ইয়েমেনের হুথিদের সঙ্গে সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার মধ্যেই বড় ধরনের প্রতিরক্ষা চাপে পড়েছে সৌদি আরব। একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ঠেকাতে গিয়ে দেশটির ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের মজুত কমে আসছে। ফলে নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করতে এখন আঞ্চলিক ও পশ্চিমা মিত্রদের দিকে তাকাতে হচ্ছে রিয়াদকে। দুই আঞ্চলিক কর্মকর্তার বরাতে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, হুথি ও অন্যান্য ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীর হামলা ঠেকাতে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান ও মিসরের কাছে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েনের অনুরোধ করেছে সৌদি আরব।
একসঙ্গে বহু দিক থেকে চাপ
সৌদি আরবের সংকট শুধু ইয়েমেন সীমান্তে সীমাবদ্ধ নেই। হুথিদের হামলার পাশাপাশি ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতায় তেল স্থাপনা, পাইপলাইন ও সমুদ্রপথও ঝুঁকিতে পড়েছে। লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হরমুজ প্রণালির উত্তেজনা। গুরুত্বপূর্ণ তেল অবকাঠামো সুরক্ষার পাশাপাশি সামরিক ঘাঁটি ও সরকারি স্থাপনাগুলো রক্ষায়ও আকাশ প্রতিরক্ষার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
ফলে রিয়াদের জন্য সমস্যা এখন শুধু পর্যাপ্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকা নয়; সীমিত ইন্টারসেপ্টর কোথায় এবং কোন হুমকির বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মক্কার আকাশে নতুন উদ্বেগ
এই চাপের মধ্যেই বুধবার সৌদি আরব দাবি করেছে, হুথিরা মক্কাকে লক্ষ্য করে একটি ড্রোন পাঠিয়েছিল। সৌদি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, ড্রোনটি মক্কার দিকে পৌঁছানোর আগেই ভূপাতিত করা হয়েছে। পবিত্র নগরীটির নিরাপত্তাকে ‘রেড লাইন’ হিসেবে বিবেচনা করছে রিয়াদ। তবে হুথিরা মক্কাকে লক্ষ্য করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে মূলত এর প্রতীকী ও নিরাপত্তাগত গুরুত্বের কারণে। ইয়েমেন সীমান্ত থেকে প্রায় ১ হাজার ১০০ কিলোমিটার দূরে থাকা মক্কার দিকে কোনো ড্রোন পৌঁছানোর দাবি সৌদির আকাশ প্রতিরক্ষার সক্ষমতা নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রও পারছে না চাহিদা মেটাতে
সৌদি আরবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক মিত্র যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ সংঘাতের কারণে ওয়াশিংটনের নিজেদের ইন্টারসেপ্টর মজুতও কমেছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ফলে রিয়াদের চাহিদা অনুযায়ী অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়েছে।
তবে ওয়াশিংটন পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় নয়। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের একটি টাস্কফোর্স সৌদি বাহিনীর সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও সামরিক পরিকল্পনায় সহায়তা করছে। কিন্তু সরাসরি সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ নেওয়ার বিষয়ে অনাগ্রহ স্পষ্ট।
তেলের বাজারেও পড়ছে প্রভাব
সৌদির নিরাপত্তা সংকটের প্রভাব এখন মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে জ্বালানি বাজারেও পড়ছে। তেল পাইপলাইন ও স্থাপনায় হামলার ঝুঁকি এবং লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের অনিশ্চয়তায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে রয়েছে।
অর্থাৎ রিয়াদের ইন্টারসেপ্টর সংকট কেবল সামরিক সরঞ্জামের ঘাটতি নয়। এটি একই সঙ্গে সৌদি তেল অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক নৌপথ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে। এখন রিয়াদের বড় প্রশ্ন—মিত্রদের কাছ থেকে কত দ্রুত আকাশ প্রতিরক্ষা সহায়তা পাওয়া যাবে এবং দীর্ঘস্থায়ী হামলার মধ্যে সীমিত প্রতিরক্ষা মজুত কতদিন টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে।
এম/এএইচ
আপনার মতামত লিখুন
Array