অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নিয়ে বিতর্কের মুখে পড়া মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রোববার (১৮ অক্টোবর) সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে ইশরাককে ডেকে নিয়ে এ নির্দেশ দেওয়া হয় বলে সরকারসংশ্লিষ্ট একাধিক উচ্চপর্যায়ের সূত্র জানিয়েছে। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এই ধরণের খবর প্রকাশ করেছে প্রথম আলোসহ একাধিক গণমাধ্যম।
রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় আগ্নেয়াস্ত্র হাতে ইশরাকের মাদকবিরোধী অভিযানের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। শনিবার (১৭ অক্টোবর) বিকেলে দয়াগঞ্জ গুন্টিঘর রেলগেট এলাকায় এ অভিযান চালানো হয়। ঘটনাটি নিয়ে বিএনপি ও সরকারের ভেতরেও অসন্তোষ তৈরি হয়।
- মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন নিয়ে বিএনপি ও সরকারে অস্বস্তি
- ঘটনার এক দিনের মাথায় কঠোর সিদ্ধান্ত
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার উদ্যোগ নিয়ে আপত্তি না থাকলেও একজন প্রতিমন্ত্রীর নিজ হাতে অস্ত্র নিয়ে অভিযানে অংশগ্রহণ গ্রহণযোগ্য নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কাজে লাগানোর পরিবর্তে কেন তিনি নিজেই এমন ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এর আগে শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাজধানীর ১৩টি স্থানে আকস্মিক পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি আবাসিক এলাকার পরিচ্ছন্নতা এবং সেবার মান উন্নয়নে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেন তিনি। এমন একটি দিনে ইশরাকের অস্ত্র হাতে অভিযানের ঘটনা সরকারের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের আলোচনা আড়াল করে দেয় বলে মনে করছেন দল ও সরকারসংশ্লিষ্ট কয়েকজন।
বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির এক সদস্যের মতে, ঘটনাটি শুধু ইশরাকের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যদেরও বিব্রত করেছে। একজন প্রতিমন্ত্রীর আচরণের দায় পুরো মন্ত্রিসভার ওপরও বর্তায়।
ভিডিওতে দেখা যায়, অস্ত্র উঁচিয়ে অভিযানে ইশরাক
শনিবার (১৭ অক্টোবর) বিকেলে গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনসংলগ্ন দয়াগঞ্জ গুন্টিঘর রেলগেট এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে যান ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন।
নিজের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, গাড়ি থেকে নেমে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে তিনি লোকজনকে ধরার নির্দেশ দিচ্ছেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে থাকা নিরাপত্তাকর্মীরা কয়েকজনকে আটক করতে ধাওয়া করেন। ভিডিওর একটি অংশে একজনকে এক তরুণকে লাথি মারতেও দেখা যায়। আটক ব্যক্তিদের কয়েকজনকে নিজেদের নির্দোষ দাবি করতে শোনা যায়।
আরেকটি ভিডিওতে আটক ব্যক্তিদের পুলিশের কাছে হস্তান্তরের দৃশ্য রয়েছে। অভিযানে ইশরাকের ব্যক্তিগতভাবে নিয়োগ করা দুই দেহরক্ষী তোফাজ্জল হোসেন ও লাভলুর পাশাপাশি একজন সরকারি দেহরক্ষীও উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের কয়েকজনের হাতেও অস্ত্র দেখা যায়।
ভিডিওর কিছু অংশে ইশরাকের হাতে থাকা পিস্তল অস্পষ্ট করা হলেও অন্য অংশে অস্ত্রটি স্পষ্ট দেখা যায়। এ সময় গুলি করার হুমকি দেওয়া এক ব্যক্তির পরিচয় অবশ্য নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
অস্ত্র প্রদর্শনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন
একজন প্রতিমন্ত্রী প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে এ ধরনের অভিযানে অংশ নিতে পারেন কি না, তা নিয়ে ঘটনার পর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালার ২৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আত্মরক্ষার প্রয়োজনে লাইসেন্সপ্রাপ্ত অস্ত্র বহন ও ব্যবহার করা গেলেও অন্যের মনে ভয় বা বিরক্তি সৃষ্টি হতে পারে—এমনভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করা যাবে না।
ঘটনাটি তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। রোববার (১৮ অক্টোবর) ডিএমপির গণমাধ্যম কেন্দ্রে এক সংবাদ সম্মেলনে গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান শফিকুল ইসলাম জানান, ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনারকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অভিযানে আইন লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে কোনো ধরনের আইনি ব্যত্যয়ের প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র ধরার দাবি ইশরাকের
