খুঁজুন
                               
, ,
           

প্রতি রাতে মুখ খুলে ঘুমান? শরীরে হতে পারে যেসব সমস্যা

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:৩৩ অপরাহ্ণ
প্রতি রাতে মুখ খুলে ঘুমান? শরীরে হতে পারে যেসব সমস্যা
মুখ খোলা রেখে ঘুমানো অনেকের কাছেই স্বাভাবিক অভ্যাস। বিশেষ করে সর্দি, অ্যালার্জি কিংবা নাক বন্ধ থাকলে ঘুমের মধ্যে মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে প্রতিদিন রাতে মুখ খুলে ঘুমানোর অভ্যাস থাকলে তা মুখের স্বাস্থ্য, দাঁত ও মাড়ির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি এটি নাকের সমস্যা কিংবা ঘুমের সময় শ্বাস-প্রশ্বাসে জটিলতারও ইঙ্গিত হতে পারে।

ঘুম থেকে ওঠার পর মুখ শুকিয়ে যাওয়া, গলা ব্যথা, নিঃশ্বাসে দুর্গন্ধ কিংবা ঠোঁট ফেটে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাঝেমধ্যে মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়া সাধারণত উদ্বেগের কারণ নয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এমনটা চলতে থাকলে এর পেছনের কারণ খুঁজে বের করা জরুরি।

নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়া কেন বেশি উপকারী

মানবদেহে নাক শুধু শ্বাস নেওয়ার অঙ্গ নয়, বরং ফুসফুসে প্রবেশের আগে বাতাসকে পরিশোধন, উষ্ণ ও আর্দ্র করার গুরুত্বপূর্ণ কাজও করে। নাকের ভেতরের সূক্ষ্ম লোম ও শ্লেষ্মা ধুলাবালি এবং বাতাসে থাকা কিছু ক্ষতিকর কণা আটকে রাখতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়ার সময় বাতাসের আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত হয়।

অন্যদিকে, মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার সময় বাতাস সরাসরি মুখ ও গলার মধ্য দিয়ে প্রবেশ করে। এতে মুখের ভেতরের আর্দ্রতা দ্রুত কমে যেতে পারে। বিশেষ করে ঘুমের সময় দীর্ঘক্ষণ মুখ দিয়ে শ্বাস নিলে মুখ ও গলা শুষ্ক হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়ার সঙ্গে নাইট্রিক অক্সাইডেরও সম্পর্ক রয়েছে। এই গ্যাস রক্তনালির কার্যক্রম এবং ফুসফুসে অক্সিজেন ব্যবহারে ভূমিকা রাখে। তাই স্বাভাবিক অবস্থায় নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়াই শরীরের জন্য বেশি উপযোগী।

মুখ খুলে ঘুমালে যেসব সমস্যা হতে পারে

মুখ খোলা রেখে নিয়মিত ঘুমানোর সবচেয়ে পরিচিত প্রভাব হলো মুখের শুষ্কতা। ঘুমের মধ্যে মুখ দিয়ে বাতাস চলাচল করলে লালা শুকিয়ে যেতে পারে। অথচ মুখের ভেতর আর্দ্রতা বজায় রাখা এবং দাঁত ও মাড়িকে সুরক্ষিত রাখতে লালা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মুখ ও গলা শুকিয়ে যাওয়া: রাতে মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার কারণে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর মুখ শুকনো লাগতে পারে। কারও কারও গলায় অস্বস্তি, খুসখুসে ভাব কিংবা ব্যথাও দেখা দেয়।

নিঃশ্বাসে দুর্গন্ধ: লালা মুখের ভেতরের খাবারের অবশিষ্টাংশ পরিষ্কার করতে এবং ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। লালার পরিমাণ কমে গেলে মুখে দুর্গন্ধ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়ার কার্যক্রম বাড়তে পারে। ফলে সকালে নিঃশ্বাসে দুর্গন্ধ দেখা দিতে পারে।

দাঁতের ক্ষয় ও মাড়ির সমস্যা: মুখের লালা দাঁতের এনামেল সুরক্ষিত রাখতে এবং মুখের অম্লীয় পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। দীর্ঘদিন মুখ শুকিয়ে থাকলে দাঁতের ক্ষয়, মাড়ির প্রদাহ এবং মুখের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

