খুলনার কয়রা
৭১ কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ, ১৪ মাসেও অগ্রগতি মাত্র ৫ শতাংশ
খুলনার কয়রা উপজেলায় কপোতাক্ষ নদের তীর রক্ষা প্রকল্পের কাজ দুই দফায় মেয়াদ বাড়ানোর পরও শেষ হয়নি। নির্ধারিত সময়ের ১৪ মাস পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৮০ শতাংশ। এরই মধ্যে কয়েকটি স্থানে নদপাড়ের মাটি ধসে পড়েছে। প্রকল্পের কাজের ধীরগতি, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার ও ব্লক গণনায় অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিরা। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশি ইউনিয়নের কাশিরহাটখোলা, গাজীপাড়া ও গাববুনিয়া এলাকায় কপোতাক্ষ নদের তীর রক্ষায় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ‘দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বর্ধন’ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৭১ কোটি টাকা ব্যয়ে কাজটি শুরু হয় ২০২৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম এম বিল্ডার্সকে ২০২৫ সালের ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে কাজ শেষ করার সময়সীমা দেওয়া হয়েছিল।
প্রকল্পের কাজ তদারকি করছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাতক্ষীরা-২ বিভাগ। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজের অগ্রগতি ছিল ৭৫ শতাংশ। গত শুক্রবার পর্যন্ত তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০ শতাংশে। অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের পর ১৪ মাস পেরিয়ে গেলেও অগ্রগতি বেড়েছে মাত্র ৫ শতাংশ। এর মধ্যে দুই দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় এক হাজার ৪৫০ মিটার নদীতীর রক্ষায় তিন লাখ ৮২ হাজার সিসি ব্লক ডাম্পিং এবং এক লাখ ১১ হাজার ব্লক স্থাপনের কথা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, এ পর্যন্ত তিন লাখ ২২ হাজার ব্লক ডাম্পিং করা হয়েছে। তবে প্রায় ৬০০ মিটার বাঁধে ব্লক বসানোর কাজ এখনো বাকি।
ধীরগতি ও নিম্নমানের কাজের অভিযোগ
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কাজ শুরুর পর থেকেই প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখা গেছে। সিসি ব্লক তৈরির সরঞ্জাম আনা ও মাঠ প্রস্তুত করতেই ছয় মাস সময় লেগেছে। পরে ব্লক তৈরিতে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের অভিযোগ ওঠায় কাজ বাধাগ্রস্ত হয়।
স্থানীয়দের দাবি, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন প্রথমে কপোতাক্ষ নদের চিকন দানার বালু দিয়ে ব্লক তৈরির চেষ্টা করেছিলেন। এলাকাবাসীর বাধার মুখে তা সম্ভব হয়নি। পরে বাইরে থেকে মোটা দানার বালু এনে আবার কাজ শুরু করা হয়।
প্রকল্প এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রহমান অভিযোগ করেন, নিম্নমানের ব্লক তৈরির বিষয়টি আড়াল করার চেষ্টা এবং অনিয়মের কারণেই কাজে ধীরগতি দেখা দিয়েছে। তাঁর দাবি, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন সুযোগ বুঝে ব্লক তৈরি করেন এবং রাতে সেগুলো নদে ফেলা হয়। কত ব্লক তৈরি ও ডাম্পিং করা হয়েছে, সে তথ্যও এলাকাবাসীকে জানানো হয়নি।
আরেক বাসিন্দা দেবাশীষ মণ্ডল বলেন, এক বছরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও দুই বছরেও কাজ শেষ হয়নি। কাজ চলমান থাকা অবস্থায় কয়েকটি স্থানে চরের মাটি ধসে পড়তে শুরু করেছে।
একই ব্লক বারবার গণনার অভিযোগ
উত্তর বেদকাশি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সরদার নুরুল ইসলাম বলেন, নিম্নমানের কাজের অভিযোগ পাওয়ার পর কয়েকবার কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। পরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন স্থানীয় এক শ্রমিক সরদারের সহায়তায় আবার কাজ শুরু করেন।
চেয়ারম্যানের অভিযোগ, পাউবোর টাস্কফোর্সের দল ব্লক গণনা করে চলে যাওয়ার পর সেগুলো সব সময় নদে ফেলা হয় না। একই ব্লক বারবার গণনায় দেখিয়ে প্রকল্পের অর্থের অনিয়ম করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ঠিকাদার ও পাউবোর বক্তব্য
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম এম বিল্ডার্সের সাইট ব্যবস্থাপক তানভীর আহমেদ বলেন, প্রকল্পের নথিতে দৈর্ঘ্য এক হাজার ৪৫০ মিটার উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে সাড়ে ১১শ মিটার এলাকায় কাজ করা হবে। এর বেশির ভাগ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।
তিনি বলেন, কাশিরহাট এলাকায় কয়েকটি দোকান ও বিদ্যুতের খুঁটির কারণে কাজ করা যাচ্ছে না। এ ছাড়া গাজীপাড়া এলাকায় প্রায় ২০০ মিটার অংশে কাজ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এসব কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি।
এলাকাবাসী ও ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের অভিযোগ অস্বীকার করে পাউবোর উপসহকারী প্রকৌশলী লিয়াকত আলী বলেন, টাস্কফোর্সের উপস্থিতিতে ব্লক গণনা শেষে সেগুলো ডাম্পিং করা হয়। দরপত্র প্রক্রিয়ায় বিলম্ব এবং প্রকল্প এলাকার কয়েকটি স্থাপনা সরাতে সময় লাগায় কাজ পিছিয়েছে। তবে বর্ধিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি, ব্লক ব্যবহারের স্বচ্ছতা এবং নদপাড়ের মাটি ধসে পড়ার বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। নির্ধারিত মান বজায় রেখে দ্রুত কাজ শেষ করা না গেলে নদীতীর সুরক্ষার উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]