বিয়ের পর হঠাৎ থেমে গিয়েছিল সোনি রাজদানের অভিনয়জীবন
একসময় নিয়মিত অভিনয় করছিলেন সোনি রাজদান। সিনেমায় প্রশংসা পাচ্ছিলেন, টেলিভিশনেও তৈরি হয়েছিল পরিচিতি। কিন্তু ১৯৮৬ সালে পরিচালক মহেশ ভাটকে বিয়ের পর হঠাৎই যেন বদলে যায় তাঁর ক্যারিয়ারের গতি। নতুন সিনেমা বা ধারাবাহিকে কাজের সুযোগ কমে যায়। একপর্যায়ে তাঁর মনে হয়েছিল, অভিনয়জীবনে এতদিনে যা কিছু অর্জন করেছিলেন, সব যেন একসঙ্গে হারিয়ে গেছে।
সম্প্রতি দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সেই সময়ের অভিজ্ঞতার কথা আবারও জানিয়েছেন এই অভিনেত্রী। তাঁর কথায়, বিয়ের সময় তিনি একটি কাজ করছিলেন এবং সেটি শেষও করেছিলেন। কিন্তু এরপর আর নতুন কোনো কাজ পাননি। যেন আচমকাই তাঁর অভিনয়জীবনের দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
১৯৮১ সালে ‘৩৬ চৌরঙ্গী লেন’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক সোনি রাজদানের। এরপর ‘মান্ডি’ ও ‘সারাংশ’-এর মতো সিনেমায় অভিনয় করে নিজের জায়গা তৈরি করেন তিনি। বিশেষ করে ‘সারাংশ’-এ তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়। সিনেমার পাশাপাশি টেলিভিশনেও পরিচিতি পান সোনি। রমেশ সিপ্পির ‘বুনিয়াদ’ তাঁকে আরও বড় পরিসরে দর্শকের কাছে পৌঁছে দেয়।
তখন তাঁর ক্যারিয়ার এগোচ্ছিল নিজের গতিতেই। কিন্তু ১৯৮৬ সালের ২০ এপ্রিল মহেশ ভাটকে বিয়ের পর পরিস্থিতি বদলে যায়।
সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে সোনি জানান, বিয়ের সময় তিনি কাজ করছিলেন। সেই কাজ শেষ হওয়ার পরও তিনি অভিনয় চালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নতুন কাজের প্রস্তাব আসা বন্ধ হয়ে যায়। তাঁর কাছে বিষয়টি ছিল আকস্মিক এবং হতাশাজনক।
এর আগে দেওয়া আরেক সাক্ষাৎকারেও একই অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলেন সোনি। তাঁর দাবি, কোথাও কোথাও তাঁকে এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছিল—তিনি যেহেতু একজন প্রতিষ্ঠিত পরিচালকের স্ত্রী, তাই তাঁর আর কাজ করার প্রয়োজন কী।
এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে সবচেয়ে বেশি হতাশ করেছিল। কারণ, বিয়ের পরও নিজের পেশা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা তাঁর ছিল। কিন্তু আশপাশের মানুষের ধারণা যেন তাঁর হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল।
‘মহেশ ভাটের স্ত্রী’ পরিচয়ের আড়ালে অভিনেত্রী সোনি
বিয়ের পর সোনি রাজদানের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে যায় আরেকটি পরিচয়—তিনি পরিচালক মহেশ ভাটের স্ত্রী। পরবর্তী সময়ে অভিনেত্রী আলিয়া ভাটের মা হিসেবেও তাঁকে ব্যাপকভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।
কিন্তু এখানেই সোনির আপত্তি ছিল। কারণ, অভিনয়ে তাঁর পথচলা শুরু হয়েছিল আলিয়ার জন্মেরও আগে। দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে নিজের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছিলেন তিনি।
২০১৯ সালের এক সাক্ষাৎকারে নিজের পরিচয় নিয়ে কথা বলেছিলেন সোনি। জানিয়েছিলেন, দীর্ঘ সময় ধরে তাঁকে মূলত মহেশ ভাটের স্ত্রী হিসেবেই দেখা হয়েছে। ২০২৫ সালের আরেক সাক্ষাৎকারে তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন, সারা জীবনই যেন তাঁকে ‘অন্য কারও কেউ’ হিসেবে দেখা হয়েছে। নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠা করাই ছিল তাঁর দীর্ঘদিনের লড়াই।
অথচ তাঁর অভিনয়জীবনের ইতিহাস চার দশকেরও বেশি সময়ের। সিনেমা, টেলিভিশন ও পরবর্তী সময়ে ওয়েবভিত্তিক কাজ—বিভিন্ন মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি।
‘বুনিয়াদ’ ফিরিয়ে দিয়েছিল কাজ
বিয়ের পর কাজের খরা অবশ্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। সোনির ক্যারিয়ারে বড় পরিবর্তন আসে ‘বুনিয়াদ’ দিয়ে।
রমেশ সিপ্পি ও জ্যোতি স্বরূপ পরিচালিত ধারাবাহিকটি ১৯৮৬ সালে দূরদর্শনে প্রচার শুরু হয়। দেশভাগ এবং তার পরবর্তী সময়ের সামাজিক বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে তৈরি এই ধারাবাহিক দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়।
‘বুনিয়াদ’-এ সোনির অভিনয়ও দর্শকের নজর কাড়ে। তাঁর নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ধারাবাহিকটি তাঁর ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এরপর আবার বেশ কিছু সিনেমায় কাজের সুযোগ পান তিনি।
অর্থাৎ যে সময়টিকে একসময় তিনি ‘সবকিছু হারিয়ে যাওয়ার’ সময় বলে মনে করেছিলেন, সেখান থেকেই ধীরে ধীরে অভিনয়ে ফিরে আসেন সোনি।
স্বামীর সিনেমাতেও সহজ চরিত্র মেলেনি
মহেশ ভাটকে বিয়ে করার পর সোনির ক্যারিয়ার পুরোপুরি স্বামীর ওপর নির্ভরশীল ছিল—বিষয়টি এমন নয়। বরং বিভিন্ন সময়ে মহেশ ভাট নিজেই তাঁর অভিনয়ক্ষমতার প্রশংসা করেছেন।
২০২৫ সালের এক সাক্ষাৎকারে মহেশ ভাট সোনিকে অত্যন্ত শক্তিশালী অভিনেত্রী হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর মতে, সোনির অভিনয়ের ধরন, শরীরী ভাষা ও সূক্ষ্ম অভিব্যক্তি মূলধারার ভারতীয় সিনেমার প্রচলিত অভিনয়শৈলীর সঙ্গে সব সময় মেলে না। ফলে তাঁর প্রতিভার যথাযথ ব্যবহার করার মতো চরিত্রও সব সময় পাওয়া যায়নি।
তবে মহেশ ভাটের সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ পেলেও সোনির চরিত্রগুলোর পরিণতি অনেক সময় সুখকর হয়নি। ২০২৬ সালের এক সাক্ষাৎকারে সোনি রসিকতা করে জানান, তাঁর স্বামী তাঁকে এমন অনেক চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ দিয়েছেন, যেগুলো গল্পের মধ্যেই মারা যেত। পরিবারের সদস্যদের কাছেও বিষয়টি একসময় মজার হয়ে উঠেছিল।
‘রাজি’-তে মেয়ের মায়ের চরিত্রে
দীর্ঘ ক্যারিয়ারের পর ২০১৮ সালের ‘রাজি’ সিনেমায় আবারও বড় পর্দায় আলোচনায় আসেন সোনি রাজদান। সিনেমায় তিনি অভিনয় করেন আলিয়া ভাটের মায়ের চরিত্রে। বাস্তব জীবনেও আলিয়া তাঁর মেয়ে হওয়ায় সিনেমাটি ঘিরে দর্শকের আগ্রহ ছিল আরও বেশি।
তবে এখানেও তৈরি হয় পরিচয়ের আরেকটি দ্বন্দ্ব। সোনির অভিনয় নিয়ে আলোচনার বদলে তাঁকে অনেক সময় শুধু ‘আলিয়া ভাটের মা’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
যদিও বাস্তবতা হলো, সোনি যখন অভিনয়জগতে পা রাখেন, তখন আলিয়ার জন্মই হয়নি।
পরবর্তী সময়ে ‘ইয়োরস ট্রুলি’, ‘সংস অব প্যারাডাইস’-এর মতো কাজেও অভিনয় করেছেন তিনি। সিনেমার পাশাপাশি ওয়েব সিরিজ ও চরিত্রনির্ভর বিভিন্ন কাজেও তাঁকে দেখা গেছে।
বদলে গেছে সময়
নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে বর্তমান সময়ের তুলনাও করেছেন সোনি রাজদান। তাঁর মতে, এখন পরিস্থিতি অনেকটাই বদলেছে। বিশেষ করে তাঁর মেয়ে আলিয়া ভাটের প্রজন্মের অভিনেত্রীদের জন্য বিয়ে কিংবা মাতৃত্ব আগের মতো ক্যারিয়ার থামিয়ে দেওয়ার কারণ নয়।
চলতি বছর দেওয়া আরেক সাক্ষাৎকারে সোনি বলেন, সময় বদলেছে দেখে তিনি খুশি। তাঁর মেয়ে এমন এক সময়ে কাজ করছেন, যখন একজন নারী একই সঙ্গে মা এবং সফল অভিনেত্রী হিসেবে নিজের পেশাজীবন চালিয়ে যেতে পারেন।
সোনি রাজদানের নিজের ক্যারিয়ারের গল্প তাই শুধু একজন অভিনেত্রীর দীর্ঘ বিরতির গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিয়ের পর একজন নারী শিল্পীর পেশাগত পরিচয় কীভাবে বদলে দেওয়া হয়, পারিবারিক পরিচয় কীভাবে ব্যক্তিগত অর্জনকে আড়াল করে দিতে পারে এবং সময়ের সঙ্গে সেই ধারণাগুলো কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে—তারও একটি দীর্ঘ অধ্যায়।
সূত্রঃ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে
কালের আলো/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
Array