ঠোঁট ফেটে যাওয়া ও জিহ্বায় আস্তরণ: সারা রাত মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার ফলে ঠোঁট শুষ্ক হয়ে ফেটে যেতে পারে। একই সঙ্গে জিহ্বায় সাদা বা ঘন আস্তরণ দেখা দিতে পারে, যদিও এর অন্য কারণও থাকতে পারে।

নাক ডাকা ও ঘুমের ব্যাঘাত: মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার সঙ্গে নাক ডাকার সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে নাক ডাকার কারণ সব সময় মুখ খোলা রেখে ঘুমানো নয়; নাক বন্ধ থাকা কিংবা ঘুমের সময় শ্বাসনালি সংকুচিত হওয়ার মতো সমস্যাও এর পেছনে থাকতে পারে।

২০২২ সালে Polymers সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় মুখের আর্দ্রতা কমে যাওয়ার সঙ্গে দাঁতের ক্ষয় ও মুখের সংক্রমণের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তবে মুখ শুকিয়ে যাওয়ার পেছনে ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, পানিশূন্যতা এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যাও ভূমিকা রাখতে পারে।

মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়া কি ঘুমের মান নষ্ট করে?

প্রতিদিন পর্যাপ্ত সময় ঘুমানোর পরও যদি সকালে ক্লান্ত লাগে, মাথাব্যথা হয় কিংবা দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুম পায়, তাহলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার পাশাপাশি এসব লক্ষণ থাকলে ঘুমের সময় শ্বাস-প্রশ্বাসে কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

এ ধরনের সমস্যার একটি সম্ভাব্য কারণ হলো অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া। এই অবস্থায় ঘুমের সময় গলার পেছনের শ্বাসনালি বারবার আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে শ্বাস-প্রশ্বাস ব্যাহত হয় এবং ঘুমের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা নষ্ট হতে পারে।

স্লিপ অ্যাপনিয়ার সম্ভাব্য লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে জোরে নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে দম বন্ধ হয়ে আসা বা হাঁসফাঁস করা, সকালে মাথাব্যথা এবং দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুম পাওয়া। এসব লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

তবে শুধু মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়া মানেই স্লিপ অ্যাপনিয়া হয়েছে, এমন নয়। নাক বন্ধ থাকা, অ্যালার্জি, নাকের পর্দা বাঁকা হওয়া কিংবা টনসিলের সমস্যার কারণেও রাতে মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে।

কেন মুখ খুলে ঘুমানোর অভ্যাস তৈরি হয়?

মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। সাধারণ সর্দি বা অ্যালার্জির কারণে নাক বন্ধ হয়ে গেলে অনেকেই স্বাভাবিকভাবে মুখ দিয়ে শ্বাস নিতে শুরু করেন। আবার দীর্ঘদিনের নাকের সমস্যা, নাকের ভেতরের গঠনগত জটিলতা কিংবা ঘুমের সময় শ্বাসনালি সংকুচিত হওয়ার কারণেও এমনটা হতে পারে।

শিশুদের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস থাকলে নাক, গলা ও শ্বাসনালির সমস্যা পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শিশু নিয়মিত নাক ডাকে, ঘুমের মধ্যে হাঁসফাঁস করে কিংবা দিনের বেলায় অস্বাভাবিক ক্লান্ত থাকে—এমন লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

মুখ খুলে ঘুমানো কমাতে কী করবেন?

মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস কমাতে প্রথমে এর কারণ চিহ্নিত করা প্রয়োজন। নাক বন্ধ থাকলে তার কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা নিতে হবে। অ্যালার্জি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং ঘুমানোর ঘর অতিরিক্ত শুষ্ক না রাখার বিষয়েও নজর দেওয়া দরকার।

নিয়মিত দাঁত ব্রাশ করা, দাঁতের ফাঁক পরিষ্কার রাখা এবং মুখের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। মুখ শুকিয়ে যাওয়ার সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে দাঁতের চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।

বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার, নাক বন্ধ থাকা বা শ্বাসনালির সমস্যা শনাক্ত না করে মুখ বন্ধ রাখার জন্য জোর করা কিংবা ঘুমের সময় মুখে টেপ লাগানো নিরাপদ সমাধান নয়। এতে শ্বাস নিতে অসুবিধা হতে পারে, বিশেষ করে নাক বন্ধ থাকলে বা স্লিপ অ্যাপনিয়ার আশঙ্কা থাকলে।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?

