ইসলামের স্বর্ণযুগের অন্যতম নায়ক হারুন আল-রশিদ
আব্বাসীয় খিলাফতের পঞ্চম খলিফা হারুন আল-রশিদ ইসলামের ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত শাসক। ৭৮৬ থেকে ৮০৯ সাল পর্যন্ত তাঁর শাসনামলকে আব্বাসীয় খিলাফতের সমৃদ্ধির অন্যতম শীর্ষ সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁর সময়ে বিজ্ঞান, সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিল্প ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে উল্লেখযোগ্য বিকাশ ঘটে।
হারুন আল-রশিদের জন্মতারিখ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে তাঁর জন্ম ১৭ মার্চ ৭৬৩ অথবা ফেব্রুয়ারি ৭৬৬ সালে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বর্তমান ইরানের তেহরান প্রদেশের অন্তর্গত ঐতিহাসিক রে শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন আব্বাসীয় খলিফা আল-মাহদি এবং মা ছিলেন আল-খায়জুরান।
তরুণ বয়সেই সামরিক নেতৃত্ব
খলিফা হওয়ার আগে হারুন বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে দুটি সামরিক অভিযানে নেতৃত্ব দেন। ৭৮০ ও ৭৮২ সালের এসব অভিযানের দ্বিতীয়টি কনস্টান্টিনোপলের এশীয় উপকণ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছেছিল বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
৭৮৬ সালে তরুণ বয়সেই তিনি খলিফার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দক্ষ মন্ত্রী ও প্রশাসকদের সহযোগিতায় তাঁর শাসনামলে সাম্রাজ্যের প্রশাসন শক্তিশালী হয় এবং বাগদাদ সমকালীন বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ ও জাঁকজমকপূর্ণ নগরীতে পরিণত হয়।
রাক্কায় সরিয়ে নেন রাজদরবার
৭৯৬ সালে হারুন তাঁর রাজদরবার ও প্রশাসনের বড় অংশ বাগদাদ থেকে ইউফ্রেটিস নদীর তীরবর্তী রাক্কায় স্থানান্তর করেন। বাইজেন্টাইন সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থান, নদীপথে বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ এবং কৃষি ও সামরিক সুবিধার কারণে রাক্কা গুরুত্বপূর্ণ সাম্রাজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হয়।
হারুনের প্রশাসনে ইয়াহইয়া ইবনে খালিদ আল-বারমাকি এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দীর্ঘদিন তাঁরা খলিফার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তবে পরে বারমাকিদের সঙ্গে হারুনের সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং তাঁদের ক্ষমতা ও সম্পদ কেড়ে নেওয়া হয়।
জ্ঞান-বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষকতা
হারুন আল-রশিদের শাসনামল আব্বাসীয় সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এ সময় জ্ঞানচর্চা, সাহিত্য, সংগীত, শিল্প ও ধর্মীয় শিক্ষার প্রসার ঘটে। পরবর্তী সময়ে আব্বাসীয় জ্ঞানচর্চার অন্যতম প্রতীক হয়ে ওঠে ‘বায়তুল হিকমা’ বা জ্ঞানগৃহ।
তবে ঐতিহাসিকভাবে বায়তুল হিকমার প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ বিশেষভাবে হারুনের উত্তরসূরি আল-মামুনের আমলে ঘটে বলে অনেক গবেষক মনে করেন। তাই হারুনের সময়কে এর প্রাথমিক ভিত্তি ও অনুবাদ-জ্ঞানচর্চার পরিবেশ তৈরির গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিসংগত।
শার্লেমানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক
হারুন আল-রশিদের সঙ্গে ইউরোপীয় শাসক শার্লেমানের কূটনৈতিক যোগাযোগও ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য। দুই পক্ষের মধ্যে দূত ও উপহার বিনিময় হয়েছিল। ৮০২ সালে হারুন শার্লেমানকে হাতি, জলঘড়ি, রেশম, সুগন্ধি ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী উপহার দেন বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়।
হারুনের পাঠানো ‘আবুল-আব্বাস’ নামের হাতিটি ইউরোপে বিশেষ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। একইভাবে তাঁর জলঘড়ির যান্ত্রিক ব্যবস্থা সে সময় ইউরোপীয়দের কাছে অত্যন্ত বিস্ময়কর ছিল।
বাইজেন্টাইনদের সঙ্গে সংঘাত
হারুনের শাসনামলে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সঙ্গেও একাধিকবার সংঘাত হয়। ৮০২ সালে সম্রাজ্ঞী আইরিন ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর নাইকিফোরোস প্রথম ক্ষমতায় এসে আব্বাসীয়দের কর দিতে অস্বীকৃতি জানান। এর প্রতিক্রিয়ায় হারুন সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন এবং শেষ পর্যন্ত বাইজেন্টাইন সম্রাটকে চুক্তিতে যেতে বাধ্য করেন।
এ ছাড়া তাং চীনের সঙ্গেও আব্বাসীয়দের কূটনৈতিক যোগাযোগ ছিল। তাং রাজবংশের নথিতে হারুনকে ‘আ-লুন’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে মৃত্যু
জীবনের শেষদিকে সামরকন্দে রাফি ইবনে আল-লাইথের নেতৃত্বে বড় ধরনের বিদ্রোহ শুরু হলে হারুন নিজেই খোরাসানের দিকে রওনা হন। বিদ্রোহ দমনের চেষ্টা চলাকালে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন।
৮০৯ সালের ২৪ মার্চ তুসের কাছে সানাবাদে হারুন আল-রশিদ মারা যান। তাঁকে সেখানে সমাহিত করা হয়। পরবর্তী সময়ে ইমাম আল-রিদার মৃত্যুর সঙ্গে স্থানটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় এবং ‘মাশহাদ’ নামটি প্রসিদ্ধ হয়।
উত্তরাধিকার ও গৃহযুদ্ধ
হারুন তাঁর সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার তাঁর দুই ছেলে আল-আমিন ও আল-মামুনের মধ্যে নির্ধারণ করেছিলেন। পরে তৃতীয় ছেলে আল-কাসিমকেও উত্তরাধিকার ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার নিয়ে দুই ভাইয়ের মধ্যে সংঘাত শুরু হয়।
আল-আমিন ও আল-মামুনের মধ্যকার গৃহযুদ্ধ আব্বাসীয় সাম্রাজ্যকে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার মধ্যে ফেলে। শেষ পর্যন্ত আল-মামুনের বিজয়ের মাধ্যমে ৮২৭ সালে এই সংঘাতের অবসান ঘটে।
হারুন আল-রশিদের শাসনামল তাই একদিকে আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তির উত্থানের প্রতীক, অন্যদিকে তাঁর উত্তরাধিকার পরিকল্পনার দুর্বলতার কারণে পরবর্তী রাজনৈতিক সংঘাতেরও অন্যতম ভিত্তি। তাঁর সময়ের সাংস্কৃতিক বিকাশ পরবর্তী আব্বাসীয় স্বর্ণযুগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছিল।
কালের আলো/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
Array