খুঁজুন
                               
, ,
           

এনসিটি পরিচালনায় বিশ্বমানের অপারেটর ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’: কৌশলগত অংশীদারিত্বের নতুন সমীকরণ

সুফি বিশ্বাস:
প্রকাশিত: সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬, ১০:২৩ পূর্বাহ্ণ
এনসিটি পরিচালনায় বিশ্বমানের অপারেটর ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’: কৌশলগত অংশীদারিত্বের নতুন সমীকরণ

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক লাইফলাইন চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হতে যাচ্ছে। কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনা করে বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) খ্যাতনামা টার্মিনাল অপারেটর ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’ এর সাথে সরকারের আলোচনা ও দরকষাকষি চূড়ান্ত পর্যায়ে এসেছে। হঠাৎ করেই নয়, বরং দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের দ্বিপাক্ষিক আলোচনা, গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং বৈশ্বিক মানের বন্দর ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা থেকেই এই উদ্যোগ আলোর মুখ দেখছে। টার্মিনালটির পরিচালন দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতেই মূলত এই আন্তর্জাতিক জায়ান্টকে যুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

বিনিয়োগ প্রস্তাব বাংলাদেশের
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনা নিয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়েছিল ২০১৯ সালে। তখন সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে একটি জিটুজি ও পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ কাঠামোর অধীনে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সরকারই ডিপি ওয়ার্ল্ডকে বন্দর খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগের প্রস্তাব দেয়। বাংলাদেশ-ইউএই জয়েন্ট পিপিপি প্ল্যাটফর্মের প্রথম ও দ্বিতীয় বৈঠকে বন্দর খাতে বিশেষ করে এনসিটিতে বিনিয়োগের বিষয়টি আলোচিত হয়। অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময় অনুষ্ঠিত তৃতীয় প্ল্যাটফর্ম বৈঠকে বিষয়টি ছিল অন্যতম প্রধান এজেন্ডা। বর্তমান সরকারের শুরুর দিকে এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিত চতুর্থ প্ল্যাটফর্ম বৈঠকেও এটি প্রধান এজেন্ডা হিসেবে আলোচনা হয়েছে। এ আলোচনার পথ ধরেই ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে দরকষাকষি ও বাংলাদেশের স্বার্থ সমুন্নত রেখে বিনিয়োগ প্রস্তাব চূড়ান্ত করার কাজ এগিয়ে নিচ্ছে সরকার।

নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি)
নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির ইতিহাসে অন্যতম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌশলগত একটি মাইলফলক। কনটেইনার হ্যান্ডলিং ক্ষমতা বাড়াতে এটি নির্মিত হয়েছিল। আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় বন্দরের ওপর চাপ বেড়ে যাওয়ায় ২০০০ সালের দিকে এনসিটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেময়কার জেটিগুলো কনটেইনারের চাপ সামলাতে পারছিল না। এই সমস্যার সমাধানে বন্দরের নিউমুরিং এলাকায় একটি সম্পূর্ণ আধুনিক এবং আন্তর্জাতিক মানের কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। ২০০৭ সালে টার্মিনালের জেটি ও অবকাঠামোগত নির্মাণ কাজ শেষ হয়। ৫টি জেটি সমৃদ্ধ এই টার্মিনাল নির্মাণে বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব তহবিল থেকে প্রায় ৫৮২ কোটি টাকা ব্যয় হয়। জেটি ও ইয়ার্ডের নির্মাণ কাজ শেষ হলেও বিভিন্ন কারণে নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার সাথে সাথে টার্মিনালটি পূর্ণাঙ্গরূপে চালু করা সম্ভব হয়নি। ক্রমান্বয়ে যন্ত্রপাতি সংযোজনের মাধ্যমে ২০১৭ সালে টার্মিনালটি পুরোদমে কনটেইনার হ্যান্ডলিং শুরু করে। চালুর পর থেকেই আধুনিক যন্ত্রপাতি সমৃদ্ধ এই টার্মিনাল নিরবচ্ছিন্নভাবে হ্যান্ডলিং করছে। ফলে যন্ত্রপাতির কার্যক্ষমতা কমেছে, কমেছে উৎপাদনশীলতা। টার্মিনালে ইক্যুইপমেন্ট অ্যাভেইলেভিলিটি বা যন্ত্রপাতির সহজলভ্যতার (কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের জন্য যন্ত্রপাতি প্রস্তুত বা সচল থাকা) বৈশ্বিক মান যেখানে গড়ে ৯৩ শতাংশ, সেখানে এনসিটিতে এই মান প্রায় ৭০ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থ্যাৎ অবকাঠামোগত সুবিধা থাকার পরও যন্ত্রপাতির পূর্ণ কার্যক্ষমতার অভাবে কাঙ্খিত মাত্রায় কনটেইনার হ্যান্ডলিং সম্ভব হচ্ছে না। এ সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ। এককভাবে সবচেয়ে বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং হওয়া এই টার্মিনালে প্রতিঘন্টায় ২০-২২ টি কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়। আন্তর্জাতিক মান বিবেচনায় নিলে একইসময়ে ৩০টি কনটেইনার হ্যান্ডলিং সম্ভব হবে। এতে বাড়বে কনটেইনার হ্যান্ডলিং এবং কমবে জাহাজের টার্ণ অ্যারাউন্ড টাইম। বিদ্যমান অবকাঠামোয় উন্নত যন্ত্রপাতি ও দক্ষতার সংযোজন এই টার্মিনালের সক্ষমতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে।

এনসিটিতে কেন ইন্টারন্যাশনাল টার্মিনাল অপারেটর (ITO)?
টার্মিনাল অপারেশনে ইন্টারন্যাশনাল টার্মিনাল অপারেটর (International Terminal Operator) যুক্ত করার বিষয়টি কেবল ক্রেন বা জাহাজ পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মূলত একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, বৈশ্বিক লজিস্টিকস চেইন এবং ভূরাজনীতির সাথে গভীরভাবে জড়িত একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত। কোনো দেশের প্রবেশদ্বার বা বন্দরকে বিশ্বমানের করে গড়ে তুলতে এবং এর পরিচালন ক্ষমতাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে আন্তর্জাতিক অপারেটরদের নিয়োগ দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ার পেছনে যে সুদূরপ্রসারী কৌশলগত, অর্থনৈতিক এবং প্রযুক্তিগত কারণগুলো রয়েছে, তা