সমালোচনার মুখে রোববার (১৮ অক্টোবর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক বিবৃতিতে ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়েছেন ইশরাক হোসেন। তিনি দাবি করেন, মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ কর্মসূচির অংশ হিসেবেই ওই এলাকায় গিয়েছিলেন। পুলিশ, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও সামাজিক প্রতিনিধিদের যৌথ সিদ্ধান্তে কর্মসূচিটি নেওয়া হয়েছিল বলে তাঁর বক্তব্য।
ইশরাকের ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকা-৬ আসনের গেন্ডারিয়ার বিভিন্ন এলাকায় মাদক কারবারের অভিযোগ পাওয়ার পর থেকেই তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আলোচনা করছিলেন। জনবলসংকট দূর করা এবং মাদকের আস্তানার কাছে স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি।
বিবৃতিতে তিনি আরও দাবি করেন, অভিযানের আগে মাদক কারবারিদের ছাদ থেকে গুলি চালানোর আশঙ্কার কথা জানতে পারেন। একটি অস্থায়ী মাদকের আস্তানার কাছে পৌঁছালে ৩০ থেকে ৩৫ জন ব্যক্তি হইচই করতে করতে তাঁদের গাড়িবহরের দিকে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে এগিয়ে আসেন। সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় নিজের ও অন্যদের নিরাপত্তার জন্য তিনি এবং তাঁর সরকারি নিরাপত্তারক্ষীরা অল্প সময়ের জন্য অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে অস্ত্র নামিয়ে নেওয়া হয়। নিজের হাতে থাকা পিস্তলটি বৈধ ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত উল্লেখ করে ইশরাক দাবি করেন, আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যেই তিনি অস্ত্র প্রদর্শন করেছিলেন এবং এতে আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি।
অভিযানে চার থেকে পাঁচটি অস্থায়ী মাদকের আস্তানা উচ্ছেদ, মাদকদ্রব্য, অস্ত্র, নগদ অর্থ ও ছিনতাই করা মুঠোফোন উদ্ধারের কথাও জানিয়েছেন তিনি। এ সময় ছয়জনকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে তাঁর দাবি। তবে এসব তথ্যের স্বাধীন যাচাই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন
অভিযানের আগে পুলিশের সঙ্গে যথাযথ সমন্বয় করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। শনিবার (১৭ অক্টোবর) ওয়ারী বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মাসুদ রানা সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, প্রতিমন্ত্রী আগাম কোনো তথ্য পুলিশকে দেননি। পরে পুলিশ বিষয়টি জানতে পারে। অন্যদিকে, ইশরাকও শনিবার (১৭ অক্টোবর) সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর প্রায় ১০ মিনিট পর তিনি পুলিশকে সেখানে আসতে বলেন। তাঁর এই বক্তব্য এবং পুলিশের বক্তব্যের মধ্যে অসংগতি থাকায় অভিযানের প্রস্তুতি ও সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
এর আগে পদ ছাড়তে হয়েছিল সংসদ সদস্য মিষ্টিকে
বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে দল ও সরকারকে বিব্রত করার পর পদত্যাগের নির্দেশ পাওয়ার ঘটনা বিএনপিতে এবারই প্রথম নয়। এর আগে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কয়েকজনের নাম মিরপুরের একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় উঠে আসে।
গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভবন ভেঙে ফেলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের কয়েকজন নেতাকর্মীর নাম আলোচনায় আসে। এতে সরকার ও দলের ভেতরে অস্বস্তি তৈরি হয় এবং মিষ্টির রাজনৈতিক দায় নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। যদিও হামলা ও ভাঙচুরে নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনার পর গত ১ অক্টোবর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন মিষ্টি। পরে সংসদ সচিবালয় তাঁর আসন শূন্য ঘোষণা করে। মিষ্টির পদত্যাগের প্রায় আড়াই সপ্তাহের মাথায় এবার অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়ার ঘটনায় প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হলো।
দুটি ঘটনাতেই বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের পর দল ও সরকারকে বিব্রত করার বিষয়টি সামনে এসেছে। ফলে ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার ঘটনাকে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের আচরণ, শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে নির্দেশের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত ইশরাকের পদত্যাগের চূড়ান্ত অবস্থা নিশ্চিত নয়।
কালের আলো/এমকে
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]