মাঝেমধ্যে মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়া সাধারণত বড় সমস্যা নয়। তবে প্রতিদিন সকালে মুখ অতিরিক্ত শুকিয়ে থাকা, দীর্ঘদিন নাক বন্ধ থাকা, নিয়মিত জোরে নাক ডাকা কিংবা ঘুমের মধ্যে শ্বাস আটকে আসার মতো লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

বিশেষ করে ঘুমের মধ্যে বারবার দম বন্ধ হয়ে আসা, হাঁসফাঁস করা বা দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুম পাওয়ার মতো লক্ষণ থাকলে দ্রুত মূল্যায়ন জরুরি।

সব মিলিয়ে, মুখ খুলে ঘুমানো সব সময় গুরুতর রোগের লক্ষণ না হলেও দীর্ঘদিনের অভ্যাস হলে তা অবহেলা করা ঠিক নয়। মুখের আর্দ্রতা ও দাঁতের সুরক্ষা বজায় রাখার পাশাপাশি নাক দিয়ে স্বাভাবিক শ্বাস নেওয়ার পথে কোনো বাধা আছে কি না, সেটি শনাক্ত করাই সুস্থ ঘুম ও ভালো স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

কালের আলো/জেএন/এসএ

 

ভোরে প্রশ্ন, সোয়া ৬টায় উত্তর, এরপর লাখ টাকায় বিক্রি

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:৩৮ অপরাহ্ণ
ভোরে প্রশ্ন, সোয়া ৬টায় উত্তর, এরপর লাখ টাকায় বিক্রি

একটি নিয়োগ পরীক্ষা, লাখো চাকরিপ্রার্থীর স্বপ্ন আর কয়েক ঘণ্টা আগেই প্রশ্নপত্র হাতে পাওয়ার গোপন ব্যবস্থা। ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটে পাওয়া প্রশ্নপত্রের অস্পষ্ট ছবি সকাল সোয়া ৬টার দিকে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এরপর তৈরি হয় উত্তরপত্র, আর তা ছড়িয়ে পড়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্যদের মাধ্যমে সম্ভাব্য পরীক্ষার্থীদের কাছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই পুরো প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন একাধিক সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী।

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগের বাছাই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) তদন্তে এমন তথ্য উঠে এসেছে। গত ১৪ থেকে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে সংস্থাটি। তাঁদের মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ব্যক্তিরা রয়েছেন। তবে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে ঘটনার সব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। প্রশ্নপত্রের মূল উৎস কে, কীভাবে তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হাতে পৌঁছাল এবং এই প্রক্রিয়ায় নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের ভেতরের কেউ জড়িত ছিলেন কি না—এসব বিষয়ে তদন্ত এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।

  • যুব উন্নয়নের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসে সরকারি তিন প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের নাম
  • ৮–১০ লাখ টাকায় প্রশ্ন-উত্তর বিক্রির তথ্য; সাতজন গ্রেপ্তার
  • প্রশ্নপত্রের মূল উৎস এখনো অজানা

কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে প্রশ্ন থেকে উত্তরপত্র
এসআরবির সংবাদ সম্মেলনে জানানো তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ অক্টোবর ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটের দিকে এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ তাঁর মুঠোফোনে প্রশ্নপত্রের একটি অস্পষ্ট ছবি পান। পরে সকাল সোয়া ৬টার দিকে একই প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীর তাঁকে প্রশ্নপত্রের তুলনামূলক স্পষ্ট ছবি পাঠান। এরপর নূর মোহাম্মদ প্রশ্নগুলোর উত্তর তৈরি করে জাহাঙ্গীর ও তাঁর সহকর্মী এস এম ইমদাদুল ইসলামের কাছে পাঠান বলে তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দাবি করেছে এসআরবি। পরবর্তী সময়ে চক্রের অন্য সদস্যদের মাধ্যমে উত্তরপত্র পৌঁছে দেওয়া হয় তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা পরীক্ষার্থী এবং প্রশ্নপত্রের সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছে।

অর্থাৎ, তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এখানে শুধু প্রশ্নপত্র সংগ্রহের ঘটনা নয়; এর সঙ্গে যুক্ত ছিল ছবি আদান-প্রদান, উত্তর প্রস্তুত, একাধিক ব্যক্তির মধ্যে তথ্য সরবরাহ এবং অর্থের বিনিময়ে তা বিক্রির একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। তদন্তের এই বর্ণনা সত্য হলে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাটি কোনো একক ব্যক্তির তাৎক্ষণিক উদ্যোগে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং প্রশ্ন সংগ্রহ থেকে শুরু করে উত্তর তৈরি ও গ্রাহকের কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত আলাদা আলাদা ভূমিকা পালনকারী একটি নেটওয়ার্ক কাজ করছিল।

প্রশ্নের দাম ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা
এসআরবির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চক্রের সদস্যরা পরিচিত প্রার্থীদের কাছে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র ও উত্তরপত্র ৮ থেকে ১০ লাখ টাকায় বিক্রি করতেন। দ্বিতীয় শ্রেণির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের ক্ষেত্রে এই অঙ্ক বেড়ে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত হতো বলে জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। এই অর্থের অঙ্ক প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে শুধু অনিয়ম নয়, একটি লাভজনক অবৈধ ব্যবসা হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও সামনে আনে। সরকারি চাকরির সীমিত সুযোগ এবং বিপুলসংখ্যক প্রার্থীর প্রতিযোগিতাকে কাজে লাগিয়ে একটি চক্র কীভাবে অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে, তদন্তের তথ্য সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে। তবে চক্রটি মোট কতজনের কাছে প্রশ্নপত্র বিক্রি করেছে, কত টাকা লেনদেন হয়েছে এবং অর্থের ভাগ কীভাবে বণ্টন করা হতো—এসব বিষয়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ফলে প্রশ্নপত্র বিক্রির প্রকৃত পরিসর নির্ধারণের জন্য আর্থিক লেনদেনের অনুসন্ধান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

প্রতারিত চাকরিপ্রার্থী থেকে চক্রের সদস্য
মতিঝিল এলাকা থেকে পরিবেশ অধিদপ্তরের ডেটা এন্ট্রি অপারেটর মো. রুবেল ইসলামের সঙ্গে আরও দুজনকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে তদন্তে নতুন সূত্র পাওয়া যায় বলে জানিয়েছে এসআরবি। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের একজন মফিজুল ইসলাম নিজেও চাকরিপ্রার্থী। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, একটি চক্রের সদস্যকে ১৭ লাখ টাকা দিয়ে প্রতারিত হওয়ার পর তিনি আরও বেশি অর্থ উপার্জনের আশায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে যুক্ত আরেকটি চক্রে যোগ দেন।

এই তথ্য তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আনে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের বাজারে চাকরিপ্রার্থীরা যেমন সম্ভাব্য ক্রেতা, তেমনি প্রতারণার শিকার হওয়ার পর তাঁদের কেউ কেউ অবৈধ কার্যক্রমের অংশ হয়ে উঠতে পারেন—এমন আশঙ্কাও তৈরি হয়। তবে মফিজুলের বক্তব্য ও ভূমিকা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য তদন্তের ফল এবং বিচারিক প্রক্রিয়া বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। রুবেল ও মফিজুলের সূত্র ধরে তদন্তকারীরা এনবিআরের কম্পিউটার