নিচে আরও বিস্তারিত ও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হলো:

১. বিশাল মূলধন ও বিনিয়োগ
একটি আধুনিক টার্মিনাল পরিচালনায় বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়। ইন্টারন্যাশনাল অপারেটররা নিজেদের অর্থ বিনিয়োগ করে টার্মিনালে সর্বাধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি স্থাপন করে। এতে একদিকে যেমন বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ে তেমনি সরকারের ওপর আর্থিক ব্যয়ের চাপ কমে।

২. সক্ষমতা
ইন্টারন্যাশনাল টার্মিনাল অপারেটরের পরিচালনগত সক্ষমতা অনেক বেশি। তারা বিশ্বমানের টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম (TOS) ব্যবহার করে জাহাজের টার্ন-অ্যারাউন্ড টাইম ২৪ ঘণ্টার নিচে নামিয়ে আনতে সক্ষম। তাদের অবকাঠামোগত সক্ষমতায় রয়েছে আধুনিক মেগা-ভেসেল হ্যান্ডলিংয়ের জন্য আধুনিক ক্রেন এবং স্বয়ংক্রিয় ইয়ার্ড ব্যবস্থাপনা। সর্বোপরি, তাদের কৌশলগত সক্ষমতা ও বৈশ্বিক শিপিং নেটওয়ার্ক আমাদের বন্দরকে একটি আঞ্চলিক লজিস্টিকস হাব-এ রূপান্তর করতে শতভাগ সক্ষম।

৩. আধুনিক প্রযুক্তি
আন্তর্জাতিক মানের অপারেটরদের অত্যাধুনিক গ্যান্ট্রি ক্রেন, স্বয়ংক্রিয় লজিস্টিকস সফটওয়‍্যার, গ্রিন পোর্ট টেকনোলজি (পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি), আধুনিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম রয়েছে। শুধু একটি টার্মিনাল অপারেশনে নয় বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগীদের থেকে এগিয়ে থাকতে অপারেটরগুলো সর্বশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করে।

৪. বৈশ্বিক লজিস্টিকস নেটওয়ার্কের সাথে যোগাযোগ
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় টার্মিনাল অপারেটরদের অনেকেরই নিজেদের মালিকানাধীন শিপিং লাইন আছে অথবা শীর্ষ শিপিং জোটগুলোর সাথে কৌশলগত চুক্তি আছে। ফলে যখন কোনো ইন্টারন্যাশনাল অপারেটর একটি টার্মিনালের দায়িত্ব নেয়, তারা তাদের বৈশ্বিক ক্লায়েন্টদের (শিপিং লাইন) সেই বন্দরে আসার জন্য উদ্বুদ্ধ বা বাধ্য করে। এর ফলে একটি সাধারণ বা আঞ্চলিক বন্দর আন্তর্জাতিক রুটের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার সুযোগ পায়, যা দেশের বাণিজ্যিক গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

৫. স্বচ্ছতা
আন্তর্জাতিক অপারেটর সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও কাগজবিহীন ‘টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম’ ব্যবহার করে। রিয়েল-টাইম ডাটা ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে প্রতিটি কনটেইনার ও জাহাজের অবস্থান কাস্টমস এবং অংশীজনদের কাছে সরাসরি দৃশ্যমান থাকে, যা মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং অন্যায্য দাবির সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। এছাড়া, আন্তর্জাতিক কর্পোরেট সুশাসন, সুনির্দিষ্ট ট্যারিফ কাঠামো এবং বৈশ্বিক অ্যান্টি-করাপশন পলিসি মেনে চলার কারণে কোনো ধরনের লুকানো খরচ বা সিন্ডিকেট তৈরির সুযোগ থাকে না; যা নিয়মিত থার্ড-পার্টি অডিটের মাধ্যমে সরকারের কাছে সর্বোচ্চ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে।

৬. দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা
বিশ্বের বিভিন্ন বড় বড় বন্দরে কাজ করার কারণে এই অপারেটরদের অভিজ্ঞতা থাকে ব্যাপক। ফলে তারা জাহাজের টার্ন-অ্যারাউন্ড টাইম বা বন্দরে জাহাজের অবস্থানকাল কমিয়ে আনতে পারে। দক্ষ লজিস্টিকস ও সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বন্দরের সামগ্রিক কর্মক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

৭. রূপান্তর (ট্রান্সফরমেশন)
একটি আন্তর্জাতিক অপারেটর যুক্ত হওয়ার সাথে সাথে টার্মিনালের পরিচালনগত ও বাণিজ্যিক চেহারায় একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। বিশ্বমানের টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেমের মাধ্যমে একটি সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও কাগজবিহীন ‘স্মার্ট পোর্ট’ এ রূপান্তরিত হয়। এর ফলে, একটি জাহাজের কনটেইনার ওঠানামার গতি ঘণ্টায় ১০-১২টি থেকে বেড়ে ৩০টিরও বেশিতে উন্নীত হয়, যা জাহাজের বন্দরে অবস্থানকাল কমিয়ে ২৪ ঘণ্টার নিচে নামিয়ে আনে। একই সাথে, অপারেটরের নিজস্ব বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের কারণে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শিপিং লাইন ও বিশাল মাদার ভেসেলগুলো সরাসরি এই বন্দরে ভিড়তে শুরু করে। ফলশ্রুতিতে, একটি সাধারণ আঞ্চলিক ফিডার পোর্ট রাতারাতি আন্তর্জাতিক রুটের একটি প্রধান সাপ্লাই চেইন হাবে পরিণত হয়, যা দেশের আমদানি-রপ্তানি খরচ এক ধাক্কায় প্রায় ৩০% পর্যন্ত কমিয়ে দেয়।

কেন ডিপি ওয়ার্ল্ড?

১. ডিপি ওয়ার্ল্ড আমিরাত সরকারের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান
ডিপি ওয়ার্ল্ডের সম্পূর্ণ মালিকানা সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের। একটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বহুজাতিক কোম্পানি। ডিপি ওয়ার্ল্ড ‘দুবাই ওয়ার্ল্ড’ এর অধীনে পরিচালিত হয়। দুবাই ওয়ার্ল্ড দুবাই সরকারের একটি বিশাল রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ সংস্থা। দুবাই ওয়ার্ল্ডের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান পোর্ট অ্যান্ড ফ্রি জোন ওয়ার্ল্ড সরাসরি ডিপি ওয়ার্ল্ডের শতভাগ শেয়ারের মালিক। যে প্রতিষ্ঠান টার্মিনাল পরিচালনার সাথে সাথে বিভিন্ন দেশে ফ্রি ট্রেড জোন স্থাপন ও পরিচালনা করে। বাংলাদেশ সরকারের সাথে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের ঐতিহাসিক, বন্ধুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত সম্পর্কের কারণে এনসিটিতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সংযোগ দুই দেশের সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করে তুলবে। যা বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

২. আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর টার্মিনাল অপারেটর
ডিপি ওয়ার্ল্ড বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম টার্মিনাল অপারেটর, যা প্রায় ৭০টিরও বেশি দেশে ৮০টি টার্মিনাল ও লজিস্টিকস কার্যক্রম পরিচালনা করে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের রয়েছে অত্যাধুনিক গ্যান্ট্রি ক্রেন, স্বয়ংক্রিয় লজিস্টিকস সফটওয়্যার, গ্রিন পোর্ট টেকনোলজি (পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি), আধুনিক কোয়ান্টাম ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা। যা প্রয়োগ করলে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা ও কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের গতি বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। ডিপি ওয়ার্ল্ড বিশ্বজুড়ে কেবল পোর্ট অপারেটর হিসেবেই নয়, বরং একটি মাল্টি-মডাল লজিস্টিকস জায়ান্ট (সমুদ্র, রেল ও সড়কপথের সমন্বিত নেটওয়ার্ক) হিসেবে কাজ করে। রেড সী কান্ট্রি বা লোহিত সাগরের অববাহিকার দেশ এবং মধ্য এশিয়ার আজারবাইজান পর্যন্ত রেল সংযোগের উন্নয়ন ও বাণিজ্যিক করিডোর উন্নয়নে কাজ করেছে ডিপি ওয়ার্ল্ড।

২. উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা
বর্তমানে এনসিটি দক্ষতার সাথে পরিচালিত হলেও বৈশ্বিক নৌবাণিজ্যের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বন্দরের দক্ষতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। ডিপি ওয়ার্ল্ড বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় টার্মিনাল অপারেটর। তাদের উন্নত অপারেটিং সিস্টেম ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনার কারণে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর গতি (হ্যান্ডলিং স্পিড) বৈশ্বিক মানের (ঘন্টায় ৩৫ একক কনটেইনার)। এর ফলে বন্দরে জাহাজের অবস্থান করার সময় বা ‘টার্ন-অ্যারাউন্ড টাইম’ বর্তমানের চেয়ে অনেক কমে আসবে। জাহাজ যত দ্রুত পণ্য খালাস করে চলে যেতে পারবে, বন্দরের সামগ্রিক দক্ষতা তত বাড়বে।

৩. বড় বিনিয়োগের সম্ভাবনা
ডিপি ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশে লজিস্টিকস ও অবকাঠামো খাতে প্রায় ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। এনসিটিতে প্রতিষ্ঠানটি যুক্ত হলে বাংলাদেশে তাদের বড় অঙ্কের বৈদেশিক বিনিয়োগের পথ সুগম হবে, যা বন্দরের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।

৪. দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব বৃদ্ধি
প্রস্তাব অনুযায়ী ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছ থেকে যে পরিমাণ অর্থ পাওয়া যাবে, তাতে জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ণ থাকবে। উপরন্তু, হ্যান্ডলিং সক্ষমতা কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় বন্দরে জাহাজের সংখ্যা এবং কনটেইনারের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। দীর্ঘমেয়াদে কনটেইনার ভলিউম বাড়ার কারণে শুল্ক ও অন্যান্য খাত থেকে সরকারের সামগ্রিক রাজস্ব আয়ের পরিমাণ বর্তমানের চেয়ে অনেক বেশি হবে।

৫. বৈশ্বিক লজিস্টিকস নেটওয়ার্কের সাথে সংযোগ
ডিপি ওয়ার্ল্ডের উপস্থিতি চট্টগ্রাম বন্দরকে বৈশ্বিক শিপিং লাইন এবং লজিস্টিকস নেটওয়ার্কের সাথে সরাসরি যুক্ত করবে। বিশ্বের বড় বড় শিপিং কোম্পানিগুলোর সাথে ডিপি ওয়ার্ল্ডের কৌশলগত সম্পর্ক থাকায়, তারা চট্টগ্রাম বন্দরকে তাদের প্রধান রুটে অন্তর্ভুক্ত করতে আগ্রহী হবে। এতে করে কনটেইনার পরিবহন ব্যয় কমে আসবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের বিশ্বস্ততা ও রেটিং বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া আমিরাত সরকার চালু করেছে আমিরাত শিপিং লাইন। যা তাদের লজিস্টিকস ও বন্দর ইকোসিস্টেমকে আরো বেশি শক্তিশালী করে তুলবে।

৬. আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের খরচ কমবে
টার্মিনালের কর্মক্ষমতা বাড়লে ব্যবসায়ীদের বিলম্ব মাশুল দিতে হবে না। পণ্য দ্রুত খালাস হওয়ায় ব্যবসায়ীদের লিড-টাইম (পণ্য উৎপাদন থেকে বাজারে পৌঁছানোর সময়) কমে আসবে। এর ফলে দেশের তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য রপ্তানি পণ্য বিশ্ববাজারে আরও বেশি প্রতিযোগিতাপূর্ণ হয়ে উঠবে।

৭. বন্দরের ব্যয় সাশ্রয়
বিনিয়োগ প্রস্তাব অনুযায়ী ডিপি ওয়ার্ল্ড এনসিটিতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ক্রয়ে নিজেরা বিনিয়োগ করবে। এ ছাড়া এখন কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির বর্তমান মূল্য পরিশোধ করে অপারেশনাল কাজে ব্যবহার করবে ডিপি ওয়ার্ল্ড। ফলে নতুন যন্ত্রপাতি ক্রয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষকে বিনিয়োগ করতে হবে না, একই সাথে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির মূল্য কর্তৃপক্ষের তহবিলে যোগ হবে। এ ছাড়া যন্ত্রপাতির মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় না থাকায় কর্তৃপক্ষের বার্ষিক বিপুল পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় হবে।

৮. বে টার্মিনাল ও অন্যান্য মেগা প্রকল্পে সহায়তার পথ সুগম হওয়া
এনসিটি পরিচালনার মাধ্যমে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে সফল অংশীদারিত্ব তৈরি হলে, চট্টগ্রাম বন্দরের প্রস্তাবিত বে টার্মিনাল কিংবা মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরের মতো মেগা প্রকল্পগুলোতে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও বিদেশি বড় বড় প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ আকর্ষণ করা অনেক সহজ হবে।

৯. মানবসম্পদ উন্নয়ন
আন্তর্জাতিক এই অপারেটরটি তাদের সাথে অত্যাধুনিক গ্যান্ট্রি ক্রেন, স্বয়ংক্রিয় লজিস্টিকস সফটওয়‍্যার এবং গ্রিন পোর্ট টেকনোলজি (পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি) নিয়ে আসবে। এর ফলে বাংলাদেশের স্থানীয় কর্মকর্তা ও বন্দর শ্রমিকরা আধুনিক বিশ্বমানের প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রশিক্ষণ পাবেন, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামগ্রিক বন্দর ব্যবস্থাপনার মানবসম্পদকে দক্ষ করে তুলবে।

টার্মিনাল পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ড, নিরাপত্তার চাবিকাঠি দেশ ও বন্দর কর্তৃপক্ষের হাতেই
ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে চুক্তি হবে শুধুমাত্র ‘টার্মিনাল অপারেশন ও লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনা’ সংক্রান্ত, কোনোভাবেই নিরাপত্তা বা সার্বভৌমত্ব হস্তান্তরের বিষয় নয়। বন্দর এলাকার সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বহির্নোঙ্গর নজরদারি এবং সাইবার গেটওয়ে নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও দেশীয় নিরাপত্তাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণেই থাকবে। চট্টগ্রাম বন্দর একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং আইএসপিএস (ISPS) কোড কমপ্লায়েন্ট বন্দর। এই বৈশ্বিক কোডের নিয়ম অনুযায়ী, টার্মিনালের চূড়ান্ত নিরাপত্তার চাবিকাঠি থাকবে বন্দরের হাতে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের নিজস্ব বা বিদেশি কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী আমাদের পূর্বানুমতি এবং কঠোর স্ক্রিনিং ছাড়া বন্দরের স্পর্শকাতর কোনো ডেটা বা সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশ করতে পারবেন না।

নিয়মিতভাবে বৈশ্বিক নিরাপত্তা সংস্থা (যেমন ইউএস কোস্ট গার্ড এবং আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন-IMO) দ্বারা অডিট হয় বন্দরে। চট্টগ্রাম বন্দর সর্বদা ‘নিরাপত্তা ঝুঁকিমুক্ত’ ক্যাটাগরিতে স্থান পেয়ে আসছে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের মতো একটি আন্তর্জাতিক মানের অপারেটর নিজেদের বাণিজ্যিক সুনাম ধরে রাখতেই ISPS কোডের নিরাপত্তা মানদণ্ড শতভাগ মেনে চলতে বাধ্য। নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোনো সামান্যতম গাফিলতি বা বিচ্যুতির ক্ষেত্রে বন্দর কর্তৃপক্ষের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বলবৎ থাকবে এবং প্রস্তাবিত চুক্তি বাতিলের কঠোর আইনি ধারা রয়েছে। এ ছাড়া ডিপি ওয়ার্ল্ড বন্দরে যে স্বয়ংক্রিয় টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম (TOS) ব্যবহার করবে, তার প্রতিটি ডেটা এবং সিসিটিভি (CCTV) ফিড রিয়েল-টাইমে বাংলাদেশ কাস্টমস, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) এবং দেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাথে সরাসরি সংযুক্ত থাকবে। ফলে বন্দরের ভেতরে কোন কনটেইনার আসছে বা যাচ্ছে, তার প্রতিটি তথ্যের ওপর রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে। তথ্য পাচার বা নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার কোনো প্রযুক্তিগত সুযোগ থাকবে না।

ল্যান্ডলর্ড মডেলের উৎকৃষ্ট প্রয়োগ
বিশ্বজুড়ে আধুনিক এবং বড় বড় সমুদ্রবন্দরগুলোর প্রায় ৮০% এরও বেশি বর্তমানে ‘ল্যান্ডলর্ড মডেল’ নীতিতে পরিচালিত হয়। রটারড্যাম, সিঙ্গাপুর, কিংবা দুবাইয়ের মতো বিশ্বসেরা বন্দরগুলো এই মডেল ব্যবহার করেই সফল হয়েছে। একটি আধুনিক বন্দর চালাতে প্রতিনিয়ত শত শত কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়। ল্যান্ডলর্ড মডেলে এই বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের দায়িত্ব বেসরকারি বা আন্তর্জাতিক অপারেটরের ওপর চলে যায়। ফলে সরকারের বা সাধারণ জনগণের ট্যাক্সের টাকা এই ঝুঁকিপূর্ণ বাণিজ্যিক বিনিয়োগে খরচ করতে হয় না। রাষ্ট্র সেই টাকা শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা অন্যান্য সামাজিক খাতে ব্যবহার করতে পারে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় কোনো নষ্ট যন্ত্রপাতি মেরামত করতে বা নতুন প্রযুক্তি কিনতে দীর্ঘ আইনি ও আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, যা বন্দরের গতি কমিয়ে দেয়। বেসরকারি অপারেটররা সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক নিয়মে চলে। তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ দ্রুত হয় এবং আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনের সাথে তাদের সরাসরি যোগাযোগ থাকে। এর ফলে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের গতি বাড়ে এবং জাহাজের বন্দরে অবস্থানকাল কমে যায়। অনেকের মনে ভয় থাকে, বেসরকারি বা বিদেশি কোম্পানিকে দিলে দেশ বন্দর হারাতে পারে। ল্যান্ডলর্ড মডেল এই ভয়কে সম্পূর্ণ দূর করে। এই মডেলে বন্দরের জমি, জেটি, জলসীমা এবং যাবতীয় স্থাবর সম্পত্তির মূল মালিকানা চিরকাল রাষ্ট্রের হাতেই থাকে। কোম্পানিটিকে কেবল একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য ‘অপারেশন বা পরিচালনার লাইসেন্স’ দেওয়া হয়। মেয়াদ শেষে বা শর্ত ভঙ্গ করলে সরকার যেকোনো সময় তাদের বের করে দিতে পারে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের মতো গ্লোবাল অপারেটরদের নিজস্ব বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক থাকে। তারা যখন কোনো বন্দরে যোগ দেয়, তখন বিশ্বের বড় বড় শিপিং লাইনগুলো সেই বন্দরে আসতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এর ফলে বন্দরে জাহাজের আগমন বাড়ে। অপারেটর লাভ করুক বা না করুক, ল্যান্ডলর্ড মডেলের চুক্তি অনুযায়ী রাষ্ট্র প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ স্থির রয়‍্যালটি, লিজ রেন্ট এবং প্রতি কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের ওপর নির্দিষ্ট ফি সরাসরি পেয়ে যায়। অর্থাৎ, ঝুঁকি ছাড়াই রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা নিশ্চিত হয়। এ ছাড়া একই সংস্থাকে যখন নিয়ম বানাতে হয় এবং নিজেই সেই নিয়ম মেনে ব্যবসা করতে হয়, তখন সেখানে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি বা দক্ষতার অভাব দেখা দিতে পারে। ল্যান্ডলর্ড মডেল এই দুটি কাজকে আলাদা করে দেয়। সরকার বা বন্দর কর্তৃপক্ষ এখানে কাজ করে ‘রেগুলেটর’ হিসেবে (নিরাপত্তা, ট্যারিফ ও আইন দেখবে)। আর বিদেশি বা বেসরকারি অপারেটর কাজ করবে, যারা শুধু ব্যবসা ও অপারেশন চালাবে। এতে বন্দরের সার্বিক সুশাসন নিশ্চিত হয়।

বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্পর্ক সুদূরপ্রসারী ও কৌশলগত
সংযুক্ত আরব আমিরাতের (UAE) সাথে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর, গতিশীল এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে আরব আমিরাত বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক অংশীদার। মূলত শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্স, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এবং অবকাঠামোগত বিনিয়োগ এই তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক দাঁড়িয়ে আছে।

১. শ্রমবাজার এবং রেমিট্যান্স
বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রায় ১২ লাখের বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি বসবাস করছেন, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ। সংখ্যার দিক থেকেভারতীয় ও পাকিস্তানি প্রবাসীদের পরেই বাংলাদেশিদের অবস্থান। সংযুক্ত আরব আমিরাত বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ রেমিট্যান্স উৎস। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যান এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (IOM) প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরব আমিরাত থেকে গড়ে বছরে ৪ থেকে সাড়ে ৪ বিলিয়ন (৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি) মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় বাংলাদেশে এসেছে।

মাসিক গড় প্রবাহ
বর্তমানে আরব আমিরাত থেকে প্রতি মাসে গড়ে ৩৫ কোটি থেকে 4৬ কোটি মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স ব্যাংকিং চ্যানেলে বাংলাদেশে আসে। চলতি বছরের মে মাসের এক মাসের হিসাবেই দেশটি থেকে প্রায় ৪৬ কোটি ৮১ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে।

২. দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য
দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ২ বিলিয়ন (২০০ কোটি) ডলার। দুই দেশই এই বাণিজ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার।

৩. বিনিয়োগ এবং অবকাঠামো উন্নয়ন
Currently বাংলাদেশে শীর্ষ ৫টি বিনিয়োগকারী দেশের একটি হলো সংযুক্ত আরব আমিরাত। সাম্প্রতিক সময়ে তারা বাংলাদেশের জ্বালানি, বন্দর ও লজিস্টিকস খাতে বড় বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছে।

৪. সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক চুক্তি ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব
বর্তমানে দুই দেশের মধ্যকার অর্থনৈতিক সম্পর্ককে সাধারণ পর্যায় থেকে ‘কৌশলগত অংশীদারিত্বে’ রূপান্তরের চেষ্টা চলছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো CEPA (Comprehensive Economic Partnership Agreement) বা ব্যাপকভিত্তিক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি। এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হলে দুই দেশের বাণিজ্য শুল্কমুক্ত হবে এবং বিনিয়োগের প্রবাহ আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

চট্টগ্রাম বন্দরকে এগিয়ে নিতে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমাদের
নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালে ডিপি ওয়ার্ল্ডের অন্তর্ভুক্তি কেবল একটি টার্মিনাল ব্যবস্থাপনার চুক্তি নয় বরং এটি বাংলাদেশের ব্লু-ইকোনমি ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে এগিয়ে যাওয়ার এক দূরদর্শী কৌশল। গ্লোবাল লজিস্টিকস জায়ান্ট ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাত ধরে যুক্ত হবে বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক ও আধুনিক প্রযুক্তি। আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত ‘ল্যান্ডলর্ড মডেল’ এবং ‘আইএসপিএস কোড’-এর দ্বিমুখী সুরক্ষাকবচের কারণে একদিকে যেমন বন্দরের মালিকানা ও সার্বভৌমত্ব শতভাগ অক্ষুণ্ণ থাকছে। নিরাপত্তা নিয়ে ওঠা সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আন্তর্জাতিক ‘আইএসপিএস (ISPS) কোড’ নিশ্চিত করবে বন্দরের বাণিজ্যিক গতি বাড়লেও এর সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার চাবিকাঠি সবসময় বন্দর কর্তৃপক্ষ ও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতেই সুরক্ষিত থাকবে। বৈশ্বিক মানদণ্ড এবং জাতীয় স্বার্থের এই সুষম সমন্বয় চট্টগ্রাম বন্দরকে আগামী দিনে আঞ্চলিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে।

সুফি বিশ্বাস: কলাম লেখক

শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন প্রধানমন্ত্রীর

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:২১ অপরাহ্ণ
শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন প্রধানমন্ত্রীর

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণে রাজধানীর ওসমানী উদ্যানে নির্মিত ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার (১৯ অক্টোবর) সকালে শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে তিনি স্মৃতিস্তম্ভটির উদ্বোধন করেন। একই অনুষ্ঠানে আধুনিকায়নকৃত ওসমানী উদ্যানেরও উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।

সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছান। পরে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদের বাবা মো. মকবুল হোসেন, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের বাবা মোস্তাফিজুর রহমান, শাহারিয়ার খাঁন আনাসের মা সানজিদা খান দীপ্তি এবং ওয়াসিম আকরামের বাবা মোহাম্মদ শফিউল আলমকে সঙ্গে নিয়ে স্মৃতিস্তম্ভটি উদ্বোধন করেন তিনি। উদ্বোধন শেষে স্মৃতিস্তম্ভ প্রাঙ্গণে একটি গাছের চারা রোপণ করেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর আধুনিকায়নকৃত ওসমানী উদ্যান ঘুরে দেখেন এবং উদ্যানের পাশে স্থাপিত গ্রন্থাগার পরিদর্শন করেন।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী আবদুল মঈন খান, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন।

৯০ ফুট উঁচু স্মৃতিস্তম্ভে ৮৩৪ শহীদের নাম

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণে প্রায় এক একর জায়গাজুড়ে নির্মাণ করা হয়েছে ৯০ ফুট উঁচু ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’। স্মৃতিস্তম্ভটির গায়ে লেজার কাটিংয়ের মাধ্যমে খোদাই করা হয়েছে ৮৩৪ জন শহীদের নাম। এর সামনে স্থাপন করা হয়েছে ২০টি প্রতীকী সমাধিফলক। স্মৃতিস্তম্ভটির বাইরের দিকে রয়েছে ১৬৩ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে ৪ ফুট উঁচু রিলিফ ভাস্কর্য। ভেতরের দিকে রয়েছে ১৭১ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে ৭ ফুট উঁচু আরেকটি রিলিফ ভাস্কর্য।

এসব ভাস্কর্যে বাংলাদেশের দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। এতে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের গণআন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিভিন্ন অধ্যায় স্থান পেয়েছে। স্মৃতিস্তম্ভটির মাধ্যমে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণের পাশাপাশি বাংলাদেশের বিভিন্ন সময়ের আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসও তুলে ধরা হয়েছে।

আধুনিকায়নে নতুন রূপ পেল ঐতিহাসিক ওসমানী উদ্যান

জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের পাশাপাশি উদ্বোধন করা হয়েছে রাজধানীর পুরান ও নতুন ঢাকার সংযোগস্থলে অবস্থিত ২৩ একর আয়তনের ঐতিহাসিক ওসমানী উদ্যানের আধুনিকায়ন প্রকল্প। উদ্যানটিকে সবুজ, নিরাপদ ও আধুনিক নাগরিক বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় পুরোনো জলাশয় সংস্কারের পাশাপাশি পাঁচটি নতুন জলাশয় নির্মাণ করা হয়েছে। বিদ্যমান গাছপালা সংরক্ষণ করে নতুন বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে এবং তৈরি করা হয়েছে সবুজ দ্বীপ। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে উদ্যানটির প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সৌন্দর্য বাড়ানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

হাঁটার পথ, ব্যায়ামাগার ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা

আধুনিকায়নকৃত ওসমানী উদ্যানে প্রায় ৩ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ হাঁটার পথ নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে ব্যায়ামাগার, প্যাগোডা, গণশৌচাগার, পার্কিং সুবিধা এবং জলাশয়ের ঘাট। উদ্যানটিতে ৫০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার বৃষ্টির পানি সংরক্ষণব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। দুই স্তরে সাজানো উদ্যানটির সড়ক থেকে দুই মিটার উঁচুতে রয়েছে দ্রুত চলাচলের পথ। নতুন অবকাঠামো ও সবুজায়নের মাধ্যমে ওসমানী উদ্যানকে নগরবাসীর বিনোদন, হাঁটাচলা ও শরীরচর্চার উপযোগী করে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণ ও নাগরিক পরিবেশ উন্নয়নের উদ্যোগ

জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ এবং ওসমানী উদ্যান আধুনিকায়নের প্রকল্প দুটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণ ও রাজধানীর নাগরিক পরিবেশ উন্নয়নের লক্ষ্যে। একটি প্রকল্পে শহীদদের নাম ও বাংলাদেশের আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে, অন্যটিতে নাগরিকদের জন্য সবুজ ও আধুনিক উন্মুক্ত পরিসর গড়ে তোলা হয়েছে।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

 

সীমান্তের গেট বন্ধ, খাদ্যসংকটে ১৫০ হাতি—বাড়ছে মানুষ-হাতির সংঘাত

শেরপুর সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:১৬ অপরাহ্ণ
সীমান্তের গেট বন্ধ, খাদ্যসংকটে ১৫০ হাতি—বাড়ছে মানুষ-হাতির সংঘাত

ভারতের মেঘালয় থেকে আসা প্রায় ১৫০টি বন্যহাতি দুই বছর ধরে নিজ আবাসস্থলে ফিরতে পারছে না। শেরপুর ও জামালপুরের গারো পাহাড় এলাকায় বিচরণ করা হাতিগুলোর স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ায় থাকা গেট বন্ধ থাকায়। এতে হাতির খাদ্যসংকট বাড়ার পাশাপাশি কৃষিজমি ও বসতবাড়ির ক্ষতি এবং মানুষ-হাতির সংঘাতের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।

বন বিভাগের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, হাতিগুলো কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে শেরপুর ও জামালপুরের প্রায় ১২ হাজার হেক্টর বনাঞ্চল ও আশপাশের এলাকায় বিচরণ করছে। এসব দলে ২৫ থেকে ৩০টি শাবকও রয়েছে। বনাঞ্চলে পর্যাপ্ত খাবার না পেয়ে হাতির পাল প্রায়ই লোকালয় ও কৃষিজমিতে ঢুকে পড়ছে। এতে ফসল নষ্ট হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বসতবাড়ি, আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দারা।

বন বিভাগের কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালের দিকে ভারতের মেঘালয় থেকে ১০ থেকে ১৫টি বন্যহাতি বাংলাদেশের গারো পাহাড় এলাকায় আসে। পরে বংশবিস্তারের ফলে হাতির সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১৫০টিতে পৌঁছেছে। একসময় হাতির দল নিয়মিত বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তবর্তী বনাঞ্চলের মধ্যে চলাচল করত। ২০০৭ সালে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে মেঘালয় রাজ্যের সঙ্গে শেরপুর ও জামালপুরের সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রায় ৫০ কিলোমিটার কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা হয়। হাতির চলাচল সহজ রাখতে সেখানে ৪৪টি গেট ও নদী-ছড়ার ওপর ১১টি আন্ডারপাস তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু গেটগুলো বন্ধ থাকায় হাতিগুলো আগের মতো সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে ফিরতে পারছে না বলে জানিয়েছে বন বিভাগ।

