ্রেপ্তারের ঘটনায় সামনে এসেছে মাদকটির বিস্তারের নতুন কৌশল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদ্বেগ, বিদেশি পাচারকারীদের পাশাপাশি দেশীয় সহযোগীদের সক্রিয়তা এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

  • ভারতীয় নাগরিকদের বাহক হিসেবে ব্যবহার করে দেশে মাদক ছড়ানোর অভিযোগ
  • বিমানবন্দর ও সীমান্তকে ঘিরে সক্রিয় পাচারচক্র

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক কয়েক মাসে কুশের একাধিক চালান জব্দ হয়েছে। গত জুলাই ও আগস্টে পাঁচটি পৃথক অভিযানে প্রায় ৩০ কেজি কুশ উদ্ধার এবং ভারতীয় তিন নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। এর বাইরে সীমান্তেও চালান আটকের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ বুধবার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভারতীয় নাগরিক অভিজিৎ দাসের কাছ থেকে চার কেজি ২৮০ গ্রাম কুশ উদ্ধার করা হয়। অভিযোগ, ভারতীয় শাড়ির নিচে লুকিয়ে তিনি মাদকটি দেশে এনেছিলেন।

তিন দেশের যোগসাজশ, দেশীয় বাজারে বিস্তারের পরিকল্পনা
ডিএনসির কর্মকর্তাদের ভাষ্য, থাইল্যান্ডের ব্যাংককভিত্তিক সরবরাহকারীদের কাছ থেকে কুশ সংগ্রহ করে ভারতীয় বাহকেরা বাংলাদেশে নিয়ে আসছে। পরে স্থানীয় সহযোগীদের মাধ্যমে তা দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এই কাজে ভারতের নিম্ন আয়ের মানুষকে বাহক হিসেবে ব্যবহারের তথ্যও পেয়েছেন তদন্তকারীরা।

ডিএনসির ঢাকা মেট্রো (উত্তর) কার্যালয়ের উপপরিচালক রাজিউর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, বিদেশি নাগরিকদের পাশাপাশি বাংলাদেশের কয়েকজন মাদক কারবারিকেও শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে তদন্ত চলছে। এর আগে গ্রেপ্তার হওয়া একাধিক ভারতীয় নাগরিকের জিজ্ঞাসাবাদেও স্থানীয় সহযোগীদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে।

পাচারের রুট হিসেবে বিমানবন্দরের পাশাপাশি স্থলসীমান্ত ব্যবহারের বিষয়টিও সামনে এসেছে। ডিএনসির তথ্য বলছে, বাংলাদেশে কয়েক দিন অবস্থান করে চালান হস্তান্তরের পর চক্রের সদস্যরা বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে ফিরে যায়। অন্যদিকে, গত ৬ আগস্ট সাতক্ষীরা সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ১২ কেজি কুশসহ একজন গ্রেপ্তার হন। ফলে আকাশপথ ও স্থলপথ—দুই দিকেই নজরদারি জোরদারের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হচ্ছে।

উচ্চমাত্রার নেশা, বাড়ছে জনস্বাস্থ্যঝুঁকি
কুশ মূলত উচ্চমাত্রার টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল (টিএইচসি) সমৃদ্ধ গাঁজাজাতীয় মাদক। এর মনঃপ্রভাব সৃষ্টিকারী উপাদান বেশি থাকায় সেবনে বিচারবোধ, স্মৃতিশক্তি ও স্বাভাবিক চিন্তাপ্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। অতিরিক্ত ব্যবহারে গুরুতর মানসিক ও শারীরিক জটিলতার ঝুঁকিও রয়েছে। ডিএনসির পরীক্ষাগার বিশ্লেষণে মাদকটির উচ্চ ঝুঁকির বিষয়টি উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সাল থেকে তরুণদের মধ্যে কুশের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অভিজাত পরিবারের তরুণদের কাছে এর চাহিদা থাকার তথ্যও তদন্তে এসেছে। উচ্চমূল্যের কারণে মাদকটি সীমিত পরিসরের বাজারে বিক্রি হলেও সেই বাজার বিস্তারের চেষ্টা করছে পাচারকারীরা।

শুধু চালান জব্দ নয়, প্রয়োজন সমন্বিত অভিযান
বারবার চালান উদ্ধার হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়িয়ে আরও মাদক দেশে ঢুকেছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তাই বাহক গ্রেপ্তারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী, অর্থায়নকারী ও স্থানীয় পরিবেশকদের শনাক্ত করা জরুরি। বিমানবন্দরে যাত্রী ও পণ্যের ঝুঁকিভিত্তিক তল্লাশি, সীমান্ত নজরদারি এবং সংশ্লিষ্ট দেশের সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কুশের বিস্তার ঠেকাতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি তরুণদের মধ্যে সচেতনতা, মাদকাসক্তদের চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, পাচারচক্রের বিরুদ্ধে অভিযান সফল হলেও চাহিদা ও স্থানীয় বিতরণব্যবস্থা অক্ষত থাকলে নতুন চালানের পথ বন্ধ করা কঠিন হবে।

কালের আলো/ওয়াইএ/এমকে

বই পড়ার অভ্যাস কমছে, নাকি বদলে যাচ্ছে পাঠের মাধ্যম?

কালের আলো রিপোর্ট
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:০৩ অপরাহ্ণ
বই পড়ার অভ্যাস কমছে, নাকি বদলে যাচ্ছে পাঠের মাধ্যম?

একসময় অবসর কাটানোর অন্যতম সঙ্গী ছিল বই। গল্প-উপন্যাস, কবিতা কিংবা প্রবন্ধের পাতায় ডুবে থাকতেন পাঠকেরা। বাসা, লাইব্রেরি কিংবা যাত্রাপথে হাতে বই নিয়ে সময় কাটানোর দৃশ্যও ছিল পরিচিত। তবে সময়ের পরিবর্তনে পাঠের ধরনেও এসেছে নতুন মাত্রা। স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ই-বুক ও অডিওবুকের বিস্তারে এখন বই পড়ার অভিজ্ঞতা অনেকটাই বদলে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—মানুষের বই পড়ার অভ্যাস কি সত্যিই কমছে, নাকি কেবল বদলে যাচ্ছে পড়ার মাধ্যম?

প্রযুক্তির প্রসারে বই পড়ার জন্য এখন আর মুদ্রিত বইয়ের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে হয় না। স্মার্টফোনেই পড়া যাচ্ছে গল্প, উপন্যাস, কবিতা ও নানা ধরনের প্রবন্ধ। অডিওবুকের মাধ্যমে বই শোনার সুযোগও তৈরি হয়েছে। ফলে ব্যস্ত জীবনে অনেকে যাতায়াতের সময় কিংবা কাজের ফাঁকে ডিজিটাল মাধ্যমে পাঠের সুযোগ নিচ্ছেন।

তবে ডিজিটাল কনটেন্টের সহজলভ্যতা যেমন পাঠের নতুন দরজা খুলেছে, তেমনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ছোট ভিডিও ও অনলাইন বিনোদনের সঙ্গে সময়ের প্রতিযোগিতাও বাড়িয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে একটি বই পড়ার পরিবর্তে দ্রুত পরিবর্তনশীল কনটেন্টে অভ্যস্ত হয়ে পড়ার প্রবণতা পাঠাভ্যাসের ওপর কী প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা প্রয়োজন।

মুদ্রিত বইয়ের আবেদন কি কমছে?
প্রযুক্তির বিস্তার সত্ত্বেও মুদ্রিত বইয়ের প্রতি পাঠকের আগ্রহ পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। বইয়ের পাতা উল্টে পড়া, নিজের পছন্দের অংশে দাগ দেওয়া কিংবা বই সংগ্রহে রাখার অভিজ্ঞতা অনেক পাঠকের কাছে এখনও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

বিশেষ করে উপহার হিসেবে বই দেওয়া, ব্যক্তিগত সংগ্রহ গড়ে তোলা এবং বইমেলা থেকে পছন্দের বই কেনার অভ্যাস মুদ্রিত বইকে আলাদা পরিচয় দেয়। তবে পাঠকের আগ্রহের প্রকৃত পরিবর্তন বুঝতে বই বিক্রির পরিসংখ্যান, প্রকাশনা খাতের তথ্য এবং পাঠকের অভিজ্ঞতা একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা জরুরি।

স্মার্টফোন কি বইয়ের বিকল্প হয়ে উঠছে?
স্মার্টফোন এখন তথ্য ও বিনোদনের অন্যতম সহজলভ্য মাধ্যম। একই যন্ত্রে সংবাদ পড়া, ভিডিও দেখা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার এবং ই-বুক পড়ার সুযোগ রয়েছে। ফলে অনেকের পাঠের সময় বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল কনটেন্টের মধ্যে ভাগ হয়ে যাচ্ছে।

একদিকে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বই পাওয়া সহজ হওয়ায় নতুন পাঠক তৈরি হওয়ার সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে নোটিফিকেশন, বিজ্ঞপ্তি ও অন্যান্য কনটেন্টের কারণে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘ উপন্যাস বা বিশ্লেষণধর্মী লেখা পড়তে যে একাগ্রতা প্রয়োজন, তা ধরে রাখতে পাঠককে সচেতনভাবে সময় বের করতে হতে পারে।

তবে ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করলেই কেউ কম বই পড়ছেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। একজন পাঠক মুদ্রিত বই কম কিনলেও ই-বুক বা অডিওবুকের মাধ্যমে নিয়মিত পড়াশোনা করতে পারেন। তাই পাঠাভ্যাস মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু বই কেনার হিসাব নয়, মানুষ কতটা পড়ছেন এবং কী ধরনের লেখা পড়ছেন, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

তরুণ প্রজন্মের পাঠাভ্যাসে কী পরিবর্তন আসছে?
তরুণদের একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাহিত্য, বইয়ের পর্যালোচনা ও লেখকদের পরিচিতি সম্পর্কে জানতে পারছেন। অনলাইনে বই নিয়ে আলোচনা, পাঠকের মতামত এবং বিভিন্ন সাহিত্যভিত্তিক পেজ নতুন বইয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরিতেও ভূমিকা রাখতে পারে।

আবার ডিজিটাল বিনোদনের বিপুল বিকল্প থাকায় নিয়মিত বই পড়ার জন্য সময় বের করা অনেকের কাছে কঠিন হতে পারে। পড়াশোনার বাইরে অবসর সময়ে বই পড়ার অভ্যাস কতটা বজায় থাকছে, তা জানতে শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক ও গ্রন্থাগারিকদের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ।

এ ক্ষেত্রে প্রজন্মভিত্তিক তুলনার পাশাপাশি শহর ও গ্রামের পাঠক, বিভিন্ন বয়সের মানুষ এবং ভিন্ন আর্থসামাজিক অবস্থার পাঠকদের অভিজ্ঞতাও বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ সবার জন্য বইয়ের প্রাপ্যতা, অবসর সময় ও ডিজিটাল সুবিধা এক রকম নয়।

পাঠক তৈরি করতে লাইব্রেরি ও প্রকাশকদের ভূমিকা
পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পাঠাগার, প্রকাশক ও সাহিত্য সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শিশুদের ছোটবেলা থেকে বইয়ের সঙ্গে পরিচিত করা, স্কুলে নিয়মিত পাঠচর্চার সুযোগ তৈরি এবং স্থানীয় পাঠাগারগুলোকে সক্রিয় রাখা এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।

একই সঙ্গে পাঠকের আগ্রহ অনুযায়ী মানসম্মত বই প্রকাশ, বই সম্পর্কে সহজবোধ্য আলোচনা এবং লেখক-পাঠকের যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগও প্রয়োজন। মুদ্রিত বইয়ের পাশাপাশি ই-বুক ও অডিওবুকের মতো মাধ্যমকে কাজে লাগানো গেলে ভিন্ন ধরনের পাঠকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

কমছে পাঠ, নাকি বদলাচ্ছে অভ্যাস?
বই পড়ার অভ্যাস কমছে কি না, তার উত্তর কেবল ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পাঠাভ্যাসবিষয়ক জরিপ, বই বিক্রির তথ্য, গ্রন্থাগারের ব্যবহার এবং ডিজিটাল মাধ্যমে পাঠের পরিসংখ্যান প্রয়োজন।

একটি বিষয় স্পষ্ট—প্রযুক্তি মানুষের পড়ার সুযোগ ও পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনেছে। কিন্তু সেই পরিবর্তন সব পাঠকের ক্ষেত্রে একই রকম নয়। কেউ মুদ্রিত বইয়ের প্রতি আগ্রহ ধরে রেখেছেন, কেউ ডিজিটাল মাধ্যমে ঝুঁকেছেন, আবার কেউ নানা ধরনের বিনোদনের চাপে নিয়মিত পড়ার সময় হারাচ্ছেন।

বই পড়ার সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার জন্য তাই শুধু মুদ্রিত বইয়ের ব্যবহার বাড়ানোর কথা বললেই হবে না; বরং মানুষের মধ্যে নিয়মিত পড়ার আগ্রহ, মনোযোগ ও সুযোগ তৈরি করাও জরুরি। মাধ্যম বদলাতে পারে, কিন্তু জ্ঞান অর্জন, কল্পনাশক্তির বিকাশ এবং গভীরভাবে চিন্তা করার জন্য পাঠের গুরুত্ব রয়ে যায়।

প্রশ্নটি তাই শুধু মানুষ বই পড়ছে কি না, তা নয়; বরং তারা কী পড়ছে, কতটা পড়ছে এবং পড়ার জন্য কতটা সময় দিচ্ছে—সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

কালের আলো/জেএন/এসএ

দুই প্রিয়জনকে হারিয়ে নিঃস্ব আরিফ, তবু কারও কাছে হাত পাতেন না

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:৫৯ অপরাহ্ণ
দুই প্রিয়জনকে হারিয়ে নিঃস্ব আরিফ, তবু কারও কাছে হাত পাতেন না

জীবনের প্রতিকূলতা যেন পিছু ছাড়ছে না ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা পৌরসভার নোয়াপাড়া গ্রামের আরিফের। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, বাবাকে হারানোর শোক, ক্যানসারে ছোট ভাইয়ের মৃত্যু, আর্থিক সংকটে বন্ধ হয়ে যাওয়া পড়াশোনা—সব মিলিয়ে কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে তাঁর জীবন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে অসুস্থ মায়ের দেখাশোনা, নিজের সংসারের খরচ এবং সন্তানসম্ভবা স্ত্রীর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রতিনিয়ত দুশ্চিন্তায় দিন কাটে তাঁর।

তবু মানুষের কাছে হাত পেতে বেঁচে থাকার পথ বেছে নেননি আরিফ। বরং কসবা বাজারের একটি ছোট্ট দোকানে মোবাইল ফোনের বিভিন্ন সরঞ্জাম বিক্রি এবং মানুষের ওজন মেপে সামান্য আয় করে সংসার চালাচ্ছেন তিনি। প্রয়োজনীয় পণ্য কেনার মতো পর্যাপ্ত পুঁজি নেই, ব্যবসা বড় করার সামর্থ্যও সীমিত। তারপরও নিজের শ্রমে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখেন এই যুবক। তাঁর চাওয়া খুব বেশি নয়—সামান্য আর্থিক সহায়তা কিংবা কর্মসংস্থানের একটি সুযোগ। এতটুকু সহযোগিতা পেলে ব্যবসাটি সম্প্রসারণ করে পরিবারের দায়িত্ব আরও ভালোভাবে পালন করতে পারবেন বলে আশা আরিফের।

ক্যানসারে বাবা-ভাইকে হারিয়ে থমকে যায় পড়াশোনা

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা পৌরসভার নোয়াপাড়া গ্রামের হানিফ মিয়ার ছেলে আরিফ। কসবা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই ব্যবসার প্রতি আগ্রহ ছিল তাঁর। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্নও ছিল। কিন্তু পারিবারিক আর্থিক সংকট ও একের পর এক শোক সেই স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। প্রথমে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তাঁর ছোট ভাই। এই মৃত্যু তাঁকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। এরপর ২০২৪ সালে একই রোগে বাবাকেও হারান তিনি। পরিবারের দুই প্রিয়জনকে হারানোর শোকের পাশাপাশি বেড়ে যায় আর্থিক চাপ। সংসারের দায়িত্ব ও মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি আরিফ। একসময় যে শিক্ষাজীবন এগিয়ে নেওয়ার কথা ছিল, সেই জায়গায় তাঁকে নামতে হয় জীবিকার কঠিন লড়াইয়ে। নিজের শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে উপার্জনের পথ খুঁজতে থাকেন তিনি।