অপারেটর এস এম ইমদাদুল ইসলাম এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলামের সন্ধান পান। পরে মুঠোফোনের কথোপকথন ও চ্যাটের তথ্য বিশ্লেষণ করে সাভার থেকে নূর মোহাম্মদ এবং মোহাম্মদপুর থেকে জাহাঙ্গীরকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার অন্য ব্যক্তি হলেন মো. হাসিনুর রহমান ওরফে সুজন। এসআরবি জানিয়েছে, চক্রের সদস্যরা হোয়াটসঅ্যাপে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে যোগাযোগ ও লেনদেনের মতো কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। এতে প্রকৃত পরিচয় আড়াল করে প্রশ্নপত্রের তথ্য আদান-প্রদান এবং সম্ভাব্য ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা কীভাবে যুক্ত হলেন?
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের পরিচয় তদন্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। তাঁদের কয়েকজন বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। তবে শুধু সরকারি চাকরিতে থাকা থেকে প্রশ্নপত্রের মূল উৎস বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয় না। তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, প্রশ্নপত্রটি প্রথম কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। এনবিআরের দুই কর্মচারী নূর মোহাম্মদ ও জাহাঙ্গীরের কাছে প্রশ্নপত্র পৌঁছানোর আগের ধাপটি এখনো স্পষ্ট নয়। সংবাদ সম্মেলনে তাঁদের কাছে প্রশ্নপত্রের উৎস জানতে চাওয়া হলে তাঁরা সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি বলে জানিয়েছে এসআরবি।

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন বলেন, তদন্ত শেষ হলে বিষয়টি নিশ্চিত করা যাবে।

অতএব, তদন্তের পরবর্তী ধাপে প্রশ্নপত্রের মূল কপি বা ডিজিটাল উৎস শনাক্ত করা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগাযোগের ধারাবাহিকতা যাচাই করা এবং অর্থ লেনদেনের তথ্য মিলিয়ে দেখা জরুরি। এসব তথ্য ছাড়া চক্রের প্রকৃত বিস্তার কিংবা দায়িত্বের স্তর নির্ধারণ করা কঠিন।

 জব্দ করা সামগ্রী কী ইঙ্গিত দিচ্ছে?
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এসআরবি ১০০ টাকার ১১৬টি স্ট্যাম্প, ৫০ টাকার চারটি স্ট্যাম্প, এক সেট প্রশ্নপত্র, বিভিন্ন পরীক্ষার প্রবেশপত্রের ১৯ পাতা, বিভিন্ন ক্যাটাগরির ১০টি সনদ, বিভিন্ন শ্রেণির আরও ১৫টি সনদ, বিভিন্ন ব্যাংকের চেকের ৪৮ পাতা, একটি ব্যাংকের চেকবই, ছয়টি জাতীয় পরিচয়পত্র এবং চার হাজার টাকা জব্দ করেছে।

জব্দ করা এসব সামগ্রীর মধ্যে প্রবেশপত্র, সনদ, চেক ও পরিচয়পত্রের উপস্থিতি তদন্তের পরিধি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে। এগুলোর সঙ্গে প্রশ্নপত্র ফাঁস, চাকরির নামে প্রতারণা কিংবা আর্থিক লেনদেনের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা আলাদাভাবে যাচাই করতে হবে।

বিশেষ করে বিভিন্ন পরীক্ষার প্রবেশপত্র ও সনদ উদ্ধারের বিষয়টি সামনে আসায় তদন্ত শুধু একটি নিয়োগ পরীক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি অন্য পরীক্ষাকেও অন্তর্ভুক্ত করবে—তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে জব্দ করা কোনো সামগ্রীকে অপরাধের প্রমাণ হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনার আগে তার উৎস, ব্যবহার ও সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

পরীক্ষা স্থগিত, বিক্ষোভ, তারপর পুনরায় আয়োজন
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে ২৪২টি শূন্য পদের বিপরীতে আবেদন করেছিলেন ৩ লাখ ১৯ হাজার চাকরিপ্রার্থী। গত ১০ অক্টোবর সকাল ১১টায় বাছাই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সকাল ১০টা ৩ মিনিটে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর পরীক্ষা স্থগিত করে কর্তৃপক্ষ।

পরীক্ষা স্থগিতের পর গত শনিবার পরীক্ষার্থীরা ঢাকার বিভিন্ন সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। অভিযোগ তদন্তে সেদিনই যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। কমিটির প্রধান করা হয় মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবকে। তবে এখনো তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়েনি।

এর মধ্যেই শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) নতুন করে পরীক্ষাটি অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই ঘটনাপ্রবাহের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে সাধারণ চাকরিপ্রার্থীদের ওপর। দীর্ঘ প্রস্তুতি, সময় ও অর্থ ব্যয়ের পর পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ তাঁদের নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে অনিশ্চয়তায় ফেলেছে। আবার পরীক্ষা স্থগিত ও পুনরায় আয়োজনের কারণে প্রার্থীদের বাড়তি সময়, যাতায়াত ও প্রস্তুতির চাপও তৈরি হয়েছে।

কালের আলো/আরআই/এমকে

প্রশ্নপত্র ফাঁসে ৮–১০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ, গ্রেপ্তার সরকারি ৫ কর্মচারী

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:২৪ অপরাহ্ণ
প্রশ্নপত্র ফাঁসে ৮–১০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ, গ্রেপ্তার সরকারি ৫ কর্মচারী

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে পাঁচ সরকারি কর্মচারীসহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি-৩)। চক্রটির বিরুদ্ধে চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে প্রশ্নপত্র, প্রবেশপত্র, স্ট্যাম্প, ব্যাংক চেক, সনদপত্র, জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন আলামত জব্দ করা হয়েছে। তবে প্রশ্নপত্রের মূল উৎস এখনো শনাক্ত করা যায়নি। কার কাছ থেকে প্রশ্নপত্র প্রথমে চক্রটির হাতে এসেছে এবং এর সঙ্গে আর কারা জড়িত, তা জানতে তদন্ত চলছে।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এসআরবির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন।

৩ লাখ ১৯ হাজার প্রার্থীর পরীক্ষা, প্রশ্নফাঁসে স্থগিত

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে ২৪২টি শূন্যপদে নিয়োগের জন্য গত ১০ অক্টোবর বাছাই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। এ পরীক্ষায় আবেদন করেছিলেন মোট ৩ লাখ ১৯ হাজার চাকরিপ্রার্থী। পরীক্ষা সকাল ১১টায় শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ওই দিন সকাল ১০টা ৩ মিনিটে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর পরীক্ষা স্থগিত করে কর্তৃপক্ষ। এতে বিপুলসংখ্যক চাকরিপ্রার্থীর নিয়োগপ্রক্রিয়া অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর এসআরবি ছায়া তদন্ত শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায় ১৪, ১৫ ও ১৬ অক্টোবর রাজধানী ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় গত ১১ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে মতিঝিল থানায় মামলা করা হয়েছিল।

গ্রেপ্তার পাঁচ সরকারি কর্মচারী

এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তর, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পাঁচ কর্মচারী রয়েছেন। গ্রেপ্তার অন্য দুজনের মধ্যে একজন চাকরিপ্রার্থী।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—

  • পরিবেশ অধিদপ্তরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মো. রুবেল ইসলাম (৩৩)।
  • চাকরিপ্রার্থী মো. মফিজুল ইসলাম (২৩)।
  • মো. হাসিনুর রহমান সুজন (৩২)।
  • এনবিআরে কর্মরত কম্পিউটার অপারেটর এস এম ইমদাদুল ইসলাম (৩৫)।
  • প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলাম (৩৩)।
  • এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ (৩০)।
  • এনবিআরে কর্মরত কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীর (৩৮)।

যেভাবে গ্রেপ্তার করা হয়

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত ১৪ অক্টোবর মতিঝিল এলাকা থেকে রুবেল ইসলাম, মফিজুল ইসলাম ও হাসিনুর রহমান সুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উত্তরখান এলাকা থেকে এস এম ইমদাদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। এসআরবি-৪-এর সহায়তায় মিরপুর-১০ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় আসাদুল ইসলামকে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনের কথোপকথন ও চ্যাট পর্যালোচনা করে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১৫ অক্টোবর সাভার এলাকা থেকে নূর মোহাম্মদকে গ্রেপ্তার করে এসআরবি-৪। পরে তাঁর কাছ থেকে পাওয়া তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে ১৬ অক্টোবর মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে জাহাঙ্গীরকে গ্রেপ্তার করা হয়।

ভোরে প্রশ্নপত্রের ছবি, পরে তৈরি হয় উত্তর

তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনের চ্যাট পর্যালোচনায় প্রশ্নপত্র ছড়িয়ে দেওয়ার একটি ধারাবাহিকতা পাওয়া গেছে। লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন জানান, ১০ অক্টোবর ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটে নূর মোহাম্মদ একটি সূত্রের মাধ্যমে প্রশ্নপত্রের অস্পষ্ট ছবি পান। পরে সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে জাহাঙ্গীর তাঁকে প্রশ্নপত্রের একটি স্পষ্ট ছবি পাঠান। এরপর নূর মোহাম্মদ প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রস্তুত করে জাহাঙ্গীর ও ইমদাদুলকে পাঠান। পরে চক্রের সদস্য এবং তাঁদের সঙ্গে যুক্ত পরীক্ষার্থীদের কাছে প্রশ্নপত্র ও উত্তর পৌঁছে দেওয়া হয় বলে তদন্তে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে জানান তিনি।  কাজে আসাদুল, রুবেল, মফিজুল ও সুজন যুক্ত ছিলেন বলেও সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, চক্রটি হোয়াটসঅ্যাপে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করত। তবে প্রশ্নপত্র প্রথম কোথা থেকে এসেছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

প্রশ্নপত্রের মূল উৎস নিয়ে ধোঁয়াশা

প্রশ্নপত্রের মূল উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক বলেন, নূর মোহাম্মদকে সকালে যে প্রশ্নপত্র দেওয়া হয়েছিল, সেটি কে দিয়েছিল, তা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও তিনি সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি বলে জানান তিনি। লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন বলেন, নূর মোহাম্মদ ও জাহাঙ্গীর দাবি করেছেন, তাঁরা ফেসবুকের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র পেয়েছেন। তবে তাঁদের দেওয়া তথ্য এখনো নির্ভরযোগ্য বলে মনে করছে না তদন্ত দল। তাঁরা যেসব ফেসবুক গ্রুপ ও আইডির কথা বলেছেন, সেগুলো যাচাই করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের মূল উৎস শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। এ ঘটনায় অন্য কেউ জড়িত থাকলে তাঁদেরও শনাক্ত করার জন্য অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কেউ জড়িত কি না

প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক বলেন, এখন পর্যন্ত ওই অধিদপ্তরের কারও সম্পৃক্ততার সরাসরি তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে অন্যান্য সরকারি দপ্তরের কর্মচারীদের এ ঘটনায় জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি। তদন্ত এগোলে এ বিষয়ে আরও তথ্য সামনে আসতে পারে বলেও উল্লেখ করেন।

উদ্ধার হয়েছে স্ট্যাম্প, চেক ও বিভিন্ন সনদপত্র

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে বিপুলসংখ্যক নথি ও অন্যান্য আলামত জব্দ করেছে এসআরবি। উদ্ধার করা সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে—

  • ১০০ টাকার ১১৬টি স্ট্যাম্প এবং ৫০ টাকার চারটি স্ট্যাম্প।
  • প্রশ্নপত্রের এক সেট।
  • বিভিন্ন পরীক্ষার প্রবেশপত্রের ১৯ পাতা।
  • ১০টি সনদপত্র এবং বিভিন্ন ক্যাটাগরির আরও ১৫টি সনদপত্র।
  • বিভিন্ন ব্যাংকের চেকের ৪৮ পাতা এবং একটি ব্যাংক চেক।
  • আটটি মোবাইল ফোন।
  • ছয়টি জাতীয় পরিচয়পত্র।
  • নগদ চার হাজার টাকা।

এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক জানান, উদ্ধার হওয়া এসব আলামত তদন্তে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের পাশাপাশি অর্থ লেনদেন ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্মকাণ্ডের বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে ,সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, মফিজুল ইসলাম চক্রের একজন সদস্যের কাছে প্রতারিত হওয়ার পর বেশি অর্থ উপার্জনের আশায় ওই চক্রের সঙ্গে যুক্ত হন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ভর্তি-বাণিজ্যসংক্রান্ত অর্থ লেনদেনের তথ্যও তদন্তে উঠে এসেছে। চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগের বিষয়টিও তদন্তের আওতায় রয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ সত্যতা এবং চক্রের কার্যক্রমের ব্যাপ্তি তদন্ত শেষে স্পষ্ট হবে।

 

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

‘হাসিনার দেখানো পথেই হাঁটছে বর্তমান সরকার’—শফিকুর রহমান

গাজীপুর সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:১৫ অপরাহ্ণ
‘হাসিনার দেখানো পথেই হাঁটছে বর্তমান সরকার’—শফিকুর রহমান

দেশে মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি এবং দুর্নীতি, অনিয়ম ও অন্যায় বেড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি দাবি করেছেন, বর্তমান সরকার সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের দেখানো পথেই হাঁটছে। এভাবে চলতে থাকলে বর্তমান সরকারের পরিণতিও হাসিনার সরকারের মতো হবে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সকালে গাজীপুর মহানগরী জামায়াতের উদ্যোগে টঙ্গীর শহীদ আব্দুল মালেক মিলনায়তনে আয়োজিত রুকন সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন শফিকুর রহমান। বক্তব্যে শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার গণভোটকে অস্বীকার করছে এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করছে না। তাঁর ভাষ্য, এভাবে চলতে থাকলে সরকারের গন্তব্যও শেখ হাসিনার সরকারের মতো হবে।

তিনি বলেন, দেশের মানুষের মৌলিক অধিকার এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সমাজে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অন্যায় বেড়েছে। গত নির্বাচনের আগে একটি দল নির্বাচনের মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান হবে বলে প্রচার করেছিল। কিন্তু তাঁর দাবি, বর্তমানে সমস্যাগুলো সমাধান হওয়ার পরিবর্তে দ্বিগুণ বেড়েছে। জামায়াত আমিরের অভিযোগ, বর্তমান সরকার আগের সরকারের পথ অনুসরণ করছে। গণতান্ত্রিক প্রত্যাশা পূরণ এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গ তুলে শফিকুর রহমান বলেন, সে সময় জামায়াতে ইসলামী ও তরুণ সমাজের প্রত্যাশা ছিল শোষণমুক্ত ও ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। এমন একটি দেশ গড়ে তোলার প্রত্যাশা ছিল, যেখানে কোনো বৈষম্য থাকবে না। তবে তাঁর অভিযোগ, বর্তমান সরকারের সময়ে বৈষম্যের নতুন মাত্রা যুক্ত হচ্ছে। শিক্ষাঙ্গনে আগের সরকারের মতো দলীয়করণ, লুটতরাজ এবং উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে ভাগ বসানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি। শফিকুর রহমানের বক্তব্য, রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মানুষের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণ করতে হলে বৈষম্য দূর করা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা জরুরি।

দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনা করতে গিয়ে জামায়াত আমির বলেন, তাঁর কাছে মনে হচ্ছে, এক লুটেরার হাত থেকে আরেক লুটেরার হাতে ক্ষমতা ন্যস্ত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, মুসলিম বিশ্বেও ঐক্যের অভাব রয়েছে। তাঁর মতে, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশে রাসুল (সা.)-এর আদর্শ উপেক্ষা করার কারণে মুসলিম বিশ্ব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শফিকুর রহমান দাবি করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে জনগণের একটি অংশ জামায়াতে ইসলামীকে নিরাপত্তার স্থল হিসেবে মনে করে। তবে এ বিষয়ে তিনি কোনো জরিপ বা পরিসংখ্যান উল্লেখ করেননি।

গাজীপুর মহানগর জামায়াতের আমির অধ্যাপক জামাল উদ্দিনের সভাপতিত্বে সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য আব্দুর রউফ, নির্বাহী সদস্য মাওলানা শাহজাহান, মাওলানা দেলোয়ার হোসেন, উত্তরাঞ্চলের দায়িত্বশীল খলিলুর রহমান মাদানি, সাবেক জেলা আমির আবুল হাশেম খান এবং জেলা আমির জাহাঙ্গীর আলম। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন গাজীপুর মহানগর মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি আমেনা বেগম, নায়েবে আমির খায়রুল হাসান, মহানগর সেক্রেটারি আ স ম ফারুক, সহকারী সেক্রেটারি আফজাল হোসেনসহ বিভাগীয় নেতারা। মহানগর কর্মপরিষদ, বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতারাও সম্মেলনে অংশ নেন।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি