ইন্দোনেশিয়ার রিয়াউ দ্বীপপুঞ্জের নিরিবিলি এক কোণে গড়ে উঠেছে বিলাসবহুল অবকাশকেন্দ্র বাওয়াহ রিজার্ভ। সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার কাছাকাছি অবস্থিত এই দ্বীপে বিলাসিতা, নির্জনতা আর প্রকৃতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন। তবে অন্য অনেক বিলাসবহুল রিসোর্টের চেয়ে বাওয়াহকে আলাদা করেছে একটি বিশেষ আয়োজন—সামুদ্রিক কচ্ছপ সংরক্ষণ।
সন্ধ্যা নামতেই রিসোর্টের অতিথিদের ফোনে ভেসে আসে জরুরি বার্তা—সৈকতে কচ্ছপের বাচ্চা বের হয়েছে, সাগরের দিকে তাদের যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে।
রিসোর্টের সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানীরা রিয়াউ দ্বীপপুঞ্জের বিভিন্ন দ্বীপে ঘুরে কচ্ছপের ডিম সংগ্রহ করেন। শিকারি প্রাণীর হাত থেকে ডিমগুলো রক্ষা করতে সেগুলো বাওয়াহর একটি নিরাপদ, ঢাকনাযুক্ত স্থানে সংরক্ষণ করা হয়। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হওয়ার পুরো প্রক্রিয়াও পর্যবেক্ষণ করেন তারা।
কচ্ছপের বাচ্চাগুলোর সাগরে যাওয়ার পথটিও বিশেষভাবে তৈরি। বালুর ওপর তৈরি সরু পথটির দুপাশে ছোট দেয়াল থাকায় কচ্ছপগুলো পথ হারিয়ে অন্যদিকে চলে যেতে পারে না। শেষ পর্যন্ত সেই পথ ধরে তারা পৌঁছে যায় সমুদ্রে।
কচ্ছপের ডাকেই রাতের খাবার ফেলে ছুট
কোনো ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়েছে—বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হওয়ার পরই অতিথিদের জানানো হয়। আর সেই বার্তা পেয়েই অনেকে রাতের খাবার ফেলে কিংবা অন্য আয়োজন বাদ দিয়ে ছুটে যান সৈকতে।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকদের কাছে কয়েক মিনিটের এই দৃশ্য এতটাই আকর্ষণীয় যে, এর জন্য তারা হাজার হাজার ডলার খরচ করতেও প্রস্তুত।
ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় ১৭ হাজার দ্বীপ রয়েছে। রিয়াউ দ্বীপপুঞ্জ দেশটির উত্তরাঞ্চলের একটি বিশাল দ্বীপমালা। বাওয়াহ রিজার্ভের মালিকানায় রয়েছে এই অঞ্চলের ছয়টি দ্বীপ। দক্ষিণ চীন সাগরের নিরিবিলি অংশে তাই গড়ে উঠেছে তাদের একান্ত অবকাশকেন্দ্র।
শুরুতেই পেরোতে হয় দীর্ঘ পথ
বাওয়াহ রিজার্ভে পৌঁছানোও কম রোমাঞ্চকর নয়। সাধারণত যাত্রা শুরু হয় সিঙ্গাপুর থেকে। সেখান থেকে গাড়িতে করে ফেরিঘাটে গিয়ে পাসপোর্ট নিয়ন্ত্রণ শেষে ফেরিতে পাড়ি দিতে হয় সিঙ্গাপুর প্রণালি। এরপর ইন্দোনেশিয়ার বাতাম দ্বীপে পৌঁছে অতিথিদের নেওয়া হয় হাং নাদিম বিমানবন্দরে।
সেখানেই অপেক্ষা করে ব্যক্তিগত জলবিমান। সর্বোচ্চ ১০ জন যাত্রী বহন করতে পারে একেকটি বিমান। বাওয়াহর জন্য রয়েছে দুটি জলবিমান—একটি নীল ও অন্যটি সবুজ।
বিমানে মালপত্রের ক্ষেত্রেও রয়েছে কঠোর নিয়ম। প্রত্যেক অতিথি সর্বোচ্চ ১৫ কেজি মালপত্র নিতে পারেন। এমনকি বিমানে ওঠার আগে যাত্রী ও তার লাগেজের সম্মিলিত ওজনও পরীক্ষা করা হয়।
বাতাম থেকে প্রায় ৭৫ মিনিট উড়ে জলবিমানটি বাওয়াহর সরু জেটির পাশে পানিতে অবতরণ করে। সেখানে রিসোর্টের কর্মীরা অতিথিদের স্বাগত জানান ঠান্ডা তোয়ালে দিয়ে।
দ্বীপে পৌঁছেই বদলে যায় জীবন
দীর্ঘ ভ্রমণের পর বাওয়াহর সবুজ ও শান্ত পরিবেশে পৌঁছালে বাইরের পৃথিবী যেন অনেক দূরে চলে যায়। ব্যক্তিগত বাটলাররা অতিথিদের স্যুটে পৌঁছে দেন। কোথাও নেই ব্যস্ত শহরের শব্দ, নেই যানজট কিংবা মানুষের ভিড়।
দ্বীপজুড়ে ওয়াই-ফাই থাকলেও যারা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন থাকতে চান, তাদের জন্য রয়েছে আলাদা ব্যবস্থা। কনসিয়ার্জের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য দেওয়া হয় সাধারণ ফোন।
এখানে থাকার খরচও সাধারণ পর্যটকের নাগালের বাইরে। সবচেয়ে সাধারণ কক্ষের ভাড়া শুরু প্রায় ১ হাজার ৯৮০ ডলার থেকে। দ্বীপে যাতায়াতের জটিলতার কারণে অতিথিদের অন্তত তিন রাত থাকতে হয়।
এই খরচের মধ্যে থাকে প্রতিদিন তিন বেলা খাবার এবং একটি স্পা সেবা। চাইলে অতিরিক্ত খরচে ব্যক্তিগত সৈকতভোজের আয়োজনও করা যায়। এর খরচ প্রায় ১ হাজার ডলার।
সবচেয়ে বিলাসবহুল চার শয়নকক্ষের স্যুটে রয়েছে নিজস্ব ইনফিনিটি পুল। ভরা মৌসুমে সেখানে এক রাতের ভাড়া প্রায় ১২ হাজার ৩০০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে।
শুধু বিশ্রাম নয়, আছে নানা আয়োজন
বাওয়াহর বিশেষত্ব শুধু বিলাসিতা নয়। সক্রিয় জীবনযাপন পছন্দ করা অতিথিদের জন্য রয়েছে নানা ধরনের আয়োজন। স্নরকেলিং, স্কুবা ডাইভিং, খোলা সাগরে সাঁতার, কফি সংগ্রহ ও সুগন্ধি তৈরির কর্মশালার মতো কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
প্রতিদিন পানির ওপর তৈরি একটি ছোট বাংলোয় যোগব্যায়ামের ক্লাস হয়। সেখানে ব্যায়ামের সরঞ্জাম ও ভারোত্তোলনের ব্যবস্থাও রয়েছে।
রিসোর্টের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা পল রবিনসনের ভাষায়, বাওয়াহ এমন অতিথিদের জন্য, যারা হয়তো মালদ্বীপের মতো জায়গায় ‘বিরক্ত’। অর্থাৎ যারা শুধু বিলাসবহুল বাংলোয় বসে থাকতে চান না, বরং প্রকৃতির মধ্যে সক্রিয় সময় কাটাতে চান।
বিলাসিতার সঙ্গে প্রকৃতির বন্ধুত্ব
বাওয়াহর আরেকটি বিশেষত্ব হলো স্থানীয় সংস্কৃতি ও প্রকৃতিকে গুরুত্ব দেওয়া। স্থানীয় উপাদান ও সামুদ্রিক খাবারনির্ভর খাবারের পাশাপাশি সপ্তাহে দুই রাত সমুদ্রসৈকতের রেস্তোরাঁকে ইন্দোনেশীয় খোলা বাজারের আদলে সাজানো হয়।
দ্বীপের ছোট দোকানে পুনর্ব্যবহৃত সামুদ্রিক প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রি হয়। লাইব্রেরিতে রয়েছে ইন্দোনেশিয়ার সংস্কৃতি ও স্থানীয় উদ্ভিদ নিয়ে বইয়ের পাশাপাশি গল্প ও থ্রিলারও।
অতিথিদের পছন্দও গুরুত্ব দিয়ে মনে রাখেন কর্মীরা। কারও নির্দিষ্ট খাবারে অ্যালার্জি থাকলে তা এড়িয়ে চলা হয়, আবার কেউ কোন পানীয় পছন্দ করেন—সেটিও খেয়াল রাখা হয়।
চেক-ইনের প্রায় এক সপ্তাহ আগেই অতিথিদের ঘুমের অভ্যাস, খাবারের পছন্দ ও অ্যালার্জিসহ বিভিন্ন তথ্য নেওয়া হয়। সেই অনুযায়ী সাজানো হয় পুরো থাকার অভিজ্ঞতা।
শেষ পর্যন্ত যে বিলাসিতা—নির্জনতা
বাওয়াহ রিজার্ভের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হয়তো তার দামি স্যুট, ব্যক্তিগত সৈকত কিংবা জলবিমান নয়। বরং ব্যস্ত পৃথিবী থেকে কয়েক দিনের জন্য পুরোপুরি দূরে সরে যাওয়ার সুযোগ।
এখানে বিলাসিতা মানে সোনার কল বা বড় ব্র্যান্ডের প্রদর্শন নয়। স্থানীয় কাঠের বাথটাব, সমুদ্রের বাতাস, নরম আলো, সবুজ দ্বীপ আর রাতের নীরবতাই হয়ে ওঠে বিলাসিতার অংশ।
আর সেই বিলাসিতার মাঝেই হঠাৎ ফোনে আসে একটি ছোট বার্তা—‘কচ্ছপের বাচ্চা বের হয়েছে।’
তখন হাজার হাজার ডলার খরচ করে আসা অতিথিরাও ছুটে যান সৈকতে। কয়েক মিনিটের জন্য তারা ভুলে যান বিলাসবহুল স্যুট, দামি খাবার কিংবা স্পা। চোখের সামনে দেখতে থাকেন ছোট্ট কচ্ছপের সমুদ্রের দিকে প্রথম যাত্রা।
বাওয়াহর আসল গল্পটা হয়তো এখানেই—অসাধারণ বিলাসিতার মাঝেও প্রকৃতির সবচেয়ে ছোট ও অসহায় প্রাণীর জন্য জায়গা করে দেওয়া।
কালের আলো/এসএ
আপনার মতামত লিখুন
Array