ওজন মাপার যন্ত্র থেকে ছোট্ট দোকান

২০২০ সালে একটি ছোট ওজন মাপার যন্ত্র দিয়ে উপার্জন শুরু করেন আরিফ। সেই সামান্য আয় দিয়েই জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা চলতে থাকে। পরে পরিবারের খরচ মেটানোর প্রয়োজন বাড়লে কসবা বাজারে ছোট্ট একটি স্টলে ব্যবসা শুরু করেন তিনি। দোকানে মোবাইল ফোনের কাভার, হেডফোন, মানিব্যাগসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করেন। পাশাপাশি বাজারে আসা মানুষের ওজন মেপেও কিছু টাকা আয় করেন। প্রতিদিনের এই সীমিত উপার্জন দিয়েই চলে তাঁর সংসার। আরিফের দোকানে পণ্যের চাহিদা রয়েছে বলে জানান তিনি। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী মালামাল কিনতে না পারায় ব্যবসার পরিসর বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। হাতে পর্যাপ্ত পুঁজি থাকলে আরও বেশি পণ্য সংগ্রহ করতে পারতেন, বাড়াতে পারতেন বিক্রিও। কিন্তু আর্থিক সীমাবদ্ধতায় সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারছেন না।

একদিকে সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়, অন্যদিকে ব্যবসায় নতুন পণ্য তোলার খরচ—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে গিয়ে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁকে।

অসুস্থ মা, সন্তানসম্ভবা স্ত্রী—দুশ্চিন্তা বাড়ছে

আরিফের জীবনের লড়াই শুধু নিজের জীবিকা নির্বাহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর মা অসুস্থ। অন্যদিকে স্ত্রীও সন্তানসম্ভবা। ফলে সামনে নতুন অতিথির আগমনকে ঘিরে আনন্দের পাশাপাশি রয়েছে বাড়তি দুশ্চিন্তা। একজন উপার্জনক্ষম মানুষ হিসেবে পরিবারের সব দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে তাঁকে। প্রতিদিনের ব্যবসা থেকে যে আয় হয়, তা দিয়ে সংসারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করাই কঠিন। এর মধ্যে মায়ের চিকিৎসা, স্ত্রীর যত্ন এবং অনাগত সন্তানের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে ভাবতে হচ্ছে তাঁকে। আরিফের কাছে ছোট্ট দোকানটি তাই শুধু উপার্জনের জায়গা নয়; এটি পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার অবলম্বন, নিজের আত্মমর্যাদা ধরে রাখার আশ্রয়ও।

‘ভিক্ষা ছাড়া কী করতে পারবা’—কটাক্ষেও দমেননি

অভাবের কারণে অনেকেই তাঁকে ভিক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন। কেউ কেউ কটাক্ষ করে বলেছেন, ভিক্ষা ছাড়া আর কী করতে পারবেন তিনি। কিন্তু এসব কথায় ভেঙে পড়েননি আরিফ। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করে যাওয়ার সিদ্ধান্তেই অটল থেকেছেন। আরিফ বলেন, “আমি আমার পরিবারের উপার্জনের একমাত্র মাধ্যম। অনেকেই ভিক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন। কেউ কেউ বলেছেন, ভিক্ষা ছাড়া তুমি আর কী করতে পারবা? তবে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি হালালভাবে ব্যবসা করে, পরিশ্রম করে আয় করার।” তাঁর এই মনোভাবই স্থানীয় অনেকের কাছে প্রশংসা কুড়িয়েছে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ও আর্থিক সংকটের মধ্যেও নিজের শ্রমে উপার্জনের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়াকে তাঁরা ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন।

ক্রেতাদের চোখে পরিশ্রমী আরিফ

কসবা বাজারে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করছেন আরিফ। তাঁর কাছ থেকে পণ্য কেনা ক্রেতাদের কেউ কেউ জানান, সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও তিনি ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁরা চান, আরিফ যেন প্রয়োজনীয় সহায়তা পেয়ে ব্যবসাটি আরও ভালোভাবে পরিচালনা করতে পারেন। ক্রেতা ফয়েজুর রহমান বলেন, “আমি আরিফের কাছ থেকে একটি মানিব্যাগ কিনেছি। ফুটপাতে এরকম ভালো জিনিস সচরাচর পাওয়া যায় না। জিনিস খুব ভালো। আরিফ এখানে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করছে। আমরা চাই, সরকারিভাবে যেন তাকে সহায়তা দেওয়া হয়।” আরেক ক্রেতা সালাহউদ্দিন আইয়ুবী বলেন, “তার বাবা নেই, মা আছেন। সঙ্গে তার পরিবারও আছে। সে ইচ্ছা করলেই মানুষের কাছে হাত পাততে পারতেন, কিন্তু সেটা না করে দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।” স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও মনে করেন, উপযুক্ত সহায়তা পেলে আরিফের পক্ষে নিজের ব্যবসা আরও ভালোভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হতে পারে।

আরিফের দীর্ঘদিনের এক সহকর্মী ব্যবসায়ী বলেন, তিনি প্রায় ছয় বছর ধরে আরিফের সঙ্গে ব্যবসা করছেন। আরিফ মোটামুটি শিক্ষিত। সরকার যদি তাঁর যোগ্যতা অনুযায়ী কোনো চাকরির ব্যবস্থা করে দেয়, তাহলে তিনি কাজটি করতে পারবেন এবং পরিবার নিয়ে ভালোভাবে চলতে পারবেন বলে আশা করেন ওই ব্যবসায়ী। পার্শ্ববর্তী ব্যবসায়ী মো. হানিফ মিয়া বলেন, “আরিফ একজন প্রতিবন্ধী। প্রতিবন্ধী হয়েও সে নিজের শ্রমের বিনিময়ে হালালভাবে উপার্জন করে যাচ্ছে। সরকার তাকে সহায়তা করলে ব্যবসাটাকে আরেকটু উন্নত করতে পারত।”

সামান্য পুঁজিই আরিফের বড় স্বপ্নের ভিত্তি

নিজের ব্যবসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে আরিফ বলেন, “আমি কসবা বাজারে ২০২০ সাল থেকে ব্যবসা করে আসছি। প্রথমে ছোট্ট একটি ওজন মাপার মেশিন দিয়ে শুরু করি। পরে পরিবারের চাহিদা মেটানোর জন্য ছোট্ট একটি স্টলে ব্যবসা শুরু করি। আমার পরিবার দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত। তাই সামান্য পুঁজি দিয়ে ব্যবসাটি শুরু করেছি।” তিনি আরও বলেন, পণ্যের চাহিদা থাকলেও আর্থিক সংকটের কারণে ব্যবসাটি ঠিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। বিভিন্ন সময়ে অনেকে সহযোগিতা করলেও এখনো সরকারিভাবে কোনো সহায়তা পাননি বলে জানান তিনি। আরিফের আবেদন, সরকার ও সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা যেন তাঁর ক্ষুদ্র ব্যবসা পরিচালনার জন্য সামান্য আর্থিক সহায়তা দেন। সেই সহায়তা দিয়ে প্রয়োজনীয় পণ্য কিনে ব্যবসার পরিসর বাড়াতে চান তিনি। এতে আয় বাড়লে পরিবারের খরচ মেটানো এবং অসুস্থ মায়ের দেখাশোনা করাও কিছুটা সহজ হবে বলে তাঁর প্রত্যাশা।

সহায়তা পেলে বদলাতে পারে পরিবারের পরিস্থিতি

আরিফের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য আর্থিক সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ কিংবা যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ জীবিকা নির্বাহের নতুন পথ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা ব্যক্তিদের কর্মসংস্থান ও স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ বাড়ানো গেলে তাঁরা নিজেদের সামর্থ্য কাজে লাগিয়ে পরিবার ও সমাজে অবদান রাখতে পারেন। কসবা বাজারের স্থানীয়দের প্রত্যাশা, আরিফের পরিশ্রম ও আত্মমর্যাদাবোধের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁর পাশে দাঁড়ানো হবে। সরকারি সহায়তা কিংবা সামান্য পুঁজি পেলে তাঁর ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি তাঁর যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরির সুযোগ তৈরি হলেও পরিবার নিয়ে একটু ভালোভাবে বেঁচে থাকার পথ খুলবে। কসবা উপজেলা মার্কেটের পশ্চিম কোণে ছোট্ট দোকানটিতে প্রতিদিন নিজের জীবনসংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন আরিফ। বাবা ও ভাইকে হারানোর বেদনা, বন্ধ হয়ে যাওয়া পড়াশোনা, অসুস্থ মা, সন্তানসম্ভবা স্ত্রী আর অভাবের চাপ—সবকিছুর মধ্যেও তিনি হাল ছাড়েননি।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি