১৯২৬ সালের মার্চ। মাদারীপুর তখন ব্রিটিশবিরোধী রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সেই সময় নিখিল বঙ্গীয় ও আসাম প্রাদেশিক মৎস্যজীবী সম্মিলনীর তৃতীয় অধিবেশনকে ঘিরে শহরে তৈরি হয়েছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। মৎস্যজীবীদের অধিকার ও স্বার্থ নিয়ে আয়োজিত সেই সম্মেলনে অতিথি হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। শুধু অতিথি হিসেবেই নয়, তাঁর গান ও উপস্থিতি সম্মেলনের আবহকে দিয়েছিল ভিন্ন মাত্রা।
১৯২৬ সালের ১০ মার্চ সন্ধ্যায় স্টিমারযোগে মাদারীপুরে পৌঁছান নজরুল। তাঁর সঙ্গে ছিলেন সম্মেলনের সভাপতি হেমন্ত কুমার সরকার, বসন্ত কুমার মজুমদার ও হেমপ্রভা মজুমদার। তাঁদের স্বাগত জানাতে মাদারীপুর স্টিমারঘাটে জড়ো হয়েছিলেন প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ। স্থানীয় অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি ছিলেন ড. প্রতাপচন্দ্র গুহরায় এবং সম্পাদক কার্তিকচন্দ্র মল্ল বর্মণ।
পরদিন ১১ মার্চ সকালে শুরু হয় সম্মেলনের প্রথম অধিবেশন। নজরুল স্বরচিত উদ্দীপনামূলক গান ‘জেলেদের গান’ পরিবেশনের মাধ্যমে অধিবেশনের সূচনা করেন। পরে গানটি তাঁর ‘সর্বহারা’ কাব্যগ্রন্থে ‘ধীবরদের গান’ নামে সংকলিত হয়।
গানটির সূচনাই ছিল জাগরণের আহ্বান—
‘শোন্ রে ও ভাই জেলে,
এবার উঠ্ব রে সব ঠেলে।’
মৎস্যজীবীদের জীবনসংগ্রাম, শোষণ ও অধিকারবঞ্চনার বাস্তবতা গানটির মূল বিষয়। মুটে-মজুর, কৃষকসহ অন্যান্য শ্রমজীবী মানুষ যখন নিজেদের অধিকার আদায়ে সংগঠিত হচ্ছে, তখন মৎস্যজীবীরাও কেন পিছিয়ে থাকবে—এই প্রশ্নের মধ্য দিয়ে নজরুল তাঁদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
‘লাঙল’ পত্রিকার দ্বাদশ সংখ্যায় গানটি প্রকাশিত হওয়ার সময় এর নিচে উল্লেখ করা হয়েছিল যে এটি মাদারীপুরে অনুষ্ঠিত মৎস্যজীবী সম্মেলনের উদ্বোধনী সংগীত। ফলে গানটির সঙ্গে মাদারীপুরের ঐতিহাসিক সম্পর্কটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট।
বিপ্লবী মাদারীপুর ও প্রতাপচন্দ্র গুহরায়
নজরুলের মাদারীপুর সফরের পেছনে স্থানীয় রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। স্বদেশী আন্দোলনের সময় থেকেই মাদারীপুর বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তর সমিতির কার্যক্রমের পাশাপাশি স্থানীয় বিপ্লবী সংগঠনগুলোও সেখানে সক্রিয় ছিল।
পূর্ণচন্দ্র দাস ১৯২১ সালে গড়ে তোলেন ‘মাদারীপুর শান্তি সেনা সমিতি’। ড. প্রতাপচন্দ্র গুহরায়ও একসময় এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে তিনি গান্ধীর জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে যুক্ত হন এবং দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের নেতৃত্বে স্বরাজ্য দলে যোগ দেন।
১৯২৬ সালের মৎস্যজীবী সম্মেলনের অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি হিসেবে প্রতাপচন্দ্র গুহরায়ের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী, মৎস্যজীবী প্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে সম্মেলনটি বড় জনসমাবেশে পরিণত হয়েছিল।
উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে নজরুলের গান
সম্মেলনের একটি পর্যায়ে উদ্যোক্তা ও প্রতিনিধিদের মধ্যে মতপার্থক্য থেকে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সেই সময় নজরুল হারমোনিয়াম হাতে গান শুরু করেন। তাঁর সংগীত পরিবেশনের ফলে পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসে। পরে শ্রোতাদের অনুরোধে তিনি আরও গান পরিবেশন করেন।
