খুঁজুন
                               
, ,
           

ট্রাম্পের চিঠি: বোয়িংয়ের আড়ালে বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণ

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড. একেএম শামছুল ইসলাম, পিএসসি, জি (অব.)
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:৪১ অপরাহ্ণ
ট্রাম্পের চিঠি: বোয়িংয়ের আড়ালে বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণ

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দেয়া সাম্প্রতিক চিঠিটি আকারে ছোট হলেও এর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তাৎপর্য বেশ গভীর। চিঠির তাৎক্ষণিক কারণ বাংলাদেশের বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত। কিন্তু এর ভাষা ও সময় বিবেচনা করলে এটি কেবল একটি বাণিজ্যিক লেনদেনের জন্য ধন্যবাদজ্ঞাপন নয়; বরং বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সম্ভাব্য নতুন গতিপথের একটি গুরুত্বপূর্ণ সবুজ সংকেত।

ডোনাল্ড ট্রাম্প চিঠিতে বোয়িং কেনার সিদ্ধান্তের জন্য জনাব তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন এবং বলেছেন, “Boeing will not let you down, and I will not forget।” এরপর বাংলাদেশের জনগণের প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা বলেছেন।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হলো, মার্কিন প্রেসিডেন্ট অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ একজন রাষ্ট্রপ্রধানের এমন ব্যক্তিগত বার্তা তাই নিছক প্রটোকল নয়; এর মধ্যে রাজনৈতিক আস্থা এবং ভবিষ্যৎ উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের ইঙ্গিত রয়েছে।

বোয়িং যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান। একটি বড় বিমান ক্রয় শুধু উড়োজাহাজ কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার সম্পর্ক তৈরি হয়। ফলে এ ধরনের চুক্তি দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে দীর্ঘস্থায়ী করার সুযোগ সৃষ্টি করে। তবে এর সম্ভাবনা শুধু বিমান ক্রয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বোয়িং-এর সঙ্গে সম্পর্ককে Aviation Maintenance, Repair and Overhaul (MRO), প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তি এবং Aerospace-Related Supply Chain-এ বাংলাদেশের অংশগ্রহণের সুযোগ হিসেবেও কাজে লাগানো যেতে পারে। অর্থাৎ চুক্তিটির দীর্ঘমেয়াদি মূল্য নির্ভর করবে এটি বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্বে কতটা রূপ নেয় তার ওপর।

তবে চিঠিটির প্রকৃত তাৎপর্য বোঝার জন্য বাংলাদেশের বর্তমান ভূরাজনৈতিক অবস্থান বিবেচনা করা জরুরি।

বাংলাদেশ এমন এক অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত প্রতিযোগিতার প্রভাব সরাসরি পড়তে পারে। বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগরীয় যোগাযোগ, আঞ্চলিক বাণিজ্য, বন্দর, সমুদ্রপথ এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তার কারণে বাংলাদেশের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। ফলে ঢাকা এখন শুধু একটি আঞ্চলিক রাষ্ট্র নয়; বৃহত্তর Indo-Pacific ভূরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অবকাঠামো, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক দীর্ঘদিনের এবং সাম্প্রতিক সময়ে তা আরও বিস্তৃত হয়েছে। বাংলাদেশের উন্নয়ন অবকাঠামো, শিল্প, যোগাযোগ ও বিভিন্ন প্রকল্পে চীনা সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি বাজার এবং প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সম্ভাব্য বড় অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র। ফলে বাংলাদেশের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো এই দুই বৃহৎ শক্তির সঙ্গে সম্পর্ককে পরস্পরবিরোধী না করে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালনা করা।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর এবং একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার উদ্যোগের পাশাপাশি ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই চিঠি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনে-বাংলাদেশ সম্ভবত ‘Multi-alignment’ বা বহুমুখী কৌশলগত ভারসাম্যের পথে এগোচ্ছে। এর অর্থ কোনো একটি পক্ষকে বেছে নেওয়া নয়; বরং বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সহযোগিতা করে বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।