কর্মকর্তারা জানান, সীমান্তের গেট খুলে দেওয়ার জন্য ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার অনুরোধ জানানো হয়েছে। তবে এখনো প্রত্যাশিত সাড়া পাওয়া যায়নি। হাতির আবাসস্থলে পর্যাপ্ত খাবার না থাকলে তারা খাদ্যের সন্ধানে কৃষিজমি ও লোকালয়ে প্রবেশ করে। এতে একদিকে কৃষকের ফসল নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে হাতির মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কায় আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের।

নালিতাবাড়ী উপজেলার পানিহাটা এলাকার কৃষক যোসেফ মারাক বলেন, এমন কোনো বছর নেই, যে বছর হাতি এসে ফসলের ক্ষতি করে না। বছরের পর বছর ফসল নষ্ট হওয়ায় ঠিকমতো ঘরে ধান তুলতে পারেন না তাঁরা। সারা বছরের পরিশ্রমের ফসল হাতি নষ্ট করে দেওয়ায় পরিবার নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। একই এলাকার কৃষানি আশালতা বলেন, ধান পাকার সময় এলেই হাতির আতঙ্ক বাড়ে। কখন হাতির পাল এসে জমির ফসল নষ্ট করে, সেই দুশ্চিন্তায় রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। ফসল রক্ষায় রাত জেগে পাহারা দিয়েও শেষ পর্যন্ত সব ফসল বাঁচানো সম্ভব হয় না।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শেরপুরে মানুষ-হাতির সংঘাতের ঘটনায় প্রায় ৪৩৫ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। একই সময়ে হাতির সঙ্গে সংঘাতে ১০ জন মানুষ ও চারটি বন্যহাতির মৃত্যু হয়েছে। এ পরিসংখ্যান সীমান্তবর্তী অঞ্চলে মানুষ ও বন্যহাতির সহাবস্থান নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি সামনে এনেছে। হাতির দল লোকালয়ে প্রবেশ করলে মানুষের জীবন ও সম্পদের ঝুঁকি তৈরি হয়। আবার মানুষের সঙ্গে সংঘাতের কারণে হাতিরও প্রাণহানি ঘটে।বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সমস্যার জন্য শুধু লোকালয়ে হাতির প্রবেশকে দায়ী করলে মূল কারণগুলো আড়ালে থেকে যাবে। হাতির চলাচলের পথ সংকুচিত হওয়া, বনাঞ্চলে খাদ্যের প্রাপ্যতা এবং মানুষের কৃষি ও বসতি সম্প্রসারণ—সবকিছুই গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এ আজিজের মতে, হাতির স্বাভাবিক চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত হলে মানুষ-হাতির সংঘাত বাড়তে পারে। এ সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ ও ভারতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তিনি জানান, দুই দেশের মধ্যে আন্তঃসীমান্ত হাতি সংরক্ষণে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে একটি প্রটোকল স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এ উদ্যোগের উল্লেখযোগ্য কার্যকর অগ্রগতি দেখা যায়নি বলে তাঁর মত। বন্যহাতি পরিযায়ী প্রাণী। তাদের চলাচলের পথ এক দেশের সীমান্তে আটকে গেলে আবাসস্থল, খাদ্য সংগ্রহ ও প্রজননের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। তাই সীমান্তবর্তী বনাঞ্চলের সংযোগ বজায় রাখা এবং হাতির চলাচলের উপযোগী পথ নিশ্চিত করাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

গত ১০ অক্টোবর শেরপুরের নালিতাবাড়ীর মধুটিলা ইকোপার্কে মানুষ-হাতির সংঘাত নিরসন ও বন্যহাতি সংরক্ষণবিষয়ক এক আলোচনায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান।

মন্ত্রী বলেন, বিদ্যমান প্রটোকলের আওতায় ভারতের সঙ্গে আলোচনা শুরু করা হবে। হাতির চলাচল সহজ করতে সীমান্তের গেট খুলে দেওয়ার জন্য ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানানো হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এ ছাড়া শেরপুরের বনাঞ্চলকে হাতির নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান মন্ত্রী। গারো পাহাড়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও বন্যহাতিকে কেন্দ্র করে পর্যটনের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। গারো পাহাড়ের বর্তমান পরিস্থিতিতে বন্যহাতির নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষা—দুই বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সীমান্তের গেট খোলার বিষয়ে দুই দেশের সমন্বয়, বনাঞ্চলে খাদ্যের প্রাপ্যতা বাড়ানো, হাতির চলাচলের পথ সংরক্ষণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তার মতো উদ্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভূমিকা রাখতে পারে।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

 

খুন-ধর্ষণ-নারী নির্যাতনে উদ্বেগ, কুমিল্লায় ৯ মাসে ১১১ প্রাণহানি

কুমিল্লা সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:০২ অপরাহ্ণ
খুন-ধর্ষণ-নারী নির্যাতনে উদ্বেগ, কুমিল্লায় ৯ মাসে ১১১ প্রাণহানি

কুমিল্লায় খুন, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, ছিনতাই ও ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী ও স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর সম্প্রতি সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় জেলাজুড়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে কুমিল্লায় ১১১টি খুন ও ১৩৯টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ২৩২টি।

জেলার ১৮টি থানার তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, নয় মাসে বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগে মোট চার হাজার ৯৬৩টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে অপহরণের ১৪টি ও ডাকাতির ৩৬টি ঘটনা রয়েছে। এ ছাড়া দাঙ্গা, দস্যুতা, চুরি, ছিনতাইসহ অন্যান্য অপরাধের ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে। পুলিশের দাবি, হত্যা ও ধর্ষণসহ প্রতিটি ঘটনার রহস্য উদ্‌ঘাটনে তারা সক্ষম হয়েছে। তবে ধারাবাহিক অপরাধের ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও শিক্ষাবিদেরা। তাঁদের মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে অপরাধের চিত্র

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসে কুমিল্লায় ১৪টি খুন, ১৬টি ধর্ষণ ও ১৭টি নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনাসহ মোট ৪৯১টি অপরাধের মামলা হয়। ফেব্রুয়ারিতে ১২টি খুন, ৮টি ধর্ষণ ও ১৯টি নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনাসহ মামলা হয় ৪০৭টি।

মার্চে ১১টি খুন, ৯টি ধর্ষণ ও ১৮টি নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনাসহ মোট মামলার সংখ্যা ছিল ৫১৭। এপ্রিলে ১০টি খুন, ২০টি ধর্ষণ ও ২৮টি নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনাসহ মামলা হয় ৫৮৪টি। মে মাসে খুনের সংখ্যা বেড়ে ১৭টিতে দাঁড়ায়, যা উল্লেখিত মাসগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। এ মাসে ১২টি ধর্ষণ ও ২৪টি নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনাসহ মোট ৬১২টি অপরাধের মামলা হয়। জুনে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ছিল ৪১টি, যা ওই সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। এ মাসে ১০টি খুন ও ২১টি ধর্ষণের ঘটনাসহ মামলা হয় ৫৭৭টি।

জুলাইয়ে ১০টি খুন, ২২টি ধর্ষণ ও ৩০টি নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনাসহ মোট ৫০৯টি মামলা হয়। আগস্টে ১১টি খুন, ১৭টি ধর্ষণ ও ২১টি নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনাসহ মামলা হয় ৫৮৫টি। সেপ্টেম্বর মাসে খুনের সংখ্যা বেড়ে ১৬টিতে দাঁড়ায়। এ মাসে ১৪টি ধর্ষণ ও ৩৪টি নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনাসহ মোট ৬৮১টি অপরাধের মামলা নথিভুক্ত হয়।

কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী হত্যা

এপ্রিল মাসের আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী হত্যা। ২৫ এপ্রিল রাতে চট্টগ্রাম থেকে বাসে এসে কুমিল্লার ঝাগুরঝুলি এলাকায় মহাসড়কে নামার পর তিনি ছিনতাইকারীদের হামলার শিকার হন এবং নিহত হন। এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সোহাগ, এমরান, রাহাত ও সুজন নামে চারজনকে গ্রেপ্তার করে। ঘটনাটি মহাসড়কে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলে।

আইফোনের জন্য স্কুলছাত্র অপ্রতিমকে হত্যা

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র ছেলে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। গত ১৯ সেপ্টেম্বর বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় অপ্রতিম। পরদিন লালমাই পাহাড়ের একটি জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় পুলিশ কিশোর গ্যাংয়ের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশের বরাতে জানা যায়, অপ্রতিমের আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে হত্যা করা হয়েছিল। একটি মুঠোফোনের জন্য স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীকে হত্যার ঘটনা কিশোর অপরাধ, অপরাধী চক্রের তৎপরতা এবং শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

সপ্তম শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ

সর্বশেষ আলোচিত ঘটনাটি ঘটে অক্টোবরে। গত ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকার বাসা থেকে বের হয় সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রী। এরপর তার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। ৮ অক্টোবর সকালে লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানক্ষেত থেকে পুলিশ তার মরদেহ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমন মিয়া ওই ছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। ঘটনাটি শিশু-কিশোরীদের নিরাপত্তা এবং যৌন সহিংসতা প্রতিরোধের বিষয়টিকে আবারও সামনে এনেছে।

দেবিদ্বারে বৃদ্ধা হত্যার পর মরদেহ টুকরো করার ঘটনা

গত ৭ আগস্ট রাতে দেবিদ্বার উপজেলা সদরে ফরিদা ইয়াসমিন নামে এক বৃদ্ধাকে হত্যার পর তাঁর মরদেহ টুকরো করে বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। পরদিন পাশের একটি ডোবা থেকে পলিথিনে মোড়ানো মরদেহের খণ্ডগুলো উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় ভাড়াটিয়া লাইলী আক্তার ও তাঁর সহযোগী আমির হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডও জেলার অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে।

‘শুধু অভিযান চালিয়ে অপরাধ বন্ধ করা যাবে না’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কুমিল্লার সভাপতি শাহ মো. আলমগীর খান বলেন, কিশোর অপরাধসহ সমাজে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ বেড়েছে। শুধু অভিযান চালিয়ে এসব অপরাধ বন্ধ করা সম্ভব নয়। এ জন্য পারিবারিক ও নৈতিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। সুন্দর সমাজ গড়ে তুলতে সামাজিকভাবে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখারও আহ্বান জানান তিনি।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, গতানুগতিক পদ্ধতিতে এখন আর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। এ জন্য রাষ্ট্রকে নতুন করে ভাবতে হবে। কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে পরিবার থেকেই উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। শিশু-কিশোরেরা যেন মুঠোফোনে অতিরিক্ত আসক্ত হয়ে না পড়ে, সে বিষয়ে অভিভাবকদের সজাগ থাকার পরামর্শও দেন এই শিক্ষাবিদ।

ধর্ষণ মামলার বিচার বিলম্বের কারণ

কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মুহাম্মদ বদিউল আলম বলেন, ধর্ষণ মামলার তদন্তে ধীরগতি, একাধিকবার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন, ডাক্তারি পরীক্ষা ও ডিএনএ প্রতিবেদন পেতে দেরি এবং সাক্ষী পাওয়া নিয়ে জটিলতার কারণে বিচারপ্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেট সাক্ষী সময়মতো না পাওয়াও বিলম্বের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এতে অনেক ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. শারমিন সুলতানা বলেন, অনেক সময় আলামত নষ্ট হওয়ার পর ভুক্তভোগীকে ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য আনা হয়। পোশাকসহ অন্যান্য আলামতও যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয় না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে ডিএনএ নমুনা পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে অপরাধের তদন্তের পাশাপাশি আলামত সংরক্ষণ, দ্রুত ফরেনসিক পরীক্ষা এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহের গুরুত্ব উঠে এসেছে। বিশেষ করে ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতনের মামলায় দ্রুত ও নির্ভুল তদন্ত বিচারপ্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

পুলিশের দাবি, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে চলছে অভিযান

কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান বলেন, হত্যা ও ধর্ষণসহ প্রতিটি ঘটনার রহস্য স্বল্প সময়ের মধ্যে উদ্‌ঘাটনে পুলিশ সক্ষম হয়েছে। জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা বিভাগ, এসআরবিসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা মাঠে কাজ করছে। তিনি আরও জানান, কিশোর গ্যাং ও মাদকবিরোধী অভিযানসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে দুই সহস্রাধিক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। নানা ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি