চলমান গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়ছে পুরো অর্থনীতি ও দৈনন্দিন জীবনে। গ্যাসের চাপ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় টেক্সটাইল, ডাইং ও স্পিনিং মিলগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশে নেমে এসেছে। চলমান গ্যাস সংকটে উৎপাদন ধরে রাখতে অস্বাভাবিকভাবে খরচ বাড়ছে। বাড়তি ওভারটাইম দেওয়া ও বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে টেক্সটাইল-পোশাক খাত মিলিয়ে প্রতিদিন আনুমানিক ১০০ থেকে ১২০ কোটি টাকার উৎপাদন ব্যাহত ও ক্ষতি হচ্ছে। এমন তথ্য দিয়েছে বাংলাদেশ টেক্সটাইলস মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)।
একইরকমভাবে ধুঁকছে সিরামিক এবং স্টিল শিল্পখাত। বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শেখ মাসাদুল আলম মাসুদ গণমাধ্যমকে জানান, বিদ্যুৎ ও ডিজেল দিয়ে রোলিং মিল অপারেশনে রাখতে প্রতি টন স্টিল উৎপাদনে বাড়তি ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি মইনুল ইসলাম সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, ভাটিতে হঠাৎ করে গ্যাসের চাপ শূন্যের কোঠায় নামলে প্রতিদিন পঁচে নষ্ট হওয়া কাঁচামাল ও উৎপাদন ক্ষতির পরিমাণ ২০ কোটি টাকার ওপর। এই ক্ষতির মুখোমুখি এখন সিরামিক শিল্প।
গ্যাসের সংকটের প্রভাব পড়েছে বিদ্যুত উৎপাদনেও। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতকেন্দ্রগুলোতে জ্বালানির সরবরাহ কমে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুত উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে, ফলে বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং বেড়েছে। একই সঙ্গে সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় দীর্ঘ লাইন সৃষ্টি হচ্ছে, যা পরিবহন খাতেও প্রভাব ফেলছে। জ্বালানি সংকটে বন্ধ হচ্ছে কারখানা। বাড়ছে বেকারত্ব। বাড়ছে অথনৈতিক ঝুঁকি।
শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-এর জুন থেকে ২০২৬-এর জুন—এই দুই বছরে মোট ৪৫৭টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে ১৭০টি বস্ত্র/পোশাক শিল্প, বাকি ২৮৭টি পোশাকখাত বহির্ভূত। এতে কমবেশি ৫০ হাজার শ্রমিক বেকার হয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জুলাই ২০২৬-এর ভয়াবহ গ্যাস সংকটের প্রভাব। ব্যবসায়ীদের সংগঠনগুলো বলছে, বর্তমান সংকটে ইতিমধ্যে প্রায় ২৫০০ শিল্পকারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ব্যবসায়ীদের শঙ্কা, সময়মতো শিপমেন্ট না হলে ক্রয়াদেশ বাতিল, জরিমানা, বাজার হারানো এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
এছাড়াও ভোগান্তিতে পড়েছেন আবাসিক গ্রাহকেরা। রাজধানীর অনেক এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় চুলায় গ্যাস থাকে না। অনেক পরিবারকে গভীর রাতে রান্না করতে হচ্ছে। আবার কেউ কেউ এলপিজির ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন। অথচ গ্যাস না পেলেও আবাসিক গ্রাহকদের বিল দিতে হচ্ছে প্রতি মাসে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে শিল্প খাতে খেলাপি ঋণ আরও বাড়তে পারে। ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাবে এবং নতুন ঋণ বিতরণও বাধাগ্রস্ত হবে। ফলে গ্যাস সংকটের প্রভাব শুধু শিল্পে সীমাবদ্ধ না থেকে আর্থিক খাতেও ছড়িয়ে পড়বে। একইসঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাও দুর্বল হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
পেট্রোবাংলার হিসাব বলছে, বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট (এমএমসিএফডি)। অথচ স্বাভাবিক সময়েও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যায় গড়ে প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ প্রতিদিনই প্রায় ১১৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থাকে।
তবে গত বৃহস্পতিবার এক বিজ্ঞপ্তিতে তিতাস গ্যাস জানিয়েছে, মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে রি-গ্যাসিফাইড এলএনজি (আরএলএনজি) সরবরাহ দৈনিক প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) কমে গেছে। ফলে, তিতাস গ্যাসের আওতাধীন এলাকায় আবাসিক, শিল্প, বাণিজ্যিক, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সিএনজিসহ সব ধরনের গ্রাহকের জন্য গ্যাসের স্বল্পচাপের সংকটটা তীব্র হয়ে উঠবে বলে জানিয়েছে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘পুরোনো গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন কমবে, এটি বহু বছর ধরেই জানা ছিল। কিন্তু সেই ঘাটতি পূরণে পর্যাপ্ত অনুসন্ধান ও নতুন কূপ খনন করা হয়নি। এখন আমরা সেই সিদ্ধান্তহীনতার মূল্য দিচ্ছি।’
কালের আলো/এম/এএইচ
আপনার মতামত লিখুন
Array