দুর্গাপূজার আগে কটিয়াদীতে বসে ৫০০ বছরের ঢাকের হাট
ঢাকের গম্ভীর আওয়াজ, ঢোলের তাল, সানাইয়ের সুর আর বাঁশির মূর্ছনায় মুখর চারপাশ। কোথাও ঢাক বাজিয়ে নিজেদের দক্ষতা তুলে ধরছেন বাদ্যযন্ত্রশিল্পীরা, কোথাও আবার চলছে পূজা আয়োজকদের সঙ্গে দরদাম। বাদ্যের তালে তালে জমে উঠেছে সুরের প্রতিযোগিতা। দুর্গাপূজার আগমনী আবহে এমনই এক ব্যতিক্রমী উৎসবের চেহারা নিয়েছে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর ঐতিহ্যবাহী ঢাকের হাট।
কথিত আছে, প্রায় ৫০০ বছর ধরে চলে আসছে এই হাট। দুর্গাপূজায় ঢাকঢোল বাজানোর জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকি ও বাদ্যবাদকেরা এখানে জড়ো হন। তাঁদের বাজনা শুনে পছন্দের দল বেছে নেন পূজার আয়োজকেরা। এরপর দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও দরদামের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় চুক্তিমূল্য। স্থানীয়দের দাবি, এটিই দেশের একমাত্র ঢাকের হাট।
গত মঙ্গলবার শুরু হওয়া এ বছরের হাটের পর্দা নামবে আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায়। কয়েক দিনের এই আয়োজন ঘিরে কটিয়াদী পুরোনো বাজারে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ।
রাজা নবরঙ্গ রায়ের আমল থেকে ঐতিহ্যের শুরু
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ষোড়শ শতাব্দীতে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার চারিপাড়া গ্রামে স্থানীয় সামন্ত রাজা নবরঙ্গ রায় তাঁর রাজপ্রাসাদে দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। পূজার বাদ্যযন্ত্র বাজানোর জন্য তিনি বিক্রমপুর, বর্তমান মুন্সীগঞ্জ অঞ্চল থেকে ঢাকি ও বাদ্যকরদের আমন্ত্রণ জানান।
আমন্ত্রণ পেয়ে নৌপথে অসংখ্য ঢাকি ও বাদক দল এসে পৌঁছান পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে যাত্রাঘাট নামের স্থানে। সেখানে রাজা নিজে তাঁদের বাজনা শোনেন এবং সেরা দলটি বেছে নেন। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত এই কাহিনিকেই ঢাকের হাটের সূচনাপর্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এলাকায় দুর্গাপূজার আয়োজন বাড়তে থাকে। বিভিন্ন জমিদারের মধ্যে ঢাকের হাট কোথায় বসবে, তা নিয়ে দ্বন্দ্বও তৈরি হয়। একপর্যায়ে যাত্রাঘাট থেকে হাটের স্থান পরিবর্তন করে কটিয়াদী পুরোনো বাজারে নিয়ে আসা হয়। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে এই বাজারই হয়ে ওঠে ঢাকি ও বাদ্যবাদকদের মিলনস্থল।
প্রায় পাঁচ শতাব্দীর এই ঐতিহ্য এখন কেবল বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদের হাট নয়; স্থানীয় সংস্কৃতি ও দুর্গাপূজার প্রস্তুতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এক হাটে ঢাক, ঢোল, সানাই থেকে নানা বাদ্যযন্ত্র
সরেজমিনে দেখা যায়, হাটের বিভিন্ন স্থানে দল বেঁধে বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছেন শিল্পীরা। ঢাকের সঙ্গে ঢোল, ড্রাম, সানাই, কাঁসি, মন্দিরা, ঝনঝনি ও বাঁশির সুর মিলিয়ে তৈরি হয়েছে বৈচিত্র্যময় আবহ। এক দল বাজনা শুরু করলে অন্য দলও নিজেদের দক্ষতা দেখাতে তালে তালে বাজিয়ে ওঠে।
পূজা আয়োজকেরা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘুরে ঘুরে দলগুলোর পরিবেশনা শুনছেন। কোন দলের বাজনা ভালো, কারা পূজার পুরো সময়জুড়ে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন, কতজন সদস্য নিয়ে দলটি কাজ করবে—এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে চলছে পছন্দ ও দরদাম।
এই হাটের বড় সুবিধা হলো, পূজা আয়োজকদের একসঙ্গে অনেক দলকে দেখার ও বাজনা যাচাই করার সুযোগ থাকে। অন্যদিকে বাদ্যবাদকেরাও বিভিন্ন এলাকার আয়োজকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন। ফলে দুর্গাপূজার মৌসুমে দুই পক্ষের মধ্যে চুক্তি সম্পাদনের জন্য হাটটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১২ হাজার থেকে লাখ টাকা ছাড়ায় চুক্তিমূল্য
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকি ও বাদ্যবাদকদের পারিশ্রমিক নির্ভর করে তাঁদের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, দলের সদস্যসংখ্যা এবং পরিবেশনার মানের ওপর। সাধারণত একটি দলের চুক্তিমূল্য ১২ হাজার টাকা থেকে শুরু হয়। চাহিদা ও দরদাম অনুযায়ী তা এক লাখ টাকা ছাড়িয়েও যেতে পারে।
দোহারের নবাবগঞ্জ থেকে তিন সদস্যের একটি বাদক দলের নেতা হিসেবে হাটে এসেছেন সুজন মালাকার। তিনি জানান, এবার পূজার আয়োজন বেশি হওয়ায় বাদক দলের চাহিদাও বেড়েছে। তাঁর দলের জন্য কেউ কেউ ৪০ হাজার টাকা পারিশ্রমিক দিতে চাইলেও তাঁরা ৬০ হাজার টাকার কমে চুক্তি করতে রাজি নন।
কিশোরগঞ্জ সদর থেকে সাত সদস্যের ঢাকঢোলের দল নিয়ে এসেছেন মো. রোকন। তিনি জানান, বাদ্যযন্ত্র বাজানো তাঁর মূল পেশা নয়। শখের পাশাপাশি বাড়তি আয়ের জন্য তিনি এ কাজ করেন। দুর্গাপূজার মৌসুমে হাটে এসে বিভিন্ন আয়োজকের সঙ্গে চুক্তির সুযোগ পান তাঁরা।
নরসিংদীর মনোহরদী থেকে আসা বাদক দলের নেতা ফারুক মিয়া জানান, তাঁরা এক যুগ ধরে এই হাটে আসছেন। এবার তাঁর দলের জন্য কেউ কেউ ৮০ হাজার টাকা পারিশ্রমিকের প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে তাঁদের প্রত্যাশা, এক লাখ টাকার কমে চুক্তি করবেন না।
এই দরদাম থেকেই বোঝা যায়, পূজার মৌসুমে দক্ষ বাদ্যবাদকদের চাহিদা কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ভালো বাজনা ও অভিজ্ঞ দলের জন্য আয়োজকেরা তুলনামূলক বেশি পারিশ্রমিক দিতেও প্রস্তুত থাকেন।
দূরদূরান্ত থেকে আসেন পূজা আয়োজকেরা
নেত্রকোনার কেন্দুয়া থেকে বাদক দলের সঙ্গে চুক্তি করতে হাটে এসেছেন উৎপল কুমার। তিনি বলেন, এখানে একসঙ্গে শত শত ঢাকি ও বাদ্যবাদককে পাওয়া যায়। ফলে পছন্দের দল বেছে নেওয়ার পাশাপাশি সরাসরি বাজনা শুনে যাচাই করার সুযোগও থাকে।
উৎপল কুমারের ভাষ্য, এই সুবিধার কারণেই তাঁরা প্রতিবছর দুর্গাপূজার জন্য ঢাকঢোলের দল ঠিক করতে ঢাকের হাটে আসেন। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুর, সুনামগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকি ও বাদ্যবাদকেরা জীবিকার টানে এখানে আসেন। অন্যদিকে বিভিন্ন জেলার পূজা উদযাপন কমিটির প্রতিনিধিরাও পছন্দের দল খুঁজতে ভিড় করেন। এভাবে হাটটি একদিকে শিল্পীদের মৌসুমি আয়ের সুযোগ তৈরি করে, অন্যদিকে পূজার আয়োজকদের জন্য সহজে দল বাছাইয়ের ব্যবস্থা করে।
দুর্গাপূজায় ঢাকের অপরিহার্যতা
দুর্গাপূজার সঙ্গে ঢাকের সম্পর্ক বহু পুরোনো। মহাষষ্ঠীর সূচনা থেকে পূজার বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান এবং বিসর্জন পর্যন্ত ঢাকের আওয়াজ উৎসবের আবহ তৈরি করে। ঢাকের তালে পূজামণ্ডপে ভক্তদের উপস্থিতি ও উৎসবের আমেজ যেন আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
তাই পূজার আয়োজন সম্পন্ন করতে প্রতিমা, মণ্ডপ ও অন্যান্য প্রস্তুতির পাশাপাশি ঢাকি ও বাদ্যবাদকদের দল ঠিক করাও গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কটিয়াদীর ঢাকের হাট সেই প্রয়োজন পূরণে দীর্ঘদিন ধরে ভূমিকা রেখে চলেছে।
শুধু অর্থ উপার্জন নয়, অনেক বাদ্যবাদকের কাছে এই আয়োজন পেশাগত দক্ষতা তুলে ধরা এবং ঐতিহ্য ধরে রাখারও একটি সুযোগ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাদ্যযন্ত্র বাজানোর অভিজ্ঞতা নিয়ে তাঁরা হাটে আসেন। নিজেদের পরিবেশনার মাধ্যমে অন্য দলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেন এবং পূজার আয়োজকদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করেন।
ঐতিহ্য রক্ষায় নিরাপত্তার প্রস্তুতি
কটিয়াদী উপজেলা পূজা উদযাপন ফ্রন্টের সভাপতি দিলীপ কুমার সাহা জানিয়েছেন, দুর্গাপূজা উদযাপনকে কেন্দ্র করে সার্বিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ধরে রেখে প্রতিবছর দুর্গাপূজার আগে এই হাট বসে। ঢাকের আওয়াজ, দরদাম আর শিল্পীদের মিলনমেলায় কটিয়াদী পুরোনো বাজার কয়েক দিনের জন্য পরিণত হয় এক সাংস্কৃতিক উৎসবস্থলে।
কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
Array