এদিকে, চীন–যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতা যতো বাড়ছে, বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রগুলোর কৌশলগত গুরুত্বও ততো বাড়ছে। ওয়াশিংটন স্বাভাবিকভাবেই চাইবে Indo-Pacific অঞ্চলে চীনের প্রভাব যেন একচেটিয়া না হয়। অন্যদিকে বেইজিংও বাংলাদেশের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানের দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর করতে আগ্রহী। এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমান নীতি হতে পারে কারও প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে উভয়ের সঙ্গে স্বার্থভিত্তিক সহযোগিতা করা।

এখানেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের চিঠির তাৎপর্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক যখন নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে, তখন মার্কিন প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে বোয়িং কেনার জন্য ব্যক্তিগত ধন্যবাদ, বাংলাদেশের নেতৃত্বের প্রশংসা এবং জনাব তারেক রহমানের সঙ্গে অদূর ভবিষ্যতে সাক্ষাতের আগ্রহ— সব মিলিয়ে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করার আগ্রহের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে এটিকে বাংলাদেশকে চীনের বিপরীতে দাঁড় করানোর সরাসরি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা অতিরঞ্জিত হবে। বরং এটি দেখায় যে, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে দুই বৃহৎ শক্তির আগ্রহ বাড়ছে।

চিঠিতে জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রশংসাও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের নতুন সরকারের জন্য আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রকাশ্য ইতিবাচক মন্তব্য সরকারের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি শক্তিশালী করতে পারে। তবে এটিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের আনুষ্ঠানিক সমর্থন হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। বরং এটি নতুন সরকারের সঙ্গে ওয়াশিংটনের ইতিবাচক সম্পর্ক তৈরির একটি রাজনৈতিক সংকেত হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিযুক্ত।

চিঠির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হলো সম্ভাব্য সাক্ষাতের কথা। ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তারেক রহমানের সরাসরি বৈঠক হলে সেটি দুই দেশের সম্পর্ককে আরও উচ্চপর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। সেখানে শুধু বোয়িং নয়, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা, রোহিঙ্গা সংকট এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মতো বিষয় আলোচনায় আসতে পারে। বাংলাদেশের উচিত হবে এমন বৈঠককে সৌজন্য সাক্ষাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সুস্পষ্ট অর্থনৈতিক ও কৌশলগত Agenda সামনে রাখা।

বিশেষ করে বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করার সুযোগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও বাজারকে বাংলাদেশের শিল্পায়ন, দক্ষ জনশক্তি এবং উচ্চমূল্যের রপ্তানি খাত সম্প্রসারণের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে সম্পর্কটি শুধু পণ্য আমদানি-রপ্তানির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি Economic Partnership-এ রূপ নিতে পারে।

প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের সামনে বড় সুযোগ রয়েছে। আধুনিকায়নের জন্য বাংলাদেশকে বিভিন্ন দেশের প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম বিবেচনা করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ইউরোপসহ সব পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে প্রতিযোগিতামূলকভাবে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহ করলে বাংলাদেশের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়বে এবং কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি কমবে। একই সঙ্গে প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদী সরবরাহ-নিরাপত্তাকেও সিদ্ধান্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ করতে হবে।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতাকে নিজের উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করা। চীন থেকে অবকাঠামো ও শিল্প সহযোগিতা, যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও বাজার সুবিধা এবং ইউরোপ, জাপান ও অন্যান্য অংশীদারের কাছ থেকে উন্নত প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ – এ সবকিছুকে একটি সমন্বিত জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের আওতায় আনা সম্ভব।

তবে এই নীতি বাস্তবায়নের জন্য সূক্ষ্ম কূটনৈতিক ভারসাম্য প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা চীনের উদ্বেগ বাড়াতে পারে, আবার চীনের সঙ্গে অতিরিক্ত সামরিক বা কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা যুক্তরাষ্ট্রের সন্দেহ সৃষ্টি করতে পারে। তাই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত কোনো শক্তির পক্ষে অবস্থান নয়, বরং কৌশলগত স্বাধীনতা এবং জাতীয় স্বার্থ।

এই নীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ব্যক্তিগত সম্পর্কের পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক গড়ে তোলা। ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তারেক রহমানের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ইতিবাচক হলেও সেটি যেনো দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের একমাত্র ভিত্তি না হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন পরিবর্তিত হতে পারে, তাই কংগ্রেস, স্টেট ডিপার্টমেন্ট, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত মহলসহ বিভিন্ন স্তরে বাংলাদেশের সম্পর্ক গভীর করা প্রয়োজন।

একইভাবে চীনের সঙ্গেও সম্পর্ককে শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্বের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না রেখে অর্থনীতি, শিল্প, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও অবকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতায় পরিণত করা প্রয়োজন। এতে সরকার পরিবর্তন বা আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন হলেও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তি স্থিতিশীল থাকবে।

সব মিলিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চিঠিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মৌলিক পরিবর্তনের ঘোষণা বলা যাবে না। বোয়িং ক্রয়ও একা যুক্তরাষ্ট্রের দিকে বাংলাদেশের কৌশলগত ঝুঁকে পড়ার প্রমাণ নয়। বরং এটি এমন একটি সময়ে দুই দেশের সম্পর্কের ইতিবাচক গতিপথের সংকেত, যখন বাংলাদেশ একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে তার দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব বজায় রেখে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করছে।

চিঠির মূল তাৎপর্য তাই বোয়িংয়ের বাইরে। এটি দেখাচ্ছে যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, ভৌগোলিক অবস্থান এবং আঞ্চলিক গুরুত্ব যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের কাছে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও ওয়াশিংটনের কাছে ঢাকার কৌশলগত মূল্য বাড়াচ্ছে।

সফল কূটনীতি হবে সেটিই, যেখানে বাংলাদেশ কারও প্রতিপক্ষ না হয়ে সবার সঙ্গে কাজ করবে, কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা যেমন চীনের বিরুদ্ধে হওয়া উচিত নয়, তেমনি চীনের সঙ্গে সহযোগিতাও যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী হওয়ার প্রয়োজন নেই।

বাংলাদেশের প্রতিটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের চূড়ান্ত মানদণ্ড হওয়া উচিত দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থ।

বর্তমানে বহুমেরু (Multipolar) বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে তার ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান– কোনো একক শক্তির অনুসারী নয়, বরং নিজের জাতীয় স্বার্থে বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সহযোগিতায় সক্ষম একটি স্বাধীন রাষ্ট্র।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের চিঠি তাই শেষ কথা নয়, বরং একটি সম্ভাব্য নতুন অধ্যায়ের সূচনা। বোয়িং দিয়ে যে কথোপকথন শুরু হয়েছে, সেটি যদি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সহযোগিতায় বিস্তৃত করা যায়, তাহলে এই ছোট চিঠিটিই ভবিষ্যতে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

লেখক : মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড. একেএম শামছুল ইসলাম, পিএসসি, জি (অব.)।

মার্কিন নির্বাচনের সময় ইরান হামলা চালাতে পারে: সাবেক রাষ্ট্রদূত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৩৬ পূর্বাহ্ণ
মার্কিন নির্বাচনের সময় ইরান হামলা চালাতে পারে: সাবেক রাষ্ট্রদূত

আগামী ছয় সপ্তাহের মধ্যে ইরান আকস্মিক কোনো হামলা চালাতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিউনিশিয়ায় দায়িত্ব পালন করা যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত জোয়ে হুড। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের সময়কে ইরান সম্ভাব্য হামলার জন্য বেছে নিতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।

শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ আশঙ্কার কথা জানান সাবেক এই মার্কিন কূটনীতিক।

জোয়ে হুড বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলার ক্ষেত্রে ইরানের একটি ইতিহাস রয়েছে। অতীতের বিভিন্ন মার্কিন প্রশাসনের সময়ও নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তেহরান এমন পদক্ষেপ নিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

তিনি বলেন, আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এ সময় জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করাকে ইরান একটি সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।

সাবেক এই রাষ্ট্রদূতের মতে, মার্কিন ভোটাররা পেট্রোলের দামের বিষয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল। ফলে তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলে তা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।

এদিকে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো সরাসরি আলোচনা চলছে না। দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন জোয়ে হুড। তবে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো কার্যকর উদ্যোগ নিলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

তিনি বলেন, মধ্যস্থতাকারীরা যদি চমকপ্রদ কোনো উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসতে না পারে, তাহলে চলমান কূটনৈতিক তৎপরতার কার্যকারিতা খুব বেশি হবে না।

হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা কমাতেও তৃতীয় পক্ষের উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। তার ভাষ্য, মক্কা চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো তাদের নৌশক্তি নিয়ে উপসাগর ও উত্তর আরব সাগরে উপস্থিত হয়ে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। এতে জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধের প্রয়োজনীয়তাও কমতে পারে।

তবে জোয়ে হুডের বক্তব্যটি একটি আশঙ্কা ও বিশ্লেষণ, ইরানের হামলার নিশ্চিত ঘোষণা নয়।

সূত্র: আলজাজিরা

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি

সরবরাহ সংকটে বিশ্ববাজারে খাদ্যের দাম বাড়ছে: এফএও

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৪৮ অপরাহ্ণ
সরবরাহ সংকটে বিশ্ববাজারে খাদ্যের দাম বাড়ছে: এফএও

বিশ্বজুড়ে খাদ্যপণ্যের দাম চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। যুদ্ধ, চরম আবহাওয়া ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্নের কারণে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)।

শুক্রবার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে এফএওর খাদ্যমূল্য সূচক টানা তৃতীয় মাসের মতো বেড়ে ১৩৩ দশমিক ৩ পয়েন্টে পৌঁছেছে। ২০২২ সালের শেষ দিকের পর এটিই সূচকটির সর্বোচ্চ অবস্থান।

এফএও জানিয়েছে, শস্য, উদ্ভিজ্জ তেল, চিনি, মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্য—সব প্রধান খাদ্যপণ্যের দামই আগস্টে বেড়েছে। এর মধ্যে চিনির দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে, যা জুলাইয়ের তুলনায় প্রায় ১২ শতাংশ বেশি। গত এক বছরের মধ্যে চিনির দামও সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

খাদ্যশস্যের দাম দুই শতাংশের বেশি বেড়ে দুই বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। কৃষ্ণসাগরে সামরিক হামলার কারণে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে গম ও ভুট্টা রপ্তানিতেও প্রভাব পড়ছে।

এফএওর প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরো বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার ফলে খাদ্য সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এদিকে সার সরবরাহ নিয়েও নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধার কারণে আন্তর্জাতিক সার বাণিজ্যে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য সরবরাহ আরও চাপে পড়তে পারে।

বিশ্ব উষ্ণায়ন ও এল নিনোর প্রভাবে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। ইউরোপে তীব্র তাপপ্রবাহে ফসলের উৎপাদন কমেছে। একই সঙ্গে এশিয়ায় খাদ্যশস্য উৎপাদনও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি সতর্ক করে বলেছে, চরম আবহাওয়ার কারণে আগামী বছরের শেষ নাগাদ আরও প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ তীব্র ক্ষুধার মুখে পড়তে পারে।

বিশ্ববাজারে পাইকারি খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লে কয়েক মাসের মধ্যে এর প্রভাব সাধারণ ভোক্তার ওপরও পড়ে। ফলে খাদ্যমূল্যের এই ঊর্ধ্বগতি বিশ্বজুড়ে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি 

খাদ্যগুদাম প্রকল্পে শুধু সময়ই বাড়ে

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:৩৭ অপরাহ্ণ
খাদ্যগুদাম প্রকল্পে শুধু সময়ই বাড়ে

খাদ্যশস্য রাখার জায়গা বাড়াতে একের পর এক প্রকল্প। বরাদ্দ হচ্ছে হাজার কোটি টাকা। কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হচ্ছে, বাড়ছে ব্যয়, তবু বাড়ছে না কাঙ্ক্ষিত সংরক্ষণ সক্ষমতা। কোথাও তিন বছরেও কাজ এগিয়েছে মাত্র ২৫ শতাংশ, কোথাও এক যুগ পেরিয়েও শেষ হয়নি নির্মাণ। আবার রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া একটি প্রকল্পে মাটি খোঁড়ার পরই থেমে গেছে কাজ। পরে যৌক্তিকতা না পাওয়ায় সেটি অসমাপ্ত রেখেই সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারি খাদ্যগুদামের সক্ষমতা বাড়ানোর নামে নেওয়া চার প্রকল্পে মোট ৫ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। অথচ প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি, দফায় দফায় সংশোধন, মেয়াদ বৃদ্ধি এবং কোথাও কোথাও স্থান পরিবর্তনের কারণে এসব বিনিয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। খাদ্য সংরক্ষণ সক্ষমতার ঘাটতি কাটাতে গিয়ে সরকারি অর্থের অপচয় কিংবা অনিয়মের সুযোগ তৈরি হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও এখন সামনে। খাদ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য এবং পরিকল্পনা কমিশন ও বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) পর্যবেক্ষণে এসব চিত্র উঠে এসেছে।

তিন বছরেও এক-চতুর্থাংশ কাজ
২০২৩ সালের জুলাইয়ে ৮৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫৩ জেলায় নতুন খাদ্যগুদাম নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। ১৪৫টি স্থাপনায় মোট ১৯৫টি গুদাম নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিক ব্যয় ৮১৪ কোটি টাকা থাকলেও পরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৫৫ কোটি টাকা। শুধু ব্যয়ই বাড়েনি, বেড়েছে সময়ও। ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। আইএমইডির হিসাবে, ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ২৫ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ২১ দশমিক ১১ শতাংশ। এরই মধ্যে ব্যয় হয়েছে ১৭৮ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। আইএমইডির পর্যবেক্ষণে মাদারীপুরের কালকিনি ও বাগেরহাট প্যাকেজে ধীরগতি দেখা গেছে। গাছ ও পুরোনো অবকাঠামো সরাতেও সময় লেগেছে। শরীয়তপুরের আঙ্গারিয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল, দিনাজপুরের ফুলবাড়ী ও বিরল এবং মোংলা এলএসডিতে জায়গার সংকট রয়েছে। এ ছাড়া লে-আউট জটিলতা, প্রকল্পের স্থান পরিবর্তন, প্রশাসনিক অনুমোদন ও দরপত্র প্রক্রিয়াতেও বিলম্ব হয়েছে। প্রকল্প পরিচালক মো. সোহেলুর রহমান খান বলেন, সময়মতো পরিচালক নিয়োগ না হওয়া, নির্ধারিত স্থানে কাজ করতে না পারা, স্থান পরিবর্তন এবং রেট শিডিউলের কারণে ব্যয় কিছুটা বেড়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন প্রকল্প পরিচালক টেন্ডারের উদ্যোগ নিলেও কাজ করা সম্ভব হয়নি। তবে বর্তমানে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা তিনি দাবি করেন, আগের প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে প্রকল্পের কার্যক্রম এখন সন্তোষজনকভাবে এগোচ্ছে।

এক যুগেও শেষ হয়নি ৩ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকার প্রকল্প
সরকারি খাদ্য সংরক্ষণ অবকাঠামোর সবচেয়ে বড় প্রকল্পগুলোর একটি শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালে। ৩ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪ লাখ ৮৭ হাজার টন ধারণক্ষমতার সাতটি আধুনিক স্টিল সাইলো নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। বরিশাল, নারায়ণগঞ্জ, আশুগঞ্জ, ময়মনসিংহ, খুলনার মহেশ্বরপাশা, চট্টগ্রাম ও মধুপুরে এসব সাইলো নির্মাণের কথা। প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের ঋণ রয়েছে ৩ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা। চার দফা সংশোধনের পর মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়েও পুরো কাজ শেষ হয়নি। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৬৯৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ মোট ব্যয়ের ৯৫ দশমিক ০৫ শতাংশই খরচ হয়ে গেছে। তারপরও বাকি কাজ শেষ করতে আবারও মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে। প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন জানান, প্রকল্পের মূল কার্যালয় ঢাকার প্রবাসী কল্যাণ ভবনে। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিয়মিত বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না বলেও জানান তিনি।

রাজনৈতিক প্রকল্প, শেষ পর্যন্ত বাতিল
খাদ্য সংরক্ষণ অবকাঠামো নির্মাণে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগও রয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের নির্বাচনি এলাকা নওগাঁর মহাদেবপুরে ৩৬৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪৮ হাজার টন ধারণক্ষমতার চালের সাইলো নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হয়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রকল্পটি পর্যালোচনায় আসে। এরপর দেখা যায়, ভূমি অধিগ্রহণ ও মাটি খোঁড়া ছাড়া বাস্তবে আর কোনো কাজ এগোয়নি। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি ছিল শূন্য। প্রকল্প পরিচালক মোস্তাক আহমেদ জানান, নতুন ফিজিবিলিটি স্টাডিতে মহাদেবপুরে প্রকল্পটি নেওয়ার যৌক্তিকতা পাওয়া যায়নি। ফলে অসমাপ্ত অবস্থায় রেখেই প্রকল্পটি সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—যে প্রকল্পের যৌক্তিকতাই শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেল না, সেটির পেছনে প্রাথমিক পর্যায়ে ৩৬৭ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রয়োজন কেন হয়েছিল?

মেরামতের প্রকল্পেও ধীরগতি
ক্ষতিগ্রস্ত খাদ্যগুদাম ও আনুষঙ্গিক অবকাঠামো মেরামতে ২৫৫ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এটি শেষ করার কথা। লক্ষ্য ছিল সরকারি খাদ্য সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানো, খাদ্যশস্যের অপচয় কমানো, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। কিন্তু ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি ৩২ শতাংশ হলেও আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ৩ শতাংশ। প্রকল্প পরিচালক এ টি এম কাউছার হোসেন জানান, সময়মতো বাজেট বরাদ্দ না পাওয়ায় কাজ কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোয়নি। ঠিকাদারদের বিলও আটকে রয়েছে।

সরকারি গুদাম বনাম বেসরকারি সক্ষমতা
স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও সরকারি খাদ্য সংরক্ষণ সক্ষমতা প্রয়োজনের তুলনায় কম। সরকারি গুদামে বর্তমানে প্রায় ২২ থেকে ২৩ লাখ টন খাদ্যশস্য রাখা যায়। বিপরীতে বেসরকারি খাতের ধারণক্ষমতা প্রায় ১ কোটি টন। অর্থাৎ বিপুল সরকারি বিনিয়োগের পরও সংরক্ষণ সক্ষমতার বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। বাংলাদেশ অ্যাগ্রোকেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কৃষিবিদ কে এস এম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শুধু সরকারি ব্যবস্থাপনায় গুদাম নির্মাণ টেকসই সমাধান নয়। সহজ শর্তে ঋণ, কর অবকাশ ও ভর্তুকির মাধ্যমে বেসরকারি খাতকে খাদ্য সংরক্ষণে যুক্ত করা যেতে পারে। তার মতে, প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়তে থাকলে সরকারি অর্থ অপচয়ের পাশাপাশি অনিয়ম-দুর্নীতির আশঙ্কাও তৈরি হয়। তাই ব্যয় নির্ধারণ, দরপত্র, নির্মাণকাজের মান এবং অর্থ ব্যয়ে কঠোর নজরদারি জরুরি।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের নজরদারি কতটা?
খাদ্যশস্যের সরবরাহ ও মজুদ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম কিংবা গাফিলতি পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা। সম্প্রতি মানিকগঞ্জে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, দুর্যোগ কিংবা জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ রাখতে হবে। দায়িত্ব পালনে গাফিলতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে বাস্তবতা হলো, একদিকে খাদ্য সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ, অন্যদিকে সেই লক্ষ্যেই নেওয়া প্রকল্পের ধীরগতি। কোথাও ব্যয় বাড়ছে, কোথাও মেয়াদ; কোথাও আবার প্রকল্পের যৌক্তিকতাই প্রশ্নের মুখে। ৫ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকার এই চার প্রকল্প তাই শুধু গুদাম নির্মাণের হিসাব নয়—এটি সরকারি প্রকল্প পরিকল্পনা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিরও পরীক্ষা। খাদ্য নিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর খাতে জনগণের অর্থ খরচ করে যদি সময়মতো গুদামই না হয়, তাহলে সেই বিনিয়োগের সুফল শেষ পর্যন্ত যাবে কোথায়—এ প্রশ্নের উত্তর এখন সংশ্লিষ্টদেরই দিতে হবে।

কালের আলো/এম/এএইচ