পাট খাতে প্রযুক্তি ও গবেষণায় বাংলাদেশের পাশে চীনের জিয়াংনান বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলাদেশের পাট খাতের বহুমুখী ব্যবহার সম্প্রসারণ, উন্নত বীজ উৎপাদন, আঁশের ফলন বৃদ্ধি এবং উচ্চমূল্যের পাটপণ্য উদ্ভাবনে যৌথভাবে কাজ করবে বাংলাদেশ ও চীনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়। এ লক্ষ্যে জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টার (জেডিপিসি) ও চীনের জিয়াংনান ইউনিভার্সিটির মধ্যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর হয়েছে। রোববার (১৮ অক্টোবর) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম। সমঝোতা স্মারকে বাংলাদেশের পক্ষে স্বাক্ষর করেন বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মো. জাহিদ হোসেন। চীনের পক্ষে স্বাক্ষর করেন জিয়াংনান ইউনিভার্সিটির ডিন অধ্যাপক মা পিবো।
অনুষ্ঠানে বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বাংলাদেশের পাট খাতের উন্নয়নে শুধু আর্থিক বিনিয়োগ নয়, বরং উন্নত প্রযুক্তি ও গবেষণা সহযোগিতা বেশি প্রয়োজন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের নিজস্ব বিনিয়োগ সক্ষমতা রয়েছে। তবে উন্নত পাটবীজ উৎপাদন, আঁশের ফলন বৃদ্ধি এবং উচ্চমূল্যের বহুমুখী পণ্য তৈরিতে চীনের আধুনিক প্রযুক্তি ও গবেষণা সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশ শুধু কাঁচা পাট কিংবা পাটের সুতা রপ্তানির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না। পাট প্রক্রিয়াজাতকরণ থেকে শুরু করে মূল্য সংযোজনের প্রতিটি ধাপে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক উচ্চমূল্যের পণ্য রপ্তানি করাই সরকারের লক্ষ্য। তাঁর মতে, পাটের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে বীজ উৎপাদন, উন্নতমানের আঁশ, আধুনিক কাপড় এবং বহুমুখী পণ্য উদ্ভাবনে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে চীনের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব কার্যকর হতে পারে।
সমঝোতা স্মারকের আওতায় জেডিপিসি ও জিয়াংনান ইউনিভার্সিটি পাটের বহুমুখী ব্যবহার সম্প্রসারণ, উন্নত বীজ উৎপাদন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং বস্ত্র খাতে গবেষণালব্ধ প্রযুক্তির প্রয়োগ নিয়ে যৌথভাবে কাজ করবে। এ সহযোগিতার মাধ্যমে গবেষণাগারে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি বাস্তব উৎপাদনব্যবস্থায় কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে পাট থেকে বিকল্প ফাইবার, উন্নতমানের কাপড় এবং নতুন ধরনের টেক্সটাইল পণ্য তৈরিতে গবেষণার সম্ভাবনা রয়েছে। অনুষ্ঠানে জিয়াংনান ইউনিভার্সিটির টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলের ডিন বাংলাদেশের পাট ও বস্ত্র খাতের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশ সফর করে মাঠপর্যায়ের চাহিদা এবং শিল্প খাতের বাস্তব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন। গবেষণার ফলাফল শিল্প খাতে কার্যকরভাবে প্রয়োগের জন্য তিনি যৌথ গবেষণাগার বা ‘জয়েন্ট ল্যাব’ প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেন।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গেও সমন্বিতভাবে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে চীনা প্রতিনিধিদল। এ ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুটেক্স) মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করে একটি সমন্বিত গবেষণা প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার বিষয়ে আগ্রহ জানানো হয়েছে। এর মাধ্যমে পাট ও তৈরি পোশাক খাতে নতুন ধরনের পণ্য উদ্ভাবন, উৎপাদনপ্রযুক্তির উন্নয়ন এবং গবেষণার ফল শিল্পপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োগের সুযোগ বাড়তে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন সংশ্লিষ্টরা। এ ধরনের সহযোগিতা কার্যকর হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং পাটপণ্য উৎপাদনকারীদের মধ্যে জ্ঞান ও প্রযুক্তি বিনিময়ের পরিসরও বাড়বে।
বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই) ও জেডিপিসিকে জিয়াংনান ইউনিভার্সিটির গবেষণাগারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের গবেষক ও প্রযুক্তিবিদদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ এবং গবেষণালব্ধ জ্ঞান বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি পাটের বীজ, আঁশের মান, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও নতুন পণ্য উদ্ভাবনে যৌথ গবেষণার ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হবে।
বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম বলেন, পাটের বহুমুখীকরণে গবেষণালব্ধ প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া জরুরি। তিনি বলেন, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের আধুনিক উৎপাদনপদ্ধতি, পণ্যের নকশা এবং মান নিয়ন্ত্রণে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া গেলে আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য তৈরির সক্ষমতা বাড়বে। প্রতিমন্ত্রীর মতে, জিয়াংনান ইউনিভার্সিটির সঙ্গে সহযোগিতা দেশের পাটপণ্য উৎপাদক ও কারিগরদের দক্ষতা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। গবেষণা ও প্রযুক্তির সুবিধা উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছানো গেলে নতুন পণ্য তৈরির পাশাপাশি উৎপাদনের মান উন্নয়নেও সহায়তা মিলবে।
বাংলাদেশের পাট খাতের সামনে বড় সম্ভাবনাগুলোর একটি হলো কাঁচামাল ও সাধারণ পণ্যের পাশাপাশি উন্নতমানের প্রক্রিয়াজাত পণ্য তৈরি করে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করা। এ জন্য উন্নত বীজ, মানসম্মত আঁশ, আধুনিক উৎপাদনপ্রযুক্তি এবং পণ্যের নকশায় উদ্ভাবন প্রয়োজন। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, জেডিপিসি ও জিয়াংনান ইউনিভার্সিটির সহযোগিতায় পাটভিত্তিক বিকল্প ফাইবার, উন্নতমানের কাপড় এবং বহুমুখী টেক্সটাইল পণ্য উদ্ভাবনের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে গবেষণা ও প্রযুক্তির প্রয়োগ বাড়লে কাঁচামালনির্ভর রপ্তানি থেকে উচ্চমূল্য সংযোজিত পণ্য উৎপাদনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]