এই ঘটনাটি নজরুলের সংগীতকে কেবল সাংস্কৃতিক বিনোদন হিসেবে নয়, জনসমাবেশে মানুষের আবেগ ও মনোভাবকে প্রভাবিত করার একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচনা করা যায়।
মাদারীপুরেই ‘হেমপ্রভা’
সম্মেলন শেষ হওয়ার পরও নজরুল মাদারীপুরে ছিলেন। ২৯ ফাল্গুন ১৩৩২ বঙ্গাব্দে, অর্থাৎ সম্মেলনের পরদিন, তিনি মাদারীপুরে বসেই রচনা করেন ‘হেমপ্রভা’।
গানটির নিচে কবি স্থান ও তারিখ হিসেবে লিখেছিলেন—‘মাদারীপুর, ২৯শে ফাল্গুন, ১৩৩২’। হেমপ্রভা মজুমদারের রাজনৈতিক তেজ, দেশপ্রেম ও ব্যক্তিত্বে অনুপ্রাণিত হয়েই এই গীতিকবিতা রচিত হয়েছিল বলে এর বিষয়বস্তু থেকে বোঝা যায়।
গানের শুরু—
‘এসো বাংলার চাঁদ-সুলতানা
বীর-মাতা বীর-জায়া গো।’
এখানে নজরুল একজন নারী রাজনৈতিক নেত্রীর মধ্যে দেশমাতৃকার মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ও সংগ্রামী চেতনাকে দেখতে পেয়েছেন। নারীজাগরণ, দেশপ্রেম এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা গানটির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
শতবর্ষে ফিরে দেখা
নজরুলের মাদারীপুর সফরের শতবর্ষ পূর্তি কেবল একটি ঐতিহাসিক তারিখ স্মরণ করার উপলক্ষ নয়; এটি মাদারীপুরের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও শ্রমজীবী মানুষের ইতিহাসকে নতুন করে সামনে আনার সুযোগ।
এই ঐতিহাসিক স্মৃতি সংরক্ষণে কয়েকটি উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। ১৯২৬ সালের স্টিমারঘাট বা মৎস্যজীবী সম্মেলনের স্থান শনাক্ত করে সেখানে স্মৃতিফলক স্থাপন করা যেতে পারে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ কোনো সড়ক, মিলনায়তন বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম নজরুলের নামে রাখা যেতে পারে।
জেলা শিল্পকলা একাডেমি বা পাবলিক লাইব্রেরিতে একটি ‘নজরুল কর্নার’ স্থাপন করে তাঁর বই, পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত লেখা এবং মাদারীপুর সফরসংক্রান্ত ঐতিহাসিক দলিল সংরক্ষণ করা যেতে পারে।
একই সঙ্গে ‘ধীবরদের গান’, ‘হেমপ্রভা’সহ মাদারীপুরে নজরুলের অবস্থান ও সৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত তথ্য জনসাধারণের কাছে তুলে ধরা যেতে পারে। আড়িয়াল খাঁ নদের তীরবর্তী কোনো এলাকায় মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের ইতিহাস ও নজরুলের সাম্যবাদী চেতনা তুলে ধরে একটি স্মারক স্থাপনও করা যেতে পারে।
সবশেষে, নজরুলের মাদারীপুর আগমনের শতবর্ষ উপলক্ষে সেমিনার, নজরুলসংগীত পরিবেশনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, গবেষণাভিত্তিক আলোচনা এবং একটি মানসম্মত স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করা যেতে পারে।
১৯২৬ সালে মাদারীপুরে নজরুলের আগমন ছিল একটি নির্দিষ্ট সম্মেলনকে কেন্দ্র করে। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া গান ও স্মৃতি সেই ঘটনাকে ছাড়িয়ে গেছে। মৎস্যজীবীদের অধিকার, শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম, সাম্য এবং স্বাধীনতার যে চেতনা তাঁর সৃষ্টিতে প্রতিফলিত হয়েছিল, শত বছর পরও তা মাদারীপুরের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে।
কালের আলো/এসএ
আপনার মতামত লিখুন
Array