মানবজাতির জন্য হুমকি হতে পারে সুপারইন্টেলিজেন্ট এআই, সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতিতে একদিকে যেমন নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলছে, অন্যদিকে তেমনি বাড়ছে মানবজাতির অস্তিত্ব নিয়ে উদ্বেগ। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, মানুষের চেয়ে অনেক বেশি বুদ্ধিমান বা ‘সুপারইন্টেলিজেন্ট’ এআই তৈরি হলে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এমনকি চলতি দশকের শেষ নাগাদ এআই মানবজাতির জন্য বড় ধরনের অস্তিত্বগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন কয়েকজন গবেষক।
সম্প্রতি অ্যানথ্রপিকের এআই নিরাপত্তা গবেষক জ্যাকব কক্সন পদত্যাগের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। চাকরি ছাড়ার পর তিনি সতর্ক করে বলেন, অতি বুদ্ধিসম্পন্ন এআই মানুষের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। তার অভিযোগ, অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআইয়ের মতো শীর্ষ এআই প্রতিষ্ঠানগুলো এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় যথেষ্ট দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
কীভাবে বিপদ তৈরি হতে পারে
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুপারইন্টেলিজেন্ট এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি শুধু মানুষের সঙ্গে যন্ত্রের সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাজনৈতিক অস্থিরতা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় হামলা, আর্থিক ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা এবং গণবিধ্বংসী অস্ত্রের অপব্যবহার—সবই বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে কোনো শক্তিশালী এআই সিস্টেম যদি পারমাণবিক, জৈবিক বা অন্যান্য ভয়ংকর অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তাহলে এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। এ ছাড়া ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন ব্যবস্থা, বিদ্যুৎকেন্দ্র কিংবা অন্যান্য অবকাঠামোয় এআই-নির্ভর হামলা চালানো হলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
বড় চ্যালেঞ্জ ‘অ্যালাইনমেন্ট’
গবেষকেরা এ সমস্যাকে ‘অ্যালাইনমেন্ট প্রবলেম’ বা সামঞ্জস্যের সমস্যা হিসেবে দেখছেন। অর্থাৎ মানুষের তৈরি এআইয়ের লক্ষ্য ও আচরণ যেন মানুষের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে, সেটি নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ।
এআই যত বেশি সক্ষম হয়ে উঠবে, তার সিদ্ধান্ত ও আচরণ নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি তত জটিল হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, কোনো সিস্টেম নিজের নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ করতে গিয়ে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে, যা মানুষের জন্য ক্ষতিকর।
জৈবিক অস্ত্র নিয়েও উদ্বেগ
এআইয়ের অপব্যবহারের আরেকটি বড় আশঙ্কা জৈবিক অস্ত্র তৈরিতে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শক্তিশালী এআই ব্যবহার করে বিপজ্জনক জীবাণু বা জৈবিক হামলার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা সম্ভব হলে নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়তে পারে।
অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, তারা জৈবিক অস্ত্র তৈরিতে সহায়তা চাওয়া পাঁচটি ক্ষতিকর প্রচেষ্টা প্রতিহত করেছে। এ ঘটনা এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়ে চলমান উদ্বেগকে আরও সামনে এনেছে।
নিয়ন্ত্রণের উপায় নিয়ে অনিশ্চয়তা
কন্ট্রোলএআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী আন্দ্রে মিওত্তির মতে, সুপারইন্টেলিজেন্ট এআইকে কীভাবে নির্ভরযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো সমাধান নেই।
তার আশঙ্কা, বিপুলসংখ্যক নিয়ন্ত্রণহীন এআই এজেন্ট একে অপরের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার শিকার হতে পারে মানুষ। একই সঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশগুলোর সামরিক ব্যবস্থায় এআইয়ের অতিরিক্ত ব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের এসব আশঙ্কা এখনো সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। বর্তমানে এআই মানুষের মতো সব কাজ করতে সক্ষম নয় এবং সুপারইন্টেলিজেন্ট এআইয়ের ভবিষ্যৎ আচরণ নিয়েও নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যায় না। তারপরও প্রযুক্তির সক্ষমতা যত বাড়ছে, ততই নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ ও মানবস্বার্থের সঙ্গে এআইয়ের সামঞ্জস্য নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা সামনে আসছে।
প্রযুক্তির অগ্রগতির পাশাপাশি তাই এআই নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলাকেই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হিসেবে দেখছেন গবেষকেরা।
সূত্র: ডেইলি মেইল
কালের আলো